Widget by:Baiozid khan
শিরোনাম:

ঢাকা Mon September 24 2018 ,

তোমার আটা তোমার রুটি আমার পেটে বাজায় বাঁশী

Published:2013-12-22 11:07:06    

বাংলাসংবাদ২৪: ‘তোমার আটা তোমার রুটি আমার পেটে বাজায় বাঁশী
                       আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালবাসি।’

একটা প্যারোডি গানের কলি। আমি তখনো বিদ্যাশিক্ষা শেষ করে বিদ্যাঙ্গন ছাড়িনি। স্বাধীনতার পর যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশটার ঘাড়ে নিষ্ঠুর দুর্ভিক্ষ এমন ঝাকি দিলো যার আক্রমনে চাল, ডাল, মরিছ এমন কি লবনও বাজার থেকে উদাও।

আজকাল যে ভাবে মাঝে মধ্যে মরিছের গুড়োতে ইটের গুড়ো মিলে তেমনি সেই সময় চা’লের সাথে কাকর মিশিয়ে অসাধু ব্যবসায়ীরা মুনাফা লূঠতে লেগে গেল। লবনের মাঝেও বালি পাথরের সংমিশ্রন ঘটালো।

এই সময় বঙ্গবন্ধুর সরকার ক্ষমতায়। দুরাবস্থা সামলাতে সরকারের ঘাম ছুটছে। কি ভাবে জনগনকে দুর্ভিক্ষের কবল থেকে বাঁচানো যায় তার পথ খোঁজতে খোলা হয়েছে পাঁচ শতের উপরে লংগারখানা। দেখা গেল বাজারে দু’রখমের আটার আমদানি।

একটা লাল আটা আর আরেকটা সাদা আটা। লাল আটার দাম কম কারন এটা খইলের মত। মানুষ সেই সময় উপোষ থেকেছে, প্রচুর কষ্ট করেছে। শ্লোগানের মত মানুষের আহাজারি ছিল ‘এক মুঠো ভাত দাও’ ‘এক মুঠো ভাত দাও’।

যে গমের আটা খেকো পাকিস্তানীদের জুতোপিটা করে বাংলাদেশ থেকে বের করে দিলেম তাদের খাবারই আমাদের পাতে বসে, আমাদের পেটের ক্ষুধা নিবৃতিতে প্রথম আসনে স্থান করে নিল। এমনটি দেখে কী কষ্টই না হচ্ছিল। এই লাল আটা অনেকের পেটে সহ্য হতোনা তারপরও ক্ষিধের জ্বালা মেটাতে আটার রুটি খেয়ে প্রাণে বেঁচেছে অনেক মানুষ। তখন না বুঝলেও আজ বুঝি এমনটি কেন হয়েছিল। আমরা তখন, মনের দুঃখ জাতিয় সঙিতের আদলে এই প্যারোডিটা গাইতাম।  

আজ উনচল্লিশ বছর পর এই প্যারোডিটা হঠাৎ হৃদয়ে নাড়া দিল। ভুলে গিয়েছিলাম সেই সব দিনের কথা, আটা রুটির কথা। ‘এক মুঠো ভাত দাও’ এমন একটা আকুতির কথা। ভুলে গিয়েছিলাম ত্রিশ লক্ষ মানুষের রক্ত ঝরা দিনগুলোর কথা। কয়েক লক্ষ মা বোনের ইজ্জত লোটে নেয়া কলংকিত ইতিহাস এর কথা। যে ইতিহাস বিশ্ব যুদ্ধের ইতিহাসকেও ম্লান করে দিয়েছিল। ভুলে গিয়েছিলাম যে একসময় এই পাকিরা আমাদের সাথে অস্ত্রধরে শক্তি পরীক্ষায় নয় মাস ঠিকতে পারে নাই।‘গু-হারা’ হেরে তেরান্নব্বই হাজার অস্ত্রধারী পাঠান, পাঞ্জাবী মাথা হেট করে নাকে খত দিয়ে এদেশ থেকে বিদায় নিয়েছিল।

ভুলে গিয়েছিলাম তাদের তল্পিবাহক, ধ্বজাধারী, তামুকের টিকিতে আগুন জেলে হুকা বাড়িয়ে দেয়ার খানেজাতদের কথা। ভুলে গিয়েছিলাম পাহাড়সম অত্যাচার, অনাচার,অবিচার আর জুলুম নির্যাতনের কথা। সেদিন উদারতা, অনুকম্পা আর মহত্বতা না দেখালে বঙ্গচিত্র ভিন্ন রূপ নিত। সেই সময় হারামীদের টিকি ধরে সঠিক চড় থাপ্পড় দিলে আজকে ইট পাটকেলটি খেতে হত না। বাংলার রাজনীতির আকাশ হয়তো পরিস্কার পরিচ্ছন্ন থাকতো এবং অসুস্থতায় ভুগতো না রাজনীতির ময়দান।

