Widget by:Baiozid khan
শিরোনাম:

ঢাকা Sun September 23 2018 ,

মশার উৎপাত থেকে নগরবাসীকে রক্ষা করুণ

Published:2015-03-18 19:19:16    
পিঁপড়ার মত যদি নিজের শরীরের পঞ্চাশগুন বেশি ওজন মশাও টেনে নিতে পারত তবে কত মানুষকে যে মশা গুম করে ফেলত তার হিসাব দেয়া খুব সহজ কাজ হত না ! কথাটি হাস্যকর শোনালেও রাজধানীসহ দেশের শহর-নগরগুলোতে সাম্প্রতিক মশার উৎপাত দেখলে এমনটা ধারণা করা খুব বেশি অযৌক্তিক হবে না । তবে মশা কাউকে গুম না করলেও ঠিকমত ঘুমাতে দিচ্ছে না । মশা নিধক গুড নাইট, কয়েল, স্প্রে কিংবা অন্যসব সরঞ্জামও মশাকে যেন ধমাতে পারছে না । 
 
সনাতন পদ্ধতির ধুপ প্রজ্বলন করলে সামান্য সময় মশার কবল থেকে রক্ষা পাওয়া যায় কিন্তু শহরের আধুনিক জীবন পদ্ধতির সাথে এটা যে বড় বেমানান । মশারি খাঁটিয়ে বসে থাকলেও শেষ রক্ষা নাই । প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত বাহিনী যেমন অতি সংগোপনে শত্রুর ডেরায় প্রবেশ করে তেমনি মশাও যে কোন ফাঁকে কোন ফোকর দিয়ে মশারীর মধ্যে প্রবেশ করে তা লক্ষ্যই রাখা যায়না । 
 
এক বন্ধু একবার গল্পচ্ছলে বলছিলেন, গভীর রাতে মশার প্যান-প্যানানিতে তিনি সজাগ হয়ে দেখলেন, রাজ্যের সকল মশা তার মশারীর অন্দরে মনের সূখে গান গাইছে ! অগ্যতা কি আর করা ? মশাগুলোকে মশারীর মধ্যে ঠিকমত বন্দি করে তিনি বাকী রাতটুকু মশারীর বাইরেই কাটিয়ে দিলেন ! বন্ধুটি সে রাত্রে মশার কবল থেকে রক্ষা পেলেও মশার কবল থেকে কি শহরবাসীর নিস্তার আছে ? মশারির মধ্যে প্রবেশ করতে না পারলেও মশারীর বাইরে বসে কর্ণের ঠিক কাছাকাছি অবস্থানে থেকে এমনভাবে অসমাপ্ত গুন-গুন শুরু করবে তা শুনে যেন মনে হয়, দেশবাসীর বিরুদ্ধে স্লোগান দিচ্ছে।
 
রক্তচোষা এ ক্ষুদ্র অজাত পতঙ্গটি যদি শুধু রক্তচুষে ক্ষান্ত হত তাও একপ্রকার সহ্য করা যেত ! রক্তশোষার সাথে সাথে মানুষের শরীরের মধ্যে এমনভাবে রোগ-জীবানুর অনু সংক্রমন করিয়ে দিবে যা কখনো কখনো মানুষের প্রাণহানির কারণ হয় । এমন শত্রুর সাথে সন্ধি করে এমন পাগল ভবে কে আছে ? তাইতো মাঝে মাঝে ‘মশা মাড়তে কামান দাগা’র মত সাংঘাতিক আয়োজন করলেও অবাক হওয়ার কিছু থাকে না । অবশ্য কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে হাজার হাজার কামান-গোলা(মশা নিধক রাসয়নিক) দিয়েও যদি মশার কবল থেকে রক্ষা পাওয়া যেত ! অবস্থা দেখে যেন মনে হয়, ক্ষুদ্র মশার বিরুদ্ধে মানুষ যত প্রকার কৌশলই অবলম্বন করুক না কেন তাতে মশার কিছু যায় আসে না । বরং মশা আরও মারাত্মকভাবে মানুষের ওপর চড়াও হতে যেন সামষ্টিকভাবে সংকল্পবদ্ধ হয়েছে । চলতি বছরে গরমের মৌসুম শুরু হওয়ার সাথে সাথে মশার উৎপাতও এমন মারাত্মকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে যে দৃশ্য গত কয়েক দশকে দেশের মানুষ দেখেনি ।  
 
