Widget by:Baiozid khan
  • Advertisement

ফরাসী বিপ্লব: নেপোলিয়ন থেকে ম্যাকরোন

Published:2017-05-13 11:10:03    
ফ্রান্সের ভাগ্যাকাশে উল্কারগতিতে আবির্ভূত হয়েছেন সাবেক ব্যাংকার ও তরুণ্যনির্ভর রাজনৈতিক প্রতিভা ইমানুয়েল ম্যাকরোন। গত ৭ মে’র দ্বিতীয় দফার নির্বাচনে এই ভাগ্যের বরপুত্র বিপুল ভোটের ব্যবধানে আগামী মেয়াদের জন্য ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন। ফরাসী স¤্রাট নেপোলিয়ন বোনাপার্টের পর তিনিই ফান্সের সর্বকনিষ্ঠ শাসক হিসাবে নিজেকে আবিস্কার করলেন। ম্যাকরোনের জীবনের বৈচিত্র শুরু হয়েছিল তার পারিবারিক জীবন দিয়েই। তিনি তার বান্ধবীর মা, তার স্কুল শিক্ষিকা ও তার চেয়ে ২৪ বছরের জ্যেষ্ঠা এক মহিলা ব্রিজিতকে বিয়ে করে দেশে-বিদেশে আলোচনার কেন্দ্র বিন্দুতে পরিণত হয়েছিলেন। মনে করা হয় এই অসম বয়সী যুগল এখন সফল দম্পতি। এ বিষয়ে ম্যাকরোন দম্পতির আত্মস্বীকৃতিও রয়েছে। মাত্র ৩৯ বছর বয়সী ম্যাকরোন ৬৩ বয়সী স্ত্রী ব্রিজিতকে প্রেরণার বাতিঘর হিসাবে উল্লেখ করেছেন। যা তাদের মধুময় দাম্পত্য জীবনের দিকেই অঙ্গলী নির্দেশ করে। 
ম্যাকরোন যে বয়সে এবং নাটকীয়তায় ফ্রান্সের ভাগ্য নিয়ন্তা হিসাবে আবির্ভূত হলেন তা বিশ্ব ইতিহাসে কালেভদ্রেও দেখা যায় না। অবশ্য ইন্দোনেশীয় প্রেসিডেন্ট জোকো উইডোডো ক্ষেত্রে কিছুটা নাটকীয়তা থাকলেও তা ছিল দীর্ঘ পথপরিক্রমার ফসল। ফরাসী স¤্রাট নেপোলিয়ন বোনাপার্টও মাত্র বত্রিশ বছর বয়সে ফ্রান্সের স¤্রাট হিসাবে আবির্ভূত হয়েছিলেন। কিন্তু তার জীবনে ম্যাকরোনের মত নাটকীয়তা ছিল না। অনেক ঘাত-প্রতিঘাত-সংঘাত মোকাবেলা করেই তাকে সামনের দিকে এগুতে হয়েছিল। কিন্তু ইমানুয়েল ম্যাকরোন ফরাসী রাজনীতিতে যেভাবে ধুমকেতুর মত আবির্ভূত হলেন তাকে অভিনব ও অদ্বিতীয় বলা ছাড়া উপায় থাকে না। এখানেই ম্যাকরোনের স্বকীয়তা ও বিশেষত্ব দৃশ্যমান। যা বিশ্ব ইতিহাসে অদ্বিতীয় ও নজীবিহীন।
নেপোলিয়ন বোনাপার্টের জন্ম ১৫ই আগস্ট, ১৭৬৯; এজাক্সিউয়ের করসিকাতে। মৃত্যু ৫ই মে, ১৮২১; সেন্ট হেলেনায়। তিনি  ছিলেন ফরাসি বিপ্লবের সময়কার একজন জেনারেল। তিনি ফরাসি প্রজাতন্ত্রের প্রথম কনসল ( ঋরৎংঃ ঈড়হংঁষ ) । তিনি নেপোলিয়ন-১ নামে ১১ নভেম্বর, ১৭৯৯ থেকে ৬ এপ্রিল ১৮১৪ পর্যন্ত ফ্রান্সের সম্রাট ছিলেন এবং পুনরায় ১৮১৫ সালের ২০ মার্চ থেকে ২২ জুন পর্যন্ত স্বল্প সময়ের জন্য ফ্রান্সের সম্রাট ছিলেন। তিনি ইতালির রাজাও ছিলেন। এছাড়া তিনি সুইস কনফেডারেশনের মধ্যস্থাকারী এবং কনফেডারেশন অফ রাইনের রক্ষকও ছিলেন। তাই তার উত্থান-পতন মোটেই কাকতালীয় নয়। কিন্তু ফ্রান্সের নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্টের উত্থানটা একেবারেই কাকতালীয়ই বলা চলে। 
