Widget by:Baiozid khan
শিরোনাম:

ঢাকা Tue July 07 2020 ,

  • Techno Haat Free Domain Offer

বৃষ্টিভেজা ঈদে শান্তির প্রার্থনা

Published:2016-09-13 23:01:53    

আবহাওয়া বিভাগের আভাস উল্টে দিয়ে রাতেই বৃষ্টির সঙ্গে মেঘের গর্জন চোখ রাঙাচ্ছিল ঈদের আনন্দ ভজঘট করে দেওয়ার, সকালে তার অনেকটাই ফলেছে।
এই বৃষ্টির মধ‌্যেই মঙ্গলবার সকালে হাজার মুসল্লির ঢল নেমেছিল রাজধানীর জাতীয় ঈদগাহ ময়দানে। সবাই হাত তুলেছিল দেশের কল‌্যাণ কামনায়।

জিলহ্জ মাসের দশম দিন উদযাপিত মুসলিমদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব বাংলাদেশে কোরবানির ঈদ নামেই পরিচিত। এদিন পশু জবাই দেওয়ার মাধ‌্যমে মনের পঙ্কিলতাকে বিসর্জন দেওয়া ইসলামের শিক্ষা।

গত ঈদুল ফিতরে শোলাকিয়ায় জঙ্গি হামলার পর এবার সব ঈদের নামাজ ঘিরেই ছিল কড়া নিরাপত্তা। কয়েক স্তরের নিরাপত্তা বেষ্টনি ছিল সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণের জাতীয় ঈদগাহ ঘিরে।

ঝুম বৃষ্টির মধ্যে যথাসময়েই শুরু হয় প্রধান জামাত। বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের জ্যেষ্ঠ পেশ ইমাম মাওলানা মুহাম্মদ মিজানুর রহমান এতে ইমামতি করেন। তারপর তার সঙ্গে মোনাজাতে হাত তোলেন মুসল্লিরা।

সৌদি আরবে হজ পালনরত বাঙালি মুসলিমদের জন্য দোয়ার পাশাপাশি রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের সুস্বাস্থ্যের জন্যও দোয়া করেন ইমাম।

রাষ্ট্রপ্রধান আবদুল হামিদ এই ঈদ জামাতে বরাবরের মতোই অংশ নেন। তার সঙ্গে নামাজ পড়তে পেরে আত্মহারা ছিল ফার্মগেইট থেকে আসা সুমন হাওলাদার, শফিকুল ইসলাম ও মোস্তাফিজুর রহমান।

মোস্তাফিজুর বলেন, “রাষ্ট্রপতির সঙ্গে ঈদের জামাত পড়ব বলে বৃষ্টি মাথায় নিয়ে এসেছি। এই সুযোগ তো হরহামেশা মেলে না।”


ঈদের প্রধান জামাতকে ঘিরে হাই কোর্ট চত্বর, মৎস‌্য ভবন মোড়, সেগুনবাগিচা, প্রেসক্লাব চত্বর এলাকায় নেওয়া হয়েছিল বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা।

জাতীয় ঈদগাহ ময়দানে নামাজ পড়তে আসা সবাইকে পেরোতে হয়েছে একাধিক নিরাপত্তা চৌকি। র‌্যাব, আর্মড ফোর্স পুলিশের দলগুলো কাউকে সন্দেহভাজন মনে হলেই জিজ্ঞাসাবাদ করছিল।

সাম্প্রতিক কয়েকটি জঙ্গি হামলার পর নিরাপত্তার এই কড়াকড়িতে সন্তুষ্টই মনে হয়েছে নামাজীদের।

বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা দিতে ঢাকায় আসা দিদার হোসেন বলেন, “শোলাকিয়ার সেই ঘটনা তো ভুলিনি আমরা। আমাদের মধ্যেও ভয় ছিল, এখানে আবার কিছু হয় কি না। তবে র‌্যাব-পুলিশের বলয় থাকায় আমাদের সেই ভয় কেটে গেছে।”

