Widget by:Baiozid khan
  • Advertisement

কিশোর রবি ঠাকুরের ইংল্যান্ড ভ্রমন

Published:2013-10-29 19:27:16    

ভিক্টোরিয়ান ইংল্যান্ড নিয়ে আমার আগ্রহ নেহায়েত কম দিনের নয়। বিংশ শতকের বঙ্গীয় রেনেসাঁর সময় ঘুরে ফিরে ভিক্টোরিয়ান ইংল্যান্ডের কথা রেফারেন্স হিসাবে চলে আসে। চার্লস ডিকেন্সের উপন্যাস যখন পড়েছি, তখনও জেনেছি। মিশেল ফুকো'র ‘হিসট্রি অব সেক্সুয়ালিটি’র প্রথম পর্ব যখন পড়েছি, তখনও ভিক্টোরিয়ান সমাজে নারীদের অবস্থান সর্ম্পকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য হয়েছি।

ইংল্যান্ডের শিল্প বিপ্লবের ইতিহাস পাঠের সময়ও ভিক্টোরিয়ান সমাজের কথা বাদ যায়নি। হুমায়ন আজাদের ‘নারী’ অথবা ‘দ্বিতীয় লিঙ্গ’ গ্রন্থে অসংখ্যবার বৃটিশ ভিক্টোরিয়ান সমাজে নারীর অবস্থানের কথা উল্লেখ আছে। সর্বশেষ, বৃটিশ নৃবিজ্ঞানের ইতিহাসে তো ‘ভিক্টোরিয়ান নৃবিজ্ঞান’ বলতে যা বোঝায়, সেখানেও নানান ইস্যু বিদ্যমান যা সেই সমাজে নারীদের অবস্থা বুঝতে সাহায্য করে, পাশাপাশি, নারীদের ব্যাপারে পুরুষতান্ত্রিক মনোভাব আন্দাজ করাটাও কিছুটা সহজ বলে মনে হয় আমার।

আমি সদ্য বরীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘য়ুউরোপ প্রবাসীর পত্র’ নামের ভ্রমন কাহিনী পড়ে শেষ করলাম এবং আমার ভিক্টোরিয়ান ইংরেজ সমাজ সম্পর্কে জানাশোনার জগৎ আরেকটু সম্প্রসারিত হল, এটুকু বলা যায়।

সে যাই হোক, ইংল্যান্ডের ইতিহাসে ভিক্টোরিয়ান যুগ বলতে আমরা বুঝি রানী ভিক্টোরিয়ার পুরো শাসনামল (১৮৩৭-১৯০১)। বৃটেনের জন্য এই যুগটি ছিল সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক শান্তি-শৃঙ্খলা, উন্নতি এবং সমৃদ্ধির যুগ। তবে ভিক্টোরিয়ান সমাজের সাফল্যের গল্পের থেকে আমার আগ্রহটি কিন্তু অন্যখানে- তৎকালীন বৃটিশ সমাজে নারীদের অবস্থা এবং তখনকার ইংরেজ মধ্যবিত্ত শ্রেনীর কাছে ‘অ-ইউরোপীয়’ সমাজ ও সংস্কৃতির ইমেজটি (যেমন ভারতবর্ষ)।

এই বিষয়গুলি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার ভ্রমন কাহিনীতে নিয়ে এসেছিলেন বলেই আমার আগ্রটি নতুন করে উসকে যায়। সেগুলির কয়েকটি নিয়েই আমার এই নিবন্ধ।

এবার রবীন্দ্রনাথ এবং পুস্তকটি নিয়ে কিছু কথা বলা যাক। রবীন্দ্রনাথ সমগ্র জীবনে অসংখ্যবার ভারতবর্ষের বাইরে নানা প্রয়োজনে ভ্রমন করলেও প্রথমবারের মতো তিনি কালাপানি পার হন ১৮৭৮ সালে। ১৮৭৮ সালের সেপ্টেম্বর মাস থেকে ১৮৮০ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দেড় বছর তিনি ইংল্যান্ডে অবস্থান করেন। উদ্দেশ্য ছিল উচ্চশিক্ষার এবং অভিভাবক হিসাবে যান মেজদা সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৪২-১৯২৩)। চার মাস লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন ছাড়া প্রাতিষ্ঠানিক পড়ালেখাটি তেমন ফলপ্রসূ হয়নি কিশোর বরীন্দ্রনাথের জন্য।

