Widget by:Baiozid khan
শিরোনাম:

ঢাকা Mon September 24 2018 ,

বিচারপতি সিনহা নিয়ে বিতর্ক : জিতবে কে ?

Published:2017-08-27 20:31:16    

তৈমূর আলম খন্দকার

সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী আপিল বিভাগে চূড়ান্তভাবে বাতিল হওয়ার পর আলোচনা-সমালোচনার স্তর এখন সীমালঙ্ঘন থেকে ‘কে হারে কে জেতে’ এ প্রতিযোগিতার মাঠে রয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নিজে। প্রধানমন্ত্রী ও তার দল মনে করছে, রায়ে মুক্তিযুদ্ধের প্রশ্নে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে অবহেলা বা খাটো করা হয়েছে। এ বিষয়টি মাথায় রেখেই সরকার ও সরকার ঘরানার প্রতিটি স্তরের নেতানেত্রীদের পক্ষ থেকে যেসব বক্তব্য রাখা হচ্ছে, তা বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহাকে লক্ষ্যবস্তু করেই। বিচারপতি সিনহা প্রধান বিচারপতি হওয়ার পেছনে প্রধানমন্ত্রীর অবদান মনে করেও তিনি ও তার দল বর্ণিত বিষয়ে অত্যন্ত নাখোশ। কিন্তু বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা প্রধান বিচারপতি হিসেবে একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান, যেমন- রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী ও স্পিকার। আপিল বিভাগ রাষ্ট্রের তিন অঙ্গের অন্যতম অঙ্গ বিচার বিভাগের সর্বোচ্চ স্তর, যার প্রতি অসন্তুষ্টির প্রকাশভঙ্গি কতটুকু গড়াতে পারে তাই নির্ধারিত হওয়া দরকার; বিচার বিভাগ ও শাসন বিভাগের নিজ নিজ অধিক্ষেত্র নির্ধারণে প্রয়োজনে যা এখন জেদের বশবর্তী হলেও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে হাস্যকর বা খারাপ নজির সৃষ্টি না হয় সেদিকেই আমাদের সতর্ক থাকা বাঞ্ছনীয়।

ষোড়শ সংশোধনী বা সংবিধানের ৯৬(২) অনুচ্ছেদ প্রমাণ করে, প্রধান বিচারপতি বা বিচারপতিরা অসদাচরণ বা অযোগ্যতার প্রশ্নে জবাবদিহিতার ঊর্ধ্বে নন। রায় নিয়েও সমালোচনা করা যাবে, এটাও বর্তমান LAW OF JURISPUDENCE স্বীকার করে। অনেক স্বনামধন্য বিচারপতি এ মর্মে Verdict দিয়েছেন যে, Judgment is a public property। তাই এর সমালোচনা করা যাবে। কিন্তু বিচারপতিকে অভিযুক্ত করা যাবে কি না, এ মর্মে বিচারব্যবস্থায় শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত কোথাও সুনির্দিষ্টভাবে বলা নেই। যেমনটি বলা হয়েছে অসদাচরণ ও অযোগ্যতার প্রশ্নে। রায় নিয়ে বিক্ষুব্ধ হলে উচ্চ আদালতে আপিল বা রিভিশন করার বিধান রয়েছে। সংবিধানের ১০৩ অনুচ্ছেদ মোতাবেক সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ প্রদত্ত রায় বা আদেশ সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১০৫ মোতাবেক নিজ রায় ও আদেশ পুনর্বিবেচনা করতে পারেন। ওই অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘সংসদের যেকোনো আইনের বিধানাবলি সাপেক্ষে এবং আপিল বিভাগ কর্তৃক প্রণীত যেকোনো বিধি সাপেক্ষে আপিল বিভাগের কোনো ঘোষিত রায় বা প্রদত্ত আদেশ পুনর্বিবেচনার ক্ষমতা উক্ত বিভাগের থাকিবে।’