অতীতে মানুষের মুখে মুখে প্রচলিত ছিল, গরম কালে মশা আর মাছিই মানুষের প্রধান শত্রু । দিনে মাছি এবং রাতে মশা মানুষকে অতিষ্ঠ করে তুলত । তবে বৈশ্বিক জলবায়ুর মত করে মশা-মাছিও অভ্যাস পরিবর্তন করেছে । মাছির প্রকোপ কিছুটা কমে গেলেও মশার সংখ্যা ও জ্বালাতন দিনে দিনে বেড়েই চলছে । শুধু গরমের মওসুমেই নয় বরং শীতের মওসুমেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মশা মানুষকে মারাত্মকভাবে অতিষ্ঠ করে তুলে । আগে সাধারণত ‍দিনের বেলায় মশা জনসম্মূখে বের হত না বললেই চলে কিন্তু বর্তমানে মশা সে লজ্জাটুকুও ত্যাগ করেছে । এখন মশার কাছে দিন আর রাতের মধ্যে খুব বেশি পার্থক্য নাই । তবে দিন-রাতের মধ্যে সন্ধ্যার সময়টাই বোধহয় মশার কাছে খুব প্রিয় । তাইতো সন্ধ্যা ঘনাতেই মশার উৎপাত চরমভাবে বেড়ে যায় । মশার যন্ত্রনায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে শিক্ষার্থীরা । সন্ধ্যার পরে শিক্ষার্থীরা পাঠে মনযোগী হবে না মশা তাড়াতে ব্যস্ত হবে তা ঠিক করতেই রাতের একাংশ কেটে যায় । আমার কেন জানি মনে হয়, চিন থেকে মশা পুড়িয়ে মারার যন্ত্র(ব্যাট) আমদানি করার পর থেকেই মশা মানবকূলের বিরুদ্ধে অঘোষিত যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছে ! বাল্যকাল থেকে মশার এত সংখ্যাধিক্য কখনো দেখেছি বলে মনে হয়না । 
 
শহরের তুলনায় অবশ্য গ্রামের চিত্র কিছুটা ভিন্ন । পূর্বে শুনতাম, গ্রামে বনজঙ্গল ও জলাশয়ের সংখ্যা বেশি থাকায় এবং নোংরা পরিবেশের কারণে সেখানে মশার সংখ্যা অনেক বেশি । কিছুদিন আগে কয়েকটি গ্রামে যাওয়ার সুযোগ হওয়ায় পূর্ব ধারণার সাথে বর্তমান বাস্তবতা গড়মিল বেধেছে । ভ্রমিত সে গ্রামগুলোতে দিনে তো মশার উপস্থিতি টের পাওয়াই যায়নি এবং সন্ধ্যা-রাতে সামান্য সংখ্যক মশার উপস্থিতি ছিল । অথচ অগণণ মানুষের চেয়ে শহরে মশা আরও কোটি গুন বেশি । আধুনিক ও উন্নত জীবনের খোঁজে গ্রাম থেকে যেমন দলবেঁধে মানুষ স্থায়ীভাবে শহরে স্থানান্তর করেছে তেমনি বোধহয় গ্রাম্য মানুষের দুর্বল শরীরের রক্ত চুষতে মশারও আর ভালো না লাগায় সেগুলোও শহরমূখী হয়েছে ! মশার প্রজণন ক্ষমতা শুনলে অবাক হতে হয় । মশার আয়ু মাত্র কয়েক দিন কিংবা কয়েক সপ্তাহের । অথচ এই সামান্য সময়ে একটি স্ত্রী মশা দশ সহস্রাধিক মশার জন্ম দিতে সক্ষম এবং তাতে কার্পণ্যও করে না । সুতরাং মশা নিধনে যদি এখনি উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ গ্রহন করা না হয় তবে রাষ্ট্রের সর্বনাশ হয়ে যাবে ।
 
মানুষের শরীরে প্রায় ৩০০-৪০০ প্রকারের রাসয়নিক পদার্থের গন্ধ বিরাজমান । এর মধ্যে কিছু গন্ধ আছে যা মশা পছন্দ করে না । মশার অপছন্দ হলেও এ মানুষগুলো নিজেদেরকে সৌভাগ্যবান/বতী মনে করতে পারেন । কারণ মশার সাথে বাস করলেও তারা মশা দ্বারা কোন ক্ষতির শিকার হবে না । কিন্তু এদের সংখ্যা খুবই কম । সাধারণত প্রায় সকল মানুষের শরীরে যে রাসয়নিক পদার্থের গন্ধ থাকে তাই মশার প্রিয় । মশা উৎপাত ও কামড়ে শ্রবননেন্দ্রিয় ও ত্বকের মারাত্মক ক্ষতি হওয়া ছাড়াও জীবন ঝুঁকিও রয়েছে । পরিসংখ্যান বলছে, প্রতি বছর পৃথিবীতে শুধু মশার জন্য ৫০ কোটি মানুষ ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয় এবং তার মধ্যে ১০ লাখ লোক মারা যায় । তাছাড়া মশা ওয়েস্টনাইল ভাইরাস, ডেঙ্গু জ্বর, হলুদ জ্বরের মত ভয়াবহ রোগ ছড়ায় । মশার কামড়ের প্রভাবে বাংলাদেশে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ম্যালেরিয়া ও ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত বিশেষ করে শিশু রোগী চিকিৎসার জন্য চিকিৎসকের দ্বারস্থ হয় এবং অনেকে মারাও যায় । আমাদের দেশে মশার জন্য ম্যালেরিয়া, হলুদ জ্বর, ডেঙ্গু জ্বর, চিকুনগুনিয়া, ফিলারিয়াসিস, এনসিফিলাটিস, শাসনি এবং ডেবিলিটাটিং এর মত মারাত্মক রোগ ছড়ায় । এ সকল রোগে আক্রান্ত হয়ে সব বয়সের বিশেষ করে ছোট শিশু বেশি মারা যায় । 
 
