Widget by:Baiozid khan
শিরোনাম:

ঢাকা Fri July 20 2018 ,

সমঅধিকার নয় বরং নারীর অধিকার নিশ্চিত করা জরুরী

Published:2015-03-07 18:12:45    
আল্লামা রুমির ভাষায়, ‘নারী বিধাতার ছায়া, সে নহে কামিনী/নহে সে যে সৃষ্ট, তারে স্রষ্টা অনুমানী’ । মানব সভ্যতার সূচনা লগ্ন থেকেই নারী মহিয়সী, নারী জয়তু, নারী বসুন্ধরা, মা-জান্নাত ইত্যাদি লাখো উচ্চতর সম্মানসূচক শব্দে-বাক্যে কিংবা বাণীতে নারী সংজ্ঞায়িত হচ্ছে । অজ্ঞতার অন্ধকারে পুরুষ কর্তৃক নারী জাতিকে কখনো কখনো অবহেলা করা হয়েছে তবে শিক্ষার আলোকিত শিখা নারীকে তার সম্মানজনক স্থানে আসীন করতে খুব বেশি সময় নেয়নি । 
 
নারীকে ঘরকুনো স্বভাবে আবদ্ধ রাখতে পুরুষের পুরুষতান্ত্রিক মনোভাব যতটুকু দায়ী তার চেয়ে ঢের বেশি দায়ী সমাজ সৃষ্ট কু-প্রথা । যদিও সামাজিক প্রথা মানুষের সৃষ্টি তবুও সে মানুষ শুধু পুরুষের মধ্য থেকেই নয় বরং নারীর অংশগ্রহনেই তা পূর্ণ হয়েছে । অনাদিকাল থেকেই নারীরাই চায়নি ঘর থেকে বের হয়ে বিশ্ব জয়ের স্বপ্ন দেখতে । ক্লারা জেটকিন, হেমলতা দেবী কিংবা বেগম রোকেয়ার মত মাত্র কিছু সংখ্যক নারীরাই নারীদেরকে অন্ধকার থেকে টেনে আলোতে বের করার চেষ্টা করেছেন । অন্ধকারে নারীর বসবাসের জন্য একচেঁটিয়াভাবে পুরুষকে দায়ী করা উচিত হবেনা। কেননা এই আধুনিক যুগে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নারী ঘরের চার দেয়ালকেই তাদের জন্য নিরাপদ আশ্রয় মনে করে। 
 
একথা বলছিনা, সব নারীকে ঘর বিরোধী স্লোগান দিয়ে রাস্তায় বের হয়ে আসতে হবে বরং শুধু বলছি, নারীর তার ইচ্ছানুযায়ী ঘরে কিংবা বাইরে যাতায়াত করার স্বাধীনতাটুকু থাকা দরকার । তবে নারী-পুরুষ উভয়কেই খেয়াল রাখতে হবে যেন, ইসলাম আগমনের পূর্বে তমসাচ্ছন্ন আরবে যেমন নারীদেরকে পরাধীনতার শৃঙ্খলাবদ্ধ করে অন্দরে আবদ্ধ রেখে পণ্যের মত ব্যবহার করা হত তার প্রতিশোধ স্বরুপ যেন এ যুগে নারীর অধিকার ও স্বাধীনতার নামে আধুনিকতার মুখোশাবদ্ধ করে নারীকে আবারও মালিকানাহীন পণ্য স্বরুপ ব্যবহার করার সুযোগ কোন গোষ্ঠী না পায় । 
 
বর্তমানে লক্ষ্যনীয় হচ্ছে, অতীতে যেমন নারীর কোন অধিকার ছাড়াই তাকে দিয়ে পুতুলের মত অভিনয় করানো হত তেমনি আজও এক শ্রেণীর চরিত্রহীন লালসাকামী পুরুষ নারীকে সমঅধিকারের শ্রুতিমধুর মন্ত্র শুনিয়ে তাদেরকে পণ্যে রূপ দেয়ার অপচেষ্টায় লিপ্ত । 
 