মূলত নেপোলিয়নের উত্থান ও তিরোধান ছিল বেশ ঘটনাবহুল। তাঁর নেতৃত্বে ফরাসি সেনাবাহিনী এক দশকের বেশি সময় ধরে সকল ইউরোপীয় শক্তির সাথে যুদ্ধে অবতীর্ণ হয় এবং তিনি ইউরোপের অধিকাংশ অঞ্চল তাঁর আয়ত্বে নিয়ে আসেন। ১৮১২ সালে সংগঠিত বিপর্যয়কারী রাশিয়া আগ্রাসন একটি যুগসন্ধিক্ষণ হিসেবে বিবেচিত হয়। রাশিয়া আগ্রাসন এবং ১৮১৩ সালে লিপজিগে পরাজয়ের পর ষষ্ঠ কোয়ালিশন ফ্রান্সে আগ্রাসন চালায় এবং এর ফলস্বরূপ নেপোলিয়ন ১৮১৪ এর এপ্রিলে পশ্চাৎপসারণ করতে বাধ্য হন। কিছুদিন পরেই নেপোলিয়ন একটি অভিযান চালান যা হান্ড্রেড ডেস নামে পরিচিত। কিন্তু নেপোলিয়ন ১৮১৫ সালের ১৮ জুন ওয়াটারলুতে পরাজিত হন। নেপোলিয়ন তাঁর জীবনের বাকী ছয় বছর ব্রিটিশদের তত্ত্বাবধানে আটলান্টিক মহাসাগরের দ্বীপ সেন্ট হেলেনাতে কাটান।
প্রসঙ্গতই ইমানুয়েল ম্যাকরোনের জীবন ঘটনা বহুল নয় বরং বেশ নাটকীয়তা ভরা। যদিও সবে তার ক্ষমতার কেন্দ্রে পদার্পনের শুভ সূচনা হয়েছে মাত্র। তাই আগামী দিনে তার ভাগ্যে কী ঘটে তা দেখার জন্য অবশ্য বিশ^বাসীকে অপেক্ষা করতে হবে। মূলত  ফ্রান্সের রাজনীতিতে বাম ও ডানপন্থী রাজনৈতিক প্রধান দু’টি ধারার বাইরে ১৯৫৮ সালের পর ইমানুয়েল ম্যাকরোনই প্রথম ব্যক্তি, যিনি দেশটির প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলেন। প্রসঙ্গত, ২০০৯ সালে স্বাধীন রাজনীতিক হওয়ার আগে তিনি তিন বছর ফরাসি সমাজতান্ত্রিক দলের সদস্য ছিলেন। পরে বর্তমান ফরাসি প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়া অলন্দের ব্যক্তিগত কর্মীদলের সদস্য হন এবং পরবর্তীতে প্রধানমন্ত্রী ম্যানুয়েল ভালাসের নেতৃত্বাধীন সরকারের অর্থ, শিল্প ও ডিজিটাল অ্যাফেয়ার্স মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। 
দুই বছর মন্ত্রীত্ব করার পরই তাতে ইস্তাফা দিয়ে ২০১৬ সালে নিজের দল ‘এগিয়ে যাও’ আন্দোলন প্রতিষ্ঠা করেন। তার মাত্র এক বছরের মধ্যেই তিনি ফরাসি রাজধানীর প্রতিষ্ঠিত সব ধারাকে ধরাশায়ী করে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলেন। যা ছিল ইতিহাসের স্মরণীয় ও বরণীয় ঘটনা।  উত্তর ফ্রান্সের আমিয়েঁর চিকিৎসক দম্পতির ঘরে জন্ম নেওয়া ম্যাকরন তার চেয়ে বয়সে ২৪ বছরের বড় নিজের স্কুল টিচারকে বিয়ে করেন। বর্তমানে ৬৩ বছর বয়সী স্ত্রী ব্রিজিতের সাতজন নাতি-নাতনি রয়েছে। ১৫ বছর বয়সে প্রাইভেট স্কুলের বিবাহিত এই শিক্ষকের সঙ্গে ম্যাকরোনর পরিচয় হয় এবং তা পরিণয়ের রূপ লাভ করে।  
