Widget by:Baiozid khan
  • Advertisement

পৌরসভা নির্বাচন ও চক্ষুষ্মানের অন্ধত্ব

Published:2015-12-09 14:28:36    
পৌরসভা নির্বাচন ও চক্ষুষ্মানের অন্ধত্ব

A PHP Error was encountered

Severity: Warning

Message: file_get_contents(): https:// wrapper is disabled in the server configuration by allow_url_fopen=0

Filename: singlecontent/tcontent.php

Line Number: 32

A PHP Error was encountered

Severity: Warning

Message: file_get_contents(https://api.facebook.com/method/fql.query?format=json&query=SELECT+url%2C+normalized_url%2C+share_count%2C+like_count%2C+comment_count%2C+total_count%2C+commentsbox_count%2C+comments_fbid%2C+click_count+FROM+link_stat+WHERE+url+%3D+%27http%3A%2F%2Fbanglasongbad24.com%2Fcontent%2Ftnews%2F443%27): failed to open stream: no suitable wrapper could be found

Filename: singlecontent/tcontent.php

Line Number: 32

A PHP Error was encountered

Severity: Notice

Message: Trying to get property of non-object

Filename: singlecontent/tcontent.php

Line Number: 35

প্রাচীন গ্রীস ও রোমে যেভাবে সকল নাগরিকেরা এক স্থানে সম্মিলিত হয়ে শাসন ও বিচার সংক্রান্ত সকল কাজ সম্পাদন করতো হালে সে অবস্থা আর নেই। তাই কালের বিবর্তনে ও সময়ের প্রয়োজনেই জনপ্রতিনিধিত্বের উৎপত্তি হয়েছে। প্রতিনিধি ( Representative ) বলতে সেই ব্যক্তিকে বোঝায় যিনি ভোট দানের ক্ষমতা সম্পন্ন প্রাপ্ত বয়স্ক নাগরিকগণের প্রকাশিত সম্মতি নিয়ে তাদের পক্ষ থেকে শাসন কার্যে অংশ গ্রহণ করেন। ভোট ( Vote ) বলতে নাগরিকের সে সম্মতিকে বোঝায়, যা নির্বাচনে আইনগতভাবে সক্ষম ব্যক্তিগণের দ্বারা প্রকাশিত হয়। নির্বাচন ( Election )  বলতে সে সুযোগকে বোঝায় যখন নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনসাধারণের সম্মতির ফলে প্রতিনিধি নির্বাচিত হন। তাই গণতন্ত্র ও আধুনিক রাষ্ট্র ব্যবস্থায় নির্বাচক মন্ডলীর গুরুত্বও অপরিসীম। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী গেটেলের মতে, , ( Because of the wide powers, direct and indirect, exercise by the voters in the modern states, the electorate has become practically a separate and important branch of government )
অর্থাৎ নির্বাচকমন্ডলী কার্যত সরকারের একটি স্বতন্ত্র ও প্রভাবশালী শাখা, কারণ এর বিস্তৃত ক্ষমতা রয়েছে এবং তা সরকারি ব্যবস্থায় প্রতক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রযোজ্য হয়।
 
দেশে পৌর  নির্বাচনের ঢামাঢোল শুরু হয়েছে। কিন্তু গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও নির্বাচকমন্ডলীর কোন মূল্যায়ন হচ্ছে বলে মনে হচ্ছে না। গণতন্ত্রের সকল অনুসঙ্গই উপেক্ষিতই থাকছে। দেশের ২৩৫ টি পৌরসভায় নির্বাচন হতে যাচ্ছে চলতি মাসের শেষের দিকে। কিন্তু এ নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হবে কী না তা নিয়ে জল্পনা-কল্পনার কোন শেষ নেই। মূলত বর্তমান নির্বাচন কমিশনের অধীনে অতীতে কোন নির্বাচন নিয়ে জনগণের সুখ-স্মৃতি নেই। তাই আসন্ন নির্বাচনে ভাল কিছুর আশা তারা করতে পারছেন বলে মনে  হয় না। সম্প্রতি পৌরসভা নির্বাচনের বিভিন্ন পদের প্রার্থীরা প্রার্থীতা জমা দিয়েছেন। কিন্তু  নির্বাচন কমিশন অতীত বৃত্ত থেকে বের হতে পারেনি  । প্রাপ্ত তথ্যে জানা গেছে, পৌর নির্বাচনেও অতীতের মতই সরকার দলীয় প্রার্থীরা নির্বাচন কমিশনের অনুকুল্য পাচ্ছেন। বিরোধী দলীয় প্রার্থীদের সাথে বিমাতাসূলভ আচরণ করা হচ্ছে। যা দেশের নির্বাচনী সংস্কৃতি ও গণতন্ত্রের জন্য অশনিসংকেতই বলতে হবে।
 
