Widget by:Baiozid khan
শিরোনাম:

ঢাকা Mon June 25 2018 ,

খাদ্য সংকট তৈরি করে রোহিঙ্গা বিতাড়নের নতুন কৌশল

Published:2017-10-18 21:03:17    

কক্সবাজার  প্রতিনিধি: মিয়ানমারের সেনাবাহিনী রাখাইন রাজ্যে খাদ্য সংকট তৈরি করে রোহিঙ্গা নির্যাতনের ধরণ পরিবর্তন করেছে। অপরদিকে সেখানের মগরা রোহিঙ্গাদের চলাচল বন্ধ করে দিয়েছে এবং তাদের সহায় সম্পদ এমনকি গরু-ছাগলও ছিনিয়ে নিচ্ছে। তীব্র খাদ্য সংকটে পড়ে বাংলাদেশ সীমান্তে চলে আসছেন হাজার হাজার রোহিঙ্গা। সেখানে তারা তারা রোদে পুড়ে বৃষ্টিতে ভিজে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।

গত তিনদিন ধরে বাংলাদেশে প্রবেশের জন্য উখিয়া সীমান্তের আনজুমানপাড়া পয়েন্টে অপেক্ষা করছেন হাজার হাজার রোহিঙ্গা। সীমান্ত এলাকার বিল-ঝিল, চিংড়িঘের ও বেড়িবাঁধে অবস্থান করছেন। কেউ কেউ সাথে আনা পলিথিন টানিয়ে মাথা গোঁজার ঠাঁই করে নিয়েছেন। শিশুদের অবস্থা খুবই ভয়াবহ। সর্দি, নিউমোনিয়া ও জ্বরে তারা নিষ্প্রাণ হয়ে পড়ছে। গর্ভবতী নারীও আছেন অনেক। দীর্ঘপথ হেঁটে আসায় অনেকের পা ফুলে গেছে। পালিয়ে আসা এসব রোহিঙ্গা জানিয়েছেন, তীব্র খাদ্য সংকট ও আতংকের কারণে বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে এসেছেন তারা। তাদের মানবেতর 
সরেজমিনে দেখা গেছে, সীমান্তে অবস্থানররত রোহিঙ্গাদের করুন অবস্থা । আসার পথে অনাহারে অনেক শিশু মারা গেছে। এ মুহূর্তে আশ্রয়স্থল, খাদ্য ও চিকিৎসা জরুর হয়ে গেছে। নয়তো সময়ের সাথে বাড়বে লাশের সংখ্যা। ইতোমধ্যে অনেকেই অসুস্থ ও ক্লান্ত হয়ে নেতিয়ে পড়ছে সীমান্তের বেড়িবাঁধের উপর।

বুচিডংয়ের রাজার পাড়ার বাসিন্দা মোহাম্মদ রফিক (৩৫) বাড়ি থেকে বাংলাদেশের উদ্দেশে বের হন সাত দিন পূর্বে। তার স্ত্রী মিনিরা জানান, তার স্বামী পাঁচ দিন ধরে অসুস্থ। বাড়ি থেকে বের হওয়ার দুই দিন পর স্বামী প্রচণ্ড জ্বরে আক্রান্ত হয়। গত ১৫ তারিখ রাতে তারা বাংলাদেশে প্রবেশ করে প্যারাবনে রাত্রি যাপন করেন। পরদিন সামনের দিকে যেতে চাইলে বিজিবির বাধার মুখে বেড়িবাধেই বসে যান। গত তিন দিন ধরে রাতে বেড়িবাঁধে ছেলেমেয়ে নিয়ে রাত যাপন করেন। অসুস্থ শরীর তার উপর নির্ঘুম ও অনাহার-অর্ধহারে আরো অসুস্থ হয়ে পড়েছেন তার স্বামী।

সরেজমিনে আরো দেখা গেছে, সীমান্তের আনজুমান পাড়ার ঘের-বেড়িবাঁধে ক্ষুধার্ত ও অসুস্থ রোহিঙ্গাদের ক্ষুধা নিবারনের বিদেশী এনজিও বিস্কুট দিচ্ছে। এসব শুষ্ক খাবারও প্রয়োজনের তুলনায় অপর্যাপ্ত। তারপরেও বেঁচে থাকার তাগিদে ভাগ করে খাচ্ছেন রোহিঙ্গারা।

