Widget by:Baiozid khan
শিরোনাম:

ঢাকা Fri December 06 2019 ,

  • Techno Haat Free Domain Offer

তিস্তা নামক ‘মুলা’ ঝুলিয়েছে ভারত!

Published:2017-04-11 12:27:10    
‘উষ্ণ অভ্যর্থনায়’ ভারত সফর করছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। প্রতিরক্ষা চুক্তি নিয়ে দেশের মধ্যে অনেক জল্পনা-কল্পনা থাকলেও শেষ পর্যন্ত ‘স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব’ ‘বিকিয়ে’ দেয়ার মতো কিছুই হয়নি। তবে সবকিছু ছাপিয়ে প্রধান আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে তিস্তা নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা ইস্যু। তিস্তার পানির ন্যায্য হিস্যা পাচ্ছে না বাংলাদেশ, এটা এখন পরিষ্কার। তবে এ ব্যর্থতা ভারতের, বাংলাদেশের নয়। যদিও তিস্তার পানির ন্যায্য হিস্যা ইস্যুতে ভারত প্রকৃতপক্ষে ইচ্ছে করেই ব্যর্থ।
 
অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, তিস্তা নদীর উপর বাংলাদেশের অধিকার বাস্তবায়নে আন্তরিক নয় ভারত। যৌথ ঘোষণায় বর্তমান সরকারসমূহের আমলেই তিস্তা চুক্তি হবে বলে আশাবাদ প্রকাশ করা হয়েছে। কিন্তু ভারতীয় পক্ষ হতে এ ঘোষণা যে নিতান্তই সৌজন্যবশত সেটা আর বলার বাকি রাখে না। কারণ তিস্তার পানি ইস্যুতে মমতা বিকল্প প্রস্তাব দিয়েছেন। তিনি তিস্তার বিকল্প হিসেবে তোর্সা (দুধকুমার), জলঢাকা (ধরলা) সহ উত্তরবঙ্গের কয়েকটি নদীর পানিবণ্টনের বিকল্প প্রস্তাব দিয়েছেন।
 
এ প্রস্তাব যে চরম অবৈজ্ঞানিক এবং মশকরা সেটা বুঝতে নদী বা পরিবেশ বিশেষজ্ঞ হতে হয়না। বাংলাদেশের প্রতি মমতার সত্যিকার অর্থে দরদ থাকত, তাহলে তিনি বাংলাদেশের মানুষের কাছে দুঃখ প্রকাশ করতেন, নিজের অসহায়ত্ব প্রকাশ করতেন, চালাকির আশ্রয় নিতেন না। মমতা বাংলাদেশের সরকার ও জনগণের অনুভূতির প্রতি সামান্যতম সম্মান না দেখিয়ে, হাস্যকর বিকল্প প্রস্তাব দিয়ে পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে করেছেন। ৭১ এ যদি বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের জন্য ভারতের জওয়ানরা প্রাণ বিসর্জন দিতে পারেন, তাহলে নদীর পানির উপর বাংলাদেশের ন্যায্য অধিকার দিতে বাধা কোথায়?  
 
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজেও তাঁর নিজের একটা লেখায় প্রশ্ন করেছেন, ‘পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে আমাদের অনেক কিছুই মেলে। লালন, রবীন্দ্রনাথ, কাজী নজরুল, জীবনানন্দ আমাদের উভয়েরই। বাংলা ভাষা আমাদের উভয়েরই। পদ্মা, ব্রহ্মপুত্র, তিস্তা নদীর জল পায় দুইদেশই। সুন্দরবন উভয়েরই গর্ব। এ নিয়ে আমাদের কোনো দ্বন্দ্ব নেই। তবে একটি নদীর জলবণ্টন নিয়ে একমত হতে বাধা কোথায়?
 
এর উত্তর ভারত দেবে না। আমরা বুঝতে পারি, তিস্তা ইস্যুতে ভারত ইচ্ছে করেই ন্যায্য হিস্যা দিতে চায় না। কেন্দ্র সরকার মমতার কথা বলে পার পেয়ে যেতে চাইলেও, মোদীজী নিজেও এক্ষেত্রে চতুরতার আশ্রয় নিয়েছেন। বিজেপি পশ্চিমবঙ্গে হিন্দুত্ববাদের স্লোগানে শক্ত আসন গাড়তে চাইছে। বামদলগুলো যদিও প্রতিরোধের চেষ্টা করছে, কিন্তু বিজেপি তৃণমূল কংগ্রেসের পরোক্ষ সহায়তায় সেখানে এবার রামনবমীতে রামদা আর ছুরিসমেত মিছিল করে নিজেদের শক্তিমত্তার প্রমাণ দিয়েছে। শত শত স্কুল পড়ুয়া মেয়ের হাতে রামদা তুলে দিয়েছে তারা। হিন্দুত্ববাদের স্লোগানে এবং চর্চায় মধ্যপন্থী কংগ্রেসকে হটিয়ে সরকার গঠন করে মজা পেয়েছে বিজেপি। পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেসকে ক্ষেপাতে চায় না বিজেপি। ভারতের সংবিধানমতে মোদি সরকার ইচ্ছে করলেই বাংলাদেশের সাথে তিস্তা চুক্তি করতে পারে, এখানে পশ্চিমবঙ্গের বা কোনো রাজ্যের সমর্থন বা অনুমতি লাগে না। কিন্তু মোদি সরকার কিংবা এর আগের সোনিয়া গান্ধীর সরকার একই কথা বলেছে। আসলে বিজেপি চায় না পশ্চিমবঙ্গে নিজেদের ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে। আর মমতা বলছেন তিস্তায় পানি নেই, তাই তিনি দিতে পারবেন না!         
 
