Widget by:Baiozid khan
শিরোনাম:

ঢাকা Thu June 21 2018 ,

ভুসিমাল ব্যবসায়ী রবীন্দ্রনাথ

Published:2018-05-09 11:06:30    

একদা প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুরের ব্যবসায় সমৃদ্ধির স্মৃতি ছিল কিংবদন্তিতুল্য। পূর্বপুরুষদের সেই ‘সাবেক কালের বড়মানুষির ভগ্নদশা মেনে নেওয়ার তালিম’ করতে করতেই কেটেছে রবীন্দ্রনাথের জীবন। অবশ্য মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথের সময় থেকেই পারিবারিক ব্যবসার ভগ্নদশা শুরু। রবীন্দ্রনাথের ঠাকুরের হাতে শেষ। মাঝখানটা ছোট-বড় ব্যবসাহী উদ্যাগের ব্যর্থ-কাহিনীর ইতিবৃত্তে ভরা। জাহাজ ব্যবসা দিয়ে ঠাকুর পরিবারের আর্থিক সমৃদ্ধির হাল ফেরানের চেষ্টা করেছিলেন জ্যোতিরিন্দ্রনাথ। উদ্যোগপতির জীবনস্মৃতিতে লেখা আছে সেই কাহিনী- ‘এই সময়ে (১৮৮৩-৮৪) একদিন হঠাৎ এক্সচেঞ্জ গ্যাজেট্টা-এ দেখিলাম একটা জাহাজের খোল নিলাম হইবে। ভালই হইল, এই খোলটা কিনিয়া একখানা জাহাজ তৈরি করিয়া চালান যাইবে, স্থির করিলাম। এই সময় আবার কলিকাতা হইতে খুলনা পর্যন্ত রেলও হইবে কথা ছিল। তাহা হইলেই খুলনা হইতে বরিশাল পর্যন্ত বেশ জাহাজ চালান’ যাইতে পারে। খোল কেনার পক্ষে এ একটা বেশ সুযুক্তিও হইল।...আমিই সর্বোচ্চ ডাকে কিনিলাম।...বাঙ্গালায় বাঙ্গালী কর্তৃক আমিই সর্বপ্রথম ‘জাহাজ-চালান’ প্রবর্তন করিব, এই গর্ব।’ এমন গর্বের আকাঙ্ক্ষা জ্যোতিরিন্দ্রনাথকে কিভাবে ফতুর করেছিল তার ইতিহাস ‘জীবনস্মৃতি’তে লিখেছেন রবীন্দ্রনাথ-‘ক্ষতির পর ক্ষতি বাড়িতে লাগিল, এবং আয়ের অঙ্ক ক্রমশ ক্ষীণ হইতে হইতে টিকিটের মূল্যের উপসর্গটা সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হইয়া গেল-বারিশাল খুলনার স্টীমার লাইনে সত্যযুগ আবির্ভাবের উপক্রম হইল। যাত্রীরা কেবল বিনাভাড়ায় যাতায়াত শুরু করিল তাহা নহে, তাহারা বিনা মূল্যে মিষ্টান্ন খাইতে আরম্ভ করিল।...

