Widget by:Baiozid khan
শিরোনাম:

ঢাকা Tue September 25 2018 ,

আল্লাহর উপর যার আস্থা যত বেশি তার সফলতার পরিপূর্ণতা ততবেশি

Published:2014-06-11 13:51:19    

বাংলাসংবাদ: তাওয়াক্কুল আরবি শব্দ। এর অর্থ হলো নির্ভর করা, ভরসা করা, আস্থা রাখা, নির্ভরশীলতা,(আরবি বাংলা ব্যবহারিক অভিধান) । “তাওয়াক্কুল আলাল্লাহ” অর্থ হলো আল্লাহ তায়ালার উপর ভরসা করা । কোন ব্যক্তিকে কোন কাজের যিম্মাদারী প্রদান করা , প্রতিনিধি বানান । পরিভাষায় যে কোন প্রয়োজন কিংবা সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে মহান আল্লাহর উপর পরিপূর্ণ নির্ভর করা কে তাওয়াক্কুল বলে ।

আল্লাহর উপর ভরসা করার নানা পর্যায় রেেয়ছে । কেউ মুখে মুখে ভরসার কথা বলে । কেউ সুনির্দিষ্ট কিছু বিষয়ের ভরসা করে, কেউ বা সর্বদাই সকল কাজে আল্লাহর উপর ভরসা করে । এটি তাওয়াক্কুলের সর্বোচ্চ পর্যায় । আল্লাহর উপর যার আস্থা যত বেশি তার সফলতার পরিপূর্ণতা ততবেশি । তাওয়াক্কুল একটি গুন, একটি ইবাদত । এটি অর্জন ব্যতীত ঈমান অসম্পূর্ণ থাকে । সে কারণে আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো ওপর তাওয়াক্কুল করা যায় না। মৃত বা জীবিত কোন ওলী-আল্লাহ, পীর-বুযুর্গ,নবী-রাসূলের উপর ভরসা করা শিরক। আর শিরক হচ্ছে সবচেয়ে বড় যুলুম।

তাওয়াক্কুল সম্পর্কে আল কুরআনে বলা হয়েছে: যে ব্যক্তি আল্লাহর ওপর ভরসা করে তার জন্য আল্লাহ তায়ালা ই যথেষ্ট । ( সূরা আত্ তালাক্ব-০৩) । আপনি কোন সংকল্প করলে আল্লাহর ওপর ভরসা করবেন । (আল-ইমরান-১৫৯) । যারা আপনার বিরুদ্ধে শলা পরামর্শ করে আপনি তাদের উপেক্ষা করুন এবং আল্লাহর উপর ভরসা করুন । ( নিসা-৮১)। আপনি ভরসা করবেন তার উপর যিনি চিরঞ্জীব,যাঁর মৃত্যু নেই । (সূরা ফুরকান-৫৮) । আপনি নির্ভর করুন আল্লাহর উপর,আপনি তো স্পষ্ট সত্যে প্রতিষ্ঠিত।  (সূরা-নামল-৭৯) ।

আপনি কাফির ও মুনাফিকদের কথা অনুযায়ী চলবেন না। তাদের নির্যাতন উপেক্ষা করবেন এবং আল্লাহর উপর ভরসা করবেন। ( আহযাব-৪৮)। বলুন, আমার পক্ষে আল্লাহ্ই যথেষ্ট । নির্ভরকারীরা তাঁরই উপর নির্ভর করে।(সুরা যুমার-৩৮) । আর আল্লাহর উপর ভরসা কর যদি তোমরা বিশ্বাসী হও। (মায়িদা-২৩) । আর ঈমানদারদের তো আল্লাহর উপর ভরসা করা  উচিত । (সূরা ইব্রাহিম-১১) । আপনি আল্লাহর উপর ভরসা করুন । কার্যনির্বাহীরূপে আল্লাহই যথেষ্ট । (আহযাব-০৩) । আর যদি  তোমরা মুসলিম হও এবং আল্লাহর উপর ঈমান এনে থাক, তবে তারই উপর ভরসা কর । ( সূরা ইউনুস-৮৪)।

