Widget by:Baiozid khan
  • Advertisement

হৃদয়ের নজরুল

Published:2015-08-27 09:09:46    
কাজী নজরুল ইসলাম (১৮৯৯–১৯৭৬)আমরা সেই মানুষটার কথা বলছি, আপাদমস্তক যিনি সৃজনশীল। যাঁরা এসেছেন তাঁর সংস্পর্শে, তাঁরাই অনুপ্রাণিত হয়েছেন। মানুষের মনে তিনি ঢুকিয়ে দিয়েছেন অদম্য আশার বাণী।
আমরা নজরুলের কথা বলছি। কাজী নজরুল ইসলাম। আমাদের জাতীয় কবি। আজ তাঁর ৩৯তম মৃত্যুবার্ষিকী। ১৯৭৬ সালের এই দিনে ঢাকার পিজি হাসপাতালে (বর্তমানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়) ৭৭ বছর বয়সে তিনি মারা যান। যে দিনটিতে তিনি চলে গিয়েছিলেন সেদিন খ্রিষ্টীয় ক্যালেন্ডারে তারিখটি ছিল ২৯ আগস্ট। কিন্তু বাংলাদেশে বাংলা পঞ্জিকার তারিখগুলো স্থির হয়ে যাওয়ার পর থেকে আমরা ২৭ আগস্টকেই তাঁর মৃত্যুদিন হিসেবে মানি।
তাঁরই প্রিয় চার শিল্পী কীভাবে তাঁদের প্রিয় ‘কাজীদা’কে পেয়েছিলেন, সে কথাই আজ স্মরণ করব তাঁর মৃত্যুদিনে।
গ্রামোফোন কোম্পানিতে কাজী নজরুল ইসলাম যোগ দিয়েছিলেন ওস্তাদ জমিরউদ্দিন খাঁর সহকারী হিসেবে। খাঁ সাহেবের মৃত্যুর পর পদোন্নতি পেয়ে নজরুল হেড কম্পোজার ও ট্রেনার হন। ফলে এই কোম্পানিতে গান তোলা ও রেকর্ড করাতে হলে নজরুলের কাছে যেতেই হতো।
ইন্দু বালা তাঁর ‘কাজীদা’র কাছে শেখা প্রথম যে দুটি গানের রেকর্ড করেছিলেন সেগুলো হলো ‘রুমু ঝুম রুমু ঝুম’ ও ‘চেয়ো না সুনয়না আর চেয়ো না এ নয়ন পানে’।
ইন্দু বালা কোনো দিন কাজী নজরুল ইসলামের মধ্যে কৃত্রিমতা দেখেননি। সবাইকে আপন করে নিতে পারতেন নজরুল। অফিসের সামনে একটা তেলেভাজার দোকান ছিল। নজরুল টাকা দিয়ে বলতেন, ‘যাও ইন্দু, তেলেভাজা নিয়ে এসো।’ তেলেভাজা খাওয়ার পর তিনি আবদার করে বলতেন, ‘ইন্দু, এবার পান দাও।’ নজরুল আর পানকে আলাদা করে দেখা যেত না।
একদিন রিহার্সেল রুমে কবি একা। ইন্দু বালা ঢুকতেই উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠলেন তিনি। বললেন, ‘ইন্দু, এসো, একটা নতুন গান লিখেছি, সুরও ঠিক করেছি, তুমিই নাও।’ যে গানটি নিয়ে উল্লাস করছিলেন নজরুল, সেটি হলো ‘অঞ্জলি লহ মোর সংগীতে’।
আঙ্গুরবালা দেবী নজরুলের প্রথম যে গানদুটি রেকর্ড করেছিলেন, তা হলো ‘ভুলি কেমনে আজো যে মনে’ ও ‘এত জল ও কাজল চোখে’। আঙ্গুরবালা দেবীর পর্যবেক্ষণ হলো, তাঁর কাজীদা গানের শব্দ-বিকৃতি একেবারেই সহ্য করতে পারতেন না। তিনি হয়তো লিখেছেন ‘বিন্ধিল’, যিনি গাইছেন তিনি হয়তো প্রমিত উচ্চারণ করলেন ‘বিঁধিল’-এটা পছন্দ করতেন না কবি।
