Widget by:Baiozid khan
শিরোনাম:

ঢাকা Fri July 20 2018 ,

খাদ্যাভ্যাসে নিষেধাজ্ঞা আরোপ অমানবিক ও বর্বরোচিত

Published:2015-03-15 19:05:14    
বেঁচে থাকার জন্য সকল প্রাণীর খাদ্য গ্রহন আবশ্যক । তবে সকল প্রাণীর মধ্যে একমাত্র মানুষ নিজ প্রজ্ঞাকে ব্যবহার করে খাদ্য উৎপাদন করে ইচ্ছামত রান্না করে কিংবা অন্যভাবে খেতে পারে । মানুষ ছাড়া অন্য সকল জীবকে খাদ্য গ্রহনের জন্য প্রাকৃতির ওপর নির্ভর করতে হয় । ঋতু-বৈচিত্র্যের ভিন্নতায় সৃষ্ট পরিবেশের কারণে এক এক অঞ্চলের মানুষের খাদ্যাভ্যাসেও রকমফের রয়েছে ।
 
ভারতীয় ‍উপমহাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মানুষের প্রধান খাদ্য যেমন ভাত তেমনি বিশ্বের কোন জনপদের রুটি, কারও আলু আবার কারও ফাস্টফুড জাতীয় কিছু । খাদ্য গ্রহণের প্রধান শর্ত যেহেতু শুধু বেঁচে থাকা নয় বরং শারীরীকভাবে সুস্থ ও সুঠামভাবে বেড়ে ওঠা, তাই খাদ্যের গুনাগুন-প্রকৃতি নিয়েও রয়েছে অনেক যাচাই বাচাই । বিশ্বের প্রতিষ্ঠিত প্রায় সকল ধর্মে এর অনুসারীদের জন্য কিছু খাদ্যের ব্যাপারে বিধি-নিষেধ ছাড়া সবার জন্যই ঢালাওভাবে প্রায় সকল ধরণের খাদ্য গ্রহনের অনুমতি রয়েছে ।
 
গ্রহনযোগ্য ধর্মে যে খাদ্যগুলো গ্রহনের ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে পরবর্তীতে বিজ্ঞানও সেই সকল খাদ্যে উপকারের চেয়ে ক্ষতিকর দিকের অস্তিত্বই বেশি খুঁজে পেয়েছে । তারপরেও ব্যতীক্রমী এক শ্রেণীর মানুষ আছে যারা যাচাই-বাচাই কিংবা ধর্মীয় নিষেধাজ্ঞা ছাড়াই সকল খাদ্য ভক্ষণে আগ্রহী । ভারতীয় উপমহাদেশে ধর্মনুরাগীর সংখ্যা বেশি হওয়ায় এখানে খাদ্য গ্রহনের পূর্বে মানুষকে ধর্মীয় সীমার ব্যাপারে খুবই মান্যগণ্যতা করতে দেখা যায়।
 
তবুও অতীতে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষার্থে রাষ্ট্র কেন্দ্রিক জনগোষ্ঠীর সংখ্যাগরিষ্ঠতা কিংবা লঘিষ্ঠতা বিবেচনা ছাড়াই যে যা খেতে অভ্যস্থ বা রুচিশীল তার ব্যাপারে স্বাধীনতা দেয়া হত । হঠাৎ সে ধ্যান ধারণায় ছেদ দিয়েছে ভারত সরকারের কিছু ধর্মীয় উগ্রবাদী সিদ্ধান্ত । হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ ভারতের কয়েকটি অঙ্গরাজ্যে গরু জবাই নিষিদ্ধ করা হয়েছে এবং এ ব্যাপারে কঠোর আইন প্রণয়ণ করা হয়েছে । কারণ হিসেবে রামায়নে গরুর উল্লেখ আছে এবং হিন্দুরা গরুকে পূজনীয় দেবতা হিসেবে বিবেচনা করায় এ সিদ্ধান্ত গ্রহীত হয়েছে। যার ফলে যে সকল রাজ্যে গরু জবাই কিংবা গোশত বিক্রি নিষিদ্ধ করা হয়েছে, সেখানকার মুসলমান কিংবা খৃষ্টানদেরকে গরুর গোস্ত ভক্ষণ থেকে বিরত থাকতে হবে । গরু জবাইয়ের বিপক্ষে ভারতীয় জনতা পার্টি এবং শিব সেনারা ১৯৯৫ সাল থেকে আনুষ্ঠানিক আন্দোলন করলেও সে বিলটি এতদিন রাষ্ট্রপতির টেবিলে আটকে ছিল। কিন্তু বিজেপী ক্ষমতায় যাওয়ার পরেই রাষ্ট্রপতি প্রনব মূখার্জী ও প্রধানমন্ত্রী নরেদ্র মোদীর অনুমতিক্রমে প্রথমে মধ্যপ্রদেশ এবং পরে হারিয়ানায় গরু জবাই এবং গোশত বিক্রি নিষিদ্ধ করা হয়েছে । ‘প্রাণী সংরক্ষণ বিল’ হিসেবে এটাকে প্রচার করার চেষ্টা করা হলেও মূলত ধর্মীয় উগ্রবাদী দৃষ্টিকোনেই এটি করা হয়েছে ।
 
