Widget by:Baiozid khan
শিরোনাম:

ঢাকা Mon June 25 2018 ,

নারী, নারীত্ব, যৌন হয়রানি

Published:2017-04-18 19:01:55    
নারী , নারীত্ব, যৌন হয়রানি- কথাগুলো আজ সমার্থক হয়ে যাচ্ছে আমাদের দেশে। একই সমাজে বসবাস করে শুধুমাত্র নারীত্বের কারণে একজন পুরুষের থেকে আমি অন্যভাবে বেড়ে উঠব, যৌন হয়রানির শিকার হব- কিন্তু কেন? কেন আমাকে ভুলতে হবে, একজন নারীর আদলে বাস্তবিকপক্ষে আমি একজন মানুষ? একজন পুরুষের মত আমারও নিজস্ব ভুবন আছে, মনন আছে। "মানুষ" আমার প্রথম পরিচয়- নারীত্ব দ্বিতীয়তে। কেন আমার প্রথম পরিচয় অস্পষ্ট করে দ্বিতীয় পরিচয়ে শুধুমাত্র পরিচিত হতে হবে?
আমার নিজের জীবন থেকে আমি কিছু বলতে চাই। শালীন পোশাক বলতে যা বোঝায়, তার জ্ঞান আমার আছে- কোথায় কি পরতে হবে , আর দশটা বাঙালি মেয়ের মত সেভাবেই দেশে আমি চলাফেরা করেছি। কিন্তু উটকো লোকের ঝামেলা কোনদিন কমেনি। বাসায় এসে লজ্জায় কেঁদেছি, কমবয়সের কারণে অনেক সময় নিজের বাবা- মাকেও বলা যায়নি সেই অপমানকর পরিস্থিতির কথা। ভারি বইয়ে ভরা জিন্সের ব্যাকপ্যাক একদিন ঘুরিয়ে ছুঁড়ে মেরেছিলাম এক লোকের (!!!!!!) ওপর- যে ফুটপাতের ভীড়ের ভেতর আমার পেছন স্পর্শ করছিল ক্রমাগত- একবার, দুইবার, তিনবার- বারবার। ব্যথায় কুঁচকে ওঠা চেহারা দেখে কিছুটা হলেও শান্তি পেয়েছিলাম। এবার বলুন, এক লাজুক কিশোরী কোন পরিস্থিতিতে একজন সম্পূর্ণ অপরিচিত মানুষকে শারীরিক আঘাত করে শান্তি পায়? কেন সে এই ঋণাত্মক শান্তিটা পাবে? কেন এক কিশোরীর গোলাপিরঙা ভুবনে আপনারা একরাশ কালি ছিটিয়ে দেন?
বাংলাদেশে আমার অভিজ্ঞতা আর দশটা মেয়ের প্রতিদিনের অভিজ্ঞতার মতই। আমি জানি, ইভটিজিং এর শিকার হয়ে কেউ প্রতিবাদ করছে, কেউ নীরবে কাঁদছে। কিন্তু ইচ্ছের বিরুদ্ধে এই অভিজ্ঞতার মুখোমুখি আমি কেন হব? শুধুমাত্র নারীত্বের কারণে? কিছু অতিমাত্রার পুরুষের বাণী বাদই দিলাম, পহেলা বৈশাখে টিএসসির ঘটনায় খোদ একজন মেয়েকে এই কথা বলতে দেখলাম- মেয়েরা কেন মেলায় যাবে? হজ্জে তো এমন সমস্যা হয় না। সেই আপুকে আমার প্রশ্ন, আপনি মানুষ তো? আপনি কি নিজেকে মানুষ ভাবেন? নাকি অন্যকিছু? আপনি কি অন্তঃপুরবাসিনী হয়ে জীবন চালাবেন বলে স্থির করেছেন? আপনার নিজের মেয়ে থাকলে তাকে নিয়ে কি ভাবনা আপনার? সেও অন্তঃপুরবাসিনী হবে? চমৎকার! মেলার কথা বাদ দিলাম আপু আর ভাইয়ারা- যারা কাপড় দিয়ে আচার আচরণের শিক্ষা দিতে চান। দৈনন্দিন জীবনে বাজার, রাস্তাঘাট, চাকুরি, বেড়ানো- আপনারা স্বস্তিতে আছেন তো? স্বাভাবিক জীবন কাকে বলে- জানেন কি? শুনতে খারাপ শুনালেও আমি বলব, দেশের বাইরে এসে আমি স্বস্তিতে রাস্তাঘাটে চলাফেরা করি। আপনাদের