গত ৭ ডিসেম্বর দেশের একটি শীর্ষস্থানীয় দৈনিকে ‘শুরুতেই প্রশ্নের মুখে পড়েছে নির্বাচন কমিশন’ শিরোনামে খবর প্রকাশিত হয়েছে। প্রকাশিত খবরে বলা হয়েছে, গত শনিবার ও রোববার ( ৫ ও ৬ ডিসেম্বর ) ২৩৪ পৌরসভায় প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র বাছাই করা হয়েছে। দৈনিকটির নিজস্ব প্রতিবেদক ও জেলা প্রতিনিধিদের পাঠানো তথ্য অনুযায়ী বিএনপির মোট ১০ জন এবং আওয়ামী লীগ-মনোনীত তিনজন মেয়র প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে। এ ছাড়া ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও বিএনপির শতাধিক বিদ্রোহী প্রার্থীর মনোনয়নপত্রও বাতিল হয়েছে। এসব পৌরসভার বেশির ভাগে রিটার্নিং কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) অথবা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও)।
 
নির্বাচন পরিচালনা বিধিতে বলা আছে, কোনো দল থেকে একজনের বেশি প্রার্থী মনোনয়ন দেওয়া যাবে না। কোনো পৌরসভায় এক দলের একাধিক মনোনয়নপত্র জমা পড়লে সব কটি বাতিল হয়ে যাবে। বিষয়টি ২৪ নভেম্বর তফসিল ঘোষণা অনুষ্ঠানে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী রকিবউদ্দীন আহমদ একাধিকবার উচ্চারণ করেছিলেন। কিন্তু শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত তিনজন রিটার্নিং কর্মকর্তা আইনটি মানেননি।
 
বরগুনার বেতাগীতে আওয়ামী লীগের দলীয় প্রধানের সই নিয়ে বর্তমান মেয়র আলতাফ হোসেন ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি গোলাম কবির মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। পরে আওয়ামী লীগ থেকে চিঠি দিয়ে রিটার্নিং কর্মকর্তাকে বলা হয়েছে, তাদের প্রার্থী গোলাম কবির। কিন্তু রিটানিং অফিসার একজনকে বাদ দিয়ে অন্যজনের প্রার্থীতা বৈধ ঘোষণা করেছে। যা নির্বাচনী আইনের মারাত্মক লঙ্ঘন।
 
এই প্রথমবারের মতো দলীয় প্রতীকে অনুষ্ঠেয় পৌরসভা নির্বাচনে ২৩৫টি মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য ১ হাজার ২২৩ মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। এছাড়া নির্বাচনে সাধারণ ও সংরক্ষিত কাউন্সিলর পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন ১২ হাজার ৪৬৬ জন। ২৩৫টি পৌরসভায় এবার প্রায় ৪ হাজার পদে ভোট হবে। এরমধ্যে মেয়র পদ ২৩৫টি, সাধারণ কাউন্সিলর পদ ২ হাজার ২১১টি ও সংরক্ষিত কাউন্সিলর পদ ৭৩৮টি। নিবন্ধনভুক্ত দলগুলোর মধ্যে অন্তত ২২টি দল নির্বাচনে মেয়র পদে প্রার্থী দিয়েছে। দলের বাইরে স্বতন্ত্র প্রার্থী হতে একশ’ ভোটারের সমর্থনের তালিকা দিতে হয়েছে মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ইচ্ছুকদের। উল্লেখ্য সর্বশেষ ২০১১ সালে অনুষ্ঠিত পৌর নির্বাচনে আড়াইশ পৌরসভায় মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের পর ১৫ হাজারেরও বেশি প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী ছিলেন। এরমধ্যে মেয়র পদে ১ হাজার ২০০ জন, সংরক্ষিত কাউন্সিলর পদে তিন হাজার ও সাধারণ কাউন্সিলর পদে ১০ হাজার ৩০০ জন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন।
 
