Widget by:Baiozid khan
শিরোনাম:

ঢাকা Mon September 24 2018 ,

বাংলাদেশের পরিবেশ বিপর্যয় রোধে তরুণদের ভূমিকা

Published:2014-06-05 15:36:30    


বাংলাসংবাদ২৪/- মোঃ সাইফুল ইসলাম খান
প্রকৃতির অনুকূল পরিবেশে একদিন জীবন সঞ্চার হয়েছিল এ পৃথিবীর বুকে। বায়ুমন্ডলে তখন প্রাণের বন্ধু অক্সিজেনের অভাব ছিল না। খাদ্য-জলে ছিল সতেজ বিশুদ্ধতা। ফলে পৃথিবীতে জীবনের  দ্রুত বিকাশ সম্ভব হয়েছিল। এলো উন্নত মস্তিষ্কের মানুষ। বিজ্ঞানের নিরুঙ্কুশ প্রাধান্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে পৃথিবীতে ডেকে আনা হলো অতি যান্ত্রিকতা। বায়ুমন্ডলে আজ আর নেই সেই প্রথম দিনের বিশুদ্ধতার প্রতিশুতি। পরিবেশে নেই জীবনের সুনিশ্চিত আশ্বাস। নির্বিচারে প্রকৃতি ধ্বংস এবং কান্ড জ্ঞানহীন পরিবেশ দূষণের মধ্য দিয়ে মানুষ তাদের সুন্দর এ পৃথিবীতে ডেকে এনেছে এক মহাবিপর্যয়। তাই পৃথিবী আর কত দিন বেঁচে থাকবে, তার বুকে সঞ্চারনমান প্রাণ বা আর কতদিন  টিকে থাকবে তা শুধু পদার্থবিদ্যার সূত্রের উপরই নির্ভর করছে না, তা আজ নির্ভর করছে মানুষের উপরও।

পরিবেশ :
ইংরেজী ecology শব্দের অর্থ বস্তুবিদ্যা। ecology থেকে environment শব্দটি সম্পর্কে ধারণা আসে।  environment অর্থ পরিবেশ। পৃথিবীর সব কিছু ভূ-পৃষ্ঠ থেকে ওজোন স্তর পর্যন্ত বিস্তৃৃত পরিমন্ডলে বিদ্যমান  আলো, বাতাস, মাটি, পানি, শব্দ, বন, পাহাড়, নদ-নদী, সাগর-মাহসাগর মানুষ নির্মিত অবকাঠামো এবং গোটা উদ্ভিদ ও জীব-জগতের সমন্বয়ে যা সৃষ্ট তাই পরিবেশ।


পরিবেশ দূষণ :
কোন কারণে যখন পরিবেশের বিভিন্ন উপাদানের কাক্সিক্ষত মাত্রা বিনষ্ট হয় বা স্বাভাবিকতা হারায় তখন তাকে পরিবেশ দূষণ বলে। তবে ইউনেস্কো, earth summit & international pelationsএর দৃষ্টিতে, পৃথিবী নামক গ্রহের প্রাকৃতিক ভারসাম্যহীনতা যা আমাদের সামাজিক, অর্থনেতিক, রাজনৈতিক জীবনের ওপর ক্ষতির প্রভাব বিস্তার করে তাকে পরিবেশ দূষণ  বলে।

পরিবেশ দূষণের সূত্রপাত :
প্রাচীন পৃথিবীতে আগুন আবিষ্কারের সাথে সাথেই সূচিত হয় প্রাণের ধাত্রী অক্সিজেনের ধ্বংসলীলা। আর অষ্টাদশ শতাব্দীতে সূচিত শিল্প বপ্লিবরে পর থেকে বিগত প্রায় আড়াইশ বছর যাবত শিল্পায়িত দেশসমূহ কর্তৃক ক্রমাগতভাবে উষ্ণতা বৃদ্ধিকারক গ্যাস (green house gas) উদগীরণই পৃথিবীর উষ্ণতা বৃদ্ধি ও জলবায়ু পরিবর্তনের মূল কারণ।

