Widget by:Baiozid khan
  • Advertisement

১০ মামলায় খালেদার জামিন

Published:2016-08-11 08:34:42    
নাশকতা ও রাষ্ট্রদ্রোহের দশ মামলায় আদালতে হাজির হয়ে জামিন পেয়েছেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া।
এর মধ্যে বিশেষ ক্ষমতা আইনের পাঁচ মামলায় পলাতক আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে আদালত পুলিশকে বলেছে, তাদের গ্রেপ্তার করা গেল কি না তা ১০ অক্টোবর প্রতিবেদন আকারে জানাতে হবে।  
 
ওই দিনই খালেদার রাষ্ট্রদ্রোহের মামলায় অভিযোগ গঠনের শুনানির দিন রেখেছেন আদালত।
 
নাশকতা, দুর্নীতি ও রাষ্ট্রদ্রোহের মোট ১২ মামলায় হাজিরা দিতে বুধবার পুরান ঢাকার আদালত পাড়ায় হাজির হন সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া।
 
কখনও উত্তেজনা, কখনো হাস্যরস আর হৈ চৈয়ের মধ্যের চার ঘণ্টার বেশি সময় ধরে চার বিচারকের আদালতে এসব মামলার শুনানি চলে।
 
বেলা ১১টা ৪০ এ আদালত প্রাঙ্গণে পৌঁছানোর পর প্রথমেই তিনি মহানগর দায়রা জজ আদালতে রাষ্ট্রদ্রোহের মামলায় হাজিরা দেন। পরে একই আদালতে বিশেষ ক্ষমতা আইনের আট মামলায় খালেদার জামিন আবেদনের শুনানি হয়।
 
এরপর বড় পুকুরিয়া কয়লা খনি ও নাইকো দুর্নীতি মামলায় বিশেষ জজ আদালতে হাজিরা দেন বিএনপি চেয়ারপরসন।
 
তার সময়ের আবেদনে নাইকো দুর্নীতি মামলায় অভিযোগ গঠনের শুনানির জন্য ১৬ অগাস্ট নতুন তারিখ দেন বিচারক। আর বড় পুকুরিয়া মামলার খালেদার হাজিরার পরবর্তী দিন ঠিক করা হয়েছে ৮ সেপ্টেম্বর।  
 
সবশেষে দারুস সালামে নাশকতার আরেক মামলায় হাকিম আদালত থেকে জামিন নিয়ে বিকালে বাড়ি ফিরে যান তিনি।  
 
রাষ্ট্রদ্রোহ
গতবছর ২১ ডিসেম্বর রাজধানীর রমনার ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে জাতীয়তাবাদী মুক্তিযোদ্ধা দলের এক আলোচনা সভায় খালেদা মুক্তিযুদ্ধে শহীদের সংখ্যা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করে বলেন, “আজকে বলা হয়, এত লক্ষ লোক শহীদ হয়েছেন। এটা নিয়েও অনেক বিতর্ক আছে যে, আসলে কত লক্ষ লোক মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হয়েছেন। নানা বই-কিতাবে নানা রকম তথ্য আছে।”
 
ওই বক্তব্যে ‘দেশদ্রোহী’ মনোভাবের পরিচয় রয়েছে অভিযোগ করে গত ২৫ জানুয়ারি ঢাকার হাকিম আদালতে খালেদার বিরুদ্ধে মামলা করেন আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী সংসদের সদস্য ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মমতাজ উদ্দিন আহমদ মেহেদী। ওই মামলা করার আগে তিনি নিয়ম অনুযায়ী স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনুমতিও নেন।
 
ওই মামলায় পুলিশের দেওয়া অভযোগপত্র আমলে নিয়ে বুধবার ঢাকার মহানগর দায়রা জজ কামরুল হোসেন মোল্লা অভিযোগ গঠনের শুনানির জন্য ১০ অক্টোবর দিন ঠিক করে দেন।
 
হাকিম আদালতে এ মামলায় জামিন পাওয়া খালেদা এ আদালত থেকেও জামিন চাইলে বিচারক তা মঞ্জুর করেন।
 