পুরুষের মত নারীর সমঅধিকারে বিশ্বাসী কিছু নারীরা এ শ্রেণীর খপ্পরে পরে নিজেদেরকে কেবল ভোগ্য পণ্যে পরিণত করছে। নারীকে তার পূর্ণ অধিকার অবশ্যই আদায় করতে হবে তবে সেটা তাদের পরিকল্পনানুযায়ী । ভূলে গেলে চলবে না, একটি ভূলের প্রতিশোধ আরেকটি ভূল দিয়ে গ্রহন করা যায়না । 
 
নারী কেন পুরুষ সমঅধিকার পেতে আন্দোলন করবে ? নারীতো আন্দোলন করবে তার পূর্ণ অধিকার পেতে । মানুষ হিসেবে যতটুকু প্রাপ্য অধিকার নারীর আছে তা উদ্ধারের আন্দোলন । সমঅধিকার আন্দোলনের নামে নারীকে বস্তুত ঠকানো হচ্ছে সেটা নারীদেরকেই বুঝতে হবে । এ সমাজে পুরুষ যেটুকু অধিকার পায় তা মানুষ হিসেবে যতটুকু অধিকার পাওয়া দরকার তার সমতুল্য নয় । কাজেই নারীরা যদি কেবল পুরুষের সমঅধিকার পেতে চায় তবে নারীর পূর্বেও যে অপূর্ণতা ছিল তা রয়েই যাবে । 
 
স্রষ্টার সৃষ্টির রহস্যানুযায়ী পুরুষের সাথে নারীর অনেকগুলো বৈসাদৃশ্য রয়েছে । তবে জ্ঞান-গরীমায় পুরুষ ও নারীতে বিভেদ নাই । বর্বরতার যুগে পেশি শক্তি প্রদর্শনের মাধ্যমে মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব নিরূপিত হতো। কিন্তু সভ্যতার আলো মানুষের চিন্তা-চেতনায় আমূল পরিবর্তন এনেছে । এখন মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব নির্ধারিত হয় মেধা-মননের সৃষ্টির বিচারে । এ যুগে নারী-পুরুষের মধ্যে সম্মানগত বিচারে পার্থক্য থাকা বা রাখার প্রশ্নই ওঠে না । 
 
প্রতিটি সন্তানের কাছে যখন জিজ্ঞাসা করা হয়, তোমার প্রিয় মানুষ কে ? ৯০ শতাংশ কিংবা তার চেয়েও বেশি মানুষ অকপটে মায়ের সম্মানের কথা ঘো্ষণা করে । ইসলাম ধর্মের পথ-প্রদর্শক মানবতার মুক্তির দুত হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর কাছে যখন জানতে চাওয়া হয়েছিল মা-বাবার মধ্যে শ্রেষ্ঠ কে ? তখন তিনি তিনবার মায়ের শ্রেষ্ঠত্বের কথা ঘোষণা করে শেষবার বাবার কথা বলেছিলেন । 
 
সম্মান ও মর্যাদার দিক থেকে যে শ্রেণীকে এত উচ্চাসনে আসীন করা হল তারা যখন পুরুষের সমান অধিকার পেতে আন্দোলনে রাস্তায় নামে তখন সেটা বেমানান দেখায় । ধর্ম এবং মানসিকতায় যাদেরকে শ্রেষ্ঠত্বের স্থানে রাখা হয়েছে তাদেরকে কি প্রাপ্য অধিকার দেয়া হচ্ছে না? কিছু পুরুষের অতি পুরুষতান্ত্রিক স্বভাব এবং নারীদের মধ্যে যারা নারী অধিকার নিয়ে আন্দোলনরত তাদের কিয়দাংশের স্বার্থালোভী সিদ্ধান্তের কারণে এখনো নারীরা তাদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত । 
আমাদের সমাজ পুরুষশাসিত হওয়ার পরেও নারীর অধিকার বিন্দুমাত্র কুঞ্চিত হতো না, যদি সন্তানের কাছে মা, স্বামী কাছে স্ত্রী, বাবার কাছে মেয়ে কিংবা ভাইয়ের কাছে বোন তাদের প্রাপ্য সম্মানটুকু পেত । নারীর অধিকার বলতে শুধু তাদের সম্পদের ভাগ বুঝায় না বরং এর সাথে তাদের সম্মান, স্বাধীনতা, অর্থনৈতিক নির্ভরতা, সামাজিক অবস্থানও অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত । নারীর সমঅধিকার নিয়ে সর্বপ্রথম আনুষ্ঠানিক আন্দোলন শুরু হয়েছিল উনবিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগে । সে আন্দোলনে সফলতা-বিফলতা যাই হোক তবে নারীরা তাদের প্রাপ্য অধিকারের দাবী আদায় করতে শিখেছে । 
 