আইনে বলা হয়েছে, যারা গো-হত্যা করবে বা গরু বিক্রি করবে তাদের ৫ বছরের জেল এবং ১০ হাজার জরিমানা করা হবে । মানব হত্যাতুল্য অপরাধ আখ্যা দিয়ে হরিয়ানায় গো-হত্যা নিষিদ্ধ করা হয়েছে এবং কেউ যদি এ আইন অমান্য করে তবে তাকেও হত্যা করার হুমকি দেয়া হয়েছে ।
 
শুধু মধ্যপদেশ কিংবা হরিয়ানায় নয় বরং ভারতের ২৯ টি অঙ্গরাজ্যের মধ্যে কেবল কেরালা, অরুণাচল, মেঘালয়, মিজোরাম, সিক্কিম, মণিপুর, নাগাল্যান্ড, ত্রিপুরা এবং কাশ্মীর ব্যতীত সকল রাজ্যেই গো-হত্যার ব্যাপারে কমবেশি নিষেধাজ্ঞা রয়েছে । হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ট ভারতের ২ টি অঙ্গরাজ্যে যেহেতু গো-হত্যা পুরোপুরো নিষিদ্ধ হয়েছে তখন সময়ের পরিক্রমায় বাকীগুলোতেও নিষিদ্ধ হবে-এটা মোটামুটি নিশ্চিত । 
 
শুধু রামায়ণে গরুর কথা উল্লেখ থাকায় গো-হত্যা নিষিদ্ধ করা হল অথচ হিন্দুধর্মের এ পবিত্র গ্রন্থে আরও অনেক পশুর কথা উল্লেখ আছে । যেমন-হাতি, গোড়া, গাধা, কুকুর ও বিড়াল । মহাভারতে উল্লেখ রয়েছে শকুন, বক, কুকুর, সিংহ, কাকা ও সাপের নাম । এতগুলো জন্তু-জানোয়ারের নাম উল্লেখ থাকার পরেও শুধু প্রাণী সংরক্ষণ আইনের নামে রাজ্যময় গো-হত্যা নিষিদ্ধের কারণ কি ? মুসলিম ধর্মাবলম্বীদের প্রিয় খাদ্য হওয়ায় তবে কি গরুর মাংস নিষিদ্ধ করা হল ? যারা ধর্মীয় গ্রন্থে গো-হত্যা নিষিদ্ধ বলে উল্লেখ করেন তারা অবশ্যই মানবেন গরু হত্যা হিন্দুদের জন্য নিষিদ্ধ কিন্তু মুসলিম কিংবা খৃষ্টানদের জন্য তো তা নয় ।
 
কাজেই ভারতের মোট জনগোষ্ঠীর ২০ভাগ মুসলিমসহ প্রায় ২৫ভাগ জনগোষ্ঠী মুসলিম ও খৃষ্টান । এ বিপুল সংখ্যক মানুষের প্রিয় খাদ্যকে আইনের মাধ্যমে নিষিদ্ধ করা কতটা যৌক্তিক হয়েছে । যদি ধর্মীয় মানদন্ড দাঁড় করানো হয় তাতেও কি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখার জন্য এ দাবী ধোঁপে টেকে । বাংলাদেশের মোট জনগোষ্ঠীর ৯০ভাগ মুসলিম এবং অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে মাত্র ৫ভাগের বেশি হিন্দু হবে না। ইসলাম ধর্মে শুকরের মাংস নিষিদ্ধ করা হয়েছে এবং মুর্তি পূজার ব্যাপারে কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে ।
 
ধরুন, বাংলাদেশেও যদি সংখ্যাগরিষ্ঠতার দোহাই দিয়ে শুকর-হত্যা নিষিদ্ধ করা হয় এবং আইনের মাধ্যমে মূর্তি পূজা বন্ধ করা হয় তখন সেটা হিন্দুদের কাছে কেমন ঠেকবে ? বস্তুতপক্ষে বাংলাদেশে যদি এটা করা হয় তবে বিশ্বব্যাপী হিন্দুদের অধিকার হরণের জন্য সমালোচনার ঝড় উঠবে কিন্তু ভারতে গরুর মাংস ভক্ষণের অধিকার মুসলমানদের কাছ থেকে কেড়ে নেওয়ার জন্য কোথাও কোন টু শব্দটি পর‌্যন্ত নাই । এটাই বাস্তবতা এবং সম্রাজ্যবাদীদের ষড়যন্ত্র । 
 
মানবিক দৃষ্টিতে ভারত সরকারের উচিত গরু জবাই ও মাংস খাওয়ার বিরুদ্ধে যে নীতিমালা প্রণয়ণ করা হয়েছে তা বাতিল করা । প্রাচীন কালেও এ রাষ্ট্রটিতে এমন কিছু কুসংস্কার ছিল । তখন তারা গরুর মাংসের মত মুরগীর মাংসও ভক্ষণ করত না । মুরগী পোকা-মাকড়সহ নানা কিছু খায় তাই এটা খাওয়া তারা নিষিদ্ধ করেছিল । অথচ কালের পরিবর্তনে মুরগির রোস্ট ছাড়া তাদের আহার চলে না । এখন আর মুরগীর কোন দোষ নাই ।
 
