Widget by:Baiozid khan
  • Advertisement

প্রথম মৃত্যুবার্ষিকীতে শহীদ কামারুজ্জামানকে নিয়ে তার স্ত্রীর চিঠি

Published:2016-04-11 16:59:34    
যারা শহীদ তারা অমর, শহীদরা মৃত নন। পবিত্র কুরআনে তাদের মৃত বলতে নিষেধ করা হয়েছে। তারা আল্লাহ থেকে রিজিকপ্রাপ্ত। তারা আল্লাহর মেহমান। নবীজি (সা.) বলেছেন- আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে কতক এমনও আছে যারা নবীও নন শহীদও নন তথাপি তারা আল্লাহর কাছে এত উচ্চ মর্যাদা লাভ করবে যা দেখে নবীগণ ও শহীদগণ পর্যন্ত তাদের প্রতি ঈর্ষাবোধ করবেন। লোকেরা জানতে চেয়েছেন তারা কারা? নবীজি বলেছেন, তারা পরস্পরের আত্মীয়ও ছিলেন না, পরস্পরের মধ্যে কোন আর্থিক লেনদেনও ছিল না। বরং শুধু আল্লাহর দ্বীনের ভিত্তিতে পরস্পরকে ভালোবাসতো। আল্লাহর কসম তাদের সুখবর জানার পর নবীজি সূরা ইউনুসের একটি আয়াতের অর্থ পড়লেন “মনে রেখো আল্লাহর বন্ধুদের কোন ভয় নেই, তারা কোন দুশ্চিন্তায়ও পড়বে না।” যত কঠিন পরীক্ষা তত বড় পুরস্কার।
আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত নবীজি বলেছেন, বালা মুসিবত অর্থাৎ পরীক্ষা যত কঠিন হবে, তত বড় পুরস্কার প্রদান করা হবে। (যদি বান্দা বিপদ মুসিবতে দিশেহারা হয়ে সত্যের পথ থেকে সরে না যায়।)
আল্লাহ তায়ালা যখন কোন জনগোষ্ঠীকে ভালোবাসেন তখন তাদেরকে আরও পবিত্র ও কলুষমুক্ত করার লক্ষ্যে পরীক্ষায় ফেলেন। যারা আল্লাহর ফয়সালায় সন্তুষ্ট থাকে ও ধৈর্যধারণ করে আল্লাহ তাদের উপর সন্তুষ্ট থাকেন। নবীজি বলেছেন, যখনই কোন মুসলমান কোন রকমের মানসিক কষ্ট, শারীরিক আঘাত বা রোগ, দুঃখ বা বিষাদ ভোগ করে এবং তাতে ধৈর্যধারণ করে তখন তার ফলে আল্লাহ তার গুণাহগুলো মা করে দেন, এমন কি তার গায়ে একটা কাটাও যদি ফুটে তবে তাও তার পাপ মোচনের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। (বুখারি, মুসলিম)
পৃথিবীতে যারা শহীদ হয়েছেন তারা চরম ধৈর্যের পরিচয় দিয়েছেন। আমার প্রিয় মানুষটিকে দেখেছি প্রচণ্ড গরম প্রচণ্ড শীত কিভাবে তিনি সহ্য করেছেন। খাওয়ার কষ্ট, পানির কষ্ট। কষ্ট দেয়াকে জালিমরা আনন্দের কাজ মনে করতো। তারা মনে করেছে এ দুনিয়া থেকে তারা কখনও বিদায় নিবে না।
হজরত ইবনে মাসউদ (রা.) বলেন, রাসূল (সা.) একবার একজন নবীর কথা (অবস্থা) বর্ণনা করছিলেন, সেই দৃশ্যটা আমার চোখের সামনে এখনো ভাসছে। রাসূল (সা.) বললেন, দাওয়াত দেয়ার অপরাধে সেই নবীকে তার স্বজাতীয়রা মারতে মারতে রক্তাক্ত করে দিয়েছিল।