১৮৫৭ সালে কর্মজীবি নারীদের অধিকার নিয়ে যে  আনুষ্ঠানিক আন্দোলনের সূত্রপাত হয়েছিল তা এখনও সাফল্যের শতভাগ পায়নি । কেননা সেদিনের সে আন্দোলন থেকে আজও নারীদের স্বার্থনিয়ে যতগুলো আন্দোলন হচ্ছে তার অধিকাংশের রূপরেখা নির্ধারণ করে দেয় পুরুষ ! কাজেই নারীদের অধিকার আদায়ের আন্দোলনে কিছুটা কিন্তু(!) থেকেই যাচ্ছে এবং স্বার্থলোভীরা তাদের বহুবিধ স্বার্থ উসূল করে নিচ্ছে । 
 
গোটা বিশ্বজুড়ে আন্তর্জাতিকভাবে প্রতি বছরের ৮ মার্চ পালিত হয় আন্তর্জাতিক নারী দিবস ( যার আদি নাম আন্তর্জাতিক কর্মজীবী নারী দিবস) । এ দিবস পালনের পিছনে রয়েছে সূদীর্ঘ আন্দোলনের ইতিহাস । ১৮৫৭ সালে আমেরিকার নিউইয়র্ক শহরের একটি সেলাই কারখানার নারী শ্রমিকদের আন্দোলন থেকে মহান ৮ মার্চের উদ্ভব । তখন নিউইয়র্ক বস্ত্র কারখানায় হাজার হাজার নারী শ্রমিক কাজ করত । তাদেরকে দৈনিক ১৫-১৮ ঘন্টা পর‌্যন্ত পরিশ্রম করতে হত অথচ তাদের সে আনুপাতিক মজুরি দেয়া হত না । নারী শ্রমিকরা সুঁচ, সুতা, বিদ্যুতসহ অন্যান্য আনুষঙ্গিক যেসব জিনিসপত্র ব্যবহার করত মালিকরা সে বাবদ বেতন কেটে রাখত । বিলম্বে ফ্যাক্টরিতে যাওয়া, কাজের ক্ষতি করা অথবা টয়লেটে বেশি সময় নেয়ার জন্য নারী শ্রমিকদের কাছ থেকে জরিমানা আদায় করা হতো। 
 
মালিক গোষ্ঠীর এ অমানবিক শোষণের বিরুদ্ধে ১৮৫৭ সালের ৮ মার্চ নিউইয়র্কের সেলাই কারখানায় নারী শ্রমিকরা উপযুক্ত বেতন ও দশ ঘন্টা কাজের দাবিতে আন্দোলনে নামে । নারীদের সে আন্দোলন দমনে পুলিশ নারীদের উপর গুলি চালায় । ধারণা করা হয়, এই ঘটনার মাধ্যমে নারী আন্দোলনের ইতিহাসে পুলিশ সর্বপ্রথম গুলি চালায় । ফলে আন্দোলন আরো জোরদার হয় । পরবর্তীতে, নারীর ভোটাধিকার ইস্যু আন্দোলনের অন্যতম কর্মসূচি হিসেবে সামনে আসে ।
 