যাত্রীরা যখন বিনামূল্যে মিষ্টান্ন খাইতছিল তখন জ্যোতিদাদার কর্মচারীরা যে তপস্বীর মতো উপবাস করিতেছিল, এমন কোন লক্ষণ দেখা যায় নাই।’ আসলে বেনিয়া বুদ্ধিতে পটু ধূর্ত ইংরেজ কম্পানির সঙ্গে এঁটে উঠতে পারেননি জ্যোতিরিন্দ্রনাথ। সেই সময় খুলনা-বরিশাল জলপথে স্টিমার নামায় ফ্লোটিলা কম্পানি। অনেক কম ভাড়াতে তারা যাত্রী বহন করত। তাছাড়া মধ্যবঙ্গ রেলওয়ের ইংরেজ কর্তৃপক্ষও নানা ভাবে ফ্লোটিলা কম্পানিকে সাহায্য করতে থাকে। ফ্লোটিলার যাত্রীদের জন্য বরিশাল থেকে কলকাতা পর্যন্ত (মেইল ট্রেন ও স্টিমারসহ) ভাড়া ছিল মাত্র সাত সিকা। জ্যোতিরিন্দ্রনাথের স্টিমার ‘সরোজিনী’র যাত্রীদের বরিশাল হতে খুলনা পর্যন্ত ভাড়া গুনতে হতো ১ টাকা করে। এই অসম প্রতিযোগিতায় ঠিকে থাকা সম্ভব ছিল না। ভাড়া কমিয়ে জ্যোতিরিন্দ্রনাথ একটা শেষ চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু ভাগ্যবিড়ম্বনায় আর পেরে ওঠেননি। কি হয়েছিল সেই ঘটনার বর্ণনা লেখা আছে ১৮৮৫ সালের ২৬ সেপ্টেম্বরের ‘সঞ্জীবনী’র পাতায়- ‘আমরা দুঃখিত হইলাম যে বাবু জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুরের একখানি স্টিমার মেরামতের জন্য বরিশাল হইতে কলিকাতায় আনা হইয়াছিল কিন্তু গঙ্গার পোলের সহিত ঠেকিয়া ডুবিয়া গিয়াছে। শুনা যায় স্টিমার তুলিতে একহাজার টাকা লাগিবে।’ পরে এ নিয়ে জ্যোতিরিন্দ্রনাথ লিখেছিলেন- ‘এবার এই দুর্ঘটনার জন্য এক ক্ষতিপূরণ ব্যাপারেই আমি অত্যন্ত জেরবার হইয়া পড়িলাম, এমন সময় ফ্লোটিলা কম্পানির পক্ষ হইতে রাজা প্যারীমোহন মুখোপাধ্যায় আমার নিকট এক সন্ধির প্রস্তাব লইয়া আসেন। তিনি বলিলেন, উভয়পক্ষেই আর এরূপ বৃথা অর্থব্যয়ে লাভ কি?

আপনি নিজেই একটা মূল্য ধার্য করিয়া দিউন। ফ্লোটিলা কম্পানি আপনার সমস্ত কারবার কিনিতে প্রস্তুত আছে। আমি মগ্নাবশিষ্ট চারিখানি জাহাজ ও তৎসংক্রান্ত সমস্তই ফ্লোটিলা কম্পানিকে বিক্রয় করিয়া দিলাম। ফ্লোটিলা কম্পানি হইতে যাহা ন্যায্য তাহাপেক্ষা অনেক বেশী টাকা পাইলেও, আমি আমার ঋণ পরিশোধ করিতে পারিলাম না।’ ব্যবসায় জ্যোতিদাদার সর্বস্বান্ত হওয়া ভাই রবীন্দ্রনাথকে মোটেই নিরুৎসাহিত করেনি। প্রমাণ জাহাজ ব্যবসায় জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ব্যর্থ হওয়ার দশ বছরের মধ্যে ১৮৯৫ সালে কুষ্টিয়ায় ‘ঠাকুর কম্পানী’ খুলে ভুসিমাল ও পাট কেনাবেচা, আখ-মাড়াইয়ের কল ইত্যাদির কারবারে নামেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ। কুষ্টিয়ায় ঠাকুর এন্ড কং-এর ব্যবসা কেন্দ্র খোলা হয়েছিল। শিলাইদহের কুঠিবাড়ির ফটকে সাদা পাথরের ওপর ঠাকুর এন্ড কম্পানি লেখা থাকত। এই কাজের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে সেই সময় ভাইঝি ইন্দিরা দেবীকে লেখেন রবীন্দ্রনাথ- ‘যত বিচিত্র রকমের কাজ আমি হাতে নিচ্ছি, কাজ জিনিসটার প্রতি আমার শ্রদ্ধা মোটের উপর ততই বাড়ছে। অবশ্য সাধারণ ভাবে জানতুম যে, কর্ম অতি উৎকৃষ্ট শ্রেষ্ঠ পদার্থ। কিন্তু সে-সমস্ত পুঁথিগত বিদ্যা। এখন বেশ স্পষ্ট বুঝতে পারছি কাজের মধ্যে পুরুষের যথার্থ চরিতার্থতা। কর্মের মধ্যে পুরুষের অনেকগুলি বৃত্তিকে সর্বদাই নিয়োগ করে রাখতে হয়-জিনিস চিনতে হয়, মানুষ চিনতে হয়, বৃহৎ কর্মক্ষেত্রের সঙ্গে পরিচয় রাখতে হয়। এখন আমার কাছে একটা নূতন রাজ্য খুলে গেছে। দেশে দেশান্তরে লক্ষ লক্ষ লোক যে-এক বৃহৎ বাণিজ্যক্ষেত্রের মধ্যে অহর্নিশি প্রাণপণ প্রয়াসে প্রবৃত্ত আমি তারই মধ্যে অবতীর্ণ হয়েছি।’ কবির মতই কথা বটে। এত সাধের ব্যবসায় অবতীর্ণ হওয়ার পরিণাম কি হয়েছিল?