ফ্রান্সের দিগি¦জয়ী বীর নেপোলিয়নের পর সবচেয়ে তরুণ বয়সে দেশটির ক্ষমতার শীর্ষে উঠেছেন মাত্র তিন বছর আগেও জনসাধারণের কাছে অপরিচিত ইমানুয়েল ম্যাকরোন। গত ৭ মে নিজের ৪০ তম জন্মদিনের কয়েক মাস আগে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন তিনি। এক বছর আগেও তার নিজের কোনো রাজনৈতিক দল ছিল না। ছিলেন বর্তমান প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়া অলন্দের একজন উপদেষ্টা। মাত্র এক বছর আগে সরকারি পদ ছেড়ে নিজের রাজনৈতিক দল ‘এন মাচর্’ বা ‘এগিয়ে যাও’ গঠন করেই বাজিমাত করলেন ম্যাকরোন। যা তার যাদুকরী ক্যারিশমা হিসাবে স্বীকৃতি দিচ্ছেন আন্তর্জাতিক বোদ্ধামহল। 
সাবেক ব্যাংকার ম্যাকরোন ফরাসি রাজনীতির প্রজন্ম বদলের দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটিয়েছেন। যে রাজনীতিতে বছরের পর পর বছর ধরে কতগুলো পরিচিত মুখই সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করেছে। জি-৭ দেশগুলোর মধ্যে এখন ম্যাকরোনই সবচেয়ে তরুণ নেতা। এসব দেশের সব নতুন-পুরাতন তরুণ নেতার চেয়েও ম্যাকরোন তরুণতর, তা হালের কানাডীয় প্রেসিডেন্ট জাস্টিন ট্রুডোই হোন আর সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডি হোন। ফ্রান্সের অভিজাত ন্যাশনাল স্কুল অব অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের গ্রাজুয়েট ম্যাকরোন। তিনি কর্মক্ষেত্রে যোগ্যতার  স্বাক্ষর রাখতে সক্ষম হয়েছেন।
 
 
 
দ্বিতীয় দফা নির্বাচনে বিজয়ের পর ফ্রান্সের নয়া প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাকরোনকে বেশ প্রতিশ্রুতিশীল ও প্রত্যয়ী বিশ্বনেতা মনে হয়েছে। বয়সে তরুণ হলেও তার বক্তব্যে বেশ মুন্সীয়ানার ছাপ দৃশ্যমান।  বিজয় ভাষণে ফরাসি বিপ্লবের সাম্য-মৈত্রী-স্বাধীনতার ঐতিহ্যকেই সামনে এনেছেন নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাকরোন। তিনি বলেছেন, আলোকায়নের (এনলাইটেনমেন্ট) সেই ইতিহাসে নতুন অধ্যায় সূচনার দিন এসেছে। নতুন দিনের সেই ইতিহাসে জনগণের আস্থা ও বিশ্বাসের প্রতীক হয়ে উঠতে চান নেপোলিয়নের পর কনিষ্ঠতম এই রাষ্ট্রপ্রধান। দ্বিতীয় দফার নির্বাচনে ম্যাকরোন পেয়েছেন ৬৬.৬ শতাংশ ভোট। তার প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী মেরিন লে পেন পেয়েছেন ৩৩.৯৪ শতাংশ ভোট। নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পর ফ্রান্সের ইতিহাসে নতুন অধ্যায় রচনার আশ্বাস দিয়ে ম্যাকরোন বলেন, আমি জনগণের আকাঙ্খা ও বিশ্বাসের প্রতীক হয়ে উঠতে চাই। 