পরিবেশ দূষণের কারণ :
পরিবেশ দূষণকে তিন শ্রেণীতে ভাগ করা যায়। যথা-
ক) শক্তি বিষয়ক দূষণসমূহ : যেমন- শব্দ, তাপ, তেজষ্ক্রিয় বিকিরণ ইত্যাদি।
খ) রাসায়নিক বিষয়ক দূষণসমূহ : যেমন- জৈব ও অজৈব কৃত্রিম বা প্রাকৃতিক রাসায়নিক পদার্থ সমূহ।
গ) জীব বিষয়ক দূষণসমূহ : যেমন- বিভিন্ন রোগের ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া ও পরজীবীসমূহ।
এছাড়া আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত, ভূমিকম্প, ঝড়, ঘূর্নিঝড়, বন্যা খরা, অপরিকল্পিত নগরায়ন ও শিল্পায়ন, কীটনাশক ও রাসায়নিক সারের ব্যবহারে, শিল্প কারখানার বর্জ্য পদার্থ, শিল্প দূর্ঘটনা, বৃক্ষ নিধন, অধিক জনসংখ্যা, দারিদ্রতা, অশিক্ষা, ইট ভাটা ও যানবাহনের কালোধোঁয়া, উপযুক্ত পয়ঃনিষ্কাশনের অভাব, প্রাকৃতিক সম্পদের অতিমাত্রায় আহরণ, রাসায়নিক ও পারমানবিক পরীক্ষা-নীরিক্ষা ইত্যাদি সব কিছু মিলে পরিবেশকে দূষিত করছে। নিচে পরিবেশ দূষণের কয়েকটি কারণ সংক্ষেপে বর্ণনা করা হলো-

১। জনসংখ্যা :
বর্তমানে বিশ্বের প্রায় ৭০০ কেটি জনসংখ্যার মধ্যে ৪০০ কোটির বাস এশিয়াতে জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে দ্রুত নগরায়ন, ব্যাপক গণদারিদ্রতা ও বেকারত্ব, বন ধ্বংস, মাটি, পানি, বায়ু ও শব্দ দূষণ, মাছ, গবাদীপশু ও পাখির সংখ্যা হ্রাস ও জনস্বাস্থ্যের অবনতি প্রভৃতির মতো নানা সমস্যা দেখা দিচ্ছে।

২। বৃক্ষ নিধন :
“শুধু মাত্র আমাদের দেশের ১৬ কোটি ২২ লাখ নয়, সারা পৃথিবীর। ৬৮২ কোটি ৯৪ লাখ মানুষ বৃক্ষের কাছে ঋনী। তারপরও নির্বিচারে বৃক্ষ নিধন চলছে। টিআইয়ের প্রতিবেদনে (৩০ মে-২০১১) উঠেছে, শুধুমাত্র সুন্দরবনে বছরে ১৩৫ কোটি টাকার গাছ চুরি যায়। একটি দেশের সুস্থ পরিবেশের জন্য তার আয়তনের ২৫ শতাংশ বণভূমি থাকা প্রয়োজন হলেও বাস্তবে বাংলাদেশের বৃক্ষের পরিমাণ  ৫ শতাংশের কিছু বেশি।”  প্রতিনিয়ত বৃক্ষ নিধনের ফলে প্রাণীকুলের বেঁচে থাকার খাদ্য ও অক্সিজেনের ঘাটতি দেখা যাচ্ছে।

