Widget by:Baiozid khan
  • Advertisement

ভিন্ন প্রেক্ষিতে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন

Published:2016-02-13 16:41:46    
ভিন্ন প্রেক্ষিতে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন

A PHP Error was encountered

Severity: Warning

Message: file_get_contents(): https:// wrapper is disabled in the server configuration by allow_url_fopen=0

Filename: singlecontent/tcontent.php

Line Number: 32

A PHP Error was encountered

Severity: Warning

Message: file_get_contents(https://api.facebook.com/method/fql.query?format=json&query=SELECT+url%2C+normalized_url%2C+share_count%2C+like_count%2C+comment_count%2C+total_count%2C+commentsbox_count%2C+comments_fbid%2C+click_count+FROM+link_stat+WHERE+url+%3D+%27http%3A%2F%2Fbanglasongbad24.com%2Fcontent%2Ftnews%2F459%27): failed to open stream: no suitable wrapper could be found

Filename: singlecontent/tcontent.php

Line Number: 32

A PHP Error was encountered

Severity: Notice

Message: Trying to get property of non-object

Filename: singlecontent/tcontent.php

Line Number: 35

দিল্লি ও তার সন্নিকটস্থ অঞ্চলে চলত ব্রজভাষা। ব্রজভাষার সাথে প্রচুর ফারসি ও ফারসির মাধ্যমে আসা শব্দ মিলে সৃষ্টি হয়েছে উর্দুভাষা। এই রকমই মনে করেন অনেক ভাষাবিদ। তবে এ বিষয়ে যথেষ্ট বিতর্ক আছে। শব্দগত অর্থে উর্দু মানে হলো সেনা ছাউনি। অর্থাৎ সেনা ছাউনিতে সৈন্যদের মুখে ব্রজভাষা থেকে উদ্ভব হয়েছিল এই ভাষার। উর্দু শব্দটা হলো তুর্কি ভাষার। তবে উর্দুতে তুর্কি শব্দ বিশেষ নেই। বাইরে থেকে আসা মুসলিম তুর্কিরা ঘরে তুর্কি ভাষা বললেও তাদের রাজকার্য চলেছে মূলত ফারসি ভাষার মাধ্যমে। তাই উর্দুতে আছে ফারসি শব্দের প্রাচুর্য, তুর্কি শব্দ নেই বললেই হয়। যদিও ভাষাটার নাম হচ্ছে তুর্কি। আর তুর্কি ভাষায় শব্দটার নাম হচ্ছে সেনা ছাউনি। উর্দুকে হিন্দুস্তানিও বলা হয়। হিন্দু শব্দটা ফারসি ভাষার। আদিতে বুঝিয়েছে সিন্ধু নদের তীরবর্তী মানুষকে। যাকে বলা হয় আধুনিক হিন্দি ভাষা, তার উদ্ভব খুব বেশি দিন আগে হয়নি। এর উদ্ভব হয়েছে উর্দুর প্রতিক্রিয়া হিসেবে এবং হিন্দুত্ব রক্ষার ইচ্ছায়। অনেক সময় উর্দুর সাধারণ কথিত রূপকেও হিন্দুস্থানি বলে উল্লেখ করা হয়। উর্দু লেখা হয় ফারসি আরবি অক্ষরে। কিন্তু হিন্দি লেখা হয় নাগরি অক্ষরে। হিন্দু-উর্দুর মধ্যে এটা আরেকটি পার্থক্য। ব্রিটিশ ভারতে আদমশুমারিতে দেখা যায়, সে সময়ে ভারতে সবচেয়ে বেশি লোক কথা বলত হিন্দুস্তানি ভাষায়। তার পরেই জনসংখ্যার দিক থেকে ছিল বাংলা ভাষার স্থান। হিন্দি ভাষার তুলনায় বাংলা গদ্য ছিল অনেক উন্নত। ১৯৩০ সালে মীর মশাররফ হোসেনের লেখা ‘বিষাদসিন্ধু’ বই হিন্দিতে অনূদিত হয়। বইটি হিন্দিতে অনুবাদ করেন কবিন্দ্র বেনীপ্রসাদ। মীর মশাররফ হোসেন (১৮৪৭-১৯১১) যথেষ্ট উন্নতমানের গদ্য লিখেছেন। বাংলা সাহিত্য এ সময় ছিল অগ্রসর। তাই বাংলা থেকে হিন্দিতে অথবা হিন্দুস্তানিতে অনূদিত হয়েছে বহু গ্রন্থ। কিন্তু যখন প্রশ্ন উঠেছে ভাবি স্বাধীন ভারতের রাষ্ট্রভাষা অথবা সাধারণ ভাষা কী হবে, তখন হিন্দুরা সমর্থন করেছেন হিন্দিকে। আর মুসলমানরা সমর্থন করেছেন উর্দুকে। এ ক্ষেত্রে হিন্দি বলতে বুঝিয়েছে আধুনিক সংস্কৃতবহুল হিন্দিভাষাকে।
 
