Widget by:Baiozid khan

ঢাকা Tue November 20 2018 ,

  • Advertisement

অাজ বেদনাবিদুর ২৪ এপ্রিল

Published:2014-04-24 02:14:06    
বাংলাসংবাদ: আজ বেদনাবিদুর অভিশপ্ত ২৪ এপ্রিল। এক বছর আগে ঠিক এ দিনটিতে ঘটে যায় বাংলাদেশের শিল্পকারখানার ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহতম দুর্ঘটনা। সাভারের রানা প্লাজার ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে অন্তত ১১৩৮ জন নারী-পুরুষ। 
 
 যে ট্র্যাজেডির কথা স্মরণ করে আজো আঁতকে ওঠে মানুষ। এখনো নির্ঘুম রাত কাটে অনেকের। যারা স্বজন হারিয়েছেন, জীবনের তরে পঙ্গু হয়েছেন, যারা এখনো স্বজনের লাশটি পর্যন্ত বুঝে পাননি, আর ঘটনার পর যারা উদ্ধার করতে দিনের পর দিন সেখানে থেকেছেন তারা কোনোভাবেই ভুলতে পারছেন না দুঃসহ সেই স্মৃতি। গভীর রাতে অনেকেরই ঘুম ভেঙে যায় ভয়াল সেই দুঃস্বপ্ন দেখে। আঁতকে ওঠেন আটকে পড়া মানুষের বাঁচার সেই আঁকুতি মনে উঠতেই। ‘বাঁচাও বাঁচাও’ বলে সেই চিৎকার এখনো মানুষের কানে বাজে।
 
এ দিকে পঙ্গু হয়ে যারা কোনোভাবে বেঁচে আছেন তাদের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। টাকার অভাবে আহতদের অনেকের দিন কাটছে বিনা চিকিৎসায়। ধুঁকে ধুঁকে ক্রমেই তারাও মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন। অনেকে কর্মহীন হয়ে খেয়ে না খেয়ে কোনোমতে দিন কাটাচ্ছেন। বাবা-মাকে হারিয়ে অনেক ছোট্ট ছোট্ট শিশু এখন পথে পথে ঘুরছে। তাদের দেখার কেউ নেই। 
 
এ দিকে স্বজনহারাদের অনেকে এখনো ঘুরে বেড়াচ্ছেন শুধু লাশটি পাওয়ার আশায়। ডিএনএ পরীক্ষার পরও ওই লাশগুলো স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা যায়নি। জুরাইন কবরস্থানে সারি সারি কবর রয়েছে যার পরিচয় শুধু ডিএনএ নম্বর। রানা প্লাজা তাদের জীবন কেড়ে নিয়েই খ্যান্ত হয়নি। তাদের পরিচয়টুকুও কেড়ে নিয়েছে। প্রতিদিনই জুরাইন কবরস্থানে এসব কবর ভিজে যায় স্বজনহারাদের চোখের পানিতে। স্বজনহারাদের কেউ না কেউ প্রতিদিনই সেখানে যান শুধু হারিয়ে যাওয়া মানুষটির টানে। যারা বেঁচে গেছেন এমন শ্রমিকদের মধ্যে এখনো প্রায় অর্ধ সহস্রাধিক রয়েছেন বেকার। তারা এখন আর কর্মক্ষম নেই। এ দিকে এই ঘটনায় ভবন মালিক রানা এবং গার্মেন্ট মালিকেরা গ্রেফতার হলেও এক বছরেও মামলার চার্জশিট জমা দিতে পারেনি তদন্তকারীরা। তদন্তের নামে শুধু সময় বাড়িয়ে নিচ্ছেন তদন্তকারী কর্মকর্তা।
 
নয়তলা ভবনের রানা প্লাজায় অবস্থিত ৫টি গার্মেন্ট কারখানায় যেসব আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের পোশাক তৈরি হতো মূলত তাদের ওই তহবিলে অর্থদানের জন্য গত ফেব্রুয়ারিতে আহ্বান জানানো হয়েছিল। কিন্তু ‘ট্রাস্ট ফান্ড’ শ্রমিকদের ক্ষতিপূরণ দেয়ার মতো ‘পর্যাপ্ত অর্থ’ সংগ্রহ করতে ব্যর্থ হয়। 
 
বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, ফান্ডে ১৭ মিলিয়ন ডলার অর্থ জমা পড়েছে এ পর্যন্ত। যার মধ্যে ব্রিটিশ ব্র্যান্ড ‘প্রিমার্ক’ এককভাবে দেয় ৯ মিলিয়ন ডলার। রানাপ্লাজার ‘নিউওয়েভ বটম লি.’ প্রিমার্কের জন্য পোশাক তৈরি করতো বলে জানা গেছে।
 
তবে প্রায় ২৯টি আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড রানা প্লাজার কারখানাগুলো থেকে পোশাক তৈরি করলেও এ পর্যন্ত ট্রাস্ট ফান্ডে অর্থ দিয়েছে মাত্র অর্ধেক ব্র্যান্ড কোম্পানি। ফলে ভবন ধসের প্রথম বার্ষিকী পার হলেও কবে ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিক পরিবারগুলোকে ক্ষতিপূরণ দেয়া যাবে সে নিয়ে সরকারি বা আন্তর্জাতিক কোন মহল থেকে কোন সুনির্দিষ্ট তথ্য দেয়া হচ্ছে না। যদিও আইএলও’র তরফ থেকে ইতিপূর্বে ইঙ্গিত দেয়া হয়েছিল ২৪ এপ্রিলের পূর্বেই ক্ষতিপূরণ দেয়ার প্রাথমিক প্রক্রিয়া শুরু করতে ইচ্ছুক তারা।
 
এদিকে দেশে শ্রমিকদের ত্রাণের জন্য বিভিন্ন ব্যক্তি ও সংস্থার দানে সৃষ্ট প্রধানমন্ত্রীর তহবিলে এ পর্যন্ত ১৩০ কোটি টাকা জমা পড়েছে বলে সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রে জানা গেছে। তবে ওই তহবিল থেকে নিহত শ্রমিকদের পরিবারগুলো এ পর্যন্ত পেয়েছে মাত্র ১২ কোটি ৩০ লাখ টাকা। উল্লিখিত তহবিল থেকে ৯০৯ জন শ্রমিককে অনুদান বাবদ নয় দফায় দেয়া হয়েছে আরও ২২ কোটি টাকা। তবে সামগ্রিকভাবে এই তহবিলের অর্থ কোথায় কিভাবে খরচ হচ্ছে সে বিষয়ে এখনো সরকারি তরফ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানানো হয়নি।
 
এদিকে বাংলাদেশের পোশাক শ্রমিকদের স্বার্থে সক্রিয় আমস্ট্রাডামভিত্তিক সংগঠন ‘ক্লিনক্লথ ইন্টারন্যাশনাল’ জানিয়েছে, রানা প্লাজায় পোশাক প্রস্তুতকারী ২৯টি আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের সম্মিলিত মুনাফার পরিমাণ ২২ বিলিয়ন ডলার। আর রানা প্লাজা ট্রাস্ট ফান্ডে তাদের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ চাওয়া হচ্ছে মুনাফার মাত্র দশমিক ২ শতাংশ। অথচ সেটাও তারা দিতে ইতস্তত করছে।
 
উল্লেখ্য, আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলো অর্থদানের ক্ষেত্রে এটাকে ‘ক্ষতিপূরণ’-এর পরিবর্তে ক্ষতিগ্রস্তদের ‘অনুদান’ হিসেবে উল্লেখ করতে আগ্রহী। কিন্তু শ্রমিক সংগঠনগুলো চাইছে ‘ক্ষতিপূরণ প্রক্রিয়ায় তাদের যুক্ত করতে।
 
রানা প্লাজা দুর্ঘটনা বাংলাদেশের পোশাক শ্রমিকদের বঞ্চনা ও অনিরাপদ জীবনের বাস্তবতাটি বিশ্বব্যাপী গভীর উদ্বেগ তৈরি করলেও গত এক বছরে এক দফা মজুরি বৃদ্ধি ও শ্রম আইনের মৃদু সংশোধন ছাড়া এ খাতে আর কোনো বড় পরিবর্তন হয়নি। এমনকি মজুরি বৃদ্ধির বিষয়টিও এখনও সকল কারখানায় বাস্তবায়ন হয়নি বলে জানা গেছে।
 
