Widget by:Baiozid khan
শিরোনাম:

ঢাকা Mon September 24 2018 ,

চার বছরে জব্ধ এক হাজার ১০১ কেজি সোনা নিলামে উঠছে

Published:2017-07-18 20:36:10    

বিশেষ প্রতিবেদক:

বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা হওয়া বাজেয়াপ্ত সোনার নিলাম হচ্ছে না ৯ বছর ধরে। চোরাচালানের কারণে শুল্ক গোয়েন্দা ও অন্যান্য সংস্থার হাতে আটক হয়ে যেসব সোনা  বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা হয় তা পরবর্তীতে বাজেয়াপ্ত ঘোষণা করে নিলামে বিক্রি করার বিধান রয়েছে কেন্দ্রীয় এই ব্যাংকের। কিন্তু খোঁজ নিয়ে জানা গেছে,  ২০০৮ সালের পর থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে বাজেয়াপ্তকৃত সোনার নিলাম অনুষ্ঠিত হয়নি। ফলে এসব সোনা বাংলাদেশ ব্যাংকে দীর্ঘদিন ধরে জমা পড়ে আছে। সোনা ব্যবসায়ীদের দাবি, দেশের ভেতরে বৈধ কোনো উৎস থেকে সোনা পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে তারা ব্যবসায় ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন। এ অবস্থায় গত ৪৬ মাসে অবৈধভাবে আমদানির দায়ে জব্দ করা ১ হাজার ১০১ কেজি সোনা নিলামে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতর। এ জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নরের কাছে একটি চিঠি দিয়েছেন শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতরের মহাপরিচালক (ডিজি)।

এদিকে বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র জানায়, বর্তমানে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে প্রায় ১১৫ মণ সোনা জমা আছে। এর অর্ধেকেরই মালিকানা কেউ দাবি করেনি। বাকি কিছু অংশের মালিকানা নিয়ে মামলা চলছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক সর্বশেষ ২০০৮ সালে নিলামের মাধ্যমে আটক করা সোনা বিক্রি করেছিল।

জানতে চাইলে  শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতরের মহাপরিচালক (ডিজি) ড. মইনুল খান বলেন, আইন অনুযায়ী দেশে সোনা আমদানির সুযোগ আছে। কিন্তু প্রক্রিয়া জটিল হওয়ায় ব্যবসায়ীরা অবৈধ পথে ঝুঁকছেন। এ অবস্থায় ব্যবসায়ীদের  বৈধ সোনা কেনা-বেচা নিশ্চিত করতে জব্দ করা সোনা নিলামে তোলা যেতে পারে।

৪ বছরে এক টনের বেশি সোনা জব্দ

সোনা চোরাচালানের নিরাপদ রুট বাংলাদেশ। তাই তো কেজি আর মণের হিসাব ছাড়িয়ে চোরাচালানি সোনা টনের হিসেবও ছাড়িয়ে গেছে। বিগত ৪৬ মাসে দেশের প্রধান দুই বিমান বন্দর চট্টগ্রামের হযরত শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ও ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে প্রায় ১ হাজার ১০১ কেজি সোনা জব্দ করেছে শুল্ক গোয়েন্দা কর্মকর্তারা। সেই সঙ্গে সোনাসহ ১৪৪ জন চোরাচালানিকে আটক করা হয়।  শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতর সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

তথ্যানুযায়ী, ২০১৩ সালের জুলাই মাস থেকে দেশে অবৈধ পথে সোনা আমদানির পরিমাণ ব্যাপক হারে বেড়ে যায়। মিথ্যা ঘোষণায় অবৈধ পথে সোনা আমদানির ব্যাপকতা ঠেকাতে তৎপর হয়ে উঠে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতরের কর্মকর্তারা। মাঠ পর্যায়ে স্থলবন্দরগুলোসহ আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরগুলোতে চলতে থাকে কড়া নজরদারি ও বসানো হয় অত্যাধুনিক স্ক্যানার মেশিনসহ নানা ইলেকট্ট্রিক ডিভাইস। এতেই একের পর এক অবৈধ পথে আসা সোনার চালান আটক হতে থাকে। ফলে ৪৬ মাসে প্রায় ১ হাজার ১০১ কেজি ৪৯১ গ্রাম সোনা জব্দ করে শুল্ক গোয়েন্দা। এসব সোনার দাম প্রায় ৫২০ কোটি ৮৬ লাখ টাকা।

জানা গেছে, গত ৪৬ মাসের মধ্যে সবচেয়ে বড় চালান ও বেশি সোনা জব্দ হয় ২০১৩-১৪ অর্থবছরে। এ অর্থবছরে প্রায় ৫৬৫ কেজি সোনা জব্দ করে শুল্ক গোয়েন্দা। আটক করা এসব সোনার মূল্য প্রায় ২৫৫ কোটি ৮২ লাখ টাকা। সোনা চোরাচালানির অভিযোগে হাতেনাতে জব্দ করা হয় জড়িত ৫৫ জনকে। এরপর ২০১৪-১৫ অর্থবছরেও চোরাকারবারীদের সোনা চোরাচালানি অব্যাহত থাকে। এ অর্থবছরে প্রায় ৩৬৪ কেজি সোনা জব্দ হয়। জব্দকৃত এসব সোনার মূল্য প্রায় ১৮১ কোটি ৩১ লাখ টাকা। এ বছর শুল্ক গোয়েন্দার হাতে আটক হন প্রায় ৫০ জন চোরাকারবারী।