তখনকার প্রবাস জীবনের অভিজ্ঞতা পারিবারিক পত্রিকা ‘ভারতী’তে ‘য়ুউরোপ প্রবাসীর পত্র’ (বরীন্দ্রনাথ এই বানানে লিখতেন) নামে প্রকাশিত হত যেটির আবার সম্পাদক ছিলেন বড়দা দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৪০-১৯২৬)। বরীন্দ্রনাথের এই প্রথম ভ্রমন সাহিত্য সর্বপ্রথম পুস্তক আকারে প্রকাশিত হয় অনেক দেরীতে, তার মৃত্যুর মাত্র ৫ বছর পূর্বে, ১৯৩৬ সালে। তখন তিনি এটির একটি ভূমিকাও লিখে দেন। যে বিষয়টি আমাকে আগ্রহী করে তোলে সেটি হল মাত্র সতের-আঠোরো বছর বয়সে কল্পনার আধুনিক ভিক্টোরিয়ান ইংল্যান্ডকে বরীন্দ্রনাথ ঠিক কি চোখে দেখেছিলেন, সেই বিষয়টি। কেননা ইংল্যান্ড ছিল তখন ভারতীয় সমাজের কাছে উপনিবেশিক শাসকের দেশ।


ভিক্টোরিয়ান সমাজের নারীর অবস্থান ‘আধুনিক’ দৃষ্টিকোন থেকে যুৎসই ছিলনা মোটেও। পরবর্তীতে নারীবাদী ইতিহাসবিদগন ভিক্টোরিয়ান সমাজকে নারীদের জন্য খুবই ‘দমনমূলক’ বলে ঘোষনা দেন। নারীদের কোন ধরনের ভোটাধিকার, সম্পত্তির অধিকার ছিলনা। বিয়ের পর স্ত্রী হয়ে যেত স্বামীর ‘সম্পত্তি’। স্ত্রীর একমাত্র কাজ ছিল স্বামীকে ভালোবাসা, সম্মান করা এবং তার কথা অনুসরন করা- এগুলিই ছিল ভিক্টোরিয়ান নারীদের সামাজিক নৈতিকতা। পিতৃতান্ত্রিক সমাজই এই নৈতিকতাকে চর্চা করতো। গৃহস্থালীর কাজ এবং সন্তান লালন পালনা যেন সুনিপুন হয়, সেদিকেই নারীদের মনোযোগ বেশি ছিল। সে সময় অভিজাত ও মধ্যবিত্ত নারীদের শিক্ষার ব্যবস্থাও নেয়া হত কিন্তু সেই শিক্ষার আসল উদ্দেশ্য ছিল ‘ভদ্রমহিলা’ উৎপাদন করা। নারীদের ততটুকুই শিক্ষিত করে তোলা হয়ে থাকে যতটুকু অবসর সময়ে একজন শিক্ষিত স্বামীর বুদ্ধিবৃত্তিক সহচর্য দিতে পারবে। উনবিংশ শতকে উপনিবেশিক বাংলায় নারী শিক্ষার প্রাথমিক কারনের মধ্যেও এটি ছিল যে শিক্ষিত পুরুষের জন্য একজন ‘ভদ্রমহিলা’ উৎপাদন করা। কেননা তখন ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত মধ্যবিত্ত ‘ভদ্রলোক’দের জন্য ‘ভদ্রমহিলা’ উৎপাদন করাটাও একটি ঐতিহাসিক দাবীর মধ্যে পরে। কিশোর রবীন্দ্রনাথ তার ভ্রমন কাহিনীতে সেই রকম নারীদের কথাও উল্লেখ করেছেন।

তৎকালীন ইংরেজ ভিক্টোরিয়ান সমাজে ব্যক্তিগত পরিসরে [private sphere] নারীদের আধিক্য বেশি ছিল এবং জন পরিসরে [public sphere] ছিল পুরুষদের নিয়ন্ত্রনে। রবীন্দ্রনাথের ভ্রমন বৃত্তান্ত দেখে মনে হয়েছে তিনি শুধু ঘরের ভেতরেই অর্থ্যাৎ ব্যক্তিগত পরিসরে বেশি সময় কাটিয়েছেন। তবে কিশোর রবীন্দ্রনাথ শুধুমাত্র মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত নারীদের কথাই বলেছেন। সেখানে কোন শ্রমিক বা নিম্নবিত্ত নারীর কথা একদম আনেননি। কিন্তু যে সময় রবীন্দ্রনাথ ইংল্যান্ডে গিয়েছিলেন, সেই সময় তো সেখানে শিল্প বিল্পবের ফসল ঘরে তোলার জন্য সমগ্র ইংল্যান্ড ব্যস্ত।

