Widget by:Baiozid khan
শিরোনাম:

ঢাকা Mon June 18 2018 ,

দেওয়ান আজরফ : এক অনন্য দার্শনিক সাহিত্যিক

Published:2015-10-29 19:12:33    

দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ (১৯০৬-১৯৯৯) বহুপ্রজ সৃষ্টিশীল, বহুমুখীন কর্মকুশলী, দার্শনিক এক প্রবাদতুল্য প্রতিভার নাম। এমন বর্ণাঢ্য ও কর্মময় তিরানব্বই বছরের সাফল্যের কাহিনী ভরা এক অনবদ্য জীবনালেখ্য আমাদের উপমহাদেশে বিরল। তিনি একাধারে দার্শনিক, শিক্ষাবিদ, ইকবাল সাহিত্য বিশেষজ্ঞ, সাহিত্য গবেষক, ইতিহাসবেত্তা, ভাষা আন্দোলনের অন্যতম নেতা, কথাসাহিত্যিক, কবি, সুবক্তা, রাজনীতিক প্রভৃতি। এমন বিশাল প্রতিভাকে আস্বাদন করা, তার সম্পর্কে সহসা কিছু বলা এক কঠিন বিষয়। একধরনের স্পর্ধাও বটে! এ কারণে এমন ধাঁচের প্রতিভাধর ব্যক্তিরা আমাদের কালে খানিকটা অনালোচিত ও উপেক্ষিত। তা ছাড়া চলিষ্ণু গতিধারা হচ্ছে- যারা জীবদ্দশায় (মৃত্যুর পর যা প্রাপ্য) তার নগদ ব্যবস্থা না করেন, তাদের মৃত্যুর পর প্রটোকলহীন জীবনের কী-ই বা দাম থাকে? কে-ই বা দাম দিতে উদার হন?


তাই, আজকাল দেখা যায় জীবদ্দশায় নিজের ঢাক নিজেই বাজাতে যতটুকু সম্ভব কসরৎ করতে। শুনেছি- পাকিস্তানের সীমান্ত প্রদেশের এক অঞ্চলে মৃত্যুর আগেই ধনী লোকেরা জিয়াফতখানার ব্যবস্থা করেন। কারণ মৃত্যুর পর সন্তান-সন্ততি সম্পদ ব্যয় করে যদি তা না করে। এ শুনেছি- কোনো এক দেশে (আফ্রিকা মহাদেশের) মৃত্যুর পর শোক প্রকাশকে গভীরতর করার জন্য রোদনের জন্য পাড়া-পড়শীদের ভাড়া করে আনে। কারণ মৃত্যুর পর নাকি শোক প্রকাশের স্বাভাবিক ধারাটি বজায় রাখতে অন্যের সাহায্য যেখানে একান্ত প্রয়োজন, সেখানে বিনা প্রাপ্তিতে কে-ই বা এমন কাজে সময় দিতে যাবে!


উপরিউক্ত প্রসঙ্গের অবতারণা করলাম এ জন্য আমাদের একজন মনীষী, জ্ঞানতাপস ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ অনেক আগেই এমন এক মন্তব্য করেছেন- ‘যে জাতি গুণীর কদর করে না। সে দেশে গুণী জন্মে না।’ আমাদের চলমান জীবনে হালে এমন ধারাটি স্পষ্টতর হচ্ছে। সে কারণেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১-১৯৪১) বুঝে তার বাবা মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের (১৮১৭-১৯০৫) জীবদ্দশায় শান্তিনিকেতনকে বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপ দেয়ার কাজটি পাকা করেন।