রবীন্দ্রনাথের পাটের ব্যবসা সম্পর্কে বিখ্যাত ঐতিহাসিক স্যার যদুনাথ সরকার লেখেন- ‘কবিগুরু একবার আত্রেয়ী গ্রামের ‘পাটের হাটে মথুর কুন্ডু শিবু শা’র সঙ্গে গা ঘেঁষাঘেঁষি করিয়া পাটের দোকান খোলেন, যদিও অবশেষে বহু অর্থক্ষতি দিয়া পালাইয়া বাঁচেন।’ ঠাকুর কম্পানির ব্যবসার কি অবস্থা হয়েছিল তার পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ কোথাও না পাওয়া গেলেও কিছুটা আভাস পাওয়া যায় রবিজীবনীকার প্রশান্ত কুমার পালের গবেষণায়- ‘মফস্বল হইতে ভুষি মাল ও পাট কিনিয়া ‘বাঁধি’ কারবার দিয়া সূত্রপাত হয়। কিছু কাল পরে আখ মাড়াই কলের কাজেও তাহারা হাত দেন। বিগত শতাব্দীর শেষ ভাগে বাংলাদেশে আখের চাষ ভালই ছিল ও গ্রামে গ্রামে আখ মাড়াই হইত। সে-সময়ে আখমাড়াই কলের একমাত্র সংগ্রাহক ছিল রেনউইক নামে এক বৃটিশ কম্পানি।’ কুষ্টিয়ায় রেনউইকের বাঁধ এখনো বিখ্যাত। গড়াই নদীর পাড়ে রেনউইক কম্পানির ভগ্নপ্রায় প্রতিষ্ঠানের কঙ্কাল এখনো বর্তমান। এই রেনউইক কম্পানির দালালরা তখন গ্রামে গ্রামে ঘুরে তাদের আখ মাড়াইয়ের কল কৃষকদের কাছে বিলি করতো। ঠাকুর কম্পানি এই বিদেশি কম্পানির সঙ্গে প্রতিযোগিতায় নামে। ফল যে খুব খারাপ হয়েছিল তা নয়। অল্প সময়ের মধ্যে রেনউইক কম্পানির একচেটিয়া ব্যবসাহে প্রভাব ফেলতে সক্ষম হয় ঠাকুর কম্পানি। ব্যবসা পরিচালনার সুবিধার্থে কুষ্টিয়ার মহিনী মিল (অবিভক্ত ভারতের একটি কাপড় কল) সংলগ্ন এলাকায় ‘ঠাকুর লজ’ স্থাপন করা হয়। ঠাকুর কম্পানি পরে অন্য ব্যবসাও খুলেছিল। ১৯৭৯ সালের ১১ জুন যুগান্তরে ‘রবীন্দ্রনাথের চামড়া ব্যবসা ছিল’ নামে একটি প্রবন্ধ ছাপা হয়। তাতে দেখা যায় রবীন্দ্রনাথ, সুরেন্দ্রনাথ, বলেন্দ্রনাথ ও রমনীমোহন চট্টপাধ্যায় মিলে কাঁচা চামড়া ক্রয় বিক্রয়ের জন্য হর এন্ড কম্পানি নামে চার নম্বর মুন্সি বাজারে একটি কম্পানি খোলেন। লেখা আছে ঠাকুর বাড়ির বিশ্বস্ত সারদাচরণ হর ছিলেন এই কম্পানির ম্যানেজার। সেই সময় শিলাইদহে গুটিপোকা চাষের চেষ্টাও করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। উদ্দেশ্য বাংলায় রেশম শিল্পের বিকাশ। যথারীতি সে উদ্যাগও ব্যর্থ হয়েছিল। রেশম গুটি চাষের করুণ কাহিনী বন্ধু জগদীশ চন্দ্রকে লেখা অনবদ্য চিঠিতে ধরা আছে- ‘শ্রীযুক্ত অক্ষয়কুমার মৈত্রেয় মহাশয় কুক্ষণে ২০টি রেশমের গুটি আমার ঘরে ফেলিয়া গিয়াছিলেন। আজ দুই লক্ষ ক্ষুধিত কীটকে দিবারাত্রি আহার এবং আশ্রয় দিতে আমি ব্যতিব্যস্ত হইয়া উঠিয়াছি-দশ বারোজন লোক অহর্নিশি তাহাদের ডালা সাফ করা ও গ্রাম-গ্রামান্তর হইতে পাতা আনার কার্যে নিযুক্ত রহিয়াছে।’