৩। দারিদ্রতা :
উন্নত দেশে বিশ্বের জনসংখ্যার ২৬% মানুষ যেখানে গড়ে দৈনিক ৩৩৯৫ ক্যালোরী খাদ্য গ্রহণ করে সেখানে উন্নয়নশীল দেশের ৭৪% মানুষ মাত্র ২৩৮৯ ক্যালোরী খাদ্য গ্রহণ করে।  যেখানে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের জনপ্রতি বার্ষিক আয় ২১ হাজারা ডলার থেকে ২৫ হাজার ডলার। আর সেখানে ২০১০ সালে বাংলাদেশে জনপ্রতি বার্ষিক আয় মাত্রা ৭৫০ ডলার। বাংলাদেশের শতকরা ৪৬ জন মানুষ দারিদ্রসীমার নীচে বাস করে। ফলে তারা স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষা গ্রহণ থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে।

৪। মরুকরণ :
১৯৭৭ ও ১৯৮৪ এবং পরবর্তীতে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের মরু প্রক্রিয়া সংক্রান্ত সম্মেলনের ফলাফল থেকে জানা যায় যে, পৃথিবীর প্রায় দুই পঞ্চমাংশ এলাকা মরুভূমি হয়ে যাবার ভয়াবহ হুমকির সম্মুখীন। প্রতি বছর ২ লাখ বর্গ কিলোমিটার এলাকা মরুতে পরিণত হচ্ছে।

৫। কীটনাশকের ব্যবহার :
অধিক ফসল ফলানোর জন্য জমিতে কীটনাশক ব্যবহারের ফলে পানি, মাটি দূষিত হয়ে জীবজগৎ ও পরিবেশ বিপর্যয়ের সম্মুখীন হচ্ছে। তাছাড়া অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহারের কারণে সৃষ্টি হচ্ছে নতুন নতুন প্রজাতির পোকা (super pests), যা প্রচলিত মাত্রায় কীটনাশক দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা যায় না।

৬। ওজোনস্তর :
cfc (chlorofluorocarbon) এবং অন্যান্য কেমিক্যাল ব্যবহার দিন দিন বাড়ছে।  যার অধিকাংশ ব্যবহার হচ্ছে উন্নত বিশ্বের কলকারখানায়। ১৯৭৫ সালে ক্লোরিণের পরিমাণ ছিল প্রতি বিলিয়নে ১.৪। বর্তমানে এর পরিমান ৪.৩ এর ওপরে। ফলে  পৃথিবী হুমকির সম্মুখীন হচ্ছে।
অন্যভাবে পরিবেশ দূষণকে চার ভাগে ভাগ করা যায়। যথা-
ক) মাটি দূষণ     খ) পানি দূষণ    গ) বায়ু দূষণ ও  ঘ) শব্দ দূষণ
ক) মাটি দূষণ : মাটি দূষণ বলতে মাটির উর্বর ক্ষমতা হ্রাস পাওয়াকে বুঝায়। বিভিন্ন কারণে মাটি দূষণ ঘটে। যেমন- ভূমিক্ষয়, বায়ু প্রবাহ, বন্যা, বৃক্ষ নিধন, জমিতে রাসায়নিক সার/কীটনাশক প্রয়োগ, শিল্প ও হাসপাতালের বর্জ্য, তেজষ্ক্রিয় বর্জ্য প্লাস্টিকের ব্যবহার ইত্যাদি।
খ। পানি দূষণ : পানিকে বলা হয় elixir of life, কারণ মানুষ ও জীবগতের প্রাণের স্পন্দন নির্ভর করে পানির উপর। পৃথিবীর মোট পানির ৯৭ ভাগ সাগরে। অবশিষ্ট তিন ভাগ মিঠা পানির মধ্যে একভাগ মাত্র মানুষের আওতায় বাকিটা মেরু অঞ্চল ও বরফের দখলে।  globel international monitoring system-GEMS- এর এক রিপোর্টে বলা হয়েছে বিশ্বের ৫৯টি দেশের ১০ ভাগ নদীর পানিই দূষিত হয় প্রধানত উন্নয়নশীল দেশগুলোর অনুন্নত পয়ঃপ্রণালীজনিত কারণে।
যেমন- চট্টগ্রাম অঞ্চলের কালুরঘাট পতেঙ্গা ও কাপ্তাইসহ প্রায় ১৪০টিরও বেশি শিল্পকারখানার বর্জ্য কর্ণফুলী নদী ও বঙ্গোপসাগরে নিক্ষিপ্ত হচ্ছে। বুড়িগঙ্গা নদীর পানি পোস্তখোলা ও ফতুল্লার ৫৩টি কারখানা এবং হাজারীবাগের ১৫১টি চামড়া শিল্প দ্বারা দূষিত হচ্ছে। অন্তত ২৯ টি শিল্পকারখানার বর্জ্য তুরাগ নদী এবং ৪২টি বৃহৎ শিল্প শীতলক্ষা নদীতে বর্জ্য নিক্ষেপ করছে। খুলনা নিউজপ্রিন্ট মিল ঘন্টায় প্রায় ৪,৫০০ ঘনমিটার বর্জ্যমিশ্রিত পানি ভৈরব নদীতে ফেলে।