‘মশা মারতে মারতে কামান দাগা’-এ প্রবাদটি সর্বজনশ্রুত । তবে সাবেক রাষ্ট্রপতি এইচ এম এরশাদের শাসনামলে শুধু কামান নয় বরং মশা নিধনে হেলিকপ্টপার পর‌্যন্ত ব্যবহার করা হয়েছিল । এরশাদ পতনের পর শুধু কামান ব্যবহার করা হত । তবে তার পরিসরও বোধহয় ধীরে ধীরে কমে এসেছে ।  পত্রিকায় প্রকাশিত তথ্য মতে, দেশে প্রায় ১৮ কোটি টাকার কামান আছে, যেগুলো দিয়ে মশা নিধক ওষুধ ছিটানো যায় । শুধু রাজধানীর দুটো সিটি কর্পোরেশনে প্রত্যেক মাসে গড়ে মশা নিধন বাবদ প্রায় ১ কোটি ৯৩ লাখ ১৫ টাকা খরচ করা হলেও সে অর্থে কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে বলে মনে হয়না । অন্তত মশার উপস্থিতি তাই বলে । দেশের বিভাগীয় শহরগুলোর অবস্থা আরও খারাপ । মশার উৎপাত দিন দিন বেড়েই চলছে তবে মশা নিধনে দৃশ্যমান তেমন আয়োজন নাই । 
 
সিটি কর্পোরেশনগুলোকে মশা নিধনে আরও তৎপর হতে হবে । মশার বিরুদ্ধে তাদের নিরবতা দেখে মনে হয়, মশা নিধক কয়েল, স্প্রেসহ অন্যান্য কোম্পানিকে বোধহয় তারা ব্যবসা করার সুযোগ দিচ্ছেন । তবে কয়েল, স্প্রেসহ অন্যান্য সরঞ্জামেও যদি মশার উৎপাত কমত তাতেও স্বান্তনা ছিল কিন্তু তাও যে হচ্ছে না । কয়েলের মনে কয়েল জ্বলে যায় কিন্তু মশা যেন কয়েলের ধোঁয়াতেই প্রাণ ফিরে পায় ! মশা নিধনে সিটি কর্পোরেশগুলোকে আরও জোরদার ভূমিকা পালন করতে হবে । প্রত্যেক সন্ধ্যায় অন্তত মশা নিধক রাসয়নিক দ্রব্য ছিটানোর ব্যবস্থা করতে হবে । শহরজুড়ে যে নোংরা জলাশয়গুলো এবং মশা উৎপন্ন হতে পারে এমন স্থান চিহ্নিত করে তা পরিস্কার পরিচ্ছন্ন করার ব্যবস্থা করতে হবে । নগরবাসীর স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য সর্বোচ্চ পদক্ষেপ গ্রহন করা জরুরী । বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের শিক্ষা কার‌্যক্রম অব্যাহত রাখা এবং ছোট্ট ছোট্ট শিশুদের জীবনের নিরাপত্তা দেওয়া রাষ্ট্রের ও স্থানীয় প্রশাসনের মৌলিক দায়িত্বের আওতাভূক্ত । অতি ক্ষুদ্র মশা মানুষকে নিয়ে খেলবে আর সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব ক্ষুদ্র মশার খেলার পুতুল হবে-এমটা কি মেনে নেয়া যায় ? অচিরেই দেশবাসীকে মশার ক্ষতিকর প্রভাব থেকে রক্ষা করার ব্যবস্থা করুণ । হরতাল-অবরোধের কারণে বাসা-বাড়ির বাইরে মানুষের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করতে না পারলেও অন্তত ঘরের মধ্যে নিরাপত্তটুকু নিশ্চিত করুণ । দেশের নাগরিকের পক্ষ থেকে এর চেয়ে ছোট চাওয়া আর কি কিছু হতে পারে ?
 
 
রাজু আহমেদ । কলামিষ্ট । 
facebook.com/raju69mathbari/ 

আরও সংবাদ