এ বিষয়ে চার্বাক সম্প্রদায় বেশ মজা করে বলেছে, যে ব্রাক্ষ্মণরা পাপ মোচনের নামে এক কোপে পাঠা বলি দিয়ে ভগবানের সান্নিধ্য পাওয়ার মানসে উৎসর্গ করে ওরা কি কখনো ওদের বাপের ঘাড়ে এক কোপ দিয়ে পাপ মোচন করেছে । বিশ্বের মধ্যে ভারত গোরুর মাংস রপ্তানিতে শীর্ষ একটি দেশ । গো-হত্যা নীতিমালা গ্রহনের পর কি তাদের সে ব্যবসা বন্ধ করে দিবে ? বাংলাদেশসহ বিশ্বের ৫০টি অধিক দেশে ভারত গরু বিক্রি করে । এ সকল রাষ্ট্র ভারত থেকে গরু ক্রয় করে জবেহ করে তার মাংস ভক্ষণ করে ।
 
সুতরাং রামায়ণ কিংবা মহাভারতের শর্ত রাখতে গিয়ে কি তারা গরু বিক্রি বন্ধ করে দিতে পারবে ? গরু দেবতার প্রতিরূপ তাই এটা যবেহ করা যাবে না কিন্তু গরুর দুগ্ধ দহন করে সেটা কি খাওয়া উচিত হবে ? গরুর স্তনে হাত দেওয়া তো গোমাতাকে যৌন হেনস্তা করার সমান । দুধ দহন করে ভক্ষণ করলে কি আরেক দেবতার অধিকার হরণ করা হয়না ? কেননা গরুর বাছুরটিও তো আরেক দেবতা ?
 
ভারত যদি গরু জবাই নিষিদ্ধ করে তবে তাদেরকে যৌক্তিক কারণেই আরও কতগুলো বস্তু নিষিদ্ধ করতে হবে । ইঁদুর মারার জন্য যে বিষ উৎপন্ন করা হয় তা নিষিদ্ধ করতে হবে কেননা ইঁদুর গণেশের বাহন । হাঁস খাওয়া নিষিদ্ধ করতে হবে কেননা হাঁস খোদ বিদ্যাদেবী স্বরস্বতীর পদযুগলের সম্মূখে অবস্থান করে । মৎস ভক্ষণও ভূলে যেতে হবে কেননা শ্রীহরি মৎসরূপ ধারণ করে ধরাধামে এসেছিলেন । পূষণের বাহন ছাগ তাই পাঠা বলিও নিষিদ্ধ করা হোক । অগ্নিদেবের ভেড়া, কার্তিকের ময়ূরও নিষিদ্ধ করতে হবে । যে কারণে গরু নিষিদ্ধ করা হয়েছে তেমন কারণেই কবুতরও নিষিদ্ধ করতে হবে । এভাবে নিষিদ্ধ করতে থাকলে তো বাকী থাকবে না কিছুই ।
 
ভূলে যাওয়া উচিত নয়, ধর্ম কারো উপর জোড় করে চাপিয়ে দেয়ার বস্তু নয় । বর্তমান অশান্তিময় পৃথিবীতে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখা খুব জরুরী । প্রতিটি মানুষ তার নিজ নিজ ধর্ম পালন করার অধিকার পাবে এবং অন্য ধর্মকে শ্রদ্ধা করবে; এমন একটা পৃথিবী কল্পনা করা কি খুব বেশি চাওয়া ? আমরা যখন অগ্রগতির জন্য প্রতিযোগীতায় নেমেছি তখন ভারত সরকার প্রণীত গো-হত্যা বিষয় সাম্প্রতিক আইন জাতিগতভাবেই আমাদেরকে মধ্য যুগের দিকে টানছে । এ থেকে উত্তরণের পথ খুঁজতে হবে এবং এর সমাধানে ভারত সরকারকেই অগ্রগন্য ভূমিকা পালন করতে হবে ।
 
সকল ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধা ততক্ষণ থাকবে যতক্ষণ আপন ধর্ম স্বাধীনভাবে পালনের অধিকার অবশিষ্ট থাকবে । কোন ধর্মের প্রতি অনাকাঙ্খিত হস্তক্ষেপ করা আদৌ সমীচীন নয় । কাজেই মহারাষ্ট্র ও হরিয়ানার মুসলমানসহ অন্যান্য রাজ্যের মুসলমানদের খাদ্যাভ্যাসের যে অধিকার ভারত সরকার রাষ্ট্রীয়ভাবে হরণ করেছে তা ফিরিয়ে দেয়া তাদের নৈতিক দায়িত্ব । কারো খাদ্যাভ্যাস বিষয়ে এমন নগ্ন হস্তক্ষেপ অমানবিক ও বর্বরোচিত বটে  ।  
 
 
রাজু আহমেদ। কলামিস্ট

facebook.com/raju69mathbaria/

আরও সংবাদ