হিন্দি উর্দুর মধ্যে কোনো ব্যকরণগত পার্থক্য নেই। পার্থক্য হলো শব্দসম্ভারে এবং লিপির ক্ষেত্রে। কেউই ব্রিটিশ শাসনামলে বলেননি বাংলা ভাষাকে করতে হবে ভাবি স্বাধীন ভারতের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা। কিন্তু সাবেক পাকিস্তানে উঠেছিল এই দাবি। এ প্রসঙ্গে আমরা পরে আরো আলোচনায় আসছি। ব্রিটিশ আমলে ভারতে উর্দুকে সব মুসলমান সমর্থন করেছেন রাষ্ট্র বা সাধারণ ভাষা করার জন্য। দৃষ্টান্ত হিসেবে বলা যায় ১৯৩৮ সালে এ কে ফজলুল হক All India Muslim Educational Conference-এর সভাপতির ভাষণে বলেন, স্বাধীন ভারতের সাধারণ ভাষা (Lingua Franca) হতে হবে উর্দু। ফজলুল হক সাহেবের মাতৃভাষা ছিল বাংলা। কিন্তু তিনি সমর্থন করেন উর্দুর দাবিকে।
 
অন্যদিকে ১৯৪০ সালে নাগপুরে হিন্দি সাহিত্য সম্মেলনে মহাত্মা গান্ধী বলেন, উর্দু ভাষার বিকাশ হয়েছে মুসলিম নৃপতিদের পৃষ্ঠপোষকতায়। ভাবি স্বাধীন ভারতে উর্দুর আরো বিকাশ করতে হলে তার দায়দায়িত্ব হলো মুসলমানদের, অন্যদের নয়। মহাত্মা গান্ধীর মাতৃভাষা হিন্দি ছিল না, ছিল গুজরাটি। তিনি তার বিখ্যাত সর্বদ্বয় নামক বই লিখেছেন গুজরাটি ভাষায়। অর্থাৎ ব্রিটিশ আমলে রাষ্ট্রভাষার প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছিল হিন্দি-উর্দুর বিতর্ক। বাংলার দাবি সেখানে ছিল অনুপস্থিত।
 
১৯৪৮ সালে জিন্নাহ সাহেব যখন বলেন, উর্দুকেই করতে হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা, তখন তিনি তা বলেছিলেন পুরাতন ঐতিহ্যকে অনুসরণ করে। এ সময় হিন্দিকে ভারতের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হিসেবে ঘোষণা করা হয়। বিষয়টি ছিল সাবেক ব্রিটিশ ভারতের মধ্যে উদ্ভূত রাজনীতির জের। এটা নতুন কিছু ছিল না। জিন্নাহর মাতৃভাষা ছিল মহাত্মা গান্ধীর মতোই গুজরাটি। তিনি তার প্রথম জীবনে রাজনৈতিক প্রবন্ধ রচনা করেন মাতৃভাষা গুজরাটিতে। তিনি গুজরাটি বলতে ও লিখতে পারতেন। তিনি উর্দু ভাষায় মোটেও পারদর্শী ছিলেন না। উর্দু বলতেন ভাঙা ভাঙা ভাবে। ১৯৪৮ সালে তিনি ঢাকায় উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার সমর্থনে যে বক্তৃতা দেন, তা দিয়েছিলেন বিশুদ্ধ ইংরেজি ভাষায়; উর্দু ভাষায় নয়।
 