অন্দোলনের মাধ্যমে পরিপূর্ণ অধিকার আদায় সম্ভব না হলেও অর্জন নিতান্তই কম ছিল না । সংগ্রামের ধারাবাহিকতায়, ১৮৬০ সালে নিউহয়র্ক শহরের সেলাই কারখানার নারী শ্রমিকরা দাবি আদায়ের জন্য ট্রেড ইউনিয়ন গঠনের সমর্থ হয় । নারী শ্রমিকদের এ সংগ্রামকে স্মারক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে প্রধান ভূমিকা পালন করেন ক্লারা জেটকিন নাম্নী একজন জার্মান সমাজতান্ত্রিক । 
তার নেতৃত্বে ১৯০৭ সালে আন্তর্জাতিক নারী সংস্থা (International women's Bureau) প্রতিষ্ঠিত হলে ক্লারা তার সম্পাদক নির্বাচিত হন । ১৯১০ সালে কোপেনহেগেনে কমিউনিস্টদের দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় । ওই সম্মেলনে ক্লারা ৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসেবে ঘোষণার প্রস্তাব দেন এবং তা সর্বসম্মতিক্রমে অনুমোদিত হয় । পরের বছর অস্ট্রিয়া, ডেনমার্ক, সুইজারল্যান্ড এবং জার্মানিতে প্রথমবারের মতো নারী দিবস পালিত হয় । ১৯১৩ ও '১৪ সালে আন্তর্জাতিক নারী দিবস প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রতিবাদ হিসেবে পালিত হয় । নারী আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ১৯৪৮ সালে জাতিসংঘের সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণায় নারী-পুরুষের সমঅধিকারের ব্যাপারে স্বীকৃতি দেয়া হয়। ১৯৭৫ সালে জাতিসংঘ দাপ্তরিকভাবে ৮ মার্চকে নারী দিবস ঘোষণা করে । তৎপরবর্তী, জাতিসংঘের সকল সদস্য রাষ্ট্র ৮ মার্চ নারী দিবস পালন করে আসছে । উল্লেখ্য, ১৯১০ থেকে ১৯১৩ পর্যন্ত মার্চের যে কোন দিন বিভিন্ন দেশে নারী দিবস পালন করা হত । কিন্তু, ১৯১৪ থেকে সুনির্দিষ্টভাবে ৮ মার্চ নারী দিবস পালিত হচ্ছে । বিশ্বের কয়েকটি দেশে এ দিবসে সরকারী ছুটি পালন করা হয় এবং রাষ্ট্রীয়ভাবেই এ দিবস উদযাপন করা হয় । প্রতি বছর ৮ মার্চ বাংলাদেশেও যথাযোগ্য আয়োজনে এ দিবসটি পালন করা হয় তবে বাংলাদেশের নারীরা এখনো বিশ্বের অন্যান্য দেশের নারীদের থেকে পিছিয়ে আছে । কেননা সম্প্রতি প্রকাশিত কিছু গবেষণা প্রতিবেদনে নারীদের ওপর যেভাবে নিরর‌্য্যাতনের চিত্র প্রকাশিত হয়েছে তা নারী স্বাধীনতা কিংবা অধিকারের শুধু পরিপন্থিই বরং ঘৃণিত ও ন্যাক্যারজনক ঘটনা । 
 
