Widget by:Baiozid khan
  • Advertisement

ইসলামী ব্যাংকের টাকায় ঢাবিতে পুনর্মিলনী, সমালোচনার ঝড়

Published:2016-01-24 16:51:58    
  
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থীদের মিলনমেলায় জামায়াত সংশ্লিষ্ট হিসেবে পরিচিত ইসলামী ব্যাংকের পৃষ্ঠপোষকতা নিয়ে ফেইসবুকে সমালোচনার ঝড় বইছে।
শনিবার ‘হিরন্ময় অ্যালামনাই মেলববন্ধন’ নামের ওই অনুষ্ঠানের পৃষ্ঠপোষক হিসেবে ইসলামী ব্যাংকের সঙ্গে ছিল শাহকো ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড ও ন্যাশনাল ব্যাংক লিমিটেড।
 
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক ছাড়াও পর্যটন মন্ত্রী রাশেদ খান মেনন, সাবেক মন্ত্রী দিলীপ বড়ুয়া, পুলিশের আইজি, র্যাববের ডিজিসহ অনেক গণ্যমান্য ব্যক্তি উপস্থিত ছিলেন অনুষ্ঠানে।
 
গত ডিসেম্বরে শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবসে পাকিস্তানের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্পর্ক ছিন্ন করার সিদ্ধান্তের পর এক মাস না যেতেই অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের উৎসবে ইসলামী ব্যাংকের টাকা নেওয়ার এই ঘটনা ঘটল।
 
মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতায় ব্যাপক মানবতাবিরোধী অপরাধের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে জামায়াত নেতাদের অংশগ্রহণের কারণে এই সংগঠনটিকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ‘ক্রিমিনাল দল’ বলেছে এক রায়ে। আর জামায়াত সংশ্লিষ্ট বা ওই মতাদর্শের লোকজনই বরাবর ইসলামী ব্যাংক পরিচালনা করে এসেছেন।
 
ইসলামী ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান আবু নাসের মোহাম্মদ আব্দুজ জাহের মুক্তিযুদ্ধের সময় চট্টগ্রাম এলাকায় আল বদর বাহিনীর নেতা ছিলেন বলে ইসলামী ঐক্যজোট নেতাদের দাবি।  যুদ্ধাপরাধের দায়ে ট্রাইব্যুনালে মৃত্যুদণ্ডাদেশ পাওয়া মীর কাসেম আলীও ইসলামী ব্যাংকের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান।
 
সেই ব্যাংকের টাকা নিয়ে আয়োজিত ‘হিরন্ময় অ্যালামনাই মেলবন্ধন’ অনুষ্ঠানের একটি লোগো নিজের ফেইসবুক পাতায় শেয়ার করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী গণজাগরণ মঞ্চের সংগঠক মারুফ রসুল। লোগোতে পৃষ্ঠপোষক হিসেবে ইসলামী ব্যাংকের নাম রয়েছে ওপরের দিকে।
মারুফ তার স্ট্যাটাসে লিখেছেন, “ঢাকা ইউনিভার্সিটি অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন যুদ্ধাপরাধীদের ইসলামী ব্যাংক ছাড়া আর কোনো ব্যাংক পেল না?
 
“আদর্শের পক্ষে আমাদের অবস্থানটি স্বচ্ছ হয় না বলেই রাজাকারদের আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে এতো দোটানায় ভুগতে হয়। ইসলামী ব্যাংকের লোগো সম্বলিত এমন আদর্শচ্যুত হিরণ্ময় মেলবন্ধনে আনন্দের চেয়ে অপমান আর বিষাদের অংশই বেশি।”
 
রিয়াজুল আলম ভূঁইয়া নামের আরেক শিক্ষার্থী লিখেছেন, “ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পাকিস্তানের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে, আর এর অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন ইসলামী ব্যাংকের টাকা নেয়। প্রগতির তীর্থভূমির এ কী অদ্ভুত দ্বিচারিতা!”
 
‘যুক্তি দিয়ে ব্যাংকটি দমিয়ে রাখা যাবে কি-না’ ধীমান রায়ের এমন প্রশ্নের জবাবে রিয়াজুল বলেছেন, “ইসলামী ব্যাংক যে যুদ্ধাপরাধী সংগঠন জামাতের তা নিশ্চয়ই জানেন। এই ব্যাংকের মাধ্যমে জঙ্গি অর্থায়ন হয়, দেশে অস্থিতিশীলতা তৈরি করা হয়, তাও জানেন।
“এই ব্যাংকটি রাষ্ট্রায়ত্ত না করে সরকারি বিভিন্ন অনুষ্ঠানে, এমনকি স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানে এর অর্থ নেয়া হয়েছে। তাতে এটি একরকম বৈধতা পায়- এর জঙ্গিবাদী কার্যক্রম নির্বিঘ্নে চালানোর।”
 