পুরান ঢাকার ব্যবসায়ী কে এম হাফিজ বলেন, “নিজের জন্য, পরিবারের জন্য আল্লাহর দরবারে ফরিয়াদ জানিয়েছি। পাশাপাশি দোয়া চেয়েছি আমার দেশটির জন্য। এ দেশটি ভালো না থাকলে তো আমরা কেউ সত্যি ভালো থাকব না।”

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এমবিএর ছাত্র ওমর শরীফ পাঠান বলেন, “শুধু জঙ্গিবাদ নির্মূল নয়, দেশ যেন অর্থনৈতিকভাবে আরও সমৃদ্ধ হয়, সেই দোয়া করেছি। আত্মপরিচয়ে বলীয়ান হয়ে বাংলাদেশ বিশ্বদরবারে একদিন পরাশক্তি হবে, সেই স্বপ্ন তো আমরা দেখতেই পারি।”


ব্যবসায়ী মো. সাইফুল ইসলাম দোয়া চেয়েছেন তার বয়োবৃদ্ধ বাবা-মায়ের জন্য।

“মনে পড়ে, ছোটবেলায় বাবার হাত ধরে আমি বায়তুল মোকাররমে এসে ঈদের জামাতে শরিক হতাম। খুব বায়না করতাম, বাবাকে জ্বালাতাম। আজ বড় হয়েছি। কিন্তু সেদিনের কথা খুব মনে পড়ে। বাবা অসুস্থ, মায়ের শরীরও ভালো নেই।”

কাছের সেগুন বাগিচা থেকে মো. দুলাল হোসেন এসেছিলেন তার ছয় বছর বয়সী ছাছিন আহমেদকে নিয়ে। ছাছিন দোয়া চেয়েছে তার প্রয়াত দাদা-দাদির জন্য।

কয়েকদিন আগে টঙ্গীর কারখানায় আগুনে পুড়ে মারা যাওয়া ব‌্যক্তিদের জন‌্য দোয়া করে মো. দুলাল হোসেন নামে এক ব‌্যক্তি বলেন, “কখন কী হয়, তার কোনো ঠিক নাই। সারাক্ষণ টেনশনে থাকি। আল্লাহর দরবারে বলছি, তিনি যেন সবাইকে সহিসালামতে রাখেন। কেউ যেন টঙ্গীর কারখানার মতো আগুনে পুড়ে না মরে।”

দেশের সঙ্গে ফিলিস্তিন, লিবিয়া, সিরিয়া, ইরাক, আফগানিস্তানসহ মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিমপ্রধান দেশগুলোতে ধ্বংসযজ্ঞের বিপরীতে মানবতাবোধ জাগরণের প্রার্থনাও এসেছে ঈদ জামাতে অংশগ্রহণকারীদের কাছ থেকে।

শফিকুল ইসলাম নামে একজন বলেন, “সৃষ্টির সবচেয়ে সুন্দর হচ্ছে মানুষ। সেই মানুষই একে অন্যকে মারছে। আল্লাহ এদের সুবুদ্ধি দিক।”

ঈদের তিন দিনের সঙ্গে এবার নির্বাহী আদেশে আরও একদিন ছুটি ঘোষণা হওয়ায় টানা ছয় দিনের ছুটি পেয়েছেন চাকরিজীবীরা। ফলে অনেকে বাড়ি ছুটেছেন।

তবে সামনেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা বলে বাড়ি যাওয়া হয়নি শরীয়তপুরের শামসুল আলমের। ঢাকায় ঈদগাহে নামাজ পড়ার সময় তাকে টানছিল প্রিয়জনের স্মৃতি।

“মা, বাবা, ভাই-বোনগুলোকে ঈদে দেখতে পাচ্ছি না। এই প্রথমবারের মতো সবাইকে ছেড়ে ঈদ করতে হচ্ছে।”

নবাবপুর সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণিপড়ুয়া রিফাত মোল্লার মোনাজাত ছিল ভালো ফলাফলের জন‌্য।

“আমি এবার পিছিয়ে গিয়েছি। রোল দুই হয়ে গেছে। আল্লাহকে বলেছি, আমার রোল যেন এক হয়ে যায়।”