এতদিন একটিবারও মনে আসেনি যে পাকিস্তানীদের গমের আটা থালা থেকে সরলেও তাদের ঘোষাইদের লেটালেটি বাঙালির পেটে ঢুকে ছুঁচোর কিত্তন করছে। তাদের মুর্গা -মুর্গী, পাঁঠা-পাঁঠি, ষাঢ়-গাভী আমাদের খেত-খামারে খেয়াল খুশীমত বিচরন করছে। টেরই পেলাম না কোন পলকে ঐ জন্তুগুলো ডিম, বীর্য, পোনা, বাচ্চা প্রসব করে করে সারাটা দেশ ছয়লাব করে ফেলেছে।

জানতাম কয়েকটি ‘জিনেটিক্যালি মডিফাই’ করা জন্তু আছে কিন্তু মডিফাইং এর ম্যাশিন দিয়ে এমন প্রডাকশন বাড়াবে তা বোধগম্য ছিল না। ‘জিনেটিক্যালি মডিফাই’ জন্তু উৎপাদনের কারখানাগুলোর খবরও আমরা রাখিনি। দু’একজন যে এ খবর পৌঁছাননি এমন নয়।

ততক্ষনে আমাদের ভাই বেরাদরেরা কিন্তু চোখ বন্ধ করে বুক মিলিয়ে, হাতেহাত ধরে, কাঁধে কাঁধ রেখে প্রেমানন্দে পান চিবুচ্ছেন। বাড়ি ঘরে,রাস্তা ঘাটে, খালে বিলে, হাওর বাওরে, গ্রামে গঞ্জে,শহরে বন্দরে এমন কি শিক্ষাশালে, অর্থশালে এমনকি ভিক্ষাশালেও পুরোদমে তা’দের সাথে চলছে প্রেম-পীরিতি।

দেশ দেশ বলে আর্তনাদ করে যারা হাতে নিয়েছিল অস্ত্র তারাও স্বাধীনতার পর কেল্লাফতে বলে বছরের পর বছর প্রশান্তিতে অচেতন ঘুমোচ্ছিলেন।

এদিগে  দখিনা বাতাশে গা এলিয়ে রাজ্যপালের রসের বাইদানি নিয়ে ‘মুজাহিদে মিল্লাত অব পাকিস্তান’ এর মুখ দিয়ে যখন বের হল ‘বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধ বলে কোন যুদ্ধ হয়নি’ তখনি ভাঙলো ঘুম। হলে হবে কি! পদ্মা, মেঘনা আর যমুনার পানি ততদিনে অনেক গড়িয়ে বঙ্গপসাগরে মিশে গেছে। এবার কান টানলে মাথা আসে।

যারা যুদ্ধ করেছিল, অস্ত্রধরে নয়টি মাস জানবাজি রেখেছিল তাদের গায়ে এবং আতেও লাগলো ভীষণ ঘা। নয় মাস তা’হলে বাংলার মাটিতে কি ঘটেছিল? আমাদের দেশের ত্রিশ লক্ষ নিরস্ত্র মানুষ খুন হল, লক্ষ লক্ষ মা বোনের ইজ্জতহানী  হল এ সব কি নিরর্থক! এমন উদ্যোতপূর্ণ বক্তব্য দেশের মূল্যবোধকে ধুলিষ্যাৎ করে জাতীয় সত্তাকে ভুলুন্ঠিত করে দিল। চায়ের পেয়ালা ছুড়ে দিয়ে কালক্ষেপন না করে জড় হলো মুক্তি যুদ্ধের সেনাপতিরা। গড়লো সেক্টার কামান্ডার ফোরাম। শহীদ জননীখ্যাত জাহানারা ইমামের কান্না আর আর্তনাদে শরীক হয়ে একবাক্যে তারাও রুখে দাড়ালো। প্রজন্ম যারা যুদ্ধ দেখেনি তারাও চোখ তুলে দেখলো সত্যিকার ইতিহাসের পাতা।

শাপলা চত্তর গর্জে উঠলো। শোনা গেল ‘জয় বাংলা’ ধ্বণী। ধরা পড়লো পাকিদের কয়েকজন পুষ্য সন্তান। দেখা গেল সেই আটার রুটি বাঙালি জাতির পেটে বসে বাজাচ্ছে শ্যামের বাঁশী। পাকিদের আস্তানায় এবার পড়েছে হাত। ভ্রাতা কাদের মোল্লার ফাঁসি দেখে তাদের মুখের হাসিটুকু উদাও। শুধু কি তাই; সহ্য করতে না পেরে তাদের নীতি নির্ধারণীর খোয়াড়ে দাড়িয়ে ছেড়ে দিল বুক গলিত চুক্ষাশ্রু আর বেদনা গলিত বিলাপ। তারা ভাবতেও পারেনি এতটি বছর পর ফাঁসির রজ্জু গলে পরে তাদের ভাইকে নিতে হবে বিদায়। ‘শ্যামের বাঁশী’ এবার ‘বিষের বাঁশী’ হয়ে তা’দের ঘরের চৌকাটে বাজছে। আর এদিকে বাঙালিরা মনের সুখে বুক লাগিয়ে শুনছে রজনী কান্তের সেই গানটি-
 
‘তুমি নির্মল কর মঙ্গল করে মলীন মর্ম মুছায়ে
তব পূণ্য কীরণ দিয়ে যাক মোর মোহ কালীমা ঘুচায়ে।
                                 
                                                                      (আব্দুল আজিজ তকি)
এমএস


 

আরও সংবাদ