আমাদের একদল কথিত প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবী জিন্নাহ সাহেবের সমালোচনা করে চলেছেন উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার দাবির জন্য। কিন্তু তিনি যে কেবল উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার দাবি তোলেন, তা কিন্তু নয়। ১৯৫১ সালের ২৪ জানুয়ারি সোহরাওয়ার্দী সাহেবের নেতৃত্বে গঠিত হয় ‘পাকিস্তান জিন্নাহ আওয়ামী লীগ’। ১৯৫২ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি সিন্ধুর হায়দ্রাবাদ শহরে সোহরাওয়ার্দী সাহেব বলেন, যে আদর্শের ভিত্তিতে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হয়েছে সেই আদর্শ অনুসারে একমাত্র উর্দুই হওয়া উচিত পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা। এটা তিনি বলেছিলেন ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারির দু’দিন পরে। অর্থাৎ ঢাকায় ছাত্র-মিছিলে গুলি চলার পরে। আমাদের প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবীরা জানেন না যে, পাকিস্তানের কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাজ্জাদ জহিরও বলেছিলেন, উর্দুই হওয়া উচিত পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা। অর্থাৎ দক্ষিণপন্থী ও বামপন্থী দৃষ্টিকোণ ভাষার প্রশ্নে হয়ে উঠেছিল একই। মার্কসবাদীরা বিশ্বাস করেন, শ্রমিক শ্রেণীরা করবে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব। এই উপমহাদেশে শ্রমিকেরা হিন্দু-উর্দু যতটা বুঝতেন, বাংলা তা বুঝতেন না। বাংলার মানুষ মূলত ছিলেন কৃষিজীবী। মার্কস যে অর্থে শ্রমজীবী কথাটা তার বিখ্যাত কমিউনিস্ট মেনুফেস্টোতে বলেছেন, বাংলার কৃষকেরা সেই সংজ্ঞায় পড়েন না। তাই তাদের ভাষাকে নির্ভর করে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব অসম্ভব। সারা উপমহাদেশে কমিউনিস্টরা হিন্দি ভাষায় আওয়াজ তুলেছিলেন,
ইয়ে আজাদি ঝুট্টা হ্যায়
লাখো ইনসান ভুখা হ্যায়।
অর্থাৎ বিদেশী ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘটেছে, কিন্তু তাই বলে প্রকৃত স্বাধীনতা আসেনি। লাখ লাখ লোক এখনো অনাহারে ধুঁকছে। করতে হবে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব। বদলাতে হবে সমাজ জীবনের আর্থিক কাঠামো। এ ছিল তখন বামপন্থীদের বিরাট অংশের চিন্তাচেতনা। রাষ্ট্রভাষার দাবি তাই তাদের কাছে ছিল কেবল অবান্তরই নয়, সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব থেকে মানুষের চেতনাকে অন্য দিকে ঘুরিয়ে নেয়া। এটা একটি বুর্জুয়া চক্রান্ত ছাড়া আর কিছুই নয়। এই উপমহাদেশে প্রকৃত শ্রমজীবীদের অধিকাংশের ভাষা হলো উর্দু বা হিন্দুস্তানি। সেটাকেই মানতে হবে বিপ্লবের ভাষা হিসেবে। তার মাধ্যমেই প্রচার করতে হবে বিপ্লবের বাণী। পূর্ব পাকিস্তানের কিছু বামপন্থী অবশ্য ছিলেন বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে। কিন্তু সেটা বাম রাজনীতির মূলধারা ছিল না। তারা ভাবছিলেন গায়ের জোরে দখল করতে হবে রাষ্ট্রক্ষমতা। রাষ্ট্রিক পরিকল্পনার মাধ্যমে গঠন করতে হবে সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি। তারা ভুগছিলেন এক রোমান্টিক বিপ্লববাদে। আমাদের অর্থনীতি বৈষয়িক ও কৃতকৌশলের দিক থেকে ছিল খুবই অনগ্রসর। কার্ল মার্কস বলেছেন, উৎপাদনী শক্তি বাড়াতে হবে। উৎপাদনী শক্তি বাড়ে নতুন প্রযুক্তির মাধ্যমে। কিন্তু তার এই শিক্ষাকে ভুলে গিয়ে এ দেশের বামপন্থীরা চাচ্ছিলেন বিপ্লব করতে; যেটা সম্ভব ছিল না। কেননা, উৎপাদনী শক্তির বিকাশের ওপর নির্ভর করে উৎপাদনী সম্পর্ক। উৎপাদনী শক্তির বিকাশ ছাড়া উৎপাদন সম্পর্কের পরিবর্তন সম্ভব নয়। কিন্তু ইলামিত্র ১৯৫০ সালের ৫ জানুয়ারি চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোল থানায় ঘটান সাঁওতাল বিদ্রোহ। এই সালেরই ২৪ এপ্রিল কমিউনিস্টরা রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারের খাপড়া ওয়ার্ডে কয়েদিদের সাথে হাত মিলিয়ে করতে চান উত্থান। তখন পাকিস্তান সবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এ দেশে মুসলিম জনসমষ্টি তখন ভাবছিলেন পাকিস্তানকে রক্ষা করতে হবে। তাদের কাছে এ ধরনের অভ্যুত্থান মোটেও গ্রহণযোগ্য ছিল না। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন অনেকের কাছে মনে হয়েছিল একটা পাকিস্তানবিরোধী ষড়যন্ত্র হিসেবে। তারা তাই করেছিলেন এর বিরোধিতা। ষড়যন্ত্র যে কিছু হয়নি, তা বলা যাবে না। Arun Bhattacharja একটি বই লিখেছেন Dateline mujibnagar নামে (Bikas Publishing house. New Dilhi 1973)।
 