তথাপি সেই নবী নিজের মুখমণ্ডলের রক্ত মুছতে মুছতে বলেছিলেন, হে আল্লাহ আমার জনগণকে মাফ করে দাও (এক্ষুণি তাদের উপর আজাব নাজিল করো না) কেননা তারা অজ্ঞ। (বুখারি, মুসলিম )
যখন কোন জাতি নবীর প্রত্য দাওয়াতকে প্রত্যাখ্যান করে, তখন সে জাতি আল্লাহর আজাবের যোগ্য হয়ে যায়। কিন্তু নবী হতাশ হন না। বরং তার জাতির মধ্যে কাজ চালিয়ে যেতে থাকেন এবং দোয়া করেন যে, এখনই আজাব দিও না, হয়তো কাল ঈমান আনবে। যখন আজাবের ফেরেশতা বলল, আপনি বললে মক্কার দুটি পাহাড় আবু কুরাইশাও জাবালে আহমারকে মিশিয়ে দিই এবং ওরা মাঝখানে পিষ্ট হয়ে মরে যাক, তখন তিনি বললেন, “আমাকে আমার জনগণের মাঝে আরও কিছু দাওয়াতের কাজ করতে দাও, হয়তো বা তারা অচিরেই ঈমান আনবে, অথবা ওদের বংশধরের মধ্যে তাওহিদপন্থী জন্ম নেবে। দ্বীনের কাজ যারা করে, তাদের জন্য এটি একটি উত্তম নমুনা ও আদর্শ। ধৈর্য ও মানবপ্রেম ছাড়া দ্বীন প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম ও চেষ্টা-সাধনা করা সম্ভব নয়। বাতিল শক্তি যখন বিজয়ী ও কর্তৃত্বশীল হয় এবং সত্য পরাজিত ও পরাধীন হয় তখন সত্য দ্বীন ইসলামের ধারক-বাহক ও অনুসারীদের কে কি পরিমাণ বা কি ধরনের দুঃখ-কষ্ট ও বিপদ-মুসিবতের সম্মুখীন হতে হয় তার ভুক্তভোগীরা হারে হারে টের পান। এই পরিবারগুলোর মানুষ না শান্তি মতো ঘুমুতে পারেন, না শান্তি মতো কামকাজ করতে পারেন। পুলিশি হয়রানিতে অস্থির থাকতে হয়। পরিবারের একজনকে আটকিয়ে জুলুম তো করছেই আবার পরিবারকেও বিরাট জুলুমের মধ্যে রেখেছে।
আমার জ্যেষ্ঠ পুত্র পাঁচ বছর আগেই বলেছিল এই এ বিচারে না গিয়ে সবার বলা উচিত ছিল আমাদেরকে এমনিতেই গুলি করে মেরে ফেলো আমরা এই বিচারে যাব না, মাঝখানে পাঁচটি বছর কঠিন থেকে কঠিন জুলুম-যন্ত্রণা করে সেই মৃত্যুই হলো কঠিন মৃত্যু। অবশ্য এটাতো আল্লাহর পক্ষ থেকেই ফায়সালা। দুঃখ একটাই মিথ্যা অভিযোগ এবং অবিচার, এরপর বলবো প্রিয় মানুষটি বিজয়ী এবং অমর। আমরা হেরে যাইনি। হিন্দু মানুষও আমাদের সান্ত্বনা দিয়েছে আপনি কান্না করবেন না, উনি বিজয়ী উনি অমর।