জাতীয় এবং ইউরোপীয় ঐক্যের প্রশ্নে ম্যাকরোন  বলেন, আমি আপনাদের ক্ষোভ, উৎকণ্ঠা, শঙ্কার কথা শুনেছি। যেসব শক্তি ফ্রান্সকে বিভক্ত করে পদানত করতে চায়, আমি তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করে যাব। আমি জাতীয় ঐক্য নিশ্চিত করবো। ইউরোপের ঐক্য নিশ্চিত করবো। পুরো বিশ্ব আজ আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে। আমরা এনলাইটেনমেন্টের চেতনাকে রক্ষা করবো, যা বহু জায়গায় হুমকির সম্মুখীন হয়েছে। ম্যাকরোন আরও বলেন, গণতন্ত্রের বড় লড়াইয়ের পর ফ্রান্সের মানুষ আমাকে বিশ্বাস করে নির্বাচিত করেছে। এটা অনেক সম্মানের। আপনারা জিতেছেন, জিতেছে ফ্রান্স। 
ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে মধ্যপন্থী ইমানুয়েল ম্যাকরোন নিরঙ্কুশ ব্যবধানে জয়ের পর জার্মান চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মার্কেল, ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে, ইউরোপীয় কমিশনের প্রধান জ্যঁ ক্লদ ইয়োঙ্কার, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পসহ বিভিন্ন দেশের নেতারা অভিনন্দন জানিয়েছেন। নির্বাচনে ম্যাকরোন পেয়েছেন ৬৬.৬ শতাংশ ভোট। তার প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী মেরিন লে পেন পেয়েছেন ৩৩.৯৪ শতাংশ ভোট। জ্যঁ ক্লদ ইয়োঙ্কার এক টুইটবার্তায় বলেন, ফরাসিরা ইউরোপীয় ভবিষ্যতের দিকে সমর্থন দেওয়ায় আমরা খুবই খুশি। এক সঙ্গে আমরা এক শক্তিশালী ও ন্যায়ভিত্তিক ইউরোপ গড়তে চাই। নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার পর ম্যকরোনের সঙ্গে ফোনে কথা বলেছেন অ্যাঙ্গেল মার্কেল। জার্মান চ্যান্সেলরের মুখপাত্র স্তেফান সেইবার্ট এক টুইট বার্তায় বলেন, অভিনন্দন ইমানুয়েল ম্যাকরোন। আপনার এ জয় শক্তিশালী ও ঐক্যবদ্ধ ইউরোপ গড়া এবং ফরাসি-জার্মান বন্ধুত্বের জয়। টুইটারে ম্যাকরোনকে অভিনন্দন জানিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, বড় ব্যবধানে বিজয়ের মধ্য দিয়ে ফ্রান্সের পরবর্তী প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ায় ম্যাকরোনকে অভিনন্দন। আমি তার সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহী। 
এদিকে নির্বাচনী ফলাফল ঘোষণার পর ফ্রান্সে অনেকটা ‘রাজনৈতিক ভূমিকম্প’ ঘটিয়েছেন ইমানুয়েল ম্যাকরন; ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জয়ী হয়ে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন তিনি-এমন সব ইতিবাচক মন্তব্য করেছে পশ্চিমা গণমাধ্যমগুলো। মূলত ম্যাকরোন এর আগে কখনো প্রেসিডেন্ট নির্বাচন করেননি। এক বছর আগে তিনি বিদায়ী প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়া ওলাঁদ সরকারের সদস্য ছিলেন। ফ্রান্সের ইতিহাসে সবচেয়ে অজনপ্রিয় প্রেসিডেন্টদের মধ্যে ওলাঁদ অন্যতম। ওলাঁদ সরকারে যোগ দেওয়ার আগে মাক্রো ফরাসিদের মাঝে খুব একটা পরিচিত ছিলেন না। অথচ ৩৯ বছর বয়সী এই মাক্রোই ফ্রান্সের পরবর্তী প্রেসিডেন্ট।
