Widget by:Baiozid khan
শিরোনাম:

ঢাকা Mon July 16 2018 ,

আত্মত্যাগের ঈদ

Published:2013-10-15 19:43:39    

আ ক ম রুহুল আমিন: আত্মত্যাগের ঈদ। আত্মত্যাগ শিক্ষা দিক। কুরবানী। হজ্জ। কিবলা। কিবলাঘর। মক্কা। মিনা। আরাফাত। মুযদালিফা। এবং শান্তির নগরী। নবীর শহর। মদীনা মুনাওয়ারা।
বিশ্ব মুসলমানের সবচেয়ে বড় মিলন সম্মিলন। বিশ্বমানুষের সম্পৃক্ততা কুরবানী এবং আরাফাত দিবসে নফল সাওম। ইবরাহীম (আ), ইসমাঈল (আ), বিবি হাজেরা এবং সাফা-মারওয়া পাহাড়।
ঈদুল আযহা। মুসলিম দুনিয়ার অসংখ্য নবী-রাসূলের সুন্নাত সমৃদ্ধ ঈদুল আযহা, হজ্জ এবং কুরবানী। বছর ঘুরে ঘুরেই আসে। এবারও ঈদ এসেছে। নানান রাজনৈতিক যন্ত্রণা, অবিশ্বাস, গীবত, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, দেশময় যানজট। এর মধ্যেই আমাদের দেশে চাঁদ কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ঈদুল আযহা পালিত হচ্ছে। প্রতিবছরের ন্যায় সরকারি ছুটি আছে ৩ দিন। সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সাপ্তাহিক দুদিনের ছুটি। ঢাকা নগরী ছ’ দিনের জন্য যানজট মুক্ত।
কুরবানীর বা ঈদুল আযহার হজ্জ সম্মিলনের পরে সবচেয়ে সৌন্দর্য কর্ম হচ্ছে চার পা’য়ের হালাল পশু কুরবানী বা যবেহ করা। এই কুরবানীর মধ্যে তিনজন নবী ও রাসূলের সুন্নাত সন্নিবেশিত হয়েছে এবং সাতজন নবী-রাসূল এই কুরবানীকে স্মরণে এনে চতুষ্পদ প্রাণী যবেহ করেছেন।
কুরবানীর ইতিহাস বিশ্ব মুসলমানের কাছে কেবল পরিচিত নয়; বিশ্বমানবের কাছে আল্লাহর উপর আস্থাশীল দু’জন মানুষের ত্যাগের সর্বশ্রেষ্ঠ দৃষ্টান্ত এর মধ্যে নিহিত। আল্লাহর সন্তুষ্টি বিধানে, স্রষ্টার স্বাপ্নিক নির্দেশে ইবরাহীম (আ) যবেহ করতে উদ্যত হয়েছিলেন স্বীয় পুত্র ইসমাঈল (আ)-কে।
জীবনসায়াহ্নে ইবরাহীম (আ) আল্লাহর ইচ্ছায় লাভ করেছিলেন প্রাণপ্রিয় পুত্র ইসমাঈল (আ)-কে। সেই পুত্রের তাঁর গভীর মমত্ববোধ তাঁকে মানসিকভাবে অনেকবারই বিভ্রান্ত করেছে আল্লাহর চেয়ে তিনি বেশি ভালোবেসে ফেলেছেন কি না। আর সে বিভ্রান্তি দূর করার জন্য তিনি পেয়েছিলেন মহান আল্লাহর কাছ থেকে ত্যাগের পরীক্ষামূলক নির্দেশনা।
নাবালক পুত্র ইসমাঈল। আল্লাহকে ভালোবেসে তিনি নবুওয়াত পেয়েছিলেন। পুত্রকে যবেহ করবেন- এই চিন্তা নিয়ে যখন পিতা পুত্রের সামনে উপস্থিত হলেন তখন পিতা নন; সন্তানই পিতাকে প্রশ্ন করেছিলেন, পিতা! আপনি বিচলিত কেন? পিতা গম্ভীর গলায় ছলছল চোখে উত্তর দিয়েছিলেন, পুত্র! নয়নের মানিক আল্লাহ আমাকে পরীক্ষা করার জন্য আমার পুত্রকে কুরবানী দেওয়ার নির্দেশ করেছেন। স্মিত হেসে পুত্র জবাব দিয়েছিলেন, আল্লাহর নির্দেশ আপনি পালন করুন। আমি প্রস্তুত। পিতা পুত্রকে বুকে জড়িয়ে ছুরি হাতে নিয়ে বেরিয়ে পড়েছিলেন তাঁবু থেকে। মিনার অদূরে পাহাড়। সেখানেই পিতা যখন পুত্রকে কুরবানীর জন্য প্রস্তুত হতে বললেন তখন পুত্র বললেন, পিতা আপনি আপনার পাগড়ি দিয়ে আপনার চোখ দুটি বাঁধুন। আমার রক্ত দেখলে আপনি ভয় পেতে পারেন। পিতা তা-ই করলেন।