যেদিনটিতে জালিমরা আমার প্রাণপ্রিয় মানুষটিকে সম্পূর্ণ অন্যায়ভাবে রাষ্ট্রীয় ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে হত্যা করা হয়েছিল সেদিন শেরপুরে প্রচণ্ড ঝড় ছিল আর মেঘের বজ্রকঠিন আওয়াজ যেন জালিমদেরকে বুকফাটা চিৎকার করে বলছিল এবং তাদের ধমকাচ্ছিল এই বলে যে, তোমরা যা করছো তা অন্যায়। কিন্তু সেই জ্ঞান কি জালিমদের আছে? যখন আমার প্রিয় মানুষটিকে নিয়ে যায়, এত ভয় ছিল ওদের রাস্তায় ঝড়ে গাছ পড়ছিল সেগুলো সরিয়ে রাস্তা পরিষ্কার করে হলেও জালিমরা তাড়াহুড়ো করে চলে গেছে। কারণ থেমে থাকলে জনরোষ থেকে নিজেদের বাঁচাতে পারত না। ঝড় বৃষ্টির মধ্যেই কেন দাফন করতে হয়েছে রাতের আঁধারে, সবার প্রিয়, লক্ষ লক্ষ লোকের হৃদয়ের মাণিক অনাদরে অবহেলায় জালিমরা শুইয়ে দিলেও লক্ষ লক্ষ মানুষ দূরে দূরে অবস্থান নিয়েছিল আগ থেকেই। যখনি জালিমরা সরে এসেছে তখনি বাঁধভাঙা জোয়ারের মতো চতুরদিক থেকে লোকজন ছুটে এসেছে কবর জিয়ারত করার জন্য। সৎ লোকদের মেরে ফেলাই হলো জালিমদের উত্তম কাজ। আর আল্লাহর নাফরমানি করে বেঁচে থাকার চেয়ে আল্লাহর হুকুম পালনের মধ্য দিয়ে মরে যাওয়াই উত্তম। আমাদের সবার প্রিয় মানুষটি ইসলামী আন্দোলনে এসেছিলেন শহীদি তামান্না নিয়েই। কাজেই তিনি স্বার্থক, তিনি বিজয়ী, তিনি অমর, তার কোন পরাজয় নেই, আল্লাহ তাকে কবুল করে নিন।
নবীজি বলেছেন, যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কাউকে ভালোবেসেছে, আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কারো সাথে শত্রুতা করেছে, আল্লাহর জন্যই কাউকে দান করেছে আবার আল্লাহর জন্য দান করা থেকে বিরত থেকেছে, সেই ব্যক্তি ঈমানকে কানায় কানায় ভরেছে। হে প্রিয় তুমি শহীদ তুমি সফল। আল্লাহ কবুল করে নিন তোমার শাহাদাত। বাতিল শক্তির কাছে তিনি মাথা নত করেননি, বার বার আমাদের বলেছেন আমার জন্য কোন চিন্তা করবে না। কত মানুষ কতভাবে এক্সিডেন্টে মারা যায়, আর আমার মৃত্যু গৌরবের। আমি ভালো আছি, তোমরা ভালো থেকো ও সাহস হারাবে না। আল্লাহর উপর ভরসা রাখবে। দেশের মানুষকে আমার সালাম পৌঁছে দিও। আরো বলেছেন, এই সরকার যেন আমার জানাজায় যেতে লোকজনদের বাধা না দেয়। সরকার কেন বাধা দিয়েছে কে বলতে যাবে। কেন এত ভয় ছিল। তাকে নিয়ে যেতে এত এম্বুলেন্স কেন লেগেছিল। মানুষ বলছে কোনটাতে শহীদ কামারুজ্জামান সাহেব আছেন তা যাতে জনগণ বুঝতে না পারে। কেন এত ভয়। কিসের এত ভয়, কে জবাব দিবে আমাকে। আমি নির্বাক হয়ে আকাশের দিকে তাকিয়েই থাকবো, মহান আল্লাহ আমাকে বলে দিবেন। আমার ছেলে বলে কেউ কান্না করো না। আব্বু এখন ভালো আছেন।