এই বইয়ের ৯৫ পৃষ্ঠায় তিনি বলেছেন, ১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ঢাকায় গুলি চলার পর পাকিস্তানে নিযুক্ত সে সময়ের ভারতীয় হাইকমিশনার সি সি দেশাই নাকি গোপনে মওলানা ভাসানীর সাথে দেখা করেন। এই সাক্ষাৎকারটি ঘটেছিল টাঙ্গাইলে আর পি সাহা কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত মেয়েদের স্কুলের এক সাস্কৃতিক অনুষ্ঠানে। সি সি দেশাই নাকি ভাসানীকে বলেছিলেন, পূর্ব পাকিস্তান যদি স্বাধীন হতে চায়, তবে ভারত তাতে মদদ দেবে। অরুণ বাবুর কথা কতটা নির্ভরযোগ্য আমি তা জানি না। তবে এরকম ষড়যন্ত্রের কথা তখন হয়তো পাকিস্তান সরকার কিছুটা আঁচ করতে পেরেছিল।
 
ভাষা আন্দোলন হয়েছিল সাবেক পাকিস্তানের রাষ্ট্রিক কাঠামোর মধ্যে। সুলতানি আমলে বাংলার সরকারি ভাষা বাংলা ছিল না। রাজকার্য চলত ফারসি ভাষার মাধ্যমে। বাদশাহী আমলেও ফারসি ভাষার মাধ্যমে চলেছে সরকারি কাজকর্ম। ব্রিটিশ শাসনামলে ইংরেজি ছিল রাজকর্মের ভাষা। বাংলা কোনো দিনই রাজকর্মের ভাষা ছিল না। এমনকি ব্রিটিশ শাসনামলেও ১৮৩৮ সাল পর্যন্ত ফারসি ছিল আদালতের ভাষা। মুসলমান বাড়ির ছেলেরা লেখাপড়া শিখতেন প্রধানত ফারসি ভাষার মাধ্যমে। আর ফারসি জানার জন্য পেতে পারতেন সরকারি চাকরি। কিন্তু ইংরেজি চালু হওয়ার ফলে তারা বিবেচিত হতে থাকলেন অশিক্ষিত হিসেবে। সরকারি চাকরিতে থাকল না তাদের আর পূর্বেকার অধিকার। ইংরেজি শিক্ষার মূল কেন্দ্র ছিল কলকাতা শহর। কলকাতা শহরে বরাবরই মুসলমানেরা বিশেষ বাস করতেন না। গোটা পশ্চিম বাংলাতেই মুসলমানেরা ছিলেন সংখ্যায় কম। ইংরেজি শিক্ষার সুযোগও তাই ছিল তাদের জন্য কম। ব্রিটিশ শাসনে তাই তারা হয়ে পড়েন সরকারি জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন। তাদের জীবনে নেমে আসে বিশেষ সঙ্কট। ইংরেজ আমলে মুসলমানেরা হয়ে পড়েন ইংরেজ ও হিন্দু শাসিত। বাঙালি হিন্দু ইংরেজি শিখে সারা উত্তর ভারতে পেতে থাকেন ইংরেজদের পরেই সরকারি চাকরি। তারা হয়ে ওঠেন একটি বিশেষ সুবিধাভোগী শ্রেণী। তাদের হাতে গড়ে ওঠে নতুন বাংলা গদ্য রস-সাহিত্য। এ থেকে এই ধারণার উদ্ভব হয় যে, বাংলা হলো বাঙালি হিন্দুর ভাষা; মুসলমানের ভাষা নয়। যে ধারণাটা আগে ছিল না। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস চর্চা করলে দেখা যায়, যে বাংলাটা আমরা বুঝি এবং যাকে বাংলা ভাষা বলতে কারো আপত্তি হয় না, সেই বাংলা ভাষায় লেখা এ পর্যন্ত যত পুরনো বই আবিষ্কার হয়েছে, তার মধ্যে শাহ মুহম্মদ সগীরের (১৩৮৯-১৪০৯) লেখা ইউসুফ জুলেখা হলো সর্বপ্রাচীন।
 
