Widget by:Baiozid khan
  • Advertisement

১৭ বছর ধরে মুজিবনগর স্মৃতিসৌধে

Published:2014-03-20 14:00:12    

মেহেরপুর প্রতিনিধি: ঐতিহাসিক মুজিবনগর স্মৃতিসৌধে ১৭ বছর ধরে স্বেচ্ছাশ্রম দিয়ে যাচ্ছেন সুভাষ মল্লিক। প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত তিনি এই স্মৃতিসৌধ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজে নিয়োজিত থাকেন।

দেশি-বিদেশি পর্যটকদের (বাংলা ও ইংরেজিতে) গাইড হিসেবে কাজ করেন তিনি। ১৭ বছর আগে স্মৃতিসৌধটি অবহেলিত অবস্থায় পড়ে থাকত। চোখের সামনে এই অবস্থা দেখতে না পেরে সব কাজকর্ম ফেলে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা এই স্মৃতিসৌধের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব নেন।

এর পর কেটে গেছে ১৭টি বছর। কিন্তু সুভাষের দায়িত্ব নেয়নি কেউ। এখন অভাবে, অনাহারে আর অর্ধাহারে কাটে তার জীবন-সংসার। মুজিবনগরের ছোট একটি গ্রাম ভবেরপাড়ার মৃত অনিল মল্লিকের ছেলে সুভাষ মল্লিক।

সুভাষের তিন সদস্যের পরিবার, যে পরিবারে নুন আনতে পান্তা ফুরায়। একমাত্র মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন অনেক কষ্টে। এখন স্মৃতিসৌধটিকে ঘিরেই তার স্বপ্ন ও সংগ্রাম। ঝড় বৃষ্টি-উপেক্ষা করে প্রতিদিন স্বেচ্ছাশ্রম দিয়ে যাচ্ছেন।

শুধু ১৭ এপ্রিলকে সামনে রেখে সরকারিভাবে স্মৃতিসৌধটি ধোয়ামোছা হয়। আর সারাবছর এই কাজটি করেন সুভাষ মল্লিক। সুভাষ মল্লিকের বয়স এখন ৬৬। ১৯৭১ সালে তখন তার বয়স ছিল ২৩। চোখের সামনে দেখেছেন মুজিবনগরে মুক্তিযুদ্ধের সূর্যোদয়।

১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল। এই দিনে মেহেরপুরের মুজিবনগরের অম্রকাননে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের শপথগ্রহণের মধ্য দিয়ে চোখ মেলেছিল নবজাতক শিশু বাংলাদেশ। বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুঞ্জয়ী মন্ত্রে দীক্ষিত বাঙালি যে রক্তাক্ত সংগ্রামের মধ্য দিয়ে অর্জন করে হাজার বছরের স্বপ্নলালিত এক সার্বভৌম রাষ্ট্র, যে সংগ্রামের আবেগমথিত উৎসমুখ ছিল মুজিবনগর সরকারের শপথগ্রহণ।

স্বাধীনতার সূতিকাগার ঐতিহাসিক এই স্থানটিকে বাঙালির নিকট চিরস্মরণীয় ও গৌরবোজ্জ্বল করে রাখার জন্য স্বাধীনতার পর ১৯৮৭ সালে তৎকালীন এরশাদ সরকার মুজিবনগর স্মৃতিসৌধ এবং রেস্ট হাউস নির্মাণ করে। সে আমলে ১৪ কোটি টাকা ব্যয়ে ২৩টি স্তম্ভবিশিষ্ট একটি স্মৃতিসৌধ নির্মিত হয়। ৩৯.৩৭ একর জমির উপর প্রায় ১ হাজার ৩০০টি বৃক্ষশোভিত অম্রকাননের নিরিবিলি সবুজ শান্ত পরিবেশে এক গর্বিত অহংকার নিয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে স্মৃতিসৌধটি।

২৩টি কংক্রিটের ত্রিকোণ দেওয়ালের সমন্বয়ে উদীয়মান সূর্যের প্রতিকৃতিকে পটভূমি করে মুজিবনগর স্মৃতিসৌধটি নির্মিত হয়েছে। ৪৩ বছর ধরে অনেক চড়াই-উৎড়াই পেরিয়ে বৈদ্যনাথতলার সেই আম্রকাননকে ঘিরে গড়ে উঠেছে মুজিবনগর কমপ্লেক্স। ১৯৪৮ সাল থেকে ১৯৭১ পর্যন্ত এই ২৩ বছর পাকিস্তানিদের নিপীড়ন, শোষণ আর নির্যাতনের প্রতীক ২৩টি স্তম্ভ।