কবির গান শেখানোর ধরন ছিল এ রকম: প্রথমে একটি গান দিলেন আঙ্গুরবালাকে, শুনলেন। গলায় সুর কীভাবে উঠছে দেখে প্রয়োজনমতো পরিবর্তন করলেন গানটির। অনেক সময় কথাও বদলাতেন। খুব ভালো গাইলে বলতেন, ‘তোমার কণ্ঠে আমার গান প্রাণ পেল।’ কখনো ঠাট্টা করে বলতেন, ‘আমি তো কাঠামোটা তুলে দিলাম। এবার তুমি আঙুরের রস মিশিয়ে মিষ্টি করো।’
১৯৭৪ সালে আঙ্গুরবালা দেবী ঢাকায় এসেছিলেন কবিকে দেখতে। খালি গায়ে কবি শুয়ে ছিলেন। তাঁর বুকের ওপর ছিল বিন্দু বিন্দু ঘাম। আঙ্গুরবালা পাউডারের প্রলেপ দিয়ে সেই ঘাম শুকিয়ে দিয়েছিলেন। গানও শুনিয়েছিলেন কবিকে।
১৯৭৪ সালে বাংলাদেশ টেলিভিশন থেকে আঙ্গুরবালা দেবীর গান প্রচার করা হয়েছিল। সে গানগুলোর মধ্যে ছিল ‘এত জল ও কাজল চোখে’ আর ‘যারে হাত দিয়ে মালা দিতে পারো নাই’। শেষোক্ত গানটি গেয়েই সবচেয়ে বেশি তৃপ্তি পেয়েছেন শিল্পী। নজরুলের সংগীত রচনা, পরিচালনায় ঋদ্ধ ধ্রুব চলচ্চিত্রের নারদ চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন নজরুল। আঙ্গুরবালা সে ছবিতে গান করেছেন। আর ধ্রুবর মা সুনীতির চরিত্রে অভিনয়ও করেছিলেন।
সে কালের প্রতিভাময়ী চলচ্চিত্র তারকা কানন দেবী নজরুলকে প্রথম দেখেন মেগাফোন কোম্পানির মহড়াকক্ষে। সেটা ১৯৩২ বা ৩৩ সাল। নজরুলের খ্যাতি তখন আকাশসম। কিন্তু এই প্রথম দেখা হলো তাঁদের। নজরুলের দিকে তাকাতে ভয় হচ্ছিল কানন দেবীর। বুক ধড়ফড় করছিল। মাথাভর্তি ঝাঁকড়া চুলের ভদ্রলোকটি চোখ বুজে হারমোনিয়াম বাজিয়ে সুর ভাঁজছিলেন। একসময় চোখ খুলে কাননকে সংকুচিত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে উচ্ছ্বসিত হয়ে কবি মেয়েটির গান, কণ্ঠ ও চেহারার প্রশংসা শুরু করলেন। কাননের মন থেকে কুণ্ঠা গেল কেটে।
কাননকে নজরুল বলেছিলেন, ‘ডাগর চোখে দেখছ কী মেয়ে? আমি হলাম ঘটক, তা জানো? এক দেশে সুর থাকে, অন্য দেশে কথা। এই দুই দেশের বর-কনেকে এক করতে হবে। কিন্তু দুটোর জাত পাত আলাদা হলেই বে-বন্তি। বুঝলে কিছু?’ তারপরই প্রাণখোলা হাসি।
নিউ থিয়েটার্সের বিদ্যাপতি চলচ্চিত্রে অভিনয় করে নায়িকা ও গায়িকা রূপে কানন দেবীর বৈপ্লবিক প্রতিষ্ঠা হয়। এই প্রতিষ্ঠার পেছনের মানুষটিও নজরুল। বিদ্যাপতির নায়িকা অনুরাধা চরিত্রটি কাহিনিতে যুক্ত করেছিলেন কাজী নজরুল ইসলাম। অনুরাধা দর্শকদের ভালোবাসা পেয়েছিল। সাপুড়ে ছবিতে যে সাতটি গান ছিল তার ছয়টিই লিখেছিলেন নজরুল। সেখানে কানন দেবী একক কণ্ঠে গেয়েছিলেন ‘আকাশে হেলান দিয়ে পাহাড় ঘুমায় ওই’ আর ‘(কথা) কইবে কথা কইবে না বৌ’।
