Widget by:Baiozid khan
  • Advertisement

নেত্রকোনার অজ্ঞাত রোগে ৫ জনের মৃত্যু, আক্রান্ত অনেকে

Published:2016-01-16 13:23:52    
নেত্রকোনার সীমান্তবর্তী কলমাকান্দা উপজেলার কৈলাটী ইউনিয়নের জামসেন গ্রামে অজ্ঞাত রোগে আক্রান্ত হয়ে একই পরিবারের দুই ভাই-বোনসহ পাঁচজন মারা গেছে। ওই রোগে শিশুসহ অন্তত আরো ৩০-৩৫ জন আক্রান্ত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
 
অজ্ঞাত রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃতরা হলেন- আবুল হাসেমের মেয়ে জান্নাত কলি (৯), ফৌজদার মিয়ার দুই সন্তান রবিকুল (৪) ও মাসুদা (১৩), সমেদ আলীর ছেলে ফজলু (৪৮) ও রবন খাঁ (৭৫)।
 
এদিকে ওই রোগে মৃত্যু বরণকারী রবণ খাঁর ছেলে নূর ইসলাম (৮), নয়ন মিয়ার সন্তান সাগর (৮) ও জাকিয়া (২) এবং তাদের মা হলুদা আক্তার (৩০), আবু তাহেরের মেয়ে হীরা মনি (৬), তার বোন নীলা মনি (৪), কালাম মিয়ার সন্তান শরীফ মিয়া (৬), মুক্তা আক্তার (৮), রেখা আক্তার (২১), রুখসানা (১০) এবং মৃত্যুবরণকারী কলির ভাই অলিসহ (৭) আরো অনেকে আক্রান্ত হয়ে অসহ্য যন্ত্রনায় কাতরাচ্ছেন।
 
শুক্রবার রাতে এই প্রতিবেদক কলমাকান্দা সীমান্তের জামসেন গ্রামে সরেজমিনে গিয়ে দেখতে পান, অজ্ঞাত রোগে মৃত ব্যক্তিদের ঘরে কান্নার রোল। আক্রান্ত রোগীদের স্বজন ও পাড়া পড়শিদের মাঝে এক ভয়ঙ্কর উদ্বেগ- উৎকন্ঠা বিরাজ করছে।
 
অজ্ঞাত রোগে ৯ বছর বয়সী কন্যা হারানো মনুজা বেগম (৪০) বুক চাপড়িয়ে বলেন, ‘গুটি বসন্তের মতো সারা শরীর মাইয়াডার গা ভইরা যায়। জ্বর, ব্যাথায় অস্থির হইয়া পড়ে। উপায় না দেইখ্যা কবিরাজ দিয়া ঝাড় ফুঁ দেওয়াই, কিন্ত কিছুতেই কিছু না হওয়ায় গত বিষ্যুদবার নেত্রকোনা শহরে নিয়া ডাঃ আনিছুর রহমানের চিকিৎসা নেওয়াই। কিন্তু সন্ধ্যায় মাইয়াডা আমার মইরা গেল। পোলা অলিডাও ওই রোগে আক্রান্ত হইয়া চিৎকার করতাছে।’
 
এর আগে একই বাড়ির ফৌজদার মিয়ার দুই ছেলে-মেয়ে পাঁচদিনের মাথায় মারা যায়। ২০-২৫ দিন আগে রবন খাঁ ও ফজলু মিয়া ওই রোগে আক্রান্ত হয়ে বিনা চিকিৎসায় মারা যান। অথচ ওই গ্রামে আক্রান্ত রোগীদের বাড়ির পাশে জামসেন কমিউনিটি ক্লিনিকে জুয়েল, সুজন নামে দুইজন ডাক্তার ও স্বাস্থ্যকর্মী থাকা সত্ত্বেও তারা কোনো খোঁজ-খবর, পরামর্শ বা চিকিৎসার বিষয়ে এগিয়ে আসেননি বলে গ্রামবাসী অভিযোগ করেন।
 
গ্রামবাসী আরো অভিযোগ করেন- প্রায় মাসাধিককাল ধরে ওই অজ্ঞাত রোগে আক্রান্ত হয়ে লোকজনের মৃত্য হলেও এ বিষয়ে স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা কোনো ধরনের খোঁজ-খবরই রাখেননি। তাদের নির্বিকার ভূমিকায় ওই রোগটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। অজ্ঞাত ওই রোগটি গুটি বসন্ত আবার কেউ জলবসন্ত বলে ধারণা করলেও ডাক্তাররা তা স্বীকার করেননি। তবে ওই রোগের নাম তারাও বলতে পারছেন না।
 
যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন, বিদ্যুৎহীন, শিক্ষাবঞ্চিত জামসেন গ্রামের সাধারণ লোকদের মাঝে আতঙ্ক এখন গভীর থেকে গভীরতর হচ্ছে। ভয় ও আতঙ্কে গ্রাম ছেড়ে অনেকে অন্যত্র চলে যাচ্ছেন।
 
গত বৃহস্প্রতিবার সন্ধ্যায় শিশু জান্নাত কলির মৃত্যুর সংবাদ সাংবাদিকদের কাছে পৌঁছার পর স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তাদের ঘুম ভাঙতে শুরু করে। শুক্রবার সিভিল সার্জনসহ অনেকে ছুটে যান অজ্ঞাত রোগে আক্রান্ত জামসেন গ্রামে। গ্রামবাসী ওই রোগটিকে গুটি বসন্ত বললেও স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা রোগটি চিহ্নিত করতে হিমশিম খাচ্ছেন। তারা ঢাকায় বিশেষজ্ঞদের কাছে জানার চেষ্টা করছেন গুটি বসন্তের মতো হলেও আসলে এটি কোন ধরনের রোগ।
 
শুক্রবার সন্ধ্যায় জামসেন গ্রামের ওই রোগে আক্রান্ত মোঃ লাল মিয়া (৬৫) বলেন, ‘গুটি বসন্তের মতো সারা শরীর গুটি গুটি হইয়া জ্বর ও প্রচণ্ড ব্যাথা শুরু হয়। আক্রান্ত কারো কারো আবার ডায়রিয়াও হইছে। এর মধ্যে পাঁচজনতো মইরাই গেল। শহরে গিয়ে চিকিৎসা করাইবার মতন ট্যাহা-পয়সা আমরার নাই, তাই ফকির ও কবিরাজের ঝাড়- ফুক নিতাছি। আজকে ডাক্তারা আইয়া দেহি দৌঁড়াদৌঁড়ি করছে। কিন্তু কোনো সমাধান দিয়া যাই নাই।’
 
উদ্বিগ্ন আবুল হাসেম বলেন, ‘মেয়েকে হারিয়েছি, ছেলেও আক্রান্ত। কী করবো কোথায় চিকিৎসা করাবো কিছুই বুঝতে পারতাছিনা।’
 
নেত্রকোনা সিভিল সার্জন ডাঃ বিজন কান্তি সরকার অজ্ঞাত রোগের সত্যতা স্বীকার করে বলেন, ‘রোগটি নির্নয় করা সম্ভব হয়নি। ভাইরাস জাতীয় ওই রোগে আক্রান্ত হয়ে ব্রেইন ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে মৃত্যু হচ্ছে বলে ধারনা করা হচ্ছে। রোগটি সনাক্ত করার জন্য নমুনা সংগ্রহ করে ঢাকায় আই.ই.ডি.সি.আর-এ পাঠানো হয়েছে। রোগটি শনাক্ত করা গেলে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেয়া সম্ভব হবে।’