যাদের মুখে পশ্চিমা অপসংস্কৃতির কথা শুনি, তাদেরকে বলব, আপনারা পারলে একবার পশ্চিমে এসে ঘুরে যাবেন, কিছুদিনের জন্য হলেও। বাংলা সিনেমা দেখে যেমন বাংলাদেশ সম্পর্কে ধারণা পাবেন না, পশ্চিমা মুভি দেখেও পশ্চিম সম্পর্কে সম্পুর্ণ ধারণা পাবেন না। আপনাকে কিছুদিন বসবাস করে জানতে হবে এখানকার "অপসংস্কৃতি" সম্পর্কে, জানতে হবে এদের শিক্ষার ধরণ। সভ্যতা কাকে বলে শিখে যাবেন। স্বাভাবিক জীবনের সংজ্ঞা কেমন হয় দেখে যাবেন।
শিক্ষা মানে কখনই পুঁথিগত বিদ্যা নয়, কিছু কাগজের সার্টিফিকেট নয়। শিক্ষা মানে নিজের ভেতর কিছু মূল্যবোধ জাগ্রত করা। অন্যের সাথে আমার আচরণ কেমন হওয়া উচিত, ভালো-মন্দ বোঝার ক্ষমতা, সহিষ্ণুতা, দায়িত্ববোধ- আর অনেক কিছুর এক সমন্বিত প্যাকেজ। বই পড়ে আমরা কিছুটা শিখি, বাস্তবজীবনে শিখি তার থেকে অনেক বেশি। আমি নিজেও ভুলে ভরা একজন মানুষ- তবু আমি শিখতে চাই। একজন সিএনজি চালকের ছবি দেখলাম ফেইসবুকে, কিছুদিন আগে। পঞ্চাশ হাজার টাকার ওয়ালেট আর মোবাইল দিয়ে গেছেন সেগুলোর প্রকৃত মালিককে- যিনি ভুলবশতঃ ফেলে এসেছিলেন সেই বাহনে। আমি সেই চালকের কাছ থেকে কিছুটা হলেও নৈতিকতা শিখি। এক শিশুর কাছে আমি সততার শিক্ষা নেই। তথাকথিত শিক্ষা নয়, প্রকৃতির সব অনুসঙ্গের কাছ থেকে আমি প্রতিনিয়ত শিখি। শিক্ষার শেষ নেই।
আশা করব, সরকারী আইন প্রয়োগকারী সংস্থা এই যৌন হয়রানি ঘটনার সাথে জড়িতদের জন্য সর্বোচ্চ শাস্তির ব্যবস্থা করবে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে কঠোর আইন প্রণয়নের বিকল্প নেই। আর সেইসাথে ছোট-বড় সব নারীদেরকে বলব, আপনার প্রতি যে কোন অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করবেন- সাথেসাথে। আপনার ইচ্ছের বিরুদ্ধে কিছু ঘটামাত্র প্রতিবাদ করতে শিখুন। আপনার জীবন, আপনার মনন, আপনার শরীর- এসব কিছুর অধিকারী শুধুমাত্র আপনি। লজ্জিত বা কুন্ঠিত হবেন না। সাহায্য চাইতে কখনো দ্বিধাবোধ করবেন না। কাপুরুষ, কুলাঙ্গারদের পাশাপাশি সত্যিকার মানুষরাও আপনার পাশেই আছে- কেউ না কেউ আপনার সাহায্যার্থে অবশ্যই এগিয়ে আসবে।
"পার্সোন্যাল স্পেস" বলে একটি টার্ম আছে। এটা আপনার নিজস্ব বলয় ভাবতে পারেন। আপনি কাকে এই বলয়ের ভেতর স্থান দেবেন, কি দেবেন না- এই অধিকারটুকু সম্পূর্ণই আপনার এক্তিয়ারে। নিজের ইচ্ছের বিরুদ্ধে কাউকে জোর খাটাতে দেবেন না। আপনি চিন্তা ভাবনায় একজন সম্পূর্ণ মানুষ। নিজেকে দেখাশুনার দায়িত্ব আপনার নিজেরই।একজন মানুষ হিসেবে এই পৃথিবীতে নিজের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হন।
সংগ্রহে-
রবিউল ইসলাম রবি
শিক্ষক, সাংবাদিক ও সমাজকর্মী
শিবগঞ্জ, বগুড়া।

আরও সংবাদ