মামলার বাদী মমতাজ উদ্দিন মেহেদী এ সময় আদালতে উপস্থিত ছিলেন। অন্যদিকে খালেদার আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন, মাহবুব উদ্দিন খোকন ও এ জে মোহাম্মদ আলী অভিযোগ আমলে নেওয়ার বিরোধিতা করে আদালতে যুক্তি তুলে ধরেন।
 
এ মামলার অনুমোদন নিয়ে রাষ্ট্র ও আসামিপক্ষের মধ্যে তুমুল বিতর্ক হয় শুনানিতে।
খালেদার আইনজীবীরা অভিযোগ করেন, মামলার অনুমোদন নেওয়া হয়েছে মামলা দায়েরের পর; এটি ‘ঘোড়ার আগে গাড়ি জুড়ে দেওয়ার মতো’।
 
এ সময় বিচারক বলেন, মামলার নথিপত্রে দেখা যাচ্ছে, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মামলা করার অনুমতি দিয়েছে ২১ জানুয়ারি; আর মামলা হয়েছে ২৫ জানুয়ারি। কোথাও অনিয়ম হয়নি।
 
বাক বিতণ্ডার এক পর্যায়ে আসামিপক্ষের অপর আইনজীবী মাসুদ আহমেদ তালুকদার অভিযোগ আমলে নেওয়ার শুনানির জন্য সময় চান।
 
বিচারক তাদের আবেদন বাতিল করে দিয়ে অভিযোগ আমলে নেন এবং ১০ অক্টোবর অভিযোগ গঠনের শুনানির জন্য দিন রাখেন। 
 
দারুস সালামের ৯ মামলা
দশম সংসদ নির্বাচনের বছরপূর্তিতে গত বছরের ৫ জানুয়ারি সমাবেশ করতে বাধা পেয়ে দলীয় কার্যালয়ে অবরুদ্ধ অবস্থায় থেকে সারাদেশে লাগাতার অবরোধ ডাকেন খালেদা জিয়া।
 
৯০ দিনের এই কর্মসূচিতে বহু গাড়ি পোড়ানো হয়, অগ্নিসংযোগ হয় বিভিন্ন স্থাপনায়। অগ্নিদগ্ধ হয়ে মারা যান প্রায় দেড়শ মানুষ।
 
তখন নাশকতার ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে অসংখ্য মামলা করে। তার মধ্যে দারুস সালাম থানায় দায়ের করা নয়টি মামলায় খালেদাকে হুকুমের আসামি করা হয়, যার মধ্যে আটটি মামলা বিশেষ ক্ষমতা আইনের।
 
গত মে ও জুন মাসে খালেদাসহ বিএনপি নেতাকর্মীদের আসামি করে এসব মামলায় অভিযোগপত্র দেয় পুলিশ।
 
বুধবার ঢাকার ১ নম্বর মহানগর বিশেষ ট্রাইব্যুনালে আত্মসমর্পণ করে বিশেষ ক্ষমতা আইনের আট মামলায় জামিনের আবেদন করেন খালেদা জিয়া।
 
শুনানি করে সবগুলোতেই তাকে জামিন দেন এ আদালতের বিচারক ঢাকার মহানগর দায়রা জজ কামরুল হোসেন মোল্লা।
 
এই আট মামলার মধ্যে পাঁচটিতে পুলিশের দেওয়া অভিযোগপত্র আমলে নিয়ে বিচারক পলাতক আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন। পরোয়ানা তামিলের বিষয়ে প্রতিবেদন দিতে পুলিশকে ১০ অক্টোবর দিন ঠিক করে দেন তিনি।
 
বাকি তিন মামলায় খালেদাসহ আসামিদের বিরুদ্ধে পুলিশের দেওয়া অভিযোগপত্র আমলে নেওয়ার বিষয়ে আদালতের সিদ্ধান্ত জানা যাবে ৭ সেপ্টেম্বর।
দারুস সালামের অন্য মামলায় খালেদার জামিন আবেদনের শুনানি হয় মহানগর হাকিম নূরুন্নাহার ইয়াসমীনের আদালতে। তিনিও জামিন মঞ্জুর করেন। 
নাইকো দুর্নীতি মামলা
 