বিভিন্ন সংস্থা প্রদত্ত তথ্যমতে, বাংলাদেশেল প্রেক্ষাপটে ৮৭% নারীই কোন না কোনভাবে নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন । এ নির্যাতিত নারীদের মধ্যে ৬৫% স্বামীর দ্বারা শারীরিক নির্যাতনের শিকার । আবার তাদের ৩৬% যৌন নির্যাতন, ৮২% মানসিক নির্যাতন এবং ৫৩% স্বামীর মাধ্যমে অর্থনৈতিক নির্যাতনের শিকার । এসকল নির্যাতিত নারীদের ৭৭% বিগত একবছরেও একই ধরনের নির্যাতন ভোগ করেছেন । পুরুষ নির্যাতিত নারীদের অর্ধেকেরও বেশি চিকিৎসা নেয়ার সুযোগ পান না । নির্যাতিত নারীদের এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি স্বামীর ভয়ে কিংবা স্বামীর অনুমতি না থাকায় চিকিৎসকের কাছে যেতে পারেন না । তবে নির্যাতনের পরিসংখ্যান বলছে, শহরের নারীদের তুলনায় গ্রামের নারীরা অনেক বেশি নির্যাতিত হয় । সাধারণত পারিবারিক নির্যাতন, ধর্ষন, যৌতুক, এসিড নিক্ষেপ, যৌন হয়রানি, প্রেমের নামে প্রতারণা, দৈহিক সম্পর্ক স্থাপন করার পর তার ধারনকৃত ভিডিও প্রকাশ করে দেওয়া, নারীদেরকে বিভিন্ন অসামাজিক কাজে বাধ্য করা এবং সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্যের মাধ্যমে নারীদেরকে নির্যাতন করা হয় । পরিসংখ্যানের তথ্যমতে, ২০০১ সালের ১লা জানুয়ারি থেকে ২০১৪ সালের ২৮শে ফেব্রুয়ারী পর্যন্ত যৌতুক সহিংসতার কারনে ২৭৫৩ জন নারীকে হত্যা এবং ১৭৮৭ জন নারীকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করা হয়েছে । এ সময় স্বামী কিংবা শ্বশুড়বাড়ীর সদস্যদের নির্যাতনের তীব্রতা সহ্য করতে না পেরে ১৯৯ জন নারী আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছে ।  ধর্ষণের শিকার হয়েছে ১০ হাজার ৮৭ জন নারী ও মেয়ে শিশু, এসিড সহিংসতার শিকার হয়েছে ১৭৯৬ জন, বখাটেদের যৌন হয়রানির শিকার হয়েছে ১৭৮২ জন নারী ও শিশু ।  অতীতের সকল পরিসংখ্যানকে ছাড়িয়ে গেছে ২০১৪ সালে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের প্রদত্ত পরিসংখ্যান । তাদের পরিসংখ্যান অনুযায়ী ২০১৪ সালের জানুয়ারী থেকে জুন পর্যন্ত মাত্র ৬ মাসে মোট ২২০৮টি নারী নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে । এ অল্প সময়ের মধ্যে ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে ৪৩১টি । যার মধ্যে গণধর্ষণের সংখ্যা ছিল ৮২টি । ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ৪৫ জনকে । ধর্ষণের  চেষ্টা করা হয় ৫১ জনকে । শ্লীলতাহানির শিকার ৭০ জন ও যৌন নির্যাতনের শিকার ২৫ জন । ২০১৩ সাল জুড়েই ছিল নারী নির্যাতনের মহোৎসবের সময় !  এসময় নারী নির্যাতনের ঘটনা ঘটে ৪ হাজার ৭৭৭টি । এর মধ্যে ধর্ষিত হয়েছে ৬৯৬ জন । যার মধ্যে গণধর্ষণের শিকার হয়েছে ১৮৫ জন । ধর্ষনের পর হত্যা করা হয়েছে ৯৪ জনকে এবং ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়েছে ১৫৩ জনকে । 
 