গ। বায়ু দূষণ : কলকারখানার বর্জ্য পদার্থ যেমন- পানি দূষণ করে, তেমনি এর কালো ধোঁয়া বায়ু দূষণও করে থাকে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, বাতাসে ভাসমান বস্তুকণার গ্রহণযোগ্য মাত্রা ২০০-৪০০ মাইক্রোগ্রাম। অথচ ঢাকার গড় পরিমান ৭০০-১৮০০ মাইক্রোগ্রাম। সীসার গ্রহণযোগ্য মাত্রা ৩৩৫ পিপিএম থাকলেও পৃথিবীর অধিকাংশ শহরে এর মাত্রা ৪০০ পিপিএম এর বেশি। সাধারণত পারমাণবিক বিষ্ফোরণ, কলকারখানা, যানবাহন ও ইট ভাটার কালো ধোঁয়া, বৃক্ষ নিধন, অতিরিক্ত এ্যারোসেল ও অন্যান্য ¯েপ্র ব্যবহার ইত্যাদি কারণে বায়ু দূষণ হচ্ছে। বায় দূষণের ফলে পরিবেশে সৃষ্টি হচ্ছে অল্ম বৃষ্টির মতো সমস্যা। একজন পূর্ণ বয়স্ক সুস্থ মানুষের দিনে ১৬.৫ কেজি বিশুদ্ধ বায়ু গ্রহণের প্রয়োজন। তাই এভাবে বায়ু দূষিত হতে থাকলে মানুষতো দূরের কথা পুরো প্রাণী জগৎই বিলুপ্ত হতে পারে।