মূলত দুই দফার নির্বাচনে দেশটির মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলোর প্রার্থীদের পেছনে ফেলে শেষ হাসি হাসছেন ম্যাকরোন। তিনি প্রথমে মধ্য বাম ও মধ্য ডানপন্থী প্রার্থীদের পরাজিত করেন। আর গতকাল রোববার অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় দফায় ভোটে পরাজিত করেন কট্টর ডানপন্থী প্রার্থীকে। দ্বিতীয় দফায় মধ্য ডানপন্থী মাক্রো পেয়েছেন ৬৬ দশমিক শূন্য ৬ শতাংশ ভোট। তার প্রতিদ্বন্দ্বী কট্টর ডানপন্থী মারিন লো পেন পেয়েছেন ৩৩ দশমিক ৯৪ শতাংশ ভোট।
তরুণ রাজনীতিক ইমানুয়েল ম্যাকরোন কাকতালীয়ভাবে এমন সাফল্য কীভাবে পেলেন তা নিয়ে চলছে বোদ্ধামহলে চুলচেরা বিশ্লেষণ। নানা জন নানা কথা বললেও বিবিসি অনলাইন বলছে ভিন্ন কথা।  গত  ৮ মে প্রচারিত এক প্রতিবেদনে ম্যাকরোর জয়ের পাঁচটি কারণ চিহ্নিত করেছে এই আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমটি। কারণগুলো হলো:
১.ভাগ্য 
নিঃসন্দেহে মাক্রো ভাগ্যবান। তাই তাকে ভাগ্যের বরপুত্র বলায় অধিক শ্রেয়।  প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জয়ী হওয়ার ক্ষেত্রে ভাগ্য তার সহায় হয়েছিল। কেলেঙ্কারির কারণে শুরুতেই নির্বাচনী লড়াই থেকে বাদ যান মধ্য ডানপন্থী প্রার্থী ফ্রাঁসোয়া ফিওঁ। সোশ্যালিস্ট প্রার্থী বেনোট হ্যামনও বাদ পড়েন। ফরাসি বিশ্লেষক মার্ক অলিভার বলেন, ম্যাকরোন খুবই ভাগ্যবান। কারণ, পুরোপুরি একটি অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতি মোকাবিলা করেছেন তিনি। আর তিনি তার ভাগ্য সুপ্রসন্ন হওয়ার জন্য শ্রমও দিয়েছে। তাই পরিশ্রম সৌভাগ্যের প্রসূতি হিসাবে দেখা দিয়েছে। 
২. বিচক্ষণতা
ভাগ্যের পাশাপাশি ম্যাকরোনের বিচক্ষণতাও তার জয়ে অবদান রেখেছে বলেই মনে করা হচ্ছে। নির্বাচনে সোশ্যালিস্ট প্রার্থী হতে পারতেন । তবে সে পথে হাঁটেননি তিনি। সোশ্যালিস্ট পার্টির টিকিটে যে জয়লাভ করা যাবে না, তা তিনি বুঝতে পেরেছিলেন। এ ক্ষেত্রে তিনি বিচক্ষণতার পরিচয় দিয়েছেন এতে কোন সন্দেহ নেই। মূলত ইউরোপের পরিস্থিতি দেখে শিক্ষা নেন ম্যাকরোন। রাজনীতিকদের ব্যর্থতায় নিজ দেশে সৃষ্টি হওয়া সুযোগ কাজে লাগান তিনি। যা তাকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। ২০১৬ সালের এপ্রিলে ম্যাকরোন নিজের দল গঠন করেন। পরে ওঁলাদের সরকার ছাড়েন। এখানেও তিনি দুরদর্শিতার পরিচয় দিয়েছেন।