সুলতানি আমলের আগের কোনো বাংলা বই এখনো আবিষ্কার হয়নি। সুলতানি আমলে মুসলিম পৃষ্ঠপোষকতায় বিশেষভাবে শুরু হতে পেরেছিল বাংলা ভাষা সাহিত্যের চর্চা। এর একটা কারণ ছিল ফারসি ভাষার সংস্পর্শে এসে চিন্তাচেতনার বিশেষ জাগরণ। ফারসি তখন ছিল বিশ্বের অন্যতম সমৃদ্ধ ভাষা। বাংলাভাষী মুসলমানের ধর্মচেতনায় আরবির থেকে ফারসি ভাষা রেখেছে অনেক বড় অবদান। নামাজ, বেহেশত, দোজখ, পয়গাম্বর এসব শব্দ আরবি ভাষার নয়। খোদা শব্দটা আরবি ভাষার হলেও, তা বাংলা ভাষায় এসেছে ফারসি ভাষারই মাধ্যমে। প্রায় ৭০০ বছর ধরে ফারসি ছিল বাংলার সরকারি ভাষা। আর ফারসি সংস্কৃতির হাত ধরে বাংলা সাহিত্যের ঘটেছে অগ্রগতি। ফারসি গদ্যের ধারায় উদ্ভব হয়েছে বাংলা গদ্য। যাতে অনেক জায়গায় রচিত হয়েছে দলিল-দস্তাবেজ।
 
১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দে লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের আদর্শে কলকাতা, মাদ্রাজ ও বোম্বাইয়ে স্থাপিত হয় বিশ্ববিদ্যালয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ ছিল উচ্চ বিদ্যালয়গুলোর সর্বোচ্চ পরীক্ষা গ্রহণ এবং কলেজগুলোর পরীক্ষা গ্রহণ। বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো পাঠদানের ব্যবস্থা ছিল না। বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠদানের ব্যবস্থা গৃহীত হয় যথেষ্ট পরে। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে ড. ই এম স্যাডলারকে আমন্ত্রণ করে আনা হয়। স্যাডলার ছিলেন বিলাতের লিড্স বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর। তার সভাপতিত্বে গঠিত হয় স্যাডলার কমিশন (১৯১৭-১৯১৯)। এই কমিশনের কাজ হিসেবে বলা হয়, শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কারকল্পে সুপারিশ প্রণয়ন। স্যাডলর কমিশন অনেক সুপারিশ প্রণয়ন করে। স্কুলের শিক্ষার ক্ষেত্রে তারা বলেন, ইংরেজিতে শিক্ষা না দিয়ে মাতৃভাষার মাধ্যমে শিক্ষা দেয়া ও পরীক্ষা গ্রহণ করতে। তারা বলেন যে, একমাত্র ইংরেজি ও গণিত ছাড়া আর সব বিষয়ে স্কুলের ছাত্রদের পঠন পাঠন করতে হবে মাতৃভাষায়। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় এই কমিশনের সুপারিশ গ্রহণ করে বাংলা প্রদেশে স্কুল পর্যায়ে বাংলা ভাষায় পাঠদান আরম্ভ করে। অবশ্য এই পাঠদান ব্যবস্থা করতে বেশ কয়েক বছর সময় লেগেছিল। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে প্রথম বাংলায় প্রবেশিকা পরীক্ষা (Entrance) গ্রহণ করা হয় ১৯৪০ সালে। অর্থাৎ ইংরেজ আমলে স্কুল পর্যায়ে বাংলা হয়ে ওঠে বাংলা প্রদেশে শিক্ষার মাধ্যম।
 
ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানি পাঞ্জাব দখল করে ১৮৪৬ খ্রিষ্টাব্দে। পাঞ্জাবের রাজধানী লাহোরে পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হয় ১৮৮২ খ্রিষ্টাব্দে। ১৯১৫ খ্রিষ্টাব্দে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানো শুরু হয় পাঞ্জাবি ভাষা সাহিত্য। পাঞ্জাবের সর্বত্র এই পাঞ্জাবি ভাষা চলত না। পাঞ্জাবি ভাষার একটা উপভাষা হলো লহন্দা বা হিন্দকি। এই উপভাষায় বিশেষভাবে কথা বলতেন পশ্চিম পাঞ্জাবের লোক। এরা ছিলেন মুসলমান। এই ভাষার কোনো লিখিত সাহিত্য ছিল না। পাঞ্জাবি বলতে যে ভাষাটাকে বোঝায়, তা চলত প্রধানত লাহোর ও পূর্ব পাঞ্জাবে। পূর্ব পাঞ্জাবে বাস করতেন শিখরা। শিখরাই করেন বিশেষভাবে পাঞ্জাবি ভাষার চর্চা। তাদের হাতে গড়ে উঠেছে বর্তমান পাঞ্জাবি সাহিত্য। পাঞ্জাবের রাজধানী লাহোর ও পশ্চিম পাঞ্জাব পড়েছে পাকিস্তানে। কিন্তু পূর্ব পাঞ্জাব পড়ে ভারতে। পূর্ব পাঞ্জাবের আবার সব অংশে যে পাঞ্জাবি বলা হতো, তা নয়। দক্ষিণ অংশে মানুষ বলত হিন্দি। পাঞ্জাবি ভাষা লেখা হয় গুরুমুখী অক্ষরে। কিন্তু পাঞ্জাবি হিন্দুরা হিন্দি লিখতেন নাগরী অক্ষরে। পাঞ্জাবি হিন্দুরা এখন পৃথক হয়ে একটা ভিন্ন প্রদেশ গঠন করেছেন, যার নাম হয়েছে হরিয়ানা। যার সরকারি ভাষা হলো হিন্দি। পাঞ্জাবি ভাষা বলেন এবং চর্চা করেন শিখরা। তারা গঠন করেছেন পাঞ্জাবি ভাষী শিখ-সুবা। পশ্চিম পাঞ্জাব যা পড়েছে পাকিস্তানে, সেখানে পাঞ্জাবি ভাষার তেমন চর্চা নেই। পাঞ্জাবি হিন্দুরা যেমন করতেন হিন্দির চর্চা, পাঞ্জাবি মুসলমানেরা করতেন তেমনি আবার উর্দুর চর্চা। উর্দু ছিল তাদের মানসিক প্রকর্ষের ভাষা (Culture Language)।
 