সুতরাং, বিশাল সেই কর্মজজ্ঞ কেন তরুন কবির চোখ এরিয়ে গেল, সেই প্রশ্নটি আমার মনে আসে। তখন ইংরেজ সামান্তন্ত্রের ভাঙ্গন শুরু হয়েছে। জমির সাথে মানুষের সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে কলকারখানার সাথে মানুষের এক নতুন ধরনের সম্পর্ক তৈরী হচ্ছে। পরিবার প্রথা ভেঙ্গে যাচ্ছে। তখনকার কলকারখানায় কাজ করার জন্য পুরুষের পাশাপাশি অসংখ্য নারীও গ্রাম থেকে চলে আসে এবং শহরের বস্তিতে মানবেতর জীবনযাপন করতো। শিল্প বিল্পবের সময় শ্রমিক শ্রেনীর অবস্থা নিয়ে ফ্রেডরিক এঙ্গেলস তার বিখ্যাত বই ‘The Condition of working class in England 1844’ তে বিস্তারিত বর্ননা করেছেন [এই গ্রন্থটিকে কেউ যদি এ্যাথনোগ্রাফীর মর্যাদা প্রদান করে, তাহলে অন্তত আমি আপত্তি করবো না]। কিন্তু দেড় বছর ইংল্যান্ডে বা লন্ডনবাস করেও অভিজাত শ্রেনীর নারী ছাড়া আর কাউকে চোখে পড়েনি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের, সেটি আমাকে অবাক করেছে কিছুটা। তবে এটি সাথে সাথেই ভেবেছি যে রবীন্দ্রনাথ ইংল্যান্ডে গিয়ে অভিজাত এবং মধ্যবিত্ত পরিবারে বসবাস করার পাশাপাশি নিজেই মধ্যবিত্ত শ্রেনীর অন্তর্গত হবার কারনে সম্ভবত শ্রমিক বা নিম্নবিত্ত নারীদের বিষয়টি তার মানসদৃষ্টিতে ধরা পরেনি। তবে এখানে উল্লেখ করাটা অপ্রাসঙ্গিক হবেনা যে ১৯১২ সালে প্রকাশিত বরিঠাকুরের আত্নজীবনমূলক গ্রন্থ ‘জীবনস্মৃতি’-তে তিনি ‘বিলাত’ নামের এক অধ্যায়ে জীবনের প্রথম ইউরোপবাসের অভিজ্ঞতার কিছু অংশ বর্ননা করেন। সেখানে তিনি উল্লেখ করেন যে টনব্রিজ ওয়েলস শহরের রাস্তা দিয়ে যাবার সময় তিনি এক মলিন চেহারার ছেঁড়া কাপড়ের ভিখারিকে মুদ্রা দিয়েছিলেন। অন্যদিকে শিক্ষার্থী হিসাবে বরীন্দ্রনাথ ইংল্যান্ডে গিয়েছিলেন, লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস করেছেন, অন্যান্য শিক্ষার্থীদের সাথে মেলামেশা করেছেন, অথচ শিক্ষা ব্যবস্থা অথবা নিজের সেই অভিজ্ঞতাগুলিও ভ্রমনকাহিনীতে আনেননি তিনি। তবে ‘জীবনন্মৃতি’ গ্রন্থের বিলাত অধ্যায়ে ব্রাইটন স্কুল এবং লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নের অভিজ্ঞতার কথা একটু হলেও বর্ননা করেছিলেন। আবার, ভিক্টোরিয়ান যুগের সাহিত্যিক এবং সাংস্কৃতিক প্রভাব রবিঠাকুর তার এই ভ্রমনে লিপিবদ্ধ করেননি। অথচ সেটিই কিন্তু স্বাভাবিক ছিল। তিনি শেক্সপিয়ার, বায়রন, শেলী, টেনিসন, মিল্টনসহ আরও অনেককেই গোগ্রাসে গিলেছেন। তার কাব্যের উপর যে তাদের প্রভাব আছে, সেগুলিও রবীন্দ্র গবেষকরা নানা দৃষ্টিকোন থেকে দেখিয়েছেন। ‘জীবনস্মৃতি’ গ্রন্থের ‘বিলাত’ অধ্যায়ে আমরা কিশোর রবিকে রেলষ্টেশনে বসে বসে হার্বাট স্পেনসারের ‘The data of Ethics’ (1879) পড়তে দেখি। ভারতী পত্রিকায় এদের অনেককে নিয়ে নিবন্ধও লিখেছেন, অনুবাদ করেছেন তিনি। কিন্তু সেই বিষয়গুলি তার ভ্রমনকাহিনীতে লিপিবদ্ধ নেই।