সংবিধানের ১৯ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী  নির্বাচনের জন্য ভোটার তালিকা প্রস্তুতকরণের তত্ত্বাবধান, নির্দেশ, নিয়ন্ত্রণ, অবাধ ও সুষ্ঠু  নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের উপর ন্যস্ত । কিন্তু বর্তমান নির্বাচন কমিশন তাদের সাংবিধানিক দায়িত্ব কতখানি পালন করছে তা-ই এখন আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রাপ্ত খবরে জানা গেছে, গত ৬ ডিসেম্বর কুমিল্লার লাকসাম পৌরসভা নির্বাচনে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী শাহনাজ আক্তারের এক কর্মীকে পিটিয়ে আওয়ামী লীগ কর্মী-সমর্থকরা তার মোটরসাইকেল ছিনিয়ে নিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এ ব্যপারে শাহনাজ আক্তার রিটানিং অফিসারের কাছে লিখিত অভিযোগ করলেও এ বিষয়ে কোন কার্যকর ও আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে বলে জানা যায়নি। যদিও আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী অধ্যাপক আবুল খায়ের এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
 
নির্বাচন কমিশন যে কতখানি পক্ষপাত দুষ্ট তা একজন নির্বাচন কমিশনারের বক্তব্য থেকে পরিষ্কার। বিএনপির চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নেয়া প্রসঙ্গে নির্বাচন কমিশনার শাহনেওয়াজ বলেছেন, আইনী বাধা না থাকায় বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া আসন্ন পৌরসভা নির্বাচনে দল মনোনীত প্রার্থীদের পক্ষে প্রচারণা চালাতে পারবেন। কিন্তু প্রচারণা চালাতে গিয়ে করা “পথসভা যেন শোভাযাত্রা বা জনসভায় পরিণত না হয়। ইসিকে যেন ‘বিব্রতকর বা অস্বস্তিকর’ সিদ্ধান্ত নিতে না হয়, সে বিষয়ে সজাগ থাকারও আহ্বান জানান তিনি। কিন্তু কথা হলো নির্বাচনী জনসভা বা সোভাযাত্রা কী আইন বা সংবিধান বিরোধী ? সংবিধানের ৩৭ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, , (  Every citizen shall have the right to assemble and to participate in public meetings and processions peacefully and without arms, subject to any reasonable restrictions imposed by law in the interests of public order or public health. ‘)
অর্থাৎ জনশৃঙ্খলা ও জনস্বাস্থ্যের স্বার্থে আইনের দ্বারা আরোপিত যুক্তিসঙ্গ বাধানিষধ-সাপেক্ষে শাান্তিপুর্ণভাবে ও নিরস্ত্র অবস্থায় সমবেত হইবার এবং জনসভা ও সোভাযাত্রায় যোগদান করিবার প্রত্যেক নাগরিকের থাকিবে।
 