বাংলাদেশের নারীদের সামগ্রিক অবস্থা পর‌্যবেক্ষন করার জন্য ‘বাংলাদেশ অ্যাকশন এইড’ একটি জরিপ পরিচালিত করেছে। ‘নিরাপদ নগর কর্মসূচির ভিত্তিমূলক জরিপ’ কর্মসূচীতে দেশের বিভিন্ন শ্রেণী ও স্তরের নারীদের উপর এ গবেষণা চালানো হয়। যাতে নারীরা স্বেচ্ছায় তাদের মতামত দিয়েছে । যাতে দেখা গেছে, নারীদের মধ্যে রাতে ঘরের বাইরে যেতে চায় না ৬২ শতাংশ, একা ঘরে বাইরে যেতে চায় না ৬০ শতাংশ, নির্দিষ্ট এলাকা এড়িয়ে চলে ৪৭ শতাংশ, গণপরিবহন ও নির্জন স্থান এড়িয়ে চলে যথাক্রমে ২৩ ও ২৬ শতাংশ নারী । ১৩ শতাংশ নারী গণপরিবহন ব্যবহার বন্ধ করেছে এবং রঙিন ও আকর্ষণীয় পোশাক পরিধান করা ছেড়ে দিয়েছে ২১ শতাংশ নারী । ৩ শতাংশ নারী চলার পথে আত্মরক্ষার্থে অস্ত্র কিংবা অন্য যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে । আইন ও সালিশ কেন্দ্র প্রদত্ত প্রকাশিত তথ্য মতে, চলতি বছরের জানুয়ারী থেকে সেপ্টেম্বর পর‌্যন্ত দেশে ১০ জন নারী যৌন নির‌্যাতনের শিকার হয়ে আত্মহত্যা করেছে এবং আত্মহত্যার চেষ্টা করেছে ১ জন । মেয়ে ও নারীদের উত্যক্তকরীদের বিরুদ্ধে কথা বলায় কিংবা প্রতিবাদ করায় খুন হয়েছে ৭জন এবং লাঞ্ছিত হয়েছে ১৩০ জন । মেয়ে ও নারীদেরকে উত্যক্ত করাকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষে আহত হয়েছে ৫৭ জন এবং বখাটেদের উৎপাতের কারনে স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছে ৫ জন মেয়ে শিক্ষার্থী । জরিপে অংশগ্রহনকারী নারীদের দেয়া তথ্যানুসারে, ৮৫ শতাংশ নারী মরর‌্য্যাদাহানীকর উক্তির শিকার হয়েছে, ৪৬ শতাংশ নারী যৌনতাপূর্ণ অশ্লীল ভাষার মুখোমুখি হয়েছে । ৪৮ শতাংশ নারীর বাসের চালক বা ভাড়া আদায়াকারীর মূখের অবমাননাকর ভাষা শোনার অভিজ্ঞতা হয়েছে । ৮৮ শতাংশ নারীকে বাজারে কিংবা বিপণিবিতানে সাধারণ মানুষও নারীদের উদ্দেশ্যে অশ্লীল বাক্য ব্যবহার করে এবং ৬৯ শতাংশ নারী দোকানের কর্মচারী বা বিক্রেতার অশ্লীল মন্তব্যের শিকার হন । তবে নারীরা সবচেয়ে বেশি যৌন হয়রানির শিকার হয় রাস্তা ঘাটে । ৮৫ শতাংশ পুরুষ এবং ৭৭ শতাংশ নারী মত দিয়েছেন যে, নারীরা বেশি হয়রানির শিকার হয় রাস্তায় বা ফুটপাতে । এরপর বাস টার্মিনার ও রেল স্টেশনে । হয়রানির স্থান হিসেবে বাজার ও বিপণিবিতানের কথা বলেছেন অর্ধেক নারী এবং ৪০ শতাংশ বলেছে পার্ক ও বিনোদন কেন্দ্রের কথা । দিনের বেশিরভাগ সময়েই নারীরা যৌন হয়রানির শিকার হলেও বিশেষ করে খুব সকালে, মধ্য দুপুরে এবং সন্ধ্যায় এর মাত্রা থাকে অনেক বেশি । যৌন হয়রানির শিকার হওয়া নারীদের মধ্যে ৮১ শতাংশ নারী পুলিশের সহায়তা চায় না । এর কারন হিসেবে তারা পুলিশের নৈতিবাচক ভাবমূর্তির কথা উল্লেখ করেছেন । ৯৫ শতাংশ নারীর মতে, তাদের সমস্যার কথা পুলিশকে জানালে সমস্যা আরও বাড়ে । অন্যদিকে পুলিশ অপরাধীর পরিবর্তে ৬৫ শতাংশ নারীকেই দোষ দেয় ।
 