কারখানা মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ সূত্রে জানা গেছে, তাদের পর্যবেক্ষণে এখনও ৩০ ভাগ কারখানায় নতুন মজুরি কাঠামো বাস্তবায়ন হয়নি যদিও গত ডিসেম্বর থেকে নতুন মজুরি কাঠামো অনুযায়ী শ্রমিকদের বেতন দেয়ার কথা। ২০১৩ সালের নভেম্বরে এই মজুরি কাঠামো নির্ধারণ হয়েছিল।
 
এদিকে, ২০১৩ সালের ৬ মে সুপ্রিমকোর্টের হাইকোর্ট ডিভিশন এক আদেশে রানা প্লাজার ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকদের ক্ষতিপূরণের হার নির্ধারণের আদেশ দিয়েছিল। এই আদেশের পর সরকার একটি কমিটি গঠন করে যাতে সেনাবাহিনীর নবম ডিভিশনের জিওসিকেও যুক্ত করা হয়। এই আদেশের পর ২৯ আগস্ট ক্ষতিপূরণের অংশ নির্ধারণের জন্য দুটি কমিটি গঠন করা হয়। যার একটির প্রধান ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতিবিদ এম এম আকাশ। 
 
তিনি সংবাদ মাধ্যমকে জানিয়েছেন, ক্ষতিপূরণের একটি কাঠামো নির্ধারণ করে গত মাসে তারা আদালতে জমা দিয়েছেন যাতে নিহতদের জন্য ১৫ লাখ টাকা করে ক্ষতিপূরণের জন্য বলা হয়। এছাড়া অন্যদের ক্ষতিপূরণের অংক সম্পর্কে তিনি বিস্তারিত বলতে অস্বীকার করেন।
 
তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি সূত্র বলেছে, সরকারের এ কমিটি মৃতদের উপরোক্ত ক্ষতিপূরণের পাশাপাশি স্থায়ীভাবে কর্মহীনদের ১৪.৫ লাখ, হাত বা পা হারানোদের ৭.৫ লাখ, অন্যান্য আঘাতে দীর্ঘমেয়াদি চিকিত্সাধীনদের ৪.৫ লাখ এবং মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য ১.৫ লাখ টাকা করে ক্ষতিপূরণের সুপারিশ করেছে। ১.৫ লাখ টাকা হলো সরকারি কমিটি সুপারিশকৃত সর্বনিম্ন ক্ষতিপূরণ।
 
এক বছরেও জমা পড়েনি তদন্ত প্রতিবেদন : রানা প্লাজার ঘটনায় দায়েরকৃত তিনটি মামলা বছর ধরে তদন্তাধীন। এরমধ্যে দু’টি মামলা করেছে পুলিশ ও রাজউকের একজন কর্মকর্তা। আর একটি মামলার বাদি হয়েছেন নিহত এক শ্রমিকের স্ত্রী। এ ছাড়াও রানার আস্তানা থেকে আগ্নেয়াস্ত্র ও মাদক উদ্ধারের ঘটনায় আরো দু’টি মামলা হয়। ও দু’টিরও তদন্ত চলছে। রানা প্লাজা ধসের ঘটনায় দায়েরকৃত মামলায় গত ফেব্রুয়ারিতে এই তদন্ত প্রতিবেদন দেয়ার কথা ছিল। এরপর তিন দফায় সময় বাড়িয়ে এখন ২১ মে’র মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। জানা গেছে, এই মামলাগুলোতে ওই তারিখের মধ্যেই প্রতিবেদন দাখিলের চেষ্টা করা হবে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সাভারের ইউএনওর কথাতেই ওই ভবনটিতে ফাটল দেখার পরেও তা চালু রাখা হয়েছিল। কিন্তু সেই ইউএনও কবির এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে। তিনি এখনো চাকরিতে বহাল রয়েছেন বলে জানা যায়।
 
বাংলাসংবাদ২৪/ইএফ

আরও সংবাদ