জরুরি অবস্থার সময় দায়ের করা এ মামলায় খালেদার সময়ের আবেদন মঞ্জুর করে অভিযোগ গঠনের শুনানি পিছিয়ে দিয়েছে আদালত।
 
তবে অন্য আসামিদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের অভিযোগ গঠনের শুনানি এদিন শেষ হয়েছে।
 
ঢাকার ৯ নম্বর বিশেষ জজ আদালতের বিচারক মো. আমিনুল ইসলাম এ মামলার পরবর্তী তারিখ ঠিক করে দিয়েছেন ১৬ সেপ্টেম্বর।
 
ওইদিন অভিযোগ গঠনের বিষয়ে আসামিপক্ষের বক্তব্য শুনবেন বিচারক। সেই সঙ্গে খালেদার বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের বিষয়েও শুনানি হবে সেদিন।
 
দুদকের পক্ষে আদালতে শুনানি করেন মোশাররফ হোসেন কাজল। খালেদার পক্ষে শুনানি করেন ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন, আসাদুজ্জামান ও তাহেরুল ইসলাম তৌহিদ।
 
সেনানিয়ন্ত্রিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় খালেদা জিয়া গ্রেপ্তার হওয়ার পর ২০০৭ সালের ৯ ডিসেম্বর তার বিরুদ্ধে তেজগাঁও থানায় এই মামলা করে দুদক। পরের বছর ৫ মে খালেদাসহ ১১ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়।
 
এতে অভিযোগ করা হয়, ক্ষমতার অপব্যবহার করে তিনটি গ্যাসক্ষেত্র পরিত্যক্ত দেখিয়ে কানাডীয় কোম্পানি নাইকোর হাতে ‘তুলে দেওয়ার’ মাধ্যমে আসামিরা রাষ্ট্রের প্রায় ১৩ হাজার ৭৭৭ কোটি টাকার ক্ষতি করেছেন।
 
সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ছাড়া এ মামলার বাকি আসামিরা হলেন- চার দলীয় জোট সরকারের আইনমন্ত্রী মওদুদ আহমদ, সাবেক জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী এ কে এম মোশাররফ হোসেন, তখনকার প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব কামাল উদ্দিন সিদ্দিকী, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সাবেক ভারপ্রাপ্ত সচিব খন্দকার শহীদুল ইসলাম, সাবেক সিনিয়র সহকারী সচিব সি এম ইউছুফ হোসাইন, বাপেক্সের সাবেক মহাব্যবস্থাপক মীর ময়নুল হক, বাপেক্সের সাবেক সচিব মো. শফিউর রহমান, বিতর্কিত ব্যবসায়ী গিয়াস উদ্দিন আল মামুন, ঢাকা ক্লাবের সাবেক সভাপতি সেলিম ভূঁইয়া (সিলভার সেলিম) এবং নাইকোর দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক ভাইস প্রেসিডেন্ট কাশেম শরীফ।
 
পলাতক ময়নুল হক, কাশেম শরীফ ও কামাল সিদ্দিকী ছাড়া আসামিদের সবাই এদিন আদালতে উপস্থিত ছিলেন। 
 
 
 বড় পুকুরিয়া
জরুরি অবস্থার সময় দুদকের দায়ের করা বড় পুকুরিয়া কয়লা খনি দুর্নীতি মামলায় এদিন আদালতে হাজিরা দেন খালেদা জিয়া।
 
শুনানি শেষে ঢাকার ২ নম্বর  বিশেষ জজ আদালতের বিচারক হোসনে আরা বেগম এ মামলার পরবর্তী দিন ধার্য করেন আগামী ৮ সেপ্টেম্বর।
 