৩. নতুনত্ব
ফ্রান্সে নতুন কিছু করার চেষ্টা করেছেন ম্যাকরোন। আর এমন ইতিবাচক মনোভাবই তাকে নির্বাচনে বেশ আনুকুল্য দিয়েছে।  তিনি তার দেশের মানুষের মন বুঝতে পেরেছিলেন। জানতে পেরেছিলেন তাদের হতাশা ও আর্তির কথা। ম্যাকরোন  তৃণমূলকে অধিক গুরুত্ব দিয়েছিলেন। নির্বাচনের অনেক আগে থেকেই ভোটারদের কাছে পৌঁছেছিলো তার দল।  প্যারিসভিত্তিক ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক এমিলি স্কুলথিস বলেন, ২০০৮ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে বারাক ওবামার নেওয়া কৌশল কাজে লাগায় ম্যাকরোনের দল। যা দলের বিজয়কে হাতের মুঠোয় এনে দেয়।
৪. ইতিবাচক বার্তা
ওলাঁদের অর্থমন্ত্রী ছিলেন ম্যাকরোন। এ সময় ফ্রান্সে সরকারি ব্যয় কমানোর বড় ধরনের উদ্যোগ নিয়েছিলেন তিনি। মাক্রো নিজেকে ওঁলাদে পরিণত করেননি। বিশ্লেষক মার্ক অলিভার বলেন, ফ্রান্সজুড়ে একটা হতাশা ছিল। এর মধ্যে আশার বাণী নিয়ে আসেন ম্যাকরোন। তিনি জনগণকে ইতিবাচক বার্তা দেন। কী করবেন, তা বলেননি তিনি। মানুষ কীভাবে সুযোগ পেতে পারে, সেই কথা বলেছেন। এই ধরনের বার্তা তিনিই শুধু দিয়েছেন।
৫. লো পেনের বিপরীত
ম্যাকরোনের  ইতিবাচক মনোভাবের বিপরীত অবস্থানে ছিলেন লো পেন। তার কণ্ঠজুড়ে ছিল নেতিবাচক কথাবার্তা। তিনি অভিবাসনবিরোধী, ইউরোপীয় ইউনিয়নবিরোধী, পদ্ধতিবিরোধী। কিন্তু ম্যাকরোনের নির্বাচনী সভায় বৈচিত্র্য ছিল। ছিল উৎসবমুখর পরিবেশ। আর লো পেনের সভায় হাঙ্গামা, বিশৃঙ্খলা লেগে থাকত। থাকত পুলিশের ব্যাপক উপস্থিতি। লো পেন ভীতির সঞ্চার করেছিলেন। অন্যদিকে, ভয়কে জয় করে আশার কথা শুনিয়েছিলেন ম্যাকরোন। নির্বাচনে জয়ের পরও ম্যাকরোন বলেছেন, তাঁর দায়িত্ব হবে ভীতি দূর করা। আশাবাদ জাগানো। 
ফ্রান্সের রাজনীতিতে ম্যাকরোনের আবির্ভাব ধুমকেতুর মতই বলতে হবে। নতুন দল গঠন করে এতো অল্প সময়ের মধ্যে পর্বততুল্য সাফল্য অভূতপূর্ণ ও নজীরবিহীন। আর তার বয়সের বিষয়টিও বিশ^বাসীর নজর কেড়েছে। তাই ম্যাকরোনের এই ভূমিধ্বস বিজয়কে কেউ নয়া ফরাসী বিপ্লব বলেও উল্লেখ করেছেন। স¤্রাট নেপোলিয়ন ফরাসী বিপ্লবের নায়ক হলেও নয়া ফরাসী বিপ্লবের মহানায়ক হিসাবেই দেখা হচ্ছে নবনির্বাচিত ফরাসী প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাকরোনকে। তবে তিনি শুভ সূচনা করেছেন সবে। তাই তার পথচলা কতখানি নির্বিঘœ হবে বা তিনি তার কার্যকালে কতখানি সফল হবেন তা বলার সময় এখনও আসেনি। তবে তার জন্য বিশ^বাসীর শুভ কামনা রয়েছে। আর তিনি সফল হবেন বলেই বিশ^বাসী প্রত্যাশা করে। 
 

আরও সংবাদ