জাতীয় ঈদগাহের কাছে জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমে সকাল ৭টা থেকে ১১টা পর্যন্ত পাঁচটি জামাতে হাজারো মানুষ নাজাজ পড়েন।


তবে ঢাকার বিভিন্ন স্থানে নির্ধারিত খোলায় ময়দানে নামাজ হতে পারেনি বৃষ্টির কারণে। ফলে মসজিদগুলোতে ঈদ জামাত সরিয়ে নেওয়া হয়। ঢাকার বাইরেও কয়েকটি স্থানে ঈদের আনন্দে বৃষ্টির বাগড়া দেওয়ার খবর এসেছে।

ঈদ জামাত শেষেই সবাই ব‌্যস্ত হয়ে পড়েছেন পশু কোরবানির তোড়জোড়ে। তবে বৃষ্টির কারণে এই নিয়ে সমস‌্যায় পড়ার কথাও জানিয়েছেন অনেকে।

পশুর বর্জ‌্য যাতে পরিবেশ দূষণ না ঘটায়, সে দিকে সবাইকে মনোযোগ রাখতে আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।  

কোরবানির পশুর বর্জ্য অপসারণের উপর বেশ জোর দিয়েছে বিভিন্ন নগরীর কর্তৃপক্ষ। ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন ৪৮ ঘণ্টার মধ‌্যে বর্জ‌্য অপসারণের ঘোষণা দিয়েছে।

নির্দিষ্ট স্থানে পশু কোরবানির আহ্বান জানানোর পাশাপাশি বর্জ‌্য অপসারণে দুই সিটি কর্পোরেশনে ১০ হাজার ৫৪৪ জন পরিচ্ছন্নতাকর্মী কাজ করবেন বলে জানানো হয়েছে।

এবার শুরুতে রাজধানীর পশুর হাটগুলোতে গরুর দাম বেশি বলে ক্রেতাদের অভিযোগ থাকলেও ঈদের আগের দিন দাম বেশ পড়ে যায়, যা নিয়ে আবার আক্ষেপ ছিল বিক্রেতাদের।

এবার ঈদযাত্রায় বরাবরের মতো ভোগান্তি থাকলেও বড় কোনো দুর্ঘটনা ঘটেনি। ট্রেন ও লঞ্চ চলাচল নিয়ে মানুষের সন্তুষ্টি দেখা গেলেও সড়ক পথে যানজট নিয়ে অভিযোগ ছিল অনেকের।

বরাবরের মত এবারও ঈদের দিন সকালে বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে ঈদ শুভেচ্ছা বিনিময় করেন। প্রধানমন্ত্রী শুভেচ্ছা বিনিময় করেন গণভবনে।

ঈদ উপলক্ষে সরকারি ও বেসরকারি গুরুত্বপূর্ণ ভবনগুলোতে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়। বিভিন্ন সড়ক ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা সাজানো হয় মনোরম সাজে।

দেশের বিভিন্ন হাসপাতাল, কারাগার, সরকারি শিশু সদন, ছোটমনি নিবাস, সামাজিক প্রতিবন্ধী কেন্দ্র, আশ্রয়কেন্দ্র, ভবঘুরে কল্যাণ কেন্দ্র ও দুস্থ কল্যাণ কেন্দ্রগুলোতে বিশেষ খাবার পরিবেশন করা হয়।

ঈদ উপলক্ষ সরকারি-বেসরকারি টেলিভিশন চ্যালেনগুলো কয়েকদিন ধরে প্রচার করছে বিশেষ অনুষ্ঠান। সংবাদপত্রগুলোও এ উপলক্ষে বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করেছে।

ঈদের উৎসবের জন‌্য রাজধানীসহ দেশের বিনোদন কেন্দ্রগুলো নতুন করে সেজেছে। সকালের বৃষ্টি আনন্দ উদযাপনে চোখ রাঙানি দিলেও দুপুরের দিকে রোদের দেখা না মিললেও আকাশে মেঘের আনাগোনা কমেছে।

 

আরও সংবাদ