মহান আল্লাহ পিতা-পুত্রের এই ত্যাগের দৃশ্য দেখে হয়তো অভিভূত হয়েছিলেন। ফেরেশতাকুলকে ডেকে বলেছিলেন, দেখ, আমার প্রিয় মানুষেরা আমার প্রতি কত বেশি সমর্পিত। আল্লাহ ফেরেশতার মাধ্যমে পুত্র ইসমাঈলকে সরিয়ে ইবরাহীমের ছুরির নিচে একটি চতুষ্পদ প্রাণীকে শুইয়ে দিয়েছিলেন। কুরবানী হয়ে গেল পুত্রের স্থলে চতুষ্পদ পশু। মহান আল্লাহর কাছে ভালো লাগা পিতাপুত্রের এই সুন্নাতটি আল্লাহ দুনিয়ার শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ (স)-এর মাধ্যমে কিয়ামত পর্যন্ত ইসলাম অনুসারীদের কাছে সেই কুরবানীকে ওয়াজিব করে দিয়েছেন। সুবহানাল্লাহ!
আর্থিক দিক থেকে সামর্থ্যবান প্রতিটি মুসলমানের জন্য কুরবানী করা ওয়াজিব। মানুষ তার জীবনের বাহ্যিক এবং অভ্যন্তরীণ সকল কুপ্রবৃত্তিকে এই পশু কুরবানীর মাধ্যমে কুরবানী করার এক বিরাট সুযোগ সৃষ্টি করে দিয়েছেন আল্লাহ স্বয়ং।
এই কুরবানী আল্লাহর সঙ্গে মানুষের আত্ম সমর্পিত একটি বিষয় যেমন অত্যন্ত সুস্পষ্ট তেমনি এর সাথে একটি সামাজিক মিলবন্ধন রয়েছে। রয়েছে অর্থের দিক থেকে যারা অসমর্থ তাদের অনুভূতিকে বুঝার। এখানে একটি বিষয় আমরা উল্লেখ করতে চাই আর তা হলো- হালাল পশু, মহিষ, উট এবং গরুর বেলায় একাধিক ব্যক্তি তাদের পক্ষ থেকে আল্লাহর নামে কুরবানী করতে পারেন। এই নাম বিষয়টি আমাদের কাছে বিভিন্ন সময় শরীয়ত বহির্ভূত ব্যাখ্যা নিয়ে উপস্থিত হয়। বলা হয়, নামে নামে কুরবানী করা জায়েয। আসলে বিষয়টি তা নয়; কুরবানী হবে আল্লাহর নামে। এখানে কারো নাম উল্লেখ করা শরীয়ত নির্দেশিত নয়। আল্লাহ তার সেরা সৃষ্টির কাছে পবিত্র নিয়তকেই বিবেচনা করেন।
আল্লাহ জানেন, এই কুরবানী কার পক্ষ থেকে আসছে এবং কার কার পক্ষ থেকে আসছে। একটি সুস্পষ্ট হাদীস হলো- কুরবানী রক্ত, মাংস, হাঁড়, চামড়া কোনোটিই আল্লাহর কাছে পৌঁছে না; আল্লাহ শুধু বিবেচনা করেন কুরবানীর নিয়তটি। সহীহ নিয়ত, মকবুল কুরবানী।
কিছু কিছু ধর্মীয় প্রচারক আছেন, যারা না জেনে নানান কথা বলেন। যেমন- কুরবানীকৃত পশুর গায়ে যত পশম থাকবে প্রত্যেকটি পশমের জন্য একটি করে সওয়াব লেখা হবে। বলা হয়, হাশরের ময়দানে কুরবানীকৃত পশু আল্লাহর কাছে সুপারিশ করবে। আসলে এগুলো সঠিক কোনো কথা নয়। কোনো এক সময় মানুষকে কুরবানী দিতে আগ্রহ সৃষ্টি করতে এ ধরনের কথা হয়তো বা তারা প্রচার করতেন। এ প্রচার না করা ভালো।
বলছিলাম, কুরবানী মাংস অনেকেই জমিয়ে রাখার চেষ্টা করেন। কেউ কেউ এমন কথাও বলেন যে, কুরবানী মাংস যদি পরবর্তী মহররম মাস পর্যন্ত রেখে তারপর তা খাওয়া হয় এতে করে সওয়াব দ্বিগুণ পাওয়া যায়। এটিও একটি বিভ্রান্তিকর অসত্য বিষয়। কুরবানী মাংসকে তিন ভাগ করতে হবে: এক ভাগ দরিদ্রের মাঝে, এক ভাগ আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীর মাঝে এবং এক ভাগ নিজের জন্য রাখারও একটি মাসআলা আমাদের মাঝে চালু রয়েছে। আসলে আমরা যদি এমনটি করি তাহলে মন্দ হয় না; কিন্তু এমনটি করতে হবে এমন কোনো সহীহ নির্দেশনা কুরআন ও হাদীস থেকে আমাদের কাছে