মমতা এমনভাবে কথা বলেছেন যেন, তিস্তা নদীর মালিক তিনি।  তিস্তা একটি নদী, ঘরের কোনো ফার্নিচার নয়। এর মালিক কোনো ব্যক্তি বা রাষ্ট্র বা রাজ্য নয়। উৎপত্তিস্থল থেকে নিজের তৈরি করা পথে স্বাধীনভাবে প্রবাহিত হওয়ার অধিকার তিস্তার রয়েছে। সেই অধিকার হরণ করেছে ভারত। আর এ নিয়ে পানি ঘোলা করে অনড় অবস্থান ধরে রেখে বাংলাদেশের সাথে ‘সৌজন্য’ খেলা করল ভারত। হাসিনা-মোদী স্বাক্ষরিত অন্যান্য চুক্তি এবং সমঝোতা স্মারকে প্রতিবেশী দেশ লাভবান হলেও ভারতীয় পক্ষের চালাকিপূর্ণ অসহযোগিতায় এবারও তিস্তার চুক্তি সফল হলেন না শেখ হাসিনা। কিন্তু এই ব্যর্থতা শেখ হাসিনা, আওয়ামী লীগ, সরকার কিংবা বাংলাদেশের নয়। শেখ হাসিনা দেশপ্রেমিক বলেই বার বার চেষ্টা করে যাচ্ছেন। খালেদা জিয়া তো একবার  ভারত গিয়ে গঙ্গার পানির কথা বলতে ভুলে গিয়েছিলেন। একটা সভ্য এবং প্রগতিশীল দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে, রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে শেখ হাসিনার যা যা করার কথা, উনি করছেন। ভারত চালাকির আশ্রয় নিয়েছে, এ ব্যর্থতা ভারতের। দেশের মানুষ শেখ হাসিনার আন্তরিক, সৎ চেষ্টার বিষয়টি ভালোই বুঝতে পারে। বিএনপির পুরনো মান্ধাতা আমলের রাজনৈতিক বক্তৃতাবাজি সাধারণ সচেতন মানুষের মধ্যে সামান্যতম আছর ফেলতে পারছে না বলেই মনে হয়। তিস্তার পানি ভারত আটকে রেখেছে  বহুদিন ধরে। চীন যেমন ব্রহ্মপুত্র নদীর পানিতে ভারতের ন্যায্য হিস্যা দেয় না, ভারত কিছুই করতে পারে না। ভারত আমাদের তিস্তা এবং অন্যান্য নদীর পানি আটকে রেখে অন্যায় করছে, কিন্তু বাংলাদেশের অগ্রগতি থামিয়ে রাখতে পারছে না। অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং দারিদ্র দূরীকরণে বাংলাদেশ ভারতের তুলনায় ২৪ ধাপ এগিয়ে আছে বলে ২০১৭ সালের শুরুতে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম রিপোর্ট দিয়েছে। গত আটবছরে আওয়ামী লীগ সরকার বাংলাদেশকে উন্নয়নের মহাসড়কে তুলে দিয়েছে। বাংলাদেশ তার অভীষ্ট লক্ষ্যে ছুটে চলেছে।  এখনো পৃথিবীর সবচেয়ে বেশিসংখ্যক দরিদ্র মানুষের বসবাস ভারতে।  
 