নির্বাচন কমিশনার বিএনপির চেয়ারপার্সনের প্রতি নসিহৎ খয়রাত  করলেও সরকার দলীয় প্রার্থীদের ক্ষেত্রে রহস্যজনকভাবে নিরব। নির্বাচনে নমিনেশন পেপার জমা দেয়ার সময় নির্বাচনী বিধিমালা লঙ্ঘন করে শাসক দলের প্রার্থীদের ব্যাপক শোডাউন এবং অস্ত্র প্রদর্শনের সচিত্র প্রতিবেদন পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে এবং তা অব্যাহত রয়েছে। কিন্তু এসবের বিরুদ্ধে কোন কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। উল্টো বিরোধী দলের প্রার্থীদের নমিনেশন পেপার জমা দেয়ার ক্ষেত্রে শাসক দলের নেতা-কর্মীদের বাধার সম্মুখীন হওয়ার ব্যাপারে নির্বাচন কমিশনার মো. শাহনেওয়াজ বলেছেন, সব অভিযোগ সত্য নয়। অভিযোগ করার জন্যই কিছু অভিযোগ করা হচ্ছে। নির্বাচন কমিশনারের এমন বক্তব্য দুঃখজনক এবং সরকারি দলের নেতাদের বক্তব্যের প্রতিধ্বনি মাত্র। মনে রাখতে হবে যে, নির্বাচন কমিশন একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান ও কমিশনার পদ একটি সাংবিধানিক পদ। তাই এই প্রতিষ্ঠান বা কোন কোন কর্তাব্যক্তির বিশেষ দল বা মহলের প্রতি অনুরাগ বা বিরাগ থাকা মোটেই কাম্য নয়।
 
অতীত অভিজ্ঞতায় নির্বাচন কমিশনকে মেরুদন্ডহীন ও দলদাস হিসেবেই মনে করা হয়। আর সে অপবাদ মাথায় নিয়েই আগামী ৩০ ডিসেম্বর ২৩৪টি পৌরসভা নির্বাচন করতে যাচ্ছে বর্তমান নির্বাচন কমিশন ।  গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদে দেখা যাচ্ছে, শাসক দল আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা ব্যাপক শোডাউন করে গত ৩ নভেম্বর নমিনেশন পেপার জমা দিয়েছেন। মন্ত্রী-এমপিদের প্রচার-প্রচারণায় নিষেধাজ্ঞা থাকলেও কাউকে কাউকে প্রার্থীর সঙ্গী হতে দেখা গেছে। কিন্তু বিরোধী শিবিরে দেখা গেছে ভিন্ন চিত্র। মূলত হামলা-মামলা, গ্রেফতার আতঙ্কে তারা সংকুচিত  ও প্রায় প্রাণহীন। পুরোপুরি বৈরি পরিস্থিতির মধ্যেই তাদের নমিনেশন পেপার জমা দিতে হয়েছে। কোনো কোনো এলাকায় নমিনেশন পেপার জমা দিতে গিয়ে শাসক দলের বাধার সম্মুখীন হয়েছেন তারা। নির্বাচন কমিশনার মো. শাহনেওয়াজও তা স্বীকার করেছেন।
 
একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি করতে বর্তমান নির্বাচন কমিশন পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে। লক্ষণীয় যে, বর্তমান নির্বাচন কমিশনের অধীনে যে কয়টি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে, সেগুলোর সুষ্ঠুতা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে ব্যাপক অভিযোগ ও প্রশ্ন উঠেছে।  নির্বাচনের শুরুর দিকে মিডিয়ার সামনে নির্বাচনী আচরণবিধি মানা নিয়ে বড় বড় কথা এবং হুমকি-ধমকি দিলেও তা অন্তস্বারশুন্য বলেই প্রমাণিত।  নির্বাচনে বিভিন্ন অনিয়মের ঘটনা মিডিয়ায় স্পষ্ট করে তুলে ধরা হলেও  তা আমলে নেয়নি বর্তমান নির্বাচন কমিশন। অভিযোগ আছে যে, কমিশন নির্বাচনী আইন ও আচরণ বিধির যেভাবে নিত্যনতুন সংশোধনী  আনছে তাতে নির্বাচন প্রক্রিয়া কঠিন  এবং কষ্টসাধ্য হচ্ছে। যা মোটেই প্রত্যাশিত নয়। অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ নিশ্চিত করার জন্য বিএনপিসহ অংশগ্রহণকারী দলগুলো  তফসিল ঘোষণার আগে কিছু পর্যবেক্ষণ দিয়েছিল। সেগুলো আমলে নিলে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ তৈরি করা যেত। কিন্তু নির্বাচন কমিশন সেসব আমলে নেয়নি।
 