বিগত সেনা নিয়ন্ত্রিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে ২০০৮ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া এবং তার মন্ত্রিসভার ১০ সদস্যসহ ১৬ জনের বিরুদ্ধে বড় পুকুরিয়া কয়লা খনি দুর্নীতি মামলা হয়। ওই বছর ৫ অক্টোবর ১৬ জনের বিরুদ্ধেই অভিযোগপত্র দেয় দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
 
এতে বলা হয়, চীনা প্রতিষ্ঠান কনসোর্টিয়াম অফ চায়না ন্যাশনাল মেশিনারিজ ইম্পোর্ট অ্যান্ড এক্সপোর্ট করপোরেশনের (সিএমসি) সঙ্গে বড় পুকুরিয়া কয়লা খনির উৎপাদন, ব্যবস্থাপনা ও রক্ষণাবেক্ষণ চুক্তি করার মধ্য দিয়ে আসামিরা রাষ্ট্রের প্রায় ১৫৮ কোটি ৭১ লাখ টাকা ক্ষতি করেছেন।
 
মামলার ১৬ আসামির মধ্যে জামায়াত নেতা আলী আহসান মুহাম্মদ মুজাহিদ ও মতিউর রহমান নিজামীর একাত্তরের মানবতাবিরোধী মামলায় মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে।
 
সাবেক অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমান সড়ক দুর্ঘটনায় ও বিএনপির মহাসচিব আব্দুল মান্নান ভূঁইয়া ক্যান্সারে মারা যাওয়ায় মামলার আসামি হিসেবে তাদের বিচারও স্থগিত হয়েছে।
 
আরেক আসমি পেট্রোবাংলার সাবেক চেয়ারম্যান এ আর ওসমানী ২০১২ সালের ১ অক্টোবর মারা যাওয়ায় তাকেও মামলা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে।
 
আসামিদের মধ্যে বিএনপি নেতা ড. খন্দকার মোশারফ হোসেন, এম কে আনোয়ার, এম শামসুল ইসলাম, এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) আলতাফ হোসেন চৌধুরী, এ কে এম  মোশারফ হোসেন ও ব্যারিস্টার মো. আমিনুল হক, হোসাব গ্রুপের চেয়ারম্যান মোয়াজ্জেম হোসেন, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব নজরুল ইসলাম এবং পেট্রোবাংলার সাবেক পরিচালক মুইনুল আহসান জামিনে রয়েছেন।
 
আরেক আসামি পেট্রোবাংলার সাবেক পরিচালক মো. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী মামলার শুরু থেকেই পলাতক। তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির নির্দেশ দিয়েছে এ আদালত।
 
নিরাপত্তা
বিএনপি নেত্রীর হাজিরার দিন থাকায় সকাল থেকেই আদালতপাড়ায় নেওয়া হয় কড়া নিরাপত্তার ব্যবস্থা । বিপুল সংখ্যক পুলিশ ও র‌্যাব সদস্য আদালত প্রাঙ্গণ এবং আশপাশের এলাকায় অবস্থান নেন। দায়রা জজ আদালতের ফটকে দুটি আর্চওয়ে বসানো হয়।
 
আদালতের প্রবেশপথগুলোতে তল্লাশি করে তারপর আইনজীবী ও বিচারপ্রার্থীদের ঢুকতে দেওয়া হয়। আইনজীবীদের পরিচয়পত্রও দেখাতে হয়।
 
নিরাপত্তারক্ষীদের সংখ্যা না জানালেও একজন পুলিশ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, আইন-শৃখলা বাহিনীর অন্তত পাঁচশ সদস্য আদালত এলাকায় ছিলেন।
 
কোতোয়ালি থানার ওসি আবুল হাসান জানান, কোনো ধরনের ‘অপ্রীতিকর ঘটনা’ যাতে না ঘটে, সেজন্যই এ ব্যবস্থা করা হয়।
 
এর আগে গত ৫ এপ্রিল যাত্রাবাড়ী থানার নাশকতার মামলাসহ পাঁচ মামলায় খালেদা জিয়া আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিন পান।
 

আরও সংবাদ