আমাদের দেশে সাধারণত বেশির ভাগ পাচার হয়ে থাকে শিশু, কিশোর ও নারী । সাম্প্রতিক সময়ে রুট পরিবর্তনের পাশাপাশি মানবপাচারের ধরনেও পরিবর্তন এসেছে । সভ্যকালে মানুষ পণ্যের মতো বেচাকেনার উপকরণ হবে, তা অচিন্তনীয় । মানবপাচারের সব খবর গণমাধ্যমে আসে না । তবে বিভিন্ন জরিপ এবং সংবাদে মানব পাচারের যে ভয়াল চিত্র ফুটে ওঠে তা আঁৎকে ওঠার জন্য যথেষ্ট । ১০ই সেপ্টেম্বর একটি সহযোগী দৈনিকে ‘১০ বছরে ভারতে তিন লাখ নারী ও শিশুপাচার’  শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয় । প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ থেকে ভারতে নারী ও শিশুপাচার বেড়েই চলেছে । জাতিসংঘের উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) গবেষণায় দেখা গেছে, গত ১০ বছরে বাংলাদেশ থেকে তিন লাখ নারী ও শিশু ভারতে পাচার হয়েছে । পাচারকৃত নারী ও শিশুর বেশিরভাগ পাচার করা হয়েছে দেশের পশ্চিমের জেলাগুলোর সীমান্ত দিয়ে বলেও প্রতিবেদনটিতে উল্লেখ রয়েছে । ২০১৪ সালে সাড়ে ৮ মাসে বেনাপোল সীমান্তে ভারতে পাচারকালে ৮৭৮ জন নারী, শিশু ও পুরষকে উদ্ধার করেছে বিজিবি । আজকাল বাংলাদেশ থেকে বিদেশে নারী শ্রমিক ও কর্মী যাওয়ার হারও উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বেড়েছে । পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বর্তমানে বিশ্বের ১৯ টি দেশে কমপক্ষে ৩ লাখ বাংলাদেশী নারী শ্রমিক কর্মরত আছে । এর বাইরেও দালাল প্রতারক চক্র ও আদম ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে অবৈধ পথে পাচার হয়েছে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নারী শ্রমিক । একমাত্র লেবাননেই কর্মরত আছে ৮১ হাজার ৭১০ জন বাংলাদেশী নারী শ্রমিক । দেশের এ নারী শ্রমিকদের অধিকাংশই কাজ করছে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশগুলোতে যাদের বেশির ভাগই গৃহকর্মী । পাচার হওয়ার সময় ভারতীয় সীমান্ত রক্ষীদের হাতে ২০১০ সালে ৭৪ জন, ২০১১ সালে ৩১ জন, ২০১২ সালে ৩৪ জন এবং চলতি বছরে এ পর‌্যন্ত ১৯ জন নিহত হওয়ার খবর প্রকাশিত হয়েছে ।
 
পূর্বেই উল্লেখ করেছি, নারীদের ন্যায্য অধিকার প্রাপ্তির পিছনে শুধু পুরুষকেই দায়ী করা অযৌক্তিক । বাংলাদেশসহ বিশ্বের অনেকগুলো দেশে রাষ্ট্রের প্রধান ক্ষমতাধর ব্যক্তি নারী অথচ তারাই নারীদের পূর্ণ নিরাপত্তা দানের জন্য উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ গ্রহন করছে না । ১৯৯১ সাল থেকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী, বিরোধীদলীয় প্রধান এবং উল্লেখযোগ্য ক্ষমতাধর মন্ত্রী নারী । অথচ এই দেশেই নারী পূর্ণ নিরাপদ নয় । নারীবান্ধব সরকারই যদি নারীর নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয় তবে অন্যরা তার কি সমাধান দিতে পারে । কোথাও কোথাও শোনা যায়, মা তার মেয়েকে পূর্ণ অধিকার দিতে নারাজ । সমাজের এই যদি অবস্থা হয় তবে ঘটা করে বছরে একদিন নারী দিবস পালন খুব বেশি ফলপ্রসূ হবে না । আমরা আর বলতে চাইনা, ‘ দস্তার চেয়েও সস্তা সে যে, বস্তার চেয়েও ভারী/মানুষ হয়েও সঙ্গের পুতুল, বঙ্গ দেশের নারী’ । বরং সাম্যের কবি কাজী নজরুল ইসলামের মত বলতে চাই, ‘ জাগো আলোকের দীপ্ত মশাল, জাগো ওগেয বীর জায়া-মৃত্যুর মাঝে খুঁজে ফেরো আজ নব জীবনের মায়া’ । 
 
রাজু আহমেদ । কলামিষ্ট । 
raju69mathbaria@gmail.com

আরও সংবাদ