প্রাপ্ত তথ্যে জানা গোছে, ঢাকার ধামরাই, ময়মনসিংহের গৌরীপুর, ভোলার দৌলতখান, যশোরের কেশবপুর, বরগুনার বেতাগীসহ দেশের অনেক পৌরসভা নির্বাচনী এলাকায় আচরণবিধি লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছে। শাসক দলের নিরপেক্ষতার অভাবে নির্বাচন অবাধ সুষ্ঠু হবে কি না এ নিয়ে জনগণের মনে সংশয় রয়েছে। নির্বাচন কমিশন নিত্যনতুন সংশোধনী এনে নির্বাচনের পরিবেশকে আরো কঠিন করে তুলেছে বলেও অভিযোগ করা হচ্ছে। ফেনী সদর, দাগনভূঁইয়া, পরশুরাম পৌরসভার ৩৩টি কাউন্সিল পদে অন্য কাউকে মনোনয়নপত্র জমা দিতে দেয়নি সরকারদলীয় সন্ত্রাসীরা। যারাই মনোনয়নপত্র জমা দিতে চেয়েছে তাদের প্রাণে মেরে ফেলাসহ পরিবারের সদস্যদের জীবননাশের হুমকি দেয়া হয়।
 
বর্তমান নির্বাচন কমিশনই ৫ জানুয়ারির একতরফা ও বিতর্কিত নির্বাচন আয়োজন করেছিল। বিশ্বের সকল গণতন্ত্র প্রিয় জাতি ও রাষ্ট্র এই নির্বাচনের কঠোর সমালোচনা করেছে। কথিত নির্বাচন বিষয়ে  বিবিসি, রয়টার্স, এ্যাসোসিয়েট প্রেস ( এপি ), এএফপি, আল-জাজিরা, যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রভাবশালী সাময়িকী ফিনানসিয়াল টাইমসসহ বিশ্বের প্রায় সব প্রভাবশালী গণমাধ্যমেই বাংলাদেশের নির্বাচন ‘ সহিংস ’ এবং ‘ ভোটারবিহীন ’ বলে মন্তব্য করেছে। পাশাপাশি নির্বাচন নিয়ে কড়া সমালোচনায় মুখর বিশ্ব গণমাধ্যম।
যুুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রভাবশালী সাময়িকী ফিনানসিয়াল টাইমস ৫ জানুয়ারি অনলাইন সংস্ককরণে বলেছে, ভোটকেন্দ্র দখল, অগ্নিসংযোগ, ব্যালট পেপার ছিনতাইয়ের মধ্যে দিয়ে সকাল আটটা থেকে বাংলাদেশে ভোটগ্রহণ শুরু হয়েছে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন।  গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয় যে, ঢাকার ২৯টি কেন্দ্রে ১জন ভোটারও ভোট প্রদান করেনি। কিন্তু নির্বাচন কমিশনের পক্ষে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ প্রার্থীদের বিজয়ী ঘোষণা করতে কোন সমস্য হয়নি। এমন কী ৫ জানুয়ারির নির্বাচনকে গণতন্ত্রের জন্য মাইল ফলক হিসাবে উল্লেখ করে উল্লাসও প্রকাশ করা হয়।
 
মূলত সরকার দলীয় প্রার্থীদের আনুকুল্য দেয়ার জন্যই নতুন নতুন নির্বাচনী আইন ও বিধিমালা তৈরি করছে নির্বাচন কমিশন। এক পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, পৌরসভার নির্বাচন আইন ও আচরণ বিধি ১৬টির বেশি ধারা-উপধারার প্রয়োগ নিয়ে প্রশ্ন মারাত্মক প্রশ্নে সৃষ্টি হয়েছে। দুটি ধারার অপপ্রয়োগের আশংকা রয়েছে। আরও দুটি ধারায় আছে অস্পষ্টতাও লক্ষণীয়। আচরণবিধির অন্তত ১১টি ধারার যথাযথভাবে প্রয়োগ হয় না বলে অভিযোগ রয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপ ছাড়াই তড়িঘড়ি বিধি সংশোধনের ফলে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য সহায়ক হয়নি।
 