ঘ। শব্দ দূষণ : ২০০৬ সালে পরিণিত নীতিমালা অনুযায়ী আবাসিক এলাকায় সকাল ৬টা থেকে রাত ৯টা  পর্যন্ত এবং রাত ৯টা থেকে সকাল ৬টা পযন্ত সর্বোচ্চ শব্দসীমা যথাক্রমে ৫৫ ডেসিবল ও ৪৫ ডেসিবেল। একইভাবে নিরব এরাকায় দিনে ও রাতে সর্বোচ্চ শব্দসীমা যথাক্রমে ৫০ ও ৪০ ডেসিবল,, বাণিজ্যিক এলাকার ৭০ ও ৬০ ডেসিবল, শিল্প এলাকায় ৭৫ ও ৭০ ডেসিবল সর্বোচ্চ শব্দ সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর উপরে শব্দ সৃষ্টি করা দণ্ডনীয় অপরাধ। কিন্তু আমাদের দেশে এই নীতিমালা মানা হচ্ছে না। একটি বেসরকারী গবেষণায় দেখা যায়, সায়েদাবাদ বাস টার্মিনালে ১০২ ডেসিবল, মতিঝিল ও ফার্মগেটে ৯৩ ডেসিবল, গুলিস্থানে ৯২ ডেসিবল এবং বাংলামটর ও স্কয়ার হাসপাতাল এলাকায় শব্দ দূষণের মাত্রা ১০৪ ডেসিবল। ঢাকার রাস্তায় সাধারণত রিকশা অতিক্রম করতে চায় বাসকে, বাস অতিক্রম করতে চায় প্রাইভেট কারকে, প্রাইভেট কার অতিক্রম করতে চায় এম্বুলেন্সকে। এর ফলেই সৃষ্টি হয় যানজট, বাড়ে শব্দ দূষণ। ওয়ার্ক ফর এ বেটার বাংলাদেশ পরিচালিত জরিপে দেখা গেছে, শব্দ দূষণের তালিকায় গাড়ির হর্ন ৯৬ শতাংশ, মাইকিং ৬১, বেবিট্যাক্সি ৪৫, কলকারখানা ৩৫, টেম্পো ২৮ ও ইট ভাঙ্গার মেশিন ১৯ শতাংশ শব্দ দূষণ করে থাকে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ইউনিসেফ এবং বিশ্বব্যাংক পরিচালিত গবেষণায় দেখা যায়, বাংলাদেশে প্রায় ৩০টি কঠিন রোগের উৎস ১২ রকমের পরিবেশ দূষণ। আর এর মধ্যে অন্যতম হল শব্দ দূষণ।
                                                                  
সূত্রঃ গ্রীন নিউজ, রেডিও টুডে, ২৬.০৩.২০১৩
বাংলাদেশের পরিবেশ বিপর্যয়ের ঝুঁকি :
ভৌগোলিক অবস্থান ও পরিবেশ দূষণ জনিত কারণে গত ১৯ জুন ২০১৩ বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশ হচ্ছে সবচেয়ে দূর্যোগ প্রবণ অঞ্চল। সর্বশেষ গবেষণায় দেখা গেছে, বর্তমানে প্রতিবছর সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ছে ২ দশমিক ৫ মিলিমিটার করে।
আর আইপিসিসির’র প্রতিবেদন অনুযায়ী, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ১ মিটার বৃদ্ধির ফলে বাংলাদেশের ১৭ শতাংশ ভূমি সমূদ্রে তলিয়ে যাবে। ফলে অবস্থা কতটা ভয়াবহ হবে তা বুঝাই যাচ্ছে।  বাংলাদেশের পরিবেশের মাত্রাতিরিক্ত দূষণের ফলে গ্রিন হাউজ প্রতিক্রিয়া, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, বন্যা, সিডর, আইলা, খরা, অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি, জলাবদ্ধতা, বরফ গলা, সমুদ্রের পানির উচ্চতা বৃদ্ধি, ফসল উৎপাদন হ্রাস, মৎস উৎপাদন হ্রাস ও বিলুপ্তি, মাটির লবণাক্ততা বৃদ্ধি, অ্যাসিড বৃষ্টি ও নতুন নতুন কঠিন রোগ সৃষ্টির বাস্তবতায় পরিবেশের বিপর্যয় আর ভবিষ্যতের ভয় নয় বিপদ এখন দোরগোড়ায়।