এতদসত্ত্বেও প্রধানমন্ত্রী ও তার সরকার বিভিন্ন বক্তব্য ও উচ্চপর্যায়ে বৈঠকের পর বৈঠক করে যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হচ্ছে তাকে উভয় পক্ষই তাদের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যাওয়ার মনোভাব ব্যক্ত করেছেন। বিচার বিভাগ, সরকার, রাষ্ট্র কোনোটাই কারো পৈতৃক সম্পত্তি নয়; বরং সময় সময় প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ পেয়ে চেয়ারের মর্যাদা কেউ সমুন্নত রেখেছেন বা কেউ ব্যত্যয় ঘটিয়েছেন। তবে উভয় বিভাগই জনগণের অর্থে জনগণের কল্যাণের জন্য লালিত। ফলে ন্যায়নীতির প্রশ্নে কোনো পক্ষ বিক্ষুব্ধ হলেই এমন কোনো সীমালঙ্ঘন করতে পারে না, যা ভবিষ্যতের জন্য একটি কালো নজির হয়ে দাঁড়ায়। ৮০৯টি অনুচ্ছেদের এই রায়ে আপিল বিভাগের সাতজন বিচারপতিই ঐকমত্য পোষণ করে রায়টি প্রণয়ন ও ঘোষণা করেছেন। ফলে এককভাবে কোনো বিচারপতি এ রায়ে প্রভাব বিস্তার করেছেন, তা বলা যাবে না। তার পরও প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধে যেসব বক্তব্য আসছে, তাতে কি তিনি অভিযুক্ত না সমালোচিত এটাই পর্যালোচনার বিষয়। বিষয়টি গুরুত্বের সাথে পর্যালোচনা অবশ্যই করা দরকার এ কারণে যে, এখানেই জাতিসত্তা শেষ হয়ে যাবে না, জাতি টিকে থাকবে রোজ কিয়ামত পর্যন্ত। তাই বারবার বলছি, সীমালঙ্ঘনের আগেই সীমা নির্ধারিত হওয়া বাঞ্ছনীয়।

সরকারি ঘরানার দায়িত্বশীলদের সম্প্রতি প্রদত্ত বক্তব্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেছেন, ‘বিচারপতি অপসারণসংক্রান্ত সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী আদালত যতবার বাতিল করবে সংসদে ততবারই নতুন করে এই সংশোধনী পাস করা হবে। বিচারপতিদের চাকরি সংসদই দেয়। সুতরাং তাদের অপসারণের ক্ষমতা সংসদের হাতেই থাকা উচিত।’ আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফ বলেছেন, ‘রাজনীতি করতে চাইলে বিচারপতির আসন ছেড়ে দিয়ে মাঠে আসুন। সাংবিধানিক পদে থেকে রাজনৈতিক কথাবার্তা বলে বিচার বিভাগকে কলুষিত করবেন না।’ শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু বলেছেন, ‘পার্লামেন্ট যদি অবৈধ হয়, তোমার নিয়োগও অবৈধ। কারণ এই পার্লামেন্ট রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করেছে। সেই রাষ্ট্রপতি তোমাকে নিয়োগ দিয়েছে। তোমার নিয়োগ অবৈধ, তুমি অবৈধ চিফ জাস্টিস।’ গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন বলেছেন, ‘আপনি যা ভাবছেন এবং মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষ শক্তির সাথে কণ্ঠ মিলিয়ে যা বলছেন তা ঠিক নয়। বাংলার মানুষ জানে- আপনি শান্তি কমিটির সদস্য ছিলেন।’ এলজিআরডি মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায়ে প্রধান বিচারপতি সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে কটাক্ষ করার ধৃষ্টতা দেখিয়েছেন।’ খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলাম বলেছেন, ‘তার যদি নৈতিকতাবোধ থাকে তাহলে তিনি স্বেচ্ছায় চলে যাবেন। না হলে আইনজীবীরা তার বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তুলবেন।’ খাদ্যমন্ত্রী আরো বলেছেন, তার (প্রধান বিচারপতি) যদি সামান্যতম জ্ঞান থাকে, সামান্যতম বুঝ থাকে তাহলে স্বেচ্ছায় চলে যাবেন। তা না হলে সেপ্টেম্বর মাস থেকে আইনজীবীরা তার বিরুদ্ধে দুর্বার আন্দোলন গড়ে তুলবেন।’ সংসদ সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী আবদুল লতিফ সিদ্দিকী (টাঙ্গাইল) বলেছেন, ‘রায় কোথা থেকে লেখা হয়েছে তা জানি, কিন্তু বলব না।’