তা ছাড়া বাবা দেবেন্দ্রনাথ তার এই প্রতিভাধর ত্রয়োদশতম ছেলেকে একটু বিশেষ নজরে দেখতেন বলেই রবীন্দ্রনাথকে জমিদারির ঝুটঝামেলার কাজ কর্ম থেকে অব্যাহতি শুধু দেননি। ছেলের ইচ্ছেকে প্রাধান্য দিয়ে রবীন্দ্র-সাহিত্যচর্চা এবং গবেষণা অব্যাহত রাখার উদ্দেশ্যে আরো দু’টি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য বিশালসম্পত্তি দান করে যান। কিন্তু সবাই রবীন্দ্রনাথের মতো ভাগ্য নিয়ে ধরাধামে জন্ম নেয় না, সবার দেবেন্দ্রনাথের মতো ‘মহর্ষি’ বাবা ভাগ্য হয় না।


অবশ্য বক্ষ্যমান আলোচ্য ব্যক্তি দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ জমিদার পরিবারে জন্ম নেন। বিখ্যাত মরমি কবি ও সঙ্গীত সাধক হাসন রাজার (১৮৫৪-১৯২২) তিনি দৌহিত্র। হাসন রাজার জ্যেষ্ঠ মেয়ে রওশন হুসন বানু ছিলেন আজরফের গর্ভধারণী মা। এ ছাড়া পিতৃকূলও ছিল জমিদারজাত উত্তরাধিকারী। বাবা দেওয়ান মোহাম্মদ আসফ চৌধুরী ছিলেন উঁচু বংশীয়, শিক্ষিত ব্যক্তি, দুহালিয়ার জমিদার ও পরে জাতীয়তাবাদী নেতা, সিলেট জেলা কংগ্রেস এবং খিলাফত কমিটির নির্বাচিত সভাপতি।
‘আজরফ’ শব্দের অর্থ ‘মহাজ্ঞানী’- তিনি তার নামের অর্থকে পরিপূর্ণ সার্থক ও সপ্রমাণ করতে শুধু জমিদারি প্রথার বাইরে বিচরণ করবেন না।

সারা জীবন জ্ঞান চর্চার মধ্যে নিজেকে এমনভাবে নিয়োজিত রাখলেন, শেষ জীবনে তিনি ছেলে আবু সাঈদ জুবেরীর ভাড়া বাড়িতে বড় দীনহীন হালে ইহজীবন ত্যাগ করলেন। এ ব্যাপারে তার কোনো আক্ষেপ ছিল না। বরং এমন বিষয়ে কেউ প্রশ্ন করলে স্বভাবসুলভ শিশুর হাসিতে বলতেন- আমার নানাজী হাসন রাজা বলিয়া গেছেন- ‘কি ঘর বানাইমু আমি শূন্যের মাঝার...।’
তার সাহিত্য গ্রন্থের দিকে যদি আমরা দৃষ্টি দিই এবং তার সাহিত্যে রসবোধ সম্পর্কে বিশ্লেষণ করি তবে তিনি একজন পুরোপুরি সৃষ্টিশীল জীবন শিল্পী ও সাহিত্য গবেষক এতে কোনো সন্দেহ নেই। তার ভাষায়-


‘আমি গল্প লিখেছি ১০৭টির অধিক। দর্শনগ্রন্থ, গল্প গ্রন্থ, উপন্যাস, নাটক এবং প্রবন্ধ ও আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থের সংখ্যা প্রায় শ’-এর কাছাকাছি। প্রকাশিত গ্রন্থ ৪০টি। সম্পাদনামূলক ও ভূমিকা লিখিত গ্রন্থের সংখ্যাও অনেক। তবে বাংলা ও ইংরেজিতে রচিত প্রবন্ধের সংখ্যা প্রায় সহস্রাধিক।’ কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যি দেওয়ান আজরফের দাবি অনুযায়ী তার ওপর প্রণীত গ্রন্থ মো: রফিকুল ইসলাম-এর ‘দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ’ এবং আল্লামা ইকবাল সংসদ পত্রিকা’ এর ‘জাতীয় অধ্যাপক দার্শনিক দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ সংখ্যা জুলাই-ডিসেম্বর ২০০০’ সংখ্যায় কোনো গ্রন্থ তালিকা পাওয়া যায়নি।