পাঞ্জাবের কবি ইকবাল কবিতা লিখেছেন ফারসি এবং উর্দুতে। যে অংশ নিয়ে গঠিত হয় সাবেক পাকিস্তানের পশ্চিমাংশ, সেখানে উর্দু হয়ে উঠেছিল মানসিক প্রকর্ষের ভাষা। উর্দুর প্রভার পড়ার আর একটি বিশেষ কারণও ছিল। ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে চলত রোমান উর্দু। রোমান উর্দু বলতে বোঝাত, রোমান অক্ষরে (ইংরেজি অক্ষরে) লেখা উর্দুকে। পাঞ্জাবি বা বালুচি এবং সীমান্ত প্রদেশের পাঠানরা বিরাট সংখ্যায় চাকরি করেছেন ব্রিটিশ ভারতের সেনাবাহিনীতে। এ কারণে তাদের শিখতে হয় উর্দু। ব্রিটিশ শাসনামলে যেসব সাহেব এ দেশে সরকারি চাকরি করতে আসতেন, তাদেরও শিখতে হতো রোমান উর্দু। রোমান উর্দু শেখার ব্যবস্থা ছিল অক্সফোর্ড, কেমব্রিজ, লন্ডন ও ডাবলিন বিশ্ববিদ্যালয়ে। বাঙালি মুসলমান সেনাবাহিনীতে চাকরি করতে যাননি। তাই শেখেননি রোমান উর্দু। না হলে তাদেরও শিখতে হতো রোমান উর্দু। আর তাদের ওপর পড়তে পারত উর্দু ভাষার একটা প্রভাব। কিন্তু সেটা পড়তে পারেনি ঐতিহাসিক কারণেই। অন্য দিকে, যেহেতু বাংলা হয়ে দাঁড়ায় স্কুল পর্যায়ে শিক্ষার মাধ্যম, তাই বাংলাদেশে হিন্দু ও মুসলমান উভয়ই শিখেছেন একইভাবে বাংলা ভাষা। বাংলা ভাষার প্রভাব তাদের ওপর পড়েছে প্রায় সমভাবে। অবশ্য মুসলমানদের মধ্যে শিক্ষার হার ছিল খুবই কম। কিন্তু যারা শিক্ষিত হয়েছিলেন, তারা সবাই জানতেন বাংলা গদ্য লিখতে ও পড়তে। বাংলা সবাই লিখেছেন একই বর্ণমালায়। সৃষ্টি হয়নি তাই বর্ণমালার বিরোধ। উর্দুকে যখন পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার প্রস্তাব ওঠে, তখন পাকিস্তানের পশ্চিমাংশ থেকে কোনো প্রতিবাদ ওঠেনি। কেননা তারা মানসিক প্রকর্ষের ভাষা হিসেবে আগেই গ্রহণ করেছিলেন উর্দুকে। এ ছাড়া শিখেছিলেন ফৌজে চাকরি করার জন্য রোমান উর্দু। কিন্তু পূর্ব বাংলা থেকে প্রতিবাদ ওঠে। কেননা পূর্ব বাংলার (পূর্ব বাংলা প্রদেশকে সরকারিভাবে পূর্ব পাকিস্তান বলা শুরু হয় ১৯৫৫ সাল থেকে, তার আগে বলা হতো পূর্ববঙ্গ প্রদেশ) বাংলাভাষী মুসলমানেরা মনে করেন, তারা যেহেতু উর্দুভাষী নন, অথবা উর্দু তাদের মানসিক প্রকর্ষের ভাষা নয়, তাই তারা পাকিস্তানের পশ্চিমাংশের এবং উর্দুভাষী মুসলমানদের সাথে উর্দু ভাষায় প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা দিয়ে ভালো করতে পারবেন না। বড় বড় চাকরি পাবেন উর্দুভাষী এবং পশ্চিম পাকিস্তানের অধিবাসীরা। পূর্ব বাংলার মানুষ শেষ পর্যন্ত হয়ে পড়বেন তাদেরই শাসনাধীন। পূর্ব বাংলার মানুষ হয়ে পড়বেন নিজভূমে পরবাসী। পাকিস্তান হওয়ার পর, সারা পাকিস্তানের মোট জনসংখ্যার অর্ধেকের বেশি দাঁড়ায় বাংলাভাষী জনসমষ্টি। বাংলার পাট, চা, ছাগ-চর্ম রফতানি করে অর্জিত হতে থাকে পাকিস্তানের বৈদেশিক মুদ্রার অধিকাংশ। বাংলাভাষী মুসলমান তাই শক্ত ভিত্তিতে দাঁড়িয়ে দাবি করতে পারেন, বাংলাকে দিতে হবে অন্যতম রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা। পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা একটি না হয়ে হতে হবে দু’টি। অন্য দিকে, ভারতে হিন্দিভাষী মানুষ হন অন্যান্য ভাষাভাষী মানুষের তুলনায় অনেক বেশি। তারা হয়ে দাঁড়ান ভাষার দিক থেকে প্রথম স্থানের অধিকারী। দ্বিতীয় স্থানের অধিকারী হন তেলুগুভাষীরা। আর তৃতীয় স্থানে আসেন বাংলাভাষীরা। তাদের বাংলা ভাষা নিয়ে আন্দোলন করার ভিত্তি ছিল না। ছিল না মনমানসিকতা। ভারতে তাই ওঠেনি বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবি। কিন্তু ভারতেও বাস্তব ক্ষেত্রে একমাত্র হিন্দিকে রাষ্ট্রভাষা করে তোলা যায়নি। বাস্তবে রাষ্ট্রভাষা এখনো হয়ে আছে ইংরেজি। যেমন ছিল ব্রিটিশ শাসনামলে। তাই সেখানে জাগছে না ভাষা নিয়ে সঙ্ঘাত। না হলে সেখানেও ভাষা নিয়ে সঙ্ঘাত অনিবার্য হয়ে উঠত।
 
লেখক : প্রবীণ শিক্ষাবিদ ও কলামিস্ট