Widget by:Baiozid khan
শিরোনাম:

ঢাকা Wed September 26 2018 ,

খালা মা

Published:2015-05-23 19:56:04    
 
মোঃ শামীম মিয়া: আজ রতনের মন্টা খুব খারাপ। খালা মা আজ তার স্বামীর বাড়িতে গেয়েছেন। মাতা হারা ছেলেটার এক মাত্র খেলার সাথী খালা মা ছাড়া কেউ নেই। বড় ভাই রনক শুধু পড়ার শাসনই করে। বাবা ভালো একটা চাকুরী করেন শহরে। বাবা গ্রামে আসবে কয়েক দিনের মধ্যে রতন জানে। তবুও ওর মন্টা আনন্দ খুজে পায় না। মা মারা যাওয়ার পর থেকে বাবাও কেমন যেন হয়ে গেছেন মনে মনে বলে রতন। রতন তার খালাকে খালা মা, বলেই ডাকে। আম গাছটার নিচে বসে কী যেন ভাবছে রতন।
হঠাৎ রতনের চোখ যায় পশ্চিম দিকে পিট্টুর মা পিট্টকে আদর করে কি যেন খাওয়াচ্ছে। রতনের মনে পরে গেলো, ওর মার কথা। মা ওকেও ঠিক এই রকমই ভালোবাসতো। আদর করে কত কি কিনে দিতো। রতনের মনে পরে গেলো সেই ছোট্ট বেলায় মার শাড়ীর আঁচল ধরে কাঁদার কথা। মায়ের মততা মাখা মুখে বকা খাওয়ার কথা। যত অপরাধিই করুক না কেন, বুকে রতনের থাই ছিলোই। তবে মা কোনদিন রতনকে একটা ফুলের টুকা দেয়নী। আজ মা নেই, অল্প একটু অপরাধেই রতনকে ওর দাদী অনেক মারে। খালা মা রতন কে ঠিক মায়ের মতই ভালোবাসে, রতনও খালা মাকে খুব ভালোবাসে।
মায়ের মুখ খানা রতনের মনে পড়াই তার দু-চোখের দু-কোণায় দু-ফোটা জল চিকচিক করছে। কোথা থেকে যেন বড় ভাই রনক সাইকেলের ব্যাল বাজাতে বাজাতে এলো, সেই আম গাছটার নিচে। ভাইয়া জানে আজ খালা মা চলে যাওয়ার কারণে রতনের মন্টা বেশ খারাপ। তাই পড়ার কথা না বলে, বললো, রতন সাইকেলে উঠো মাঠ থেকে ঘুরে আসি। রতনের মন্টা চাইছিলো না, সে ভাইয়ার সাইকেলে করে মাঠে যাক। রতন পিট্টুর মা এবং পিট্টুর দিকে তাকিয়ে আছে, আসলে সে দেখছে পিট্টুর মা পিট্টুকে কীভাবে আদর করে। রতন, তার ভাইয়াকে কোন কিছুতে না বলে না। তাই সে ভাইয়ার সাইকেলের পিছনে বসে চললো, মাঠের দিকে। তবে যত দুর চোখ যায় ততদুর পযন্ত দেখেছিলো রতন, পিট্টু এবং পিট্টুর মায়ের দিকে। 
কিছুদুর যেতেই রনক রতনকে বললো, জানো আজ রাতে বাবা আসচ্ছে ? রতন মাথা নাড়িয়ে আস্তে কন্ঠে বললো, না। রনক বেশ খুশি বাবা আসার কথা শুনে, কারন রনক বাবার কাছ থেকে যা চায় তাই পায়। রতনকেও দেয় বা দিবে তবে রতন কোনদিন বাবার কাছে কিছু চায় না। বাবা এলেই বলতো, বাবা মা কবে আসবে ? বাবার মুখটা মায়াবীতে ভরে যেতো। বলতো, বাবা তোমার মা অনেক দুর চলে গেছে সেখান থেকে আসতে অনেক সময় লাগবে। সেই কথা শুনে রতন চুপচাপ তার রুমে চলে যেতো। সাইকেলের পেছনে বসেই রতন ভাবছে সেই পথটা আবার কত দুর, যেখান থেকে আসতে এতো সময় লাগে।