তবে ভারতীয় অসহযোগিতায় তিস্তার পানি নিয়ে সমাধানে পৌঁছানো সম্ভব না হলেও অন্যান্য ক্ষেত্রে শেখ হাসিনার ভারত সফরের সাফল্য কম নয়। বিশেষ করে ভারতের দিক থেকে থেকে প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করার চাপ থাকা সত্ত্বেও সমঝোতা স্মারক সই করতে ভারতকে বাধ্য করাও জনগণের দৃষ্টিতে এক তাৎপর্যপূর্ণ বিষয়। বাংলাদেশ রাষ্ট্র হিসেবে আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক শক্তিশালী। ভারতের বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গি থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশ কিন্তু শেখ হাসিনার নেতৃত্বেই চীন থেকে দুটি সাবমেরিন কিনে কমিশনিং করে ফেলেছে। ভারত সরকার, মিডিয়া, সুশীল সমাজ কেউই বাংলাদেশের সাবমেরিন ক্রয়কে ভালো চোখে দেখেনি।  প্রতিরক্ষাখাতে দ্বিপাক্ষিক সহায়তা নিয়ে একটি সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে, কোনো চুক্তি নয়। মাঠ গরম করার সুযোগ হাতছাড়া করে দিশেহারা বিএনপি। বিএনপি যদিও ‘বাংলাদেশ বিক্রি করে দিয়েছে আওয়ামী লীগ সরকার’ বলে বক্তৃতাবাজি করে চলেছে, প্রকৃত অর্থে সচেতন মানুষের মনে ও মগজে এর কোনো প্রভাবই নেই। মানুষ হেসে উড়িয়ে দিচ্ছে এমনতর কথা-বার্তা।
 
‘বাংলাদেশ ও ভারত সরকারের মধ্যে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা রূপরেখা’ সংক্রান্ত সমঝোতা স্মারকের  অধীনে  ‘কৌশলগত ও ব্যবহারিক শিক্ষা ক্ষেত্রে সহযোগিতা বাড়াতে’ ঢাকার মিরপুরের ডিফেন্স সার্ভিস কমান্ড অ্যান্ড স্টাফ কলেজ ও ভারতের তামিলনাডু রাজ্যের ওয়েলিংটনে (নিলগিরি) ডিফেন্স সার্ভিস স্টাফ কলেজের মধ্যে সমঝোতা হয়। এছাড়া ‘জাতীয় নিরাপত্তা, উন্নয়ন ও কৌশলগত শিক্ষার ক্ষেত্রে সহযোগিতা বাড়াতে’ ঢাকার ন্যাশনাল ডিফেন্স কলেজ ও নয়া দিল্লির ন্যাশনাল ডিফেন্স কলেজের মধ্যে সমঝোতা স্মারক সই হয়। সামরিক সহায়তা নিয়ে একটি ঋণ চুক্তি সই হয়েছে। তবে আমাদের পররাষ্ট্রসচিব বলেছেন, এ ঋণ দিয়ে ভারত থেকেই অস্ত্র কিনতে হবে এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। ভারত অস্ত্র দেবে কোত্থেকে? ভারত নিজেই বিশ্বের শীর্ষ অস্ত্র আমদানিকারক রাষ্ট্র। হতে পারে, ভারত অন্য কোনো রাষ্ট্র থেকে অস্ত্র কিনে একটু বেশি দামে বাংলাদেশে বিক্রি করতে চাইতে পারে। হালকা অস্ত্র আমাদের দেশেও বানানো যায়। ভারী অস্ত্র ভারত নিজেও বানাতে পারে না।
 
তবে কানেক্টিভিটির এই যুগে ভারত-বাংলাদেশের সরকারি এবং জনগণের পর্যায়ে যোগাযোগ না বাড়ানোর কোনো সুযোগ নেই। একটা ভালো উদাহরণ হতে পারে বর্ডার হাট স্থাপন। বর্ডার হাট কিন্তু কাজে লেগেছে। দিল্লিতে বঙ্গবন্ধুর নামে রাস্তার নামকরণও একটা বড় বিষয় নিঃসন্দেহে। ভারতের অনেক মানুষ বাংলাদেশের ইতিহাস জানেনা।  বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মান দেখাতে মোদি যেসব ঘোষণা দিয়েছেন সেগুলো ইতিবাচক। ভারতের অনেক মানুষতো মুক্তিযুদ্ধে আমাদের বীরত্বগাঁথা স্বীকারই করতে চায় না। এর আগে গুন্ডে সিনেমাতে বঙ্গবন্ধুকে অবমাননাকর উপস্থাপনের প্রতিবাদ জানিয়ে বাংলাদেশে চলচ্চিত্রটি নিষিদ্ধ করেছিল বর্তমান সরকার। রেল ও বাসযোগাযোগ বৃদ্ধিও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বুদ্ধি করে বাংলাদেশের চ্যানেলগুলো ভারতে প্রদর্শনের রাস্তা সহজ করতে পারলে ভালো হত। ডিজেল আনতে সুপারফাস্ট পাইপলাইন উদ্বোধন, বিদ্যুৎ খাতে ভারতীয় বিনিয়োগ আনয়ন, বঙ্গবন্ধুর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ গ্রন্থের হিন্দি সংস্করণ প্রকাশ, ইত্যাদি বিষয়ের গুরুত্ব অনেক। কিন্তু তিস্তার পানি ইস্যুতে ভারতের ইচ্ছাকৃত অসহযোগিতার কথাই মনে রাখবে মানুষ বেশি।
 
লেখক: সহকারী অধ্যাপক, সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম অধ্যয়ন বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়    

আরও সংবাদ