পৌরসভা (নির্বাচন আচরণ) বিধিমালার ২২ ধারাটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আচরণ বিধিমালার ১৪ ধারার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। অপরদিকে স্থানীয় সরকার (পৌরসভা) নির্বাচন বিধিমালার ১২ ধারায় একক প্রার্থীর বিধান এবং আচরণ বিধিমালার ৭(খ) ধারায় ঘরোয়া সভার আগে পুলিশকে জানানোর বিধান প্রয়োগে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো হয়রানির আশংকা করছে। এছাড়া নির্বাচনবিধির ১২ ধারার (ইইই) উপধারা ও আচরণবিধির ৩১ ধারায় অস্পষ্টতা রয়েছে। এ দুটির ধারা প্রয়োগে রিটার্নিং ও সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তারা বিপত্তিতে পড়তে পারেন। এছাড়া প্রতিদ্বন্দ্বী সব প্রার্থীর ক্ষেত্রে আচরণবিধির ১১, ১২, ১৩, ১৬, ১৭, ১৮, ২০, ২৭, ২৮, ২৯, ৩০ ধারার যথাযথ প্রয়োগ করতে দেখা যায় না। এ নিয়ে বিগত নির্বাচনগুলোতে কমিশনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
 
নির্বাচনবিধি ও আচরণবিধির দুটি ধারার অপপ্রয়োগের আশংকা করছেন বিরোধী দলগুলো। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রাথমিকভাবে পাঁচজন মনোনয়ন দেয়ার বিধান থাকলেও পৌরসভায় সেই সুযোগ রাখা হয়নি। এ নির্বাচনে মনোনয়নপত্র দাখিলের আগেই একক প্রার্থী নির্ধারণের বিধান রাখা হয়েছে নির্বাচনবিধির ১২ ধারায়। সংশোধিত বিধিতে বলা হয়েছে, ‘কোন রাজনৈতিক দল কোন পৌরসভায় মেয়র পদে একাধিক ব্যক্তিকে মনোনয়ন প্রদান করতে পারবে না। একাধিক ব্যক্তিকে মনোনয়ন প্রদান করলে সংশ্লিষ্ট পৌরসভায় ওই দলের প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল বলে গণ্য হবে।’ সংশ্লিষ্টদের মতে, যাচাই-বাছাইয়ের পর্যায়ে ত্রুটির কারণে দলীয় প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল হলে ওই পৌরসভায় সংশ্লিষ্ট দলটির কোনো প্রার্থী ও প্রতীক থাকবে না। বিএনপির আশংকা, নানান অজুহাতে তাদের অনেক প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল করা হতে পারে। বাছাই পর্বে তার প্রতিফলনও লক্ষ করা গেছে। বাছায়ের ১ম দিনেই ৯ বিএনপির প্রার্থীর মনোনয়ন পত্র বাতিল করা হয়েছে। ফলে ওই সব পৌরসভায় নির্বাচন থেকে বঞ্চিত হচ্ছে দলটি।
এছাড়া পথসভা ও ঘরোয়া সভার ২৪ ঘণ্টা আগে পুলিশকে জানানোর বিধানের অপপ্রয়োগের আশংকা করছে বিএনপি। এবার প্রচারণার ক্ষেত্রে আচরণবিধির ৭(খ) ধারায় নতুন শর্ত দেয়া হয়েছে। এতে বলা হয়েছে- ‘পথসভা ও ঘরোয়া সভা করতে চাইলে প্রস্তাবিত সভার কমপক্ষে ২৪ ঘণ্টা আগে তার স্থান ও সময় সম্পর্কে স্থানীয় পুলিশ কর্তৃপক্ষকে জানাতে হবে, যাতে উক্ত স্থানে চলাচল ও আইন-রক্ষার জন্য পুলিশ প্রশাসন প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারবে।’ কতজন নিয়ে বৈঠক করলে ঘরোয়া সভা হিসেবে গণ্য হবে এতে তার কোনো ব্যাখ্যা দেয়া হয়নি। বিরোধী দলগুলোর মতে, নতুন এ শর্তে পুলিশকে হয়রানির সুযোগ করে দেয়া হয়েছে। সভার বিষয়টি পুলিশকে আগভাগে জানানোর ফলে হয়রানি বাড়বে। গোপন সভার নামে ধরপাকড় বাড়তে পারে।
 