রনক বললো, রতনকে, রতন তোমার স্কুল কবে খুলবে ? রতন বললো, শনিবারে খুলবে ভাইয়া। এই কথা ঐকথা বলতেই প্রায় সন্ধ্যা সন্ধ্যা ভাব হয়ে এলো, তাই তারা বাড়ির দিকে এলো। রতনকে বাড়ি এসে রনক বললো,ভাইয়া এখন পড়তে বসো। রতন মাথা নাড়িয়ে বললো ঠিক আছে।
রতন হাত মুখ ধুচ্ছে, এমন সময় দাদী বললো, রতন সারাটা দিন আজ কোথায় ছিলি বল তো ? রতন বললো, ভাইয়ার সাথে মাঠে খেলতে গিয়েছিলাম। দাদী রান্না ঘর থেকে বেড় হয়ে এলেন, এসে রতনকে বললো, আয়নাতে দেখতো তোর মুখটা কেমন শুকিয়ে গেছে। এখনো তো কিছু খাসনি। রতন বললো, দাদী আমার ক্ষুধা নেই। দাদী বললো, তোর বাবা আসছে, যদি তোর চেহারাটা এমন দেখে তাহলে কী ভাববে বলতো। দাদীর এতো কথা, রতনের মাথায় কেমন যেন লাগছে, অবশেষে বললো ঠিক আছে  অল্প একটু দাও। দাদী ভাত এনে দিলো রতনকে, রতন অল্প খেয়ে নিলো। আজ আর পড়া হলো না রতনের আগেই দাদীর ঘরে ঘুমিয়ে পড়লো।
পরেরদিন ফোজরের আযানের সময় ঘুম থেকে উঠে রতন। প্রতিদিনের মত আজও রতন দাদীকে সঙ্গে নিয়ে মসজিদে নামাজ পড়তে গেলো। নামায শেষে বাড়ী ফিরে আসার সময় দাদী রতনকে বললো, তোর বাবা এসেছে। তোর জন্য অনেক খেলনা এনেছে। রতন হঠাৎ বললো, দাদী বাবার কাছ থেকে আমি তো খেলনা চাইনী। আমি চেয়েছি আমার মাকে। আচ্ছা দাদী বলো তো, আমার মা কত দুর গিয়েছে। দাদী মা হারা ছোট্ট ছেলেটার মুখে এমন কথা শুনে থমকিয়ে গেলেন। দাদী কোন উত্তর দেওয়ার আগেই । রতন বললো, দাদী আমি যখন সাইকেল চালানো শিখবো তখন সাইকেল নিয়ে যাবো আমার মাকে আনতে দেখো। দাদী বললো, তোর মা আর কোনদিন আসবেনা। তোর মা মারা গেছে। রতন মারা যাওয়া কাকে বলে সে যানেনা তবে, তার মনে পড়লো একদিনের কথা। 
যেদিন মাকে একটা চাটির উপড় শুয়ে রাখা হয়েছিলো। মার গায়ে পরিয়ে দেওয়া হয়েছিলো ধপধপে সাদা রংঙ্গের শাড়ী। বাবা সেদিন খুব কেঁদেছিলো। আমি মায়ের কাছে বসে ছিলাম,আমার দাদু মার মুখের আঁচলটা সড়িয়ে অন্যদের দেখাতো। মায়ের হাতটা কতবার যে টেনেছিলাম মায়ের হাতে মাথা দিয়ে ঘুমাবো। কিন্তু দাদু, বা অন্যরা বলতো, ছেলেটাকে অন্য কোথাও নিয়ে যাও। বড় ভাইয়া কোথায় যেন গিয়েছিলেন কোথা এসে, মায়ের মুখ খানা দেখেই মাটিতে ঘুমিয়ে পরেছিলেন। আমাকে মায়ের কাছে বসে থাকা দেখে খালা মা, আমাকে বুকে নিয়ে চিৎকার দিয়ে খুব কেঁদেছিলেন। আর তো মনে নেই আমার । মনে মনে ভাবছে রতন। 
দাদী কৈ যেন গেছেন। রতন এসব ভাবতেই এলো, আমের গাছের পশ্চিম পাশের গোলাপ ফুল গাছটির কাছে। এসে ফুল গাছের চারপাশটা দেখছে । আর ভাবছে খালা মা কবে আসবে ? খালা মা এবার এলে আমি খালা মার সাথে যাবো আর আসবো না। আমার মা দেখতে ঠিক গোলাপ গুলোর মত সুন্দর ছিলো। আমার মার মত মা আর কোথাও নেই। সূর্যটা উকি দিয়ে সামানে এসে দাড়িয়েছে। রতন ওর বাবাকে দেখতে পায় দুর থেকে । বাবা বারান্দায় দাড়িয়ে আছে। রতন ভাবে বাবা আমাকে অনেক মিথ্যা কথা বলেছে, মাকে আনবে বলে অনেক কথা দিয়েছে। আমি আর আমার বাবা সাথে কথা বলবো না। বাবার সাথে আড়ি। এই ভেবে রতন ফুল গাছের আড়ালে লুকিয়ে গেলো। বাবা কি যেন ভেবে জমির দিকে গেলেন। রতন আবারো এলো ফুল গাছটির কাছে। 