যাহোক, ‘য়ুরোপ প্রবাসীর পত্রে’ ইংল্যান্ডের নৈসর্গিক বর্ননাও তেমন নাই শুধু নবম পত্রে টর্কি নামের এক সমুদ্রের ধারের শহরের প্রকৃতির কিছু বর্ননা দিয়েছেন। তবে ভারতীয় ও ইংলিশ সংস্কৃতির ভিন্নতার কথা বলতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথ পরিবেশগত ‘ফ্যাক্টর’ গুলিকে খুবই চমৎকারভাবে ব্যবহার করেছেন তার বিশ্লেষনে। অর্থ্যাৎ, বিভিন্ন সংস্কৃতির মধ্যে ভিন্নতার জন্য পরিবেশ যে খুবই গুরুত্বপূর্ন একটি চলক হিসাবে কাজ করে, তা কিশোর রবীন্দ্রনাথের চোখ এড়ায়নি। এখন এ ব্যাপারে একটু উদৃতির আশ্রয় নেই।

তিনি বলেন: ‘একে তো আমাদের দেশের মেতা এ দেশের জমিতে আঁচড় কাটলেই শস্য হয়না, তাতে শীতের সঙ্গে মারামারি করতে হয়- প্রথমত শীতের উপদ্রবে এদের কত কাপড় দরকার হয় তার ঠিক নেই, তার পরে কম খেলে এদেশে বাঁচবার জো নেই, শরীরে তাপ জন্মাবার জন্যে অনেক খাওয়া চাই।…..আমাদের বাংলায় খওয়া নামমাত্র, কাপড় পড়াও তাই।’ এরপর তিনি ভারতীয় এবং ইংরেজ সংস্কৃতিতে ‘পরিস্কার’ বা ‘হাইজিন’ ধারনাটিকেও কিশোর বরীন্দ্রনাথ পরিবেশগত দৃষ্টিকোন থেকে ব্যাখ্যা করেন। একটু দীর্ঘ উদৃতি দেই: ‘এখানকার লোকেরা অপরিস্কার নয়, আমাদের দেশে যাকে ‘নোংরা’ বলে তাই। এখানে পরিস্কার ভাবের যে অভাব আমরা দেখতে পাই, সে অনেকটা শীতের জন্য। আমরা যে-কোন জিনিস হোক-না কেন, জল দিয়ে পরিস্কার না হলে পরিস্কার মনে করি নে। এখানে অত জল দিয়ে নাড়াচাড়া পোষায় না। তা ছাড়া শীতের জন্য এখানকার জিনিসপত্র শীঘ্র নোংরা হয়ে ওঠে না। এখানে শীত ও গায়ের আবরন থাকাতে শরীর অত পরিস্কার হয়না। এখানে জিনিসপত্র পচে ওঠেনা।…আমাদের যেমন পরিস্কার ভাব আছে, তেমনি পরিস্কার হওয়ার বিষয়ে অনেক ঢিলেমিও আছে। আমাদের দেশে পুষ্করিণীতে কী না ফেলা হয়? অপরিস্কার জলকুন্ডে স্নান; তেল মেখে দুটো ডুব দিলেই আমরা শুচিতা কল্পনা করি।’