ইস্ট ইন্ডিয়া কম্পানির সময় রেশম চাষে কুমারখালীর বিশেষ খ্যাতি ছিল। বিদেশের বাজারে কুষ্টিয়ার কুমারখালীর রেশমের বিশেষ চাহিদাও ছিল। রবীন্দ্রনাথকে রেশম চাষ করতে প্ররোচনা দানের পেছনে এ ছাড়া আর কোন তথ্য নেই। রেশম চাষি রবীন্দ্রনাথের ‘নিষ্ফল অধ্যবসায়’ জ্যোতিরিন্দ্রনাথের জাহাজ ব্যবসার মতই ব্যর্থ হয়েছিল। ১৯৯৯ সালের ২৯ আগস্ট ২৯ বছর বয়সে মারা গিয়েছিলেন কবির ভাতুষ্পুত্র বলেন্দ্রনাথ। ঠাকুর কম্পানির অন্যতম অংশীদার ছিলেন এই বলেন্দ্রনাথ। তার মৃত্যুর পর কম্পানির সমস্ত ঋণভার রবীন্দ্রনাথের কাঁধে এসে পড়ে। এরপর থেকেই শুরু হয় ব্যবসা থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেওয়ার পালা। যদিও ব্যবসা গুটিয়ে নিলেও ঋণভার থেকেই যায়। শান্তিনিকেতন গড়ার স্বপ্ন তাকে পদ্মাপাড়ের শ্যামল বঙ্গভ‚মি থেকে নিয়ে যায় বীরভুমের ঊষর প্রান্তরে।

সেখানে ‘লাল মাটির নিস্তব্ধ তোলপাড়ের’ বুকে প্রতিষ্ঠা করেন আশ্রম বিদ্যালয়। এরপর শান্তিনিকেতন আর বিশ্বভারতীর স্বপ্নে বিভোর রবীন্দ্রনাথ। ক্রমশ পদ্মাপাড়ে প্রতিষ্ঠিত ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ঠাকুর কম্পানি অভিভাবকহীন অবস্থায় এক সময় হারিয়ে যায়।

 

সূত্র : প্রশান্তকুমার পালের রবিজীবনী। জগন্নাথ বিশ্বাস : সাংবাদিক।

আরও সংবাদ