পরিবেশ সংরক্ষণের উপায় ও তরুণদের ভূমিকা
সমগ্র বিশ্ববাসী যদি মনে করে এ বিশ্ব তাদের জন্যই তাহলে সঠিক প্রচেষ্টায় আমরা পরিবেশ দূষণের প্রতিকার করতে পারি। বর্তমানে বিশ্বের মোট জনসংখ্যার ৬৫% তরুণ। জাতিসংঘ তথ্যমতে, ৮৫% যুবকই উন্নয়নশীল দেশে বসবাস করে এবং ২০২৫ সালের মধ্যে এটি ৮৯.৫% হবে। তাই উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশের জনসংখ্যার বৃহদাংশই তরুণ। এই বৃহদাংশ তরুণদের উপযুক্ত  শিক্ষা, প্রশিক্ষণ, মানবিক মূল্যবোধ ও স্বদেশপ্রেমের সমন্বয়ে তাদেরকে সচেতন পরিবেশ কর্মী হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। পরিবেশ রক্ষায় তরুণদের জ্ঞান, মেধা-মনন ও সৃষ্টিশীলতাকে কাজে লাগাতে হবে। আর এ জন্য তরুণদের মধ্যে পরিবেশ বিষয়ক জ্ঞান ও সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে এ সম্পর্কিত কুইজ, বিতর্ক, ক্লাইমেট চ্যাম্পিয়ানস প্রতিযোগিতা, রচনা প্রতিযোগিতা, চিত্রাাঙ্কন এবং শোভাযাত্রার আয়োজন করা যেতে পারে। তরুণদের পরিবেশ রক্ষায় কার্যকর ভূমিকা রাখতে হলে গবেষণা আবশ্যক।  গবেষণার মাধ্যমেই পরিবেশ রক্ষার চ্যালেঞ্জগুলো জানা যাবে এবং সমাধান করা যাবে।
পরিবেশ সংরক্ষণে ও জনসচেতনতায় তরুণরা যে ধরনের ভূমিকা রাখতে পারে তা নিন্মরূপ-

ক) পরিবেশ বিজ্ঞানে জ্ঞান রাখা :
বাংলাদেশের মাত্র ১০-২০% জনগণ পরিবেশগত সমস্যা সম্পর্কে সচেতন। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যেও উল্লেখযোগ্য অংশের পরিবেশবিজ্ঞান সম্পর্কে ধারণা নেই। তাই তাদের পরিবেশ ও তার দূষণ সম্পর্কে বিস্তারিত জানা উচিত।

খ) বায়ু দূষণ রোধ :
বায়ু দূষণ রোধে করণীয় :
১.    বায়ু দূষণের জন্য দায়ী NH4,CO, CO2, PB, DUST, Agricultural chemicals, C6H6 প্রভৃতি সম্পর্কে জ্ঞানার্জন ও পরিবেশকে এগুলোর ক্ষতি থেকে বাঁচানোর উপায় জনগণকে বলে দেওয়া।
২.    ধূমপানের ধোঁয়া, যানবাহন ও কলকারখানার ধোঁয়া ইত্যাদি নিয়ন্ত্রণ করার উপর জনমত সৃষ্টি করা।
৩.    গ্রীন হাউজ গ্যাসের কারণে উষ্ণতা বৃদ্ধি রোধে যতœবান থাকা প্রয়োজন।
৪.    ওজোন স্তরে গর্ত হয়ে যে সমস্ত ক্ষয়ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবণা আছে তা প্রতিরোধের উপায় জনগণকে জানানো উচিত।
৫.    জনগণকে বন ও জলাশয় সংক্ষণ ও ব্যাপক বৃক্ষরোপনে উৎসাহী করা।
৬.    পুরানো ও দুই ইঞ্চিন চালিত বাহন পরিহার করে প্রাকৃতিক গ্যাস (CNG) চালিত বাহন ব্যবহার করা।
৭.    ধরন অনুযায়ী আবর্জনাকে পৃথক করে জমা ও অপসারণ করতে উদ্বুদ্ধকরা।
৮.    অরিক্তি অ্যারোসল ও অন্যান্য স্প্রে  ব্যবহার না করা।