দেওয়ান আজরফকে দার্শনিক বলা হয়, যদিও দর্শনের ওপর লিখিত গ্রন্থের সংখ্যা মাত্র চারটির খোঁজ পাওয়া যায়। এগুলো হলো- ১ ফিলোসফি অব হিস্ট্রি (১৯৮২), ২. ধর্ম ও দর্শন (১৯৮৬), ৩. দর্শনের নানা প্রসঙ্গ (১৯৭৭) ও ৪. জীবনদর্শনের পুনর্গঠন। এ প্রসঙ্গে কথাসাহিত্যিক ও ভাষাসৈনিক অধ্যাপক শাহেদ আলী যথার্থ মন্তব্য করেছেন-
‘দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ দার্শনিক ও শিক্ষাব্রতী ছিলেন কিন্তু তার রচনায় দর্শনের ছিটেফোঁটাই কেবল আছে। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত মোটামুটি একজন সৃজনশীল রস স্রষ্টার পরিচয়ই গ্রন্থে ফুটে উঠেছে।’


(আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ ‘সোনাঝরা দিনগুলি’ গ্রন্থের ভূমিকা)।
তবে এ মন্তব্যের মাধ্যমে আজরফের দার্শনিকত্বকে খাটো কিংবা নাকচ করে দিতে পারি না। নিঃসন্দেহে তিনি একজন বড় মাপের সৃজনশীল লেখক ছিলেন, পাশাপাশি দর্শন সম্পর্কে তার অংশগ্রহণগ্রন্থসমূহ প্রভৃতি পর্যালোচনা করে তার একটি স্বতন্ত্র দার্শনিক তত্ত্বও খুঁজে পাবো। সেটি সম্ভবত কালের ঝড়ো বাতাসে চাপা পড়ে গেছে খানিকটা। তিনি গ্রিসের দার্শনিক মতবাদের সাথে ধর্মের সম্পর্ক সৃষ্টি করতে চেয়েছেন এবং জোরের সাথেই বলেছেন দর্শনের ছাত্র মাত্রই নাস্তিকতা তা তিনি বিশ্বাস করেন না।


তার জীবনজুড়ে শিক্ষাবিদ হিসেবে সফলতার ইতিহাসটি অনেক বিশাল। শিক্ষক হিসেবে দীর্ঘ দিন বিভিন্ন কলেজে অধ্যাপনার সাথে যুক্ত থাকা, সর্বোচ্চ পদ অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন তার ব্যক্তিত্ব ও পরিচিতিকে খণ্ডিত করেছে। বিশেষ করে তিনি ঢাকায় সাহাবি হজরত আবুজর গিফারী (রা)-এর নামে প্রতিষ্ঠিত ‘আবুজর গিফারী কলেজ’-এর প্রতিষ্ঠাতা প্রিন্সিপাল হিসেবে ১৯৬৭-১৯৮০ সাল একটানা ১৩ বছর নিষ্ঠার সাথে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ১৯৭৩ সাল থেকে ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দর্শন, পরে ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের খণ্ডকালীন অধ্যাপনার দায়িত্ব পালন করেন।

এসব শিক্ষাবিষয়ক গুরু দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে সাহিত্য চর্চায় তার খানিকটা ব্যাঘাত ঘটে এবং বাইরের অনেক কার্যক্রম থেকে নিজেকে গুটিয়ে রাখতে বাধ্য হন। এ ছাড়া ভাষা আন্দোলনের মতো আমাদের জাতীয় ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ পর্বে তিনি ‘তমুদ্দুন মজলিসের’ (নেতৃত্ব দানকারী সংগঠন) সভাপতি হিসেবে অতি গুরু দায়িত্ব পালন করেন। কিন্তু ১৯৭১-এর পর এমন ধারার ব্যক্তিত্বদের জাতীয় কর্মকাণ্ডও ইতিহাসের পাতা থেকে আড়াল করার এক নেতিবাচক প্রয়াসের দরুন আমরা পরবর্তী প্রজন্ম চিনতে পারিনি এদের, জানতে পারিনি উজ্জ্বল ইতিহাস।