রায়ে সরকারের যে হতাশা তাতে সরকারই ধরা খেয়েছে। কারণ মন্ত্রীদের কথা যখন জনগণ প্রত্যাখ্যান করছে তখন আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক পাল্টা বিবৃতি দিয়ে বলছেন, এটা দল বা সরকারের বক্তব্য নয়, বরং এটা ওমুক মন্ত্রীর ব্যক্তিগত মন্তব্য। শপথবাক্য পাঠ করে, রাষ্ট্রীয় ফাগ চড়িয়ে দায়িত্বপূর্ণ পদ অলঙ্কৃত করে কেউ কি ব্যক্তিগত বক্তব্য দিতে পারেন? যদি তাই হয় তবে দল বা সরকার থেকে কোনো সংশোধনী পদক্ষেপ নেয়া হয় না কেন? যেমনটি নেয়া হয়েছিল আবদুল লতিফ সিদ্দিকীর বেলায় ধর্ম নিয়ে কটূক্তি করার কারণে। মূলত দেখা যাচ্ছে, বক্তব্য দেয়ার পর যখন জনগণ থেকে প্রত্যাখ্যাত হয় তখনই দল বা সরকার থেকে বলা হয়, ব্যক্তিগত বক্তব্য। ব্যক্তিগত বক্তব্য যদি বেফাঁস হয় বা আদালত অবমাননার শামিল হয়, তবে সে মুখে তালা লাগানোর বিধান যখন রয়েছে তাও কার্যকর করার দায়িত্ব বিচার বিভাগের রয়েছে, এ বিভাগের ভাবমূর্তি সমুন্নত রাখার স্বার্থে।

অন্য দিকে সরকারি দল থেকে বলা হয়েছে, ‘এ রায় একটি ইংরেজি দৈনিক পত্রিকার সম্পাদক লিখে দিয়েছে।’ বাক্যটি সংক্ষিপ্ত হলেও এর অর্থ অনেক ব্যাপক। এ বক্তব্যটি সম্পূর্ণভাবে একটি অভিযোগ, যেখানে শুধু প্রধান বিচারপতিকে নয় বরং সম্পূর্ণ আপিল বিভাগকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। এর প্রমাণ করার দায়িত্ব কার? প্রধান বিচারপতি বলেছেন, তিনি রাজনৈতিক ফাঁদে পা দেবেন না। যদি তাই হয় তবে বিচার বিভাগ বা তিনি সরাসরি অভিযুক্ত হলেও কি তা খণ্ডাবেন না? তিনি আরো বলেছেন, জীবন দেবেন কিন্তু পিছু হটবেন না। এ বক্তব্যটিও নিশ্চয়ই বিচার বিভাগের স্বাধীনতার স্বার্থে। তবে কেন এ নীরবতা, নাকি পিছুটান!

রায়টি নিয়ে সরকারের যে টেনশন তা দিন দিন বেড়ে চলায় জনগণ নিশ্চিত- সরকার এখন বেকায়দায়, নতুবা প্রধানমন্ত্রী এ নিয়ে এত উদ্বিগ্ন কেন? ২১ আগস্ট প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা গওহর রিজভী প্রধান বিচারপতির সাথে সাক্ষাৎ করেছেন। এ সাক্ষাৎ নয় অথবা প্রধানমন্ত্রীর অগোচরেও এ সাক্ষাৎকার নয়। প্রধানমন্ত্রীর এক বিশ্বস্ত দূত হিসেবেই পররাষ্ট্র উপদেষ্টা প্রধান বিচারপতির সাথে সাক্ষাৎ করেছেন। নিশ্চয়ই তা সৌজন্যমূলক ছিল না, বরং সেখানে প্রধানমন্ত্রীর একটি জটিল বার্তাই বহন করেছে, যার সাথে বৈদেশিক চাওয়া বা না চাওয়ার যোগসূত্র উড়িয়ে দেয়া যায় না। প্রধান বিচারপতির সাথে সরকারের এ টানাপড়েন কোথায় শেষ হবে তা বলা যাচ্ছে না।