গ) পানি দূষণ প্রতিরোধ :
পানিকে দূষণমুক্ত রাখতে তরুণদের যা যা করা উচিত তা নিন্মরূপ :
১.    পানিতে আবর্জনা, কীটনাশক, সার বা বিষাক্ত দ্রব্য ইত্যাদি না ফেলা।
২.    Water treatment plant স্থাপনে উদ্বুদ্ধকরণ।
৩.    উপযুক্ত পয়ঃনিষ্কাশনের ব্যবস্থা করা।
৪.    ভূগর্ভস্থ পানির পরিমিত ব্যবহার।
৫.    জমিতে সার বা কীটনাশক প্রয়োগের ফলে জলাশয়ে সৃষ্ট সমস্যা সম্পর্কে জনগণকে সচেতন করা।
৬.    হাজারীবাগ ট্যানারী কর্তৃক বুড়িগঙ্গার পানি দূষণের মতো কোন কলকারখানার বর্জ্যই যেন কোন জলাশয়ে পতিত হতে না পারে সে ব্যাপারে জনমত সৃষ্টি করা।
৭.    কোন কোন এলাকার ভূগর্ভস্থ পানিতে ০.০৫ পিপিএম এর বেশি আর্সেনিক আছে তা জানা এবং এর বিষক্রিয়া সম্পর্কে জনগণকে সচেতন করা। প্রয়োজনে দূষণ অঞ্চলের মানচিত্র প্রস্তুত করা।
৮.    পানি দূষণ রোধে জনসাধারণ ও তরুণরা মিলে  স্বেচ্ছাসেবী উদ্যোগ গ্রহন করা (যেমন : বদ্ধ জলাশয়কে কচুরিপানামুক্ত করণ।)।


ঘ) মাটিকে দূষণমুক্ত রাখা :
মাটি দূষণ রোধে নিন্মোক্ত কাজগুলো সম্পাদন করা যেতে পারে :-
১.    প্যলাস্টিক ব্যাগ, পলিথিন পরিহার।
২.    বৃক্ষরোপন, পাহাড় ও উচ্চভূমি রক্ষা ইত্যাদির দ্বারা ভূমিক্ষয় রোধে উদ্বুদ্ধকরণ।
৩.    ভূমিতে অপরিকল্পিত শিল্প প্রতিষ্ঠান স্থাপনের কুফল সম্পর্কে জনগণকে সচেতন করা।
৪.    কৃষকদের জৈব সার ব্যবহারে উদ্বুদ্ধকরণ।
৫.    কৃষকদের Rotation of crops নীতি অনুসরণের গুরুত্ব বুঝানো।
৬.    ইটের বিকল্পে ব্লক ইট ব্যবহার :
বাংলাদেশের পরিবেশ বিপর্যয়ের ও উষ্ণতা বৃদ্ধির প্রধান কারণ সনাতন পদ্ধতির ইটভাটা গুলো। এই ইটভাটার ফলে নষ্ট হচ্ছে ভূ-স্থরের ভারসাম্য, ব্যহত হচ্ছে কৃষিকাজ এবং দেখা দিচ্ছে মারাত্মক সব জটিল রোগ। উন্নত বিশ্বসহ বিশ্বের সব দেশে বালু ও সিমেন্ট দিয়ে প্রস্তুতকৃত ব্লক ইট ব্যবহৃত হচ্ছে; যার গুণগত মান পোড়া ইট থেকে অনেক ভালো। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল দিয়ে বহমান ৫৪টি বড় নদীসহ অসংখ্য ছোট নদী ও খাল বালুতে ভর্তি হয়ে আছে। এসব বালু ব্যবহার করে উন্নতমানের ব্লক ইট তৈরি করলে একদিকে নদীগুলো খনন হয়ে যাবে, অপরদিকে মানসম্পন্ন ব্লক ইট প্রস্তুত হবে। ফলে সাশ্রয় হবে কয়লা ও ফার্নেস অয়েল, আমদানির জন্য ব্যবহৃত বৈদিশক মুদ্রা, নিরুৎসাহিত হবে গাছ কাটা। নিচু হবে না দেশের ভূমি এবং দেশ ও জাতি রক্ষা পাবে পরিবেশের মহাবিপর্যয়ের হাত থেকে।