সংশোধিত নির্বাচনী আইন, কমিশনের পক্ষপাত দুষ্ট আচরণের কারণে বিরোধী দলীয় প্রার্থীরা বাছাই পর্বেই প্রার্থীতা হারাতে শুরু করেছেন। বাছাই পর্বের প্রথম দিনে ২১ জন মেয়র প্রার্থীর মনোনয়ন পত্র বাতিল করা হয়েছে। এদের মধ্যে ৯ জনই বিএনপি দলীয় প্রার্থী হলেও সরকার দলীয় মাত্র ২ জন।পৌর নির্বাচনে মনোনয়নপত্র বাছাইয়ের দ্বিতীয় দিনে শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত ১২ মেয়র প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিল করা হয়েছে। এর মধ্যে সিলেটে ৬, মৌলভীবাজারে ১, গোপালগঞ্জে ২ এবং বরগুনায় ৩ প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিল করা হয়। সিলেটের গোলাপগঞ্জ, কানাইঘাট ও জকিগঞ্জে ৬ মেয়র প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিল করা হয়েছে। ৬ ডিসেম্বর দুপুরে বাছাইকালে গোলাপগঞ্জ পৌরসভায় বিএনপি মনোনিত প্রার্থী গোলাম কিবরিয়া শাহীনসহ ৩ মেয়র প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল করেছেন রিটার্নিং অফিসার।
 
ফলে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মতোই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় পৌরসভায় মেয়র ও কাউন্সিলররা নির্বাচিত হচ্ছেন। নানা কারণে বাদ যাচ্ছেন বিএনপি মনোনীত প্রার্থীরা। একই সাথে বিএনপির বিকল্প তথা স্বতন্ত্র প্রার্থীরাও বাদ পড়ছেন। এছাড়া আওয়ামী লীগের দল সমর্থিত কারো মনোনয়ন বাতিল না হলেও বিদ্রোহী অনেকেরই বাতিল হয়েছে। গত ৫ ডিসেম্বর বাছাইয়ের প্রথম দিনেই ফেনী, চাঁদপুর, রাজশাহী, কুষ্টিয়া, কুমিল্লা টাঙ্গাইল, ময়মনসিংহ, কুড়িগ্রাম, পাবনা, পশুরাম, পৌরসভায় বিএনপির মনোনীত এবং বিকল্পপ্রার্থীসহ মোট ২৮ জনের মেয়র প্রার্থিতা বাতিল করা হয়। এতে করে ফেনী, কুমিল্লা এবং পশুরামে আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ায় পৌরসভাগুলোতেও কার্যত প্রতিযোগিতা হচ্ছে না।
 
সার্বিক দিক বিবেচনায় পৌর নির্বাচন আসন্ন পৌরসভা নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হবে কী না তা নিয়ে মারাত্মক আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীরা নির্বাচনী আইন ও আচরণ বিধি লঙ্ঘন করে নির্বাচনী প্রচারণা চালাচ্ছেন। নির্বাচন কমিশন তা দেখেও না দেখার ভান করে ‘চক্ষুষ্মান অন্ধ’র ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। অবশ্য নির্বাচনের আচরণবিধি লঙ্ঘনের জন্য সরকার দলীয় ৩ এমপির বিরুদ্ধে নির্বাচন কমিশন নোটিশ জারি করলে তা শুধুই আইওয়াস বলেই মনে করছেন অভিজ্ঞমহল। অতীতে এমন ঘটনা ঘটলেও নির্বাচন কমিশন তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার পরিবর্তে দায়মুক্তি দিয়েছে। কিন্তু বিরোধী দলীয় প্রাথীদের ব্যাপারে বেশ সোচ্চার। এমন কী নির্বাচন কমিশন তিন বারের প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার প্রতি কোন প্রকার সৌজন্য প্রদর্শন করছে না। ফরে পৌরসভা নির্বাচন যে ৫ জানুয়ারি নির্বাচনের ধারাবাহিকতা হবে না তা দিব্যি দিয়ে বলা যাচ্ছে না। অবস্থাটা বোধ সেদিকেই মোড় নিচ্ছে।
 
-সৈয়দ মাসুদ মোস্তফা, সাংবাদিক ও কলাম লেখক।