রিয়াজুল লিখেছেন, “ইসলামী ব্যাংক এখন উদারহস্ত হয়ে বসে আছে বিভিন্ন জায়গায় স্পন্সর হতে। বিশেষ করে সরকারি অনুষ্ঠান, আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যালামনাইদের স্পন্সর হওয়াটা এর যাবতীয় অনৈতিক অবৈধ কাজের বৈধতা পেতে সাহায্য করে।”
 
ওই অনুষ্ঠানে থাকা এক সাংবাদিক শনিবার রাতে তার ফেইসবুক পাতায় বলেছেন, “আজ সারাদিনে স্টেজের দিকে তাকালে এই একটা জিনিসই মন খারাপ করে দিয়েছে, লজ্জা দিয়েছে।
 
“হিরন্ময় মেলবন্ধন লেখার ঠিক নিচেই আশেপাশের সব লেখার চেয়ে বড় করে লেখা ‘ইসলামী ব্যাংক’। আর তার নিচে মলিন করে প্রায় অস্পষ্ট অক্ষরে লেখা ‘বাংলাদেশ লিমিটেড’......! বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসের সব গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের জন্মস্থান এই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলাদেশকে এমন ‘লিমিটেড’ না বানালে কি খুব ক্ষতি হতো?”
 
ওই পোস্টে এক মন্তব্যের জবাবে সেই সাংবাদিক লিখেছেন, ওই অনুষ্ঠানে কৃতজ্ঞতা স্বীকারের সময় যতোগুলো ব্যাংক ও প্রতিষ্ঠানের নাম ‘স্পন্সর’ হিসেবে বলা হয়েছে, তার মধ্যে বাংলাদেশের ‘বেশিরভাগ’ ব্যাংকেরই নাম চলে এসেছে।
“টাকাও নেহায়েত কম দেয়নি নিশ্চয়ই! তাহলে এত টাকা পেয়েও ইসলামী ব্যাংককে এতো গুরুত্ব দিল কে,  কোন উদ্দেশ্যে?”
 
সঞ্জীবন সুদীপ নামে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী তার ফেইসবুক পাতায় লিখেছেন, “ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন ইসলামী ব্যাংকের কাছ থেকে টাকা নিয়ে পুনর্মিলনী করেছে। আমার মনে হয় টাকাপয়সার খুবই টানাটানিতে উনারা এই কাজ করেছেন। অথচ আমাকে বললেই আমি কয়টি খুচরো টাকা দিয়ে সাহায্য করতাম। আমি গরীব হলেও দানশীল।”
 
গণজাগরণ মঞ্চের একটি তালিকায় যুদ্ধাপরাধীদের প্রতিষ্ঠান হিসাবে শীর্ষে থাকা এই ব্যাংকটি থেকে টাকা নিয়ে এর আগে সরকারও বেশ কয়েকবার সমালোচনার মুখে পড়েছে।
 
২০১৪ সালে ‘লাখো কণ্ঠে সোনার বাংলা’ আয়োজনে ইসলামী ব্যাংক তিন কোটি টাকা দিলেও তীব্র সমালোচনার মুখে তা না নেওয়ার সিদ্ধান্ত জানায় সরকার।
 
তবে অনুষ্ঠানের দিন ইসলামী ব্যাংকেরই সহযোগী প্রতিষ্ঠান ইবনে সিনা ফার্মাসিউটিক্যাল লিমিটেডের ওষুধ পাওয়া যায় খাবারের প্যাকেটে। এ নিয়েও সমালোচনা হয়।
এছাড়া ২০১১ সালে বিশ্বকাপ ক্রিকেট আয়োজনে ব্যাংকটির কাছ থেকে টাকা নেওয়া এবং পদ্মাসেতু নির্মাণে হাজার কোটি টাকা চেয়ে সমালোচনার মুখে পড়েছিল সরকার। দুই ঘটনাতেই পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল টাকা নেওয়ার পক্ষে সাফাই গেয়েছেন। 
 
জঙ্গি অর্থায়নের অভিযোগ ওঠায় ২০১৪ সালে এইচএসবিসি যুক্তরাজ্য, সিটি ব্যাংক এনএ, ব্যাংক অব আমেরিকা ইসলামী ব্যাংকের সঙ্গে লেনদেন বন্ধ করে দেয়। যুক্তরাষ্ট্রের সিনেট কমিটির এক প্রতিবেদনেও ইসলামী ব্যাংকের মাধ্যমে মুদ্রা পাচার ও সন্ত্রাসে অর্থায়নের অভিযোগ আসে।
 
কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলছে, এই ব্যাংকে এমন কিছু হিসাবধারী পাওয়া গিয়েছিল, যাদের নাম ছিল জাতিসংঘের সন্দেহের তালিকায়। এসব হিসাবের তথ্য বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে ‘গোপন’ করেছিল ইসলামী ব্যাংক কর্তৃপক্ষ।

আরও সংবাদ