ঙ) শব্দ দূষণ রোধে :
শব্দ দূষণ রোধে আমাদের করণীয় কিছু কাজ নিন্মরূপ :
১.    উচ্চস্বরে কথা/চিৎকার/অট্টহাসি/হাঁচি-কাশি না দেওয়া।
২.    জোরে রেডিও/টিভি/গান না বাজানো।
৩.    হাইড্রোলিক হর্ণের ব্যবহার/অতিরিক্ত শব্দে মাইকের ব্যবহার/নির্মাণ কাজ ও কারখানার উচ্চ শব্দ/ক্যাম্পাসে গোলাগুলি/বোমাবাজী/বিকট আওয়াজে শ্লোগান  ইত্যাদির বিরুদ্ধে জনমত সৃষ্টি করা।
৪.    শব্দ শোষক যন্ত্রের ব্যবহার বৃদ্ধি করতে হবে।

চ) পরিবেশ সংক্রান্ত আইন মেনে চলা।
ছ) পরিবেশগত পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা।
জ) স্বাস্থ্য বিধি মেনে চলা।
ঝ) সুস্থ্য রাজনীতি চর্চা।
ঞ) সামাজিক দায়িত্ব পালন করা।
ট) পরিবেশ রক্ষার আন্দোলনে সম্পৃক্ত থাকতে বিভিন্ন পরিবেশবাদী সংগঠনের আন্দোলনের সাথে যুক্ত থাকা।

শেষকথা :
“চলে যাব, তবু আজ যতক্ষণ দেহে আছে প্রাণ
প্রাণ পণে পৃথিবীর সরাব জঞ্জাল
এ বিশ্বকে এ শিশুর বাসযোগ্য করে যাব আমি
নব জাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার।”
তাই  আসুন আগামী শতাব্দীর পৃথিবীকে মানুষের বাসযোগ্য করে তোলার জন্য পৃথিবীর সকল মানুষ ধনী-দরিদ্র, উত্তর-দক্ষিণ ভেদাভেদ ভুলে জননীতুল্য পৃথিবীর অস্তিত্ব রক্ষায় এগিয়ে আসি। আর পরিবেশ রক্ষার এই আন্দোলনে আমাদের তরুণ প্রজন্মকে থাকতে হবে প্রথম সারিতে এবং আজ থেকে আমাদের শ্লোগান হোক Live and let live (বাঁচ এবং বাঁচতে দাও)।
সহায়ক গ্রন্থাবলি
    হারুন-অর-রশিদ, জলবায়ু পরিবর্তন বিপদে বাংলাদেশ-২০১২
    হাসান জাহিদ মোহাম্মদ জিল্লুর রহমান- পানি সম্পদ ও জলীয় প্রতিবেশ: বিপন্ন বিশ্ব
    হারুন-অর-রশিদ, বাংলাদেশের প্রকৃতি ও পরিবেশ-২০১২
    প্রথম আলো- ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০১০/ ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৩
    কালের কণ্ঠ-১৫ মে ২০১৪
    যুগান্তর- ১১ ফেব্রুয়ারি ২০১৪
    জনকণ্ঠ- ১৫ জানুয়ারি ২০১৩
    আমার দেশ- ২৪ এপ্রিল ২০১৩
    নয়াদিগন্ত ৫ মার্চ ২০১৪
    ইনকিলাব- ১১ ফেব্রুয়ারি ২০১৪
    আলোকিত বাংলাদেশ- ১৩ আগস্ট ২০১৩
    করতোয়া- ৫ মে ২০১৩
    ডেসটিনি- শব্দ দূষণ সারাদেশে
    সচিত্র বাংলাদেশ- অক্টোবর ২০১২
    ধরিত্রী বাংলাদেশ- ১৪১৯ ও ১৪২০
      www.pobabd.org
    Green news,Radio today.26.03.2013
    environment move.com-22 november 2013
    banglamail 24.com, 2 october 2013
    somewhereinblog.net-28 may 2013
বাংলাসংবাদ২৪/জি.এম


 

আরও সংবাদ