আয়াত গুলোতে বার বার ভরসা করার জন্য নির্দেশ করা হয়েছে । এ কথা প্রমাণিত যে, আল্লাহর ওপর ভরসাকারীই প্রকৃত  মুমিন ও সঠিক পথ প্রাপ্ত সফল ব্যক্তি। প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ সা. নিজেও  তাওয়াক্কুল করতেন এবং কি ভাবে তাওয়াক্কুল করতে হয় তা শিখিয়ে গেছেন । হযরত আনাস রা. থেকে বর্ণিত। এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ সা. কে জিজ্ঞেস করলো , হে আল্লাহর  রাসূল  ! আমি আমার উট বাঁধবো এরপর কি আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল করবো ? না তাকে ছেড়ে দেবো এরপর তাওয়াক্কুল করবো? রাসূলুল্লাহ সা. বললেন, প্রথমে উটকে বাঁধো এরপর তাওয়াক্কুল করো। (তিরমিযি) । অন্য এক হাদিসে বলা হয়েছে,হযরত উমর (রা.) বর্ণনা করেন, রাসূল সা. কে বলতে শুনেছি : তোমরা যদি আল্লাহর উপর ‘তাওয়াক্কুল’ করার হক আদায় করতে, তাহলে তিনি পাখিকূলকে রিযিক দেয়ার মতো তোমাদেরকেও রিযিক দান করতেন ।

‘তোমরা লক্ষ্য করে থাকবে’ পাখিকূল অতি প্রত্যুষে খালি পেটে বের হয়ে যায় এবং সন্ধ্যায় ভরা পেটে তারা বাসায় ফিরে আসে ।( ইবনে মাজাহ্:৪১৬৪, তিরমিযী : ২৩৪৪) । পাখিরা আগামী দিনের জন্য খাবার মজুদ করে রাখেনা । তারা যথাযথ ভাবেই আল্লাহর ওপর ভরসা করে এ হাদিসগুলো তাই প্রমাণ করে । কেননা আবু হুরায়রা রা. রাসূল স.থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন, জান্নাতে এমন কিছু সম্প্রদায় প্রবেশ করবে ,যাদের অন্তর পাখির  অন্তরের মত হবে । (মুসলিম) । অন্তর হবে পাখির অন্তরের মত এর অর্থ হল, তারা পাখিদের মত তাওয়াক্কুলকারী। বা তারা কোমল হৃদয়ের মানুষ ।

তাওয়াক্কুল করার কারণে কঠিন বিপদও মোকাবেলা সহজ হয় । হযরত ইব্রাহিম আ: কে মূুর্তি ভাঙ্গার মিথ্যা অভিযোগে যালিম শাসক নমরুদ যখন আগুনে নিক্ষেপ করার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করে তখন ইব্রাহিম আ. পূর্ণভাবে আল্লাহর উপর ভরসা করার কারণে সেই আগুন ফুলের বাগানে পরিণত হয় । ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন ,ইব্রাহীম আ. কে যখন আগুনে নিক্ষেপ করা হলো,তখন তিনি বললেন,হাসবুনাল্লাহ ওয়া নিমাল ওয়াকিল (আল্লাহ আমাদের জন্য যথেষ্ট,তিনি উত্তম অভিভাবক) আর লোকেরা যখন মুহাম্মদ (স.) ও তাঁর সাথীদের বলল, শত্রুবাহিনীর লোকেরা তোমাদের বিরুদ্ধে সমবেত হচ্ছে,তাই তোমরা তাদের ভয় কর,তখন তাদের ঈমান বেড়ে গেল এবং তারা বলল, হাসবুনাল্লাহ ওয়া নি’মাল ওয়াকিল (আল্লাহ আমাদের জন্য যথেষ্ট,তিনি উত্তম অভিভাবক) । ( বুখারী) ইবনে আব্বাস রা. খেকে বুখারির আরেকটি বর্ণনায় আছে, আগুনে নিক্ষেপকালে ইব্রাহিম আ. এর শেষ কথা ছিল,হাসবিআল্লাহু ওয়-নি’মাল ওয়াকিল (আল্লাহ আমার জন্য যথেষ্ট,তিনি উত্তম অভিভাবক) । হাসবুনাল্লাহ আর হাসবিআল্লাহ এর পার্থক্য হল এক বচন ও বহুবচনের । প্রথমটির অর্থ আল্লাহ আমাদের জন্য যথেষ্ট । আর দ্বিতীয় টির অর্থ হলো,আল্লাহ আমার জন্য যথেষ্ট । এক বচনে হাসবিআল্লাহ,আর বহুবচনে হাসবুনাল্লাহ বলতে হয় । ইবরাহিম (আ:) ছিলেন একা। তাই তিনি হাসবি আল্লাহ  বলেছেন । ( ইসলাম প্রচার ব্যুরো,রাবওয়াহ,রিয়াদ,সৌদিআরব)