বৃটিশ ইতিহাসবিদ জেমস মিলস তার History of British India (1817) গ্রন্থে ভারতীয়দের সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক এতিহ্যের শেকড় অস্বীকার করেন এটি প্রমান করার জন্য যে ভারতীয়রা একেবারেই সভ্যতার ‘আদিম’ পর্যায়ে রয়েছে। আর এভাবেই রুডইয়ার্ড কিপলিং ভারতবাসীদের মনে করতেন ‘শেতাঙ্গদের বোঝা’। দূরদেশ ভারতবাসীদের সম্পর্কে এই ধরনের দৃষ্টিভঙ্গির প্রকাশ বরীন্দ্রনাথ তৎকালীন বৃটিশ শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেনীর মধ্যে দেখতে পেয়ে কিছুটা বিস্মিত হন। কিশোর রবি একজন আধাবুড়ো ডাক্তারের সাথে পরিচিত হন যিনি ইংল্যান্ডের বহির্ভূত কোন জিনিস তাঁর পচ্ছন্দসই নয়। সেই ডাক্তারটি মনে করেন ‘যে ইংরেজ নয়, যে খৃষ্টান নয়, এমন একটা অপূর্ব সৃষ্টি দেখলে তার মনুষ্যত্ব কী করে থাকতে পারে ভেবে পান না’। এরকম ‘এ্যাথনোসেনট্রিক’ ভিক্টোরিয়ান মানসিকতার অভাব তৎকালীন শিক্ষিত সমাজে মোটেও ছিলনা। আরও একটি উদাহারন দেই। একটি পারিবারিক অনুষ্ঠানে কিশোর বরিকে গান গাইতে হয়েছিল জোর অনুরোধের কারনে। একজন রমনী তাকে গানটি ইংরেজি অনুবাদ করতে অনুরোধ করলে রবি সেই গানটি যেই না অনুবাদ করে তাকে শুনালেন [গানটি ছিল ‘প্রেমের কথা আর বলো না’], অমনি সেই রমনী অনুবাদটি শুনে বরীন্দ্রনাথকে জিজ্ঞাসা করলেন ‘তোমাদের দেশে প্রেমের স্বাধীনতা আছে নাকি।’ ইংল্যান্ডে রবিঠাকুর একটি পরিবারের সাথে কিছু সময় বসবাস করেছিলেন। সেই পরিবার থেকে যে ভালোবাসা তিনি পেয়েছিলেন, তা অনেকদিন পর্যন্ত তিনি মনেও রেখেছিলেন। সেই পরিবার যখন শুনলো যে তাদের সাথে একজন ভারতীয় কিছু সময়ের জন্যে বাসবাস করবে, তখন ‘তাদের ভারি ভয় হয়েছিল। যেদিন আমার আসবার কথা সেইদিন মেজ ও ছোট মেয়ে, তাদের এক আত্নীয়দের বাড়ীতে পালিয়ে গিয়েছিলন। প্রায় এক হপ্তা বাড়িতে আসেনি। তারপর হয়তো যখন তারা শুনলেন যে, মুখে ও সর্বাঙ্গে উল্কি নেই, ঠোঁট বিঁধিয়ে অলংকার পরে নি, তখন তারা বাড়িতে ফিরে এলেন।’ প্রকৃতপক্ষে, প্রাচ্যের বা ভারতীয় সংস্কৃতির নানা বৈশিষ্ট্যকে ‘অপর’ হিসাবে দেখতে গিয়ে উপনিবেশি শক্তি হিসাবে ইংল্যান্ড যে ‘exoticism’ এর জন্ম দিয়েছিল, রবিঠাকুর ভিক্টোরিয়ান ইংল্যান্ডে গিয়ে সেটিরই প্রতিফলন দেখতে পান।

এছাড়া, বৃটিশদের সম্পর্কে রবিঠাকুরের ধারনাও অনেক উঁচু ছিল। বিশেষ করে জ্ঞান বিজ্ঞানের চর্চার ক্ষেত্রে কিন্তু সেটির প্রকাশভঙ্গি দেখে রবিঠাকুর বেশ হতাশই হন।

উপসংহার:
সেই কিশোর বয়সে মূলত রবীন্দ্রনাথের কৌতুহল ছিল লক্ষ করার মতো, সমালোচনা করার মতো বয়স ছিল সেটি। এবং রবীন্দ্রনাথ ইংরেজ এবং নিজ ভারতীয় সমাজকে সমালোচনা, ঠাট্টা বা বিদ্রুপ করতে পিছুপা হননি। মাত্র পনের বছর বয়সে তিনি মেঘনাদবধ কব্যের দু:হসাহসিক সমালোচনা লিখেছিলেন। পুস্তক আকারে ‘ইউরোপ প্রবাসীর পত্র’ প্রকাশের সময় তিনি ভূমিকাতে লেখেন ‘চিঠি যেগুলো লিখেছিলুম তাতে খাঁটি সত্য বলার চেয়ে খাঁটি স্পর্ধা প্রকাশ পেয়েছে প্রবল বেগে।’ আরও একটি অতিগুরুত্বপূর্ন বিষয় জড়িয়ে আছে এই গ্রন্থটিকে ঘিরে আর তা হল এটির ভাষা। গ্রন্থটির ভূমিকাতে রবীন্দ্রনাথ নিজেই ঘোষনা দিচ্ছেন ‘নিশ্চিত করে বলতে পারিনে কিন্তু আমার বিশ্বাস, বাংলা সাহিত্যে চলতি ভাষায় লেখা বই এই প্রথম। আজ এর বয়স হল প্রায় ষাট।…..। আমার বিশ্বাস বাংলা চলিত ভাষার সহজ প্রকাশপটুতার প্রমান এই চিঠিগুলির মধ্যে আছে।’


ফাহমিদ আল জায়িদ
নৃবিজ্ঞান বিভাগ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
আগষ্ট, ২০১৩।
বাংলাসংবাদ২৪/জায়িদ/আরএইচ

আরও সংবাদ