পাশাপাশি বীর বাঙালির ক্রমবর্ধমান প্রতিরোধের প্রতীক ২৩টি দেওয়াল। ২ ফুট ৬ ইঞ্চি উচ্চতার বেদিটিতে অসংখ্য গোলাকার বৃত্ত দ্বারা স্বাধীনতা যুদ্ধে ৩০ লাখ শহীদের স্মৃতিচিহ্ন প্রতিফলিত হয়েছে। ৩ ফুট উচ্চতার অপর বেদিটির অসংখ্য নুড়িপাথর মুক্তিযুদ্ধকালীন সাড়ে ৭ কোটি ঐক্যবদ্ধ সংগ্রামী জনতার প্রতীক।

যেখানে প্রথম বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকার শপথগ্রহণ করেছিল, স্মৃতিসৌধের বেদিতে সেই স্থানকে লাল সিরামিকের ইট দিয়ে আয়তকার রণক্ষেত্র চিহ্নিত করা হয়েছে। স্মৃতিসৌধের বেদিতে আরোহণের জন্য রয়েছে একটি র‌্যাপ ও বের হওয়ার জন্য ৯টি সিঁড়ি, যা ৯ মাসের স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রতীক।

১৭ বছরে অনেক সরকার বদল হলেও ভ্যাগের বদল ঘটেনি সুভাষ মল্লিকের। অনেক এমপি, মন্ত্রী কথা দিয়েছেন; কিন্তু কেউ কথা রাখেননি। এখনো তার নিজের টাকায় ঝাড়ু তৈরি করে প্রতিদিনই পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ করে চলেছেন তিনি। বাংলা সংবাদের সঙ্গে একান্ত আলাপচারিতায় সুভাষ মল্লিক বলেন, ‘মৃত্যুর আগ পর্যন্ত আমি এই স্থানটিকে এভাবেই আগলে রাখব। আমি বেঁচে থাকতে এই পবিত্র স্থানটিকে অপরিচ্ছন্ন হতে দেব না।’ তার শেষ ইচ্ছার কথা জানিয়ে বাংলা সংবাদকে বলেন, ‘আমি বেশিকিছু চাই না।

আমি চাই স্থায়ীভাবে বা মাস্টাররোলে একটি চাকরি। শেষ বয়সে চলার মতো কিছু অর্থ। অনেক তদবির করে গত কয়েক বছর ধরে গনপূর্ত অফিস থেকে দুই হাজার টাকা পাচ্ছি, যা দিয়ে আমার সংসার চলে না।’ কয়েক দিন আগে অসুস্থ হয়ে হাসপাতালের বেডে থেকেও তিনি ভেবেছেন স্মৃতিসৌধের কথা। তিনি যে কদিন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন, সেই কদিন তার স্ত্রী স্মৃতিসৌধের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ করেছেন।

এই ১৭ বছরে এক সপ্তাহের জন্য কোনোদিন এই স্থানটি ছেড়ে কোথাও যাননি। কারণ তিনি না থাকলে আবার যদি অপরিচ্ছন্ন হয়ে পড়ে স্মৃতিসৌধটি। সব কষ্ট ভুলে শুধু স্মৃতিসৌধকে বুক দিয়ে আগলে রাখছেন তিনি।

এ ব্যাপারে গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আহসান উল্লাহ বাংলা সংবাদকে বলেন, ‘আমরা স্মৃতিসৌধসহ বিভিন্ন স্থানের জন্য মন্ত্রণালয়ে ৩৭ জন লোকবল চেয়ে চিঠি দিয়েছি। মন্ত্রণালয় থেকে যদি অনুমতি হয়ে যায়, তাহলে সুভাষ মল্লিকের একটা স্থায়ী চাকরি হবে বলে আমি মনে করি। তবে আপাতত গণপূর্ত বিভাগের ফান্ড থেকে তাকে কিছু অর্থ দেওয়া হয়।

জেলা প্রশাসক মাহমুদ হোসেন জানান, ‘সুভাষ মল্লিক দীর্ঘদিন যাবৎ এখানে কাজ করছেন বলে আমি জানি। এখনো মন্ত্রণালয় থেকে লোক নিয়োগের কোনো চিঠি না আসায় আমরা তাকে নিয়োগের আওতায় আনতে পারিনি। তবে দ্রুত যাতে মুজিবনগর স্মৃতিসৌধে লোকবল নিয়োগ দেওয়া যায়, এ জন্য আমরা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করছি।’

বাংলাসংবাদ২৪/রানী/মাক্কী

আরও সংবাদ