Widget by:Baiozid khan
শিরোনাম:

ঢাকা Mon July 13 2020 ,

  • Techno Haat Free Domain Offer

ভারতের এনআরসি বিল ও বিক্ষোভ

Published:    
Image

মো. মাঈন উদ্দিন: ভারতের এনআরসি বিল ও বিক্ষোভ বাংলার লোকমুখে একটি প্রবাদ প্রায়ই শোনা যায়- চুন খেয়ে মুখ পুড়লে দই দেখে ভয় হয়। ১৯৭১ সালে পাকিস্তান আমাদের শুধু ভয়ই দেখায়নি, ভয়কে বাস্তবে পরিণত করেছিল। তারা রীতিমতো তাণ্ডব চালিয়েছিল এদেশের সম্পদের ওপর, জনগণের ওপর। 

তাদের তাণ্ডবে এদেশে ৩০ লাখ লোক শহীদ হয়েছিল এবং লাখ লাখ নারী তাদের সম্ভ্রম হারিয়েছিল। সে ভয় আমরা এখনো কাটিয়ে উঠতে পারিনি, আমরা এখনো কাটিয়ে উঠতে পারিনি তাদের তাণ্ডবের ক্ষয়-ক্ষতি, এরই মধ্যে আমাদের পাশ্ববর্তী দেশ মিয়ানমার আমাদের ভয় দেখাতে শুরু করে। সেই আশির দশক থেকে তারা তাদের নাগরিকদের ঠেলে দিতে থাকে আমাদের ছোট্ট এ দেশে। আমরা আবারও ধাক্কা খাই। পাকিস্তানি তাণ্ডবের ধ্বংসলীলা ধুয়ে-মুছে সাফ করতে না করতেই মিয়ানমার তাদের জনগণের বোঝা আমাদের কাঁধে চাপিয়ে দেয়। পশ্চিম থেকে আমাদের উদ্বিগ্ন নজর ঘুরিয়ে নিতে হয় পূর্বে। এমনিতেই ছোট্ট এদেশে বেকারত্ব ঘুচাতে যখন আমরা হিমশিম খাচ্ছি তখন মিয়ানমার সময় সময় তাদের মানুষকে আমাদের দেশে ঠেলে পাঠিয়ে এ দেশকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা চালায়। সেই আশির দশকের রোহিঙ্গা সমস্যা বর্তমানে এসে প্রকট আকার ধারণ করেছে।

পুলিশ ক্যাম্পে হামলার ঘটনাকে কেন্দ্র করে মিয়ানমার ২০১৭ সালে কমবেশি ৮ লাখ রোহিঙ্গাকে তাড়িয়ে এদেশে পাঠায়। এসব রোহিঙ্গাকে জায়গা দিতে এদেশের লাখ লাখ একর বনভূমি আজ উজার। এছাড়াও নানাবিধ সমস্যা আজ এদেশে উদ্ভব হচ্ছে ওইসব রোহিঙ্গাদের জন্য। ২০১৭ সালে আসা ৮ লাখসহ মোট ১২ লাখ রোহিঙ্গার বোঝা আজ উন্নয়নশীল এবং ক্ষুদ্র পরিসরের এই দেশকে বইতে হচ্ছে। মিয়ানমার এই রোহিঙ্গাদের ফেরত নেওয়ার কথা বলেও বিভিন্ন অজুহাতে আজও ফেরত নিচ্ছে না। এই যে সমস্যাটা- এটার সমাধান হতে না হতেই আমাদের আরেক পাশর্^বর্তী দেশ ভারতে চলছে এনআরসি নামক জুজু। যে জুজুর ভয় আমাদের তাড়িয়ে বেড়াতে শুরু করেছে। ওই যে বললাম, চুন খেয়ে মুখ পুড়লে দই দেখে ভয় হয়। ভারতের এই এনআরসি বিলটি আইনে পরিণত হলে কী হবে? শোনা যাচ্ছে এনআরসি বিলটি আইনে পরিণত হলে বাংলাদেশ, পাকিস্তান, আফগানিস্তান এবং চীন থেকে নিপীড়নের মুখে পালিয়ে যাওয়া হিন্দু, বৌদ্ধ, শিখ, জৈন, পার্সি ও খ্রিস্টানদের নাগরিকত্ব দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

বিলটি পাসের পর থেকে দেশ-বিদেশে সমালোচনার ঝড় বইছে। এই আইনে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হবে দ্বিতীয় সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম জনগোষ্ঠী। ভারতের এই নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনের প্রতিবাদে জ্বলছে পুরো ভারত। বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে দেশটির বিভিন্ন রাজ্যে। এই আইনের বিরুদ্ধে ও জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশের নির্যাতনের প্রতিবাদে হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় নেমেছে। বিক্ষোভে প্রাণহানিও ঘটছে। হাজার হাজার ব্যক্তিকে আটক করা হয়েছে। হিন্দুস্তান টাইমসের খবরে বলা হয়েছে, শুধু গত শুক্রবারের বিক্ষোভে মেরুতে ৩ জন, বিজোনরে ২ জন, বারানসী, ফিরোজবাদ, সম্ভাল এবং কানপুরে একজন করে বিক্ষোভকারী নিহত হয়েছে। এসব প্রাণহানির প্রতিবাদে আবার বিক্ষোভকারীরা রাস্তায় নামে। প্রতিদিন হাজার হাজার বিক্ষোভকারী নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনের বিরুদ্ধে রাস্তায় স্লোগান দিচ্ছে। বিক্ষোভকারীদের ওপর টিয়ার গ্যাসের শেল নিক্ষেপ ও লাঠিচার্জ করছে পুলিশ। দেশটির সংবাদ মাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, উত্তরপ্রদেশ রাজ্যে পুলিশ হাজারেরও বেশি মানুষকে গ্রেফতার করেছে।

আর পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সহিংসতায় জড়িত থাকার অভিযোগে গত এক সপ্তাহে সমগ্র উত্তর প্রদেশ রাজ্যে প্রায় ৩ হাজার জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতি সামাল দিতে বিভিন্ন রাজ্যে জারি করা হয় ১৪৪ ধারা। বন্ধ রাখা হয় ইন্টারনেট পরিসেবা। ভারতের উত্তর প্রদেশ রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ এই সহিংসতার ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ করেছেন। তিনি সব মানুষকে শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। কিন্তু তার আবেদনই কি সবকিছু।

নাগরিকত্ব আইনের প্রতিবাদে গত কয়েক দিন থেকেই উত্তাল ভারত। ভারতের এই অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতিতে দেশের নিরাপত্তা বিষয়ে উদ্বিগ্ন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। শান্তি-শৃঙ্খলা ফেরানোর লক্ষ্যে গত শনিবার কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার সদস্যদের নিয়ে জরুরি বৈঠক ডাকেন। ভারতের এমন পরিস্থিতিতে আমরা বাংলাদেশিরা উদ্বিগ্ন। গত কয়েক বছর ধরে ভারতের আসামে যা ঘটছে এবং এই এনআরসি নামক জুজু আইনে পরিণত হলে ভারতের সংখ্যালঘু মুসলিমরা নির্যাতনের মুখে জীবন বাঁচানোর তাগিদে এদেশে আশ্রয় নিতে পারে।

আর সেটাই আশঙ্কার বিষয়। কারণ, চুন খেয়ে আমাদের মুখ ইতোমধ্যেই পুড়ে গেছে!

প্রশাসনিক কর্মকর্তা, কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়,

moin412902@gmail.com