এমন সময় দুর থেকে কে যেন বলছেন, রুটি নিবেন, রুটি নিবেন, টাটকা রুটি। রতনের বড় ক্ষুধা লেগেছে। সেই সন্ধ্যায় অল্প একটু ভাত খেয়েছে। মন্টা আর মানচ্ছে না। তাই হাতের ইশারাই বললো ও ভাই এখানে আসেন। কাছে এলে রতন বললো, ভাই একটু দ্বারান। আমি টাকা নিয়ে আসি ঘর থেকে। ঘরে এসে দেখলো দাদী নেই, ভাইয়ার ঘরে ভাইয়া নেই। রতন ভাবলো বাবার থেকে এখন রুটি কিনার টাকা নেই, পরে আড়ি হবো বাবার উপড়। বাবার ঘরে গিয়ে দেখলো বাবাও নেই। অবশেষে রুটি ওলার কাছে এসে বললো, ভাই আমাকে এটা রুটি দেন পরে টাকা দিবো। রুটি ওলা বললো, আমি বাকিতে রুটি বিক্রি করিনা। রতন সব ভুলে এবার রেগে গিয়ে বলে একটা রুটি দে দাদী এলে টাকা দিবো। লোকটি তবুও রতনকে একটা রুটি দেয় না। শান্ত ছোট্ট ছেলে রতন রাগে আগুন হয়ে এক খামছা বালু রুটির মধ্যে ছুড়ে মারে। এবং  দৌড়ে যায় মায়ের পাকা করা কবরের কাছে। রুটি ওলা ছেলেটা কাঁদছে, কাঁদতে কাঁদতে বাড়ি চলে যায় ছেলেটা। পথে ছেলেটা গ্রামের এক শিক্ষক কে বিচার দেয়। শিক্ষক ছেলেটাকে সঙ্গে করে নিয়ে আসে রতনদের বাড়িতে। এর মধ্যে ঘরে রতনের দাদী, ভাই, বাবা এসেছে। ছেলেটার কথা শিক্ষক সবাইকে বলে। এক সময় রনক রাগে প্রায় আগুন আর বলে রতন কোথায় আজ বাড়িতে আসুক। দাদী বলে রতন তো এই রকম না। বাবা চুপচাপ দাড়িয়ে আছেন। রুটি ওলা বললো, রতন ঐদিকে গেছে। তারা সবাই গেলো সেদিকে। রতন কে মায়ের কবরের কাছে দেখে চোখের পানি দিয়ে বুকটা ভিজে যায় ভাইয়ার। বাবার ও চোখে পানি। শিক্ষক রতনকে বললো, বাবা রতন ওর রুটি গুলোতে বালু দিয়েছো কেন। রতন কোন কথা বলে না। শিক্ষক বললো, রতন তোমাদের অনেক টাকা আছে, ভাত, ধান চালের অভাব নেই, তোমাদের। তুমি কি জানো রতন ? ওর মা-টা অন্ধ । অন্ধ মায়ের জন্য ও রুটি বিক্রি করে ঔষধ আনে। তুমি তার রুটিতে এই ভাবে বালু দিতে পারলে ? রতন কোন কথা বলতে পারছে না। আসলে সে তো এসব ভেবে বা যেনে বালু দেয়নী। রনক বললো, স্যার ওর রুটির দাম আমি দিচ্ছি। এই কথা  রতন শুনে দৌড়ে যায় ভাইয়ের বুকে। আর বলে ভাইয়া আমি আমার খালা মার কাছে যাবো। আমাকে নিয়ে যাবে ভাইয়া ? ভাইয়া জানে রতন কেন খালা মার কাছে যেতে চায়। মায়ের পরে কেউ যদি ভালো বেসে থাকে তা খালা মায় বেসেছে রতনকে। তাই রনক মাথা নাড়িয়ে বললো ঠিক আছে। তোমাকে খালা মার কাছে নিয়ে যাবো।
বাংলাসংবাদ24/শামীম মিয়া/কবির হোসেন।
 
 

আরও সংবাদ