তাওয়াক্কুল,তাকদীর ও প্রচেষ্টা এর কয়েকটি উদাহরণ হচ্ছে -  প্রত্যন্ত অঞ্চলে,মধ্যরাতে ,যাতায়াত সুবিধা নগণ্য,আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থা নেই ,এমন স্থানে কেউ অসুস্থ হলে, সে ক্ষেত্রে তাওয়াক্কুল হলো জ্ঞান ও সামর্থের মধ্যে রোগ নিবারণের যে উপায় জানা আছে তা অবলম্বন করে সুস্থতার জন্য আল্লাহর উপর ভরসা করা । তেমনি শহরে অবস্থিত অসুস্থ ব্যক্তি চিকিৎসার সকল সুবিধা নিয়ে সুস্থতার জন্য আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল করাই শ্রেষ্ঠ পন্থা । ( কিমিয়ায়ে সাদাত-ইমাম গাযযালী র.) হাসান বসরী (র.) বলেন, রিযক অন্বেষণের ক্ষেত্রে কোনো উপায় উপকরণ অবলম্বন করা তাওয়াক্কুল পরিপন্থী নয় । কোন যানবাহনে আরোহন করেই গন্তব্য স্থলে কেউ নিরাপদে পৌছে যাবে তার নিশ্চয়তা নেই,বরং আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করবে নিরাপদ গন্তব্যে পৌছার জন্য ।

ইবনুল কায়্যিম রহ. বলেন, তাওয়াক্কুল হলো ঈমানের অর্ধেক। আর দ্বিতীয় অর্ধেক হলো আল্লাহর দিকে রুজু হওয়া । কোনো কিছু পাওয়ার জন্য শরীয়ত সমর্থিত জায়েয কোন উপায় উপকরণ বা পন্থা না করা তাওয়াক্কুল নয় । যেমন কেউ বলল,যদি আমার তাকদীরে ধনী হওয়া লেখা থাকে,তবে কোন প্রকার চেষ্টা ব্যতীত ই ধনী হয়ে যাব । আর যদি তাকদীরে ধনী হওয়া না থাকে তাহলে যত চেষ্টা করি না কেন তাতে সফল হবো না । প্রকৃত অর্থে এটি তাওয়াক্কুল নয় । ইরানের বিখ্যাত লেখক ও চিন্তাবিদ ড.হোসেইন এলাহি কুমশেরি তার কিমিয়া বা পরশমনি নামক বই এ লিখেছেন- আমি শক্তিহীন এক পরগাছা,আমার নিজের কোন শেকড় নেই,যতক্ষণ আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল করি ,ততক্ষণ আমার ভেতর কোন ভয়ভীতি থাকে না । উল্লেখ্য যে ,আল কুরআনে তাওয়াক্কুল ৯ বার, বহুবচনে মুতাওয়াক্কিল ৪বার, বিভিন্ন ক্রিয়াপদে ৩৩ বার এবং ওয়াকিল ২৪ বার ব্যবহৃত হয়েছে । (কুরআনের পরিভাষা : ড.মুস্তাফিজুর রহমান)

ইসলামী শরীয়তে তাকদিরে বিশ্বাস রাখা ওয়াজিব । তাই তাকদীরে বিশ্বাস রাখার পাশাপাশি চেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। সফল হলে যেকোন ব্যাপারে শোকর আদায় করতে হবে। আর সফল না হলে ধৈর্য্য ধারণ করতে হবে। প্রচেষ্টা ও তাওয়াক্কুল উভয়টাই থাকতে হবে। তাকদীরের দোহাই দিয়ে রোগ হলে চিকিৎসা না করা,শত্রুর হাত থেকে আত্মরক্ষার চেষ্টা না করা ইসলাম সম্মত নয় । সুতরাং সামর্থ অনুযায়ী চেষ্টা করে আল্লাহর উপর ভরসা করাই তাকদীর । লা হাওলা অলা কুয়্যাতা ইল্লা বিল্লাহ ।
                              
বাংলাসূবাদ/নেছারী/সমিরূল

আরও সংবাদ