তিবরানীতে হজরত মুয়াজ বিন জারুন (রা.) থেকে বর্ণিত একটি হাদীস যাতে বলা হয়েছে যে, ইসলামের রাজনৈতিক অবস্থা যখন বিকৃত হয়ে যাবে, তখন বিপথগামী শাসকরা কর্তৃত্বশীল হবে এবং তারা সমাজকে ভ্রান্ত পথের দিকে নিয়ে যাবে। তাদের নির্দেশ মেনে চললে জনগণ গোমরাহ হয়ে যাবে। আর তাদের নির্দেশ অমান্য করলে তারা তাদের হত্যা করবে। এ কথা শোনার পর লোকেরা জিজ্ঞেস করলো তারপর তারা কি করবে, তিনি বললেন : সে সময়ে তোমাদেরকে হজরত ঈসার সহচরগণ যা করেছিল তাই করতে হবে। তাদেরকে করাত দিয়ে চিরে ফেলা হয়েছে। শূলে চড়ানো হয়েছে, তবুও তারা বাতিলের কাছে আত্মসমর্পণ করেননি।
ওহুদের যুদ্ধে মুসলমানদের পরাজয়ের প্রেক্ষিতে আল্লাহপাক একটি সত্য মুসলমানদের জন্য তুলে ধরেছেন। “যদি তোমাদের আঘাত লেগে থাকে তবে অনুরূপ তাদেরও তো লেগেছে। মানুষের মধ্যে এই দিকগুলোর আমি পর্যায়ক্রমে আবর্তন ঘটাই যাতে আল্লাহ মুসলিমদেরকে জানতে পারেন এবং তোমাদের মধ্য থেকে কিছু লোককে শহীদ হিসেবে গ্রহণ করতে পারেন।” শহীদের রক্তরাঙ্গা পিচ্ছিল পথের পথিকরা ভীতু নয় কাপুরুষ নয়। যারা তাদেরকে রাতের আঁধারে মারে পিছন থেকে মারে বিনা বিচারে মারে তারাই কাপুরুষ। এই সংগ্রামের পথে আসে বীর পুরুষেরা। আল্লাহর রাহে জীবন দিতে বিন্দুমাত্র বিচলিত নয় শতবাধা অতিক্রম করে বীর পুরুষেরা পথ এগোয়। সেই বাঁধা আনে দুঃখ যন্ত্রণা। এই দুঃখ যন্ত্রণা ব্যক্তি জীবনকে পরিশুদ্ধ করার আসল হাতিয়ার। সত্য প্রতিষ্ঠার বন্ধুর পথের পথিক ছিলেন আমার প্রিয় মানুষটি। শেষ বিদায়ে আমি বলেছি তুমি হাসতে হাসতে ফাঁসির মঞ্চের দিকে যাবে। সত্য প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে তাকে জীবন দিতে হয়েছে। আল্লাহ কবুল করে নিন তাকে।
যারা ক্ষমতার মোহে অন্ধ তারা হয়তো জানেন না ‘‘যে ক্ষমতার মঞ্চ এবং ফাঁসির রশির দূরত্ব খুব বেশি দূরে না।” সম্ভবত সবুর খান বলেছিলেন। ফরাসী লেখক ভলতেয়ার বলেছেন, “যারা করাতে পারবে, তারা তোমাকে দিয়ে নৃশংস কাজও করাতে পারবে।” এ মাসের ১১ তারিখে আমাদের প্রিয় মানুষটির প্রথম শাহাদাত বার্ষিকী। আসুন আমরা সবাই মিলে তার জন্য দোয়া করি তার মতো ‘ভাগ্যবান’ অর্থাৎ শহীদী তামান্না নিয়ে কাজ করি। আল্লাহ আমাদের সহায় হোন। হে মালিক, মৃত্যুর পর যখন আমাদের অনন্ত জীবন শুরু হবে তখন যেন আমরা আমাদের প্রিয় মানুষটির সান্নিধ্যে থাকতে পারি। হে মালিক, তুমি আমাদের সেই তাওফিক দিও।
লেখক : শহীদ কামারুজ্জামানের স্ত্রী 

আরও সংবাদ