আসেনি। কেউ ইচ্ছা করলে পুরো মাংস বিলিয়ে দিতে পারে। আবার কেউ ইচ্ছা করলে যদি প্রয়োজন হয় তাহলে নিজের খাবারের সবটুকু রেখে দিতে পারেন। তবে তা অল্প সময়ের মধ্যে শেষ করা ভালো। এই সময়টি সম্পর্কে ইসলামী সমাজ সংস্কারকগণ যে বিষয়টির প্রাধান্য দিয়েছেন তাহলো- আড়াই দিন কিংবা তিন দিনের বেশি সময় যেন কুরবানীর মাংস নিজের ব্যবহারের জন্য না রাখা হয়। পাশাপাশি মাংস গরীবদের মাঝে যত বেশি বিলানো যাবে ততই উত্তম। রাসূল আমাদেরকে এই নির্দেশনাটুকু করেছেন।
চামড়া বা চামড়ার বিক্রয়লব্ধ টাকা। এ সম্পর্কেও বিভিন্ন মাসআলা-মাসাইল আমাদের মাঝে প্রচলিত আছে। বিশেষ করে আমাদের দেশের কওমী মাদরাসাগুলো এই চামড়ার উপর অনেক বেশি নির্ভরশীল। যারা যাকাত নিতে পারেন বা যাদেরকে যাকাত দেওয়ার নির্দেশনা রয়েছে তাদেরকে চামড়াও দিয়ে দেওয়া যাবে কিংবা এর বিক্রয়লব্ধ অর্থ তারা নিতে  পারবেন।
প্রাতিষ্ঠানিকভাবে মাদরাসায় চামড়া দিয়ে দেওয়া সহীহ শর্ত নয়। যাকাত যেমন ব্যক্তিবিশেষকে দিতে হয় ঠিক তেমনি চামড়াকেও যাকাত নেওয়ার উপযুক্ত ব্যক্তিকে দিতে হবে। সেক্ষেত্রে আমাদের দেশের ইসলাম প্রচারক সম্মানিত ব্যক্তিগণ যে মাসআলার মাধ্যমে মাদরাসায় চামড়া দেওয়ার বৈধ পথ তৈরি করেছেন তা হলো- অধিকাংশ মাদরাসায় গরীব মেধাবী ছাত্রদের জন্য লিল্লাহ বোডিং নামে একটি আবাসিক ব্যবস্থা চালু থাকে। ঐ গরীব ছাত্রদের নামে তারা চামড়া সংগ্রহ করতে পারেন, চামড়ার অর্থ সংগ্রহ করতে পারে। অতঃপর তাদের কাছ থেকে সেটি নামমাত্র মূল্যে বা সম্পূর্ণ দান হিসেবে গ্রহণ করে তা মাদরাসার কাজে ব্যবহার করতে পারেন।
প্রক্রিয়াটি একটি মহৎ প্রক্রিয়া বলে এদেশে এবং বিশ্বের দেশে দেশে অনেক দিন ধরে একটি স্বীকৃত ব্যবস্থা। আমরা যদি এ ব্যবস্থায় যাই তাহলে পরোক্ষভাবে ইসলাম প্রচারের যে মানসিক চিন্তা এখানে কাজ করে তা থেকে সওয়াব আল্লাহ দিলে দিতেও পারেন। এখানে একটি কথা মনে রাখতে হবে, কুরবানী পশুটি আল্লাহর নামে উৎসর্গ করা হয়। সুতরাং এর কোনো অংশেরই মালিক পৃথিবীর কোনো মানুষ নয়। এমনকি যিনি কুরবানী করেন তিনিও নয়। সে প্রেক্ষাপটে আল্লাহর রাস্তায় চামড়াটি ব্যয় করা নিঃসন্দেহে একটি উত্তম কাজ তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
প্রাসঙ্গিক অন্য একটি দৃষ্টিকটু বিষয় এখানে আলোচনা করা প্রয়োজন বলে মনে করছি। আর তা হলো- প্রতিযোগিতামূলক কুরবানী। সামাজিক প্রতিষ্ঠা লাভের আশায় কুরবানীর প্রদর্শনী করা এবং বাড়ি বাড়ি মাংস পাঠিয়ে নির্বাচনী ভোট পাওয়াটি নিশ্চিত করা অথবা রাজনৈতিক এবং সামাজিক স্বার্থ খোঁজা- এই সবগুলো কাজ কুরবানী বিরোধী তৎপরতা। এই তৎপরতা থেকে আমরা সরে না আসলে কুরবানী যেমন সম্মানিত হবে না; আমরাও সেই কুরবানী থেকে আল্লাহর সন্তুষ্টির বিপরীতে অসন্তুষ্টি লাভ করব। আল্লাহ আমাদেরকে ক্ষমা করুন। আল্লাহ সকল আরাফাতির হজ্জ কবুল করুন। বিধানসম্মত সকল কুরবানী গ্রহন করুন। আমাদের ইচ্ছাকে পূতপবিত্র রাখার তৌফিক দান করুন। আমীন।


বাংলাসংবাদ২৪/আর

আরও সংবাদ