টানা ২ বছর ধরপাকড়ের ও বিমানবন্দরগুলোতে নিশ্চিদ্র নিরাপত্তার কারণে ২০১৫-১৬ অর্থবছরে এসে দেশে সোনা চোরাচালানির পরিমাণ কিছুটা কমতে শুরু করে। সেই সঙ্গে কমতে থাকে জব্দ সোনার পরিমাণ। এ অর্থবছরে অবৈধভাবে আনা প্রায় ১২১ কেজি সোনা জব্দ করে শুল্ক গোয়েন্দা। জব্দ এসব সোনার দাম প্রায় ৫৬ কোটি ২৯ লাখ টাকা।

এদিকে ২০১৬-১৭ অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে (জুলাই-১৬ থেকে এপ্রিল-১৭) প্রায় ৫০ কেজি সোনা জব্দ করে শুল্ক গোয়েন্দা। এসব সোনার দর ২৭ কোটি ৪৩ লাখ টাকা। এ সময়ের মধ্যে চোরালানির সঙ্গে জড়িত প্রায় ১৮ জনকে আটক করা হয়।

শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতরের মহাপরিচালক ড. মইনুল খান বলেন, দেশে অবৈধ পথে সোনা আমদানি ঠেকাতে সব ধরনের প্রটেকশন নিয়েছে শুল্ক গোয়েন্দা। যার কারণে সাম্প্রতিক সময়ে সোনা চোরাচালানি কিছুটা কমেছে। এজন্য এ বছর সোনা জব্দের পরিমাণ অনেক কমেছে। তিনি বলেন, বিমানবন্দরগুলোতে প্রত্যেকটা যাত্রীর ব্যাগ ব্যাগেজ থেকে শুরু করে পুরো শরীর তল্লাশী করা হচ্ছে। এখন পেটের ভেতরে করে সোনা আনলেও আমরা ধরে ফেলছি। এসব কারণে সোনা চোরাকারবারীরা এখন হতাশ। আমি চোরা কারবারীদের হুঁশিয়ার করে বলছি, দেশে সোনাসসহ যে কোনো ধরনের চোরাচালান ঠেকাতে শুল্ক গোয়েন্দার টিম সবসময় তৎপর রয়েছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে চিঠি

ড. মইনুল খানের সই করা চিঠিতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ জুয়েলার্স এসোসিয়েশনের (বাজুস) পক্ষ থেকে দীর্ঘদিন ধরে বৈধভাবে সোনা সরবরাহের ব্যবস্থা করার দাবি জানানো হয়েছে। এ বিষয়ে বাজুসের নেতারা এনবিআরের সঙ্গে বিভিন্ন বৈঠকে আলোচনা করেছেন। সোনা চোরাচালানবিরোধী বিভিন্ন কার্যক্রমের বিশ্লেষণে দেখা যায়, ব্যাগেজ রুলের আওতায় শুল্ক করাদি পরিশোধ সাপেক্ষে ২৩৪ গ্রাম বা প্রায় ২০ ভরি সোনা আনার সুযোগ রয়েছে। এভাবে প্রতি ভরিতে ৩০০০ টাকা শুল্ক দিয়ে সোনা আনছেন যাত্রীরা।

চিঠিতে বলা হয়েছে, শুল্ক গোয়েন্দা ও অন্যান্য সংস্থা কর্তৃক চোরাচালানের দায়ে আটক ও বাংলাদেশ ব্যাংকে জমাকৃত এবং পরবর্তীতে বাজেয়াপ্ত সোনা নিলামে বিক্রি করার বিধান রয়েছে। কিন্তু খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০০৮ সালের পর থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে বাজেয়াপ্তকৃত সোনার নিলাম অনুষ্ঠিত হয়নি। ফলে এ সব সোনা বাংলাদেশ ব্যাংকে দীর্ঘদিন ধরে জমা পড়ে আছে। সোনা ব্যবসায়ীদের দাবি, দেশের ভেতরে বৈধ কোনো উৎস থেকে সোনা পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে তারা ব্যবসায় ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন।

চিঠিতে আরো বলা হয়েছে, সোনা নিষিদ্ধ কোনো পণ্য নয়। আমদানি নীতি আদেশ ২০১৫-১৮ এর অনুচ্ছেদ ২৬ (২২) অনুযায়ী বাণিজ্যিক ভিত্তিতে সোনা আমদানির সুযোগ রয়েছে। তবে ওই আমদানির জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমতি নিতে হয়। কিন্তু ব্যবসায়ীদের দাবি, এ ধরনের অনুমতি সহসা পাওয়া যাচ্ছে না এবং তারা বিভিন্ন প্রশ্নের সম্মুখীন হচ্ছেন।

একই সঙ্গে ব্যবসায়ীদের বৈধ ও অবাধে সোনা সরবরাহ নিশ্চিতের লক্ষ্যে বাজেয়াপ্তকৃত সোনা নিয়মিত নিলামের মাধ্যমে বিক্রি করা যেতে পারে। আমদানি নীতি অনুযায়ী বাণিজ্যিকভাবে আমদানির আবেদন ইতিবাচকভাবে দেখে দ্রুত নিষ্পত্তি করা হলে সোনা ব্যবসায়ে অসাধুতা রোধ হবে বলে মনে করে সংস্থাটি।

আরও সংবাদ