কারণ পত্রিকান্তরে প্রকাশ দুর্নীতি দমন বিভাগে প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধে ১২৬ অভিযোগ জমা পড়েছে। দুদক বলেছে, অভিযোগ তারা শর্ট আউট করছে, যা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। বাংলাদেশ ভৌগোলিক দিক থেকে একটি ছোট রাষ্ট্র হলে অভিজ্ঞতা ও চমক রয়েছে অনেক। এখানে দু’জন রাষ্ট্রপতি নিহত হয়েছেন সেনাবাহিনীর হাতে। খন্দকার মোশতাক ও জেনারেল এরশাদ রাষ্ট্রপতির পদ ভোগ করার পরও দীর্ঘ দিন জেল খেটেছেন। সাবেক ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রীও জেল খেটেছেন। সাবেক সব স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীই পুলিশের হাতে লাঞ্ছিত হয়েছেন। অতএব, বিচিত্র এই দেশে জেল কখন কার জন্য আশীর্বাদ(!) হয়ে যায়, কেউ তা বলতে পারে না। আবার অন্য দিকে উচ্চ আদালতের কোনো রায়ে ভবিষ্যতে যদি ৫ জানুয়ারি ২০১৪-এর রায় বাতিল হয়ে যায়, তবে এখন যারা জেলে পাঠানোর হুমকি-ধমকি দিচ্ছেন, তাদের পরিণতি উল্টো হয়ে যেতে পারে। তাই বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি অনিশ্চয়তার কোন দিকে মোড় নেয় তা এখনো আঁচ করা যাচ্ছে না।

‘একটি ইংরেজি দৈনিক পত্রিকার সম্পাদক এই রায় লিখে দিয়েছে’- এ বক্তব্যটি আপিল বিভাগ কিভাবে নিয়েছেন তা জানি না। তবে আমি মনে করি এটা অভিযোগ, সমালোচনা নয়। অভিযোগ প্রমাণ করার দায়িত্ব অভিযোগকারীর। অভিযোগ প্রমাণে ব্যর্থতায় বিচার বিভাগের সম্মান ও ভাবমূর্তি অক্ষুণ্ন রাখতে আদালত অবমাননার দায়ে বক্তব্যটির ব্যাখ্যা দেয়ার জন্য অভিযোগকারীকে আদালতে তলব করার দায়িত্ব প্রধান বিচারপতির অবশ্যই রয়েছে, নতুবা অভিযোগকারীরা ভবিষ্যতে বলে বেড়াবে, ‘হাতি ঘোড়া গেল তল মশা বলে কত জল?’

বিচার বিভাগকে অনেক ধকল সইতে হচ্ছে। বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগ এ ক্ষেত্রে যথেষ্ট সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছেন, যার দৃষ্টান্ত পৃথিবীর অন্যান্য রাষ্ট্রেও আছে। অন্য জায়গা থেকে রায় লেখানোর তার (প্রধান বিচারপতি) বিরুদ্ধে যে অভিযোগ, তা সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলে তদন্ত হতে হবে বা আদালত অবমাননার কৈফিয়ত তলব করে এর নিষ্পত্তি করতে হবে, নতুবা বক্তব্যটি বিলীন হওয়ার পরিবর্তে ইথারে ভাসতেই থাকবে, যা বিচার বিভাগের ভাবমূর্তির জন্য কালো ছায়া হয়ে রয়ে যাবে, যেটি নিশ্চয়ই স্বাধীন বিচারব্যবস্থার প্রতি শ্রদ্ধাশীল কোনো নাগরিকের কাম্য নয়।

লেখক : কলামিস্ট ও বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা 
E-mail : taimuralamkhandaker@gmail.com

আরও সংবাদ