ইন্দু বালা, আঙ্গুরবালা দেবী, কানন দেবী ফিরোজা বেগমফিরোজা বেগমের প্রথম নজরুলসংগীতের রেকর্ড ‘গগন গহনে সন্ধ্যাতারা’। ফিরোজা তখন নেহাত বালিকা, নজরুলের সুস্থ অবস্থার শেষদিক সেটি। যেদিন প্রথম নজরুল ফিরোজার গান শুনলেন তখন বললেন, ‘দেখেছ, মেয়েটা একেবারে রেকর্ডের মতো গায়!’ ফিরোজা রেকর্ড থেকেই শিখেছিলেন গান। গ্রামোফোন কোম্পানিতেই দেখা হয়েছিল তাঁদের। তখন নজরুলের নির্দেশে চিত্ত রায় একজন শিল্পীকে শেখাচ্ছিলেন ‘মমতাজ’, ‘নূরজাহান’, ‘একাদশীর চাঁদ’ গানগুলো। শিল্পীর চেয়ে আগেই ফিরোজা ধরে ফেলছিলেন গানগুলো। নজরুল তো অবাক! তখন ফিরোজার বয়স বারো। ফিরোজা তখনো জানতেন না ইনিই হলেন নজরুল।
নজরুলের ‘মোমের পুতুল’ ও ‘দূর দ্বীপবাসিনী’ ফিরোজা বেগমকে খ্যাতি এনে দেয়। সুস্থ নজরুলকে ফিরোজা বেগম পেয়েছিলেন আড়াই বছর। এরপর নজরুলসংগীতের প্রচার ও প্রসারে ব্যাপক অবদান রেখেছেন ফিরোজা বেগম।
সৃজনেই যাঁর সুখ, সেই নজরুল বিশ্বাস করতেন, ‘আমি চিরতরে দূরে সরে যাব, তবু আমারে দেব না ভুলিতে’।
না, নজরুলকে ভুলে যায়নি কেউ; তাঁর গান, কবিতা, প্রবন্ধ তাঁকে বাঁচিয়ে রেখেছে। তিনি চলে গেছেন, কিন্তু তাঁর সৃষ্টির মাধ্যমে রয়ে গেছেন কাছে।
(লেখাটি তৈরি করা হয়েছে কাজী নজরুল ইসলাম জন্মশতবর্ষ স্মারকগ্রন্থ ও কাজী নজরুল ইসলামবিষয়ক সাক্ষাৎকার অবলম্বনে)
 
কর্মসূচি: জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে বিভিন্ন সংগঠন কর্মসূচি নিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে কবির সমাধিতে শ্রদ্ধা নিবেদন, ফাতেহা পাঠ, আবৃত্তি ও আলোচনা সভা।
নজরুল ইনস্টিটিউটের পক্ষ থেকে সকাল সাতটায় কবির সমাধিতে শ্রদ্ধা জানানো হবে। বিকেল চারটায় নজরুল ইনস্টিটিউট শিল্পকলা একাডেমীর জাতীয় নাট্যশালা মিলনায়তনে আয়োজন করেছে আলোচনা সভা, নজরুল পুরস্কার প্রদান ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যোগে কোরআনখানির আয়োজন করা হয়েছে বাদ ফজর বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদে। সকাল সাতটায় অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে জমায়েত, সেখান থেকে শোভাযাত্রা নিয়ে কবির কবরে শ্রদ্ধা নিবেদন ও ফাতেহা পাঠ।
সকালে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির পক্ষ থেকে প্রতিনিধিদল আলাদাভাবে কবির কবরে শ্রদ্ধা জানাবে। বিশ্ব বাঙালি সম্মেলন ও বিশ্ব কবিতা কংগ্রেস শ্রদ্ধা নিবেদনের পাশাপাশি আলোচনা সভার আয়োজন করেছে। তিন দিনের কর্মসূচি পালন করছে বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি।

আরও সংবাদ