আগেই বলেছি, আজরফের গ্রন্থ দুষ্প্রাপ্য। তার মৃত্যুর পর প্রকাশিত-অপ্রকাশিত গ্রন্থ প্রকাশের উদ্যোগ এ যাবৎকাল কেউ গ্রহণ করেনি। অনুসন্ধিৎসু পাঠক গবেষকের পক্ষেও চট করে তথ্য-উপাত্ত জোগাড় করে তাকে মূল্যায়ন করা কঠিন ব্যাপার। এর ফলে আজরফ সম্পর্কে অনেক অবিমিশ্র ধারণা সুধী মহলে রয়েছে। 
আজরফের জীবন ছিল এক মহীরুহসম। তাকে নিয়ে কিছু লিখতে যাওয়া এক নেহায়েৎ বিড়ম্বনা ছাড়া কিছু নয়। তা ছাড়া সৃষ্টিকর্ম পাওয়া না যাওয়ায় অন্ধের হাতী দর্শনের মতো পরিস্থিতিতে পড়তে হয়। এত সাফল্য তিনি অর্জন করলেও তার নিজের মনে অপূর্ণতার খেদ ছিলই- তাঁর ভাষায় :


‘কিন্তু যে স্বপ্নটি পূরণ হয়নি তা হচ্ছে পিএইচডি করা’। দেওয়ান আজরফ ড. গোবিন্দ চন্দ্র দেবের অধীন ‘এসিস টু রিয়েলেটি নামে একটি গবেষণা সন্দর্ভ সম্পন্ন করেন। কিন্তু ১৯৭১-এ জিসি দেবের মর্মান্তিক মৃত্যুতে তার ডিগ্র্রিটি পাওয়া হয়নি। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগ থেকে তার সন্দর্ভটিকে মূল্যায়ন করা হয়নি। প্রকৃতপক্ষে আজরফের এ দুঃখ থাকার কথা নয়। তিনি যে জ্ঞানের বিশাল জমি কর্ষণ করেছেন তার ওপর যদি আমরা বিচরণ করতে পারি তবে তার একটির স্থলে কয়েকটি ডিগ্রি দেয়া সম্ভব। কিন্তু সে রকম শুভ বুদ্ধির উদয় হবে কি আমাদের?


দেওয়ান আজরফ জাতীয় অধ্যাপকে ভূষিত হয়েছিলেন। ইসলামিক ফাউন্ডেশনে তার একটি সম্মানজনক চেয়ার ছিল। কিন্তু আজ তাকে নিয়ে তেমন কোনো আলোচনা নেই। এতে আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি। আমাদের সমৃদ্ধ ঐতিহ্য-ইতিহাস জানতে পারছি না। এতে বর্তমান প্রজন্ম হীন্মন্যতায় ভুগছে। ভাবছে আমাদের গর্বের কিছু নেই। যা আছে পর দেশের। পর দেশকে ভালোবাসতে আগ্রহী হচ্ছে। পর দেশকে আপন ভাবছে। পাড়ি দিচ্ছে নতুন নতুন স্বপ্ন নিয়ে ভিন দেশে। দিনে দিনে পরনির্ভরশীল জাতিতে পরিণত হচ্ছি। যে জাতি তার অতীত গৌরব পরবর্তী প্রজন্মকে জানায় না। সে জাতি মুখাপেক্ষী হতে বাধ্য।


তাই আজরফকে পাঠ করতে হবে। তার গ্রন্থসমূহ প্রকাশের ব্যবস্থা করতে হবে। তিনি ছিলেন সার্বজনীন চিন্তার কীর্তিমান পুরুষ। এমন প্রতিভাধর ব্যক্তিরাই জাতির অহমিকা হতে পারেন। 

আরও সংবাদ