নুরুল ইসলাম (৫৬) নামে এক রোহিঙ্গা জানান, বাংলাদেশে আসার পথে জীবন বাঁচাতে লতা পাতা খেয়ে বেঁচে থাকার চেষ্টা করেছেন তারা।

সেখানের বিজিবি সদস্যরা জানিয়েছেন, ক্যাম্পে জায়গা সংকট এবং প্রক্রিয়াগত কারণে তাদের আটকে রাখা হয়েছে।

আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম) জানিয়েছে, আনজুমানপাড়া সীমান্ত পয়েন্টের নো-ম্যানসল্যান্ডে এ মুহূর্তে অন্তত ২০ হাজার রোহিঙ্গা অবস্থান করছেন।

আইওএম সূত্র জানায়, গত দুই দিনে অন্তত ৫০ হাজার রোহিঙ্গা নারী-শিশু-পুরুষ বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করেছেন। রাখাইন রাজ্য থেকে এ পর্যন্ত পাঁচ লাখ ৮২ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছেন। গত মঙ্গলবার জাতিসংঘ শরণার্থী বিষয়ক সংস্থার মুখপাত্রের বরাত দিয়ে এ তথ্য জানানো হয়।

স্থানীয়রা জানান, কিছুদিন রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ বন্ধ থাকার পর গত রোববার থেকে আবারো তাদের ঢল নামে। এখন ওই সীমান্তের নো-ম্যানসল্যান্ডে গাদাগাদি করে হাজার হাজার রোহিঙ্গা অবস্থান করছেন।

উখিয়ার পালংখালী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান এম. গফুর উদ্দিন চেীধুরী জানান, গত সোমবার ভোর রাত থেকে হঠাৎ করে আনজুমানপাড়া সীমান্ত দিয়ে রোহিঙ্গাদের অনুপ্রবেশ বেড়ে যায়। বিজিবি এসব রোহিঙ্গাকে মানবিক সহায়তা দিয়ে আপাতত নো-ম্যানসল্যান্ডে আশ্রয় দিয়েছে।

পালিয়ে আসা রোহিঙ্গারা বলছেন, রাখাইনে নতুন করে তাণ্ডব চালাচ্ছে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ও মগরা। যে মুসলিম রোহিঙ্গারা এখনও সেখানে রয়ে গেছেন তাদের বর্মি ভাষায় বাঙালি লেখা কার্ড নিতে বাধ্য করা হচ্ছে। কেউ কার্ড নিতে অস্বীকৃতি জানালে তাকে মেরে ফেলা হচ্ছে। সেনাবাহিনী ও মগদের হামলায় গত রোববার থেকে রাখাইনের বুচিডংয়ের ৩২টি গ্রামে নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। তাই তারা দলে দলে এদেশে আসতে বাধ্য হচ্ছেন।

নয় সদস্যের পরিবার নিয়ে বুচিদংয়ের মুরাপাড়া গ্রাম থেকে পালিয়ে এসে আনজুমানপাড়া বেড়িবাঁধে আশ্রয় নিয়েছেন আলী হোসেন।

তিনি জানান, মিয়ানমারের সেনারা এবার বাড়িঘরের মালামাল লুট করছে। বিতরণ করছে সাদা কার্ড। কার্ড না নিলে রাখাইন ত্যাগের নির্দেশ দিচ্ছে। ভয়, আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ার কারণে বুচিদংয়ের বাপিডিপো, নাইছাদং, চিংদং, লাউয়াদং, নয়াপাড়া, চান্দেরবিল, লম্বাবিল, জংমং ও প্রংফোপাড়াসহ ৩২টি গ্রামের প্রায় ৫০ হাজার মানুষ নাফ নদীর এপারে চলে এসেছেন।

রাখাইনের চান্দেরবিল এলাকার ফরিদুল আলম (৫৫) জানান, তার মতো অসংখ্য রোহিঙ্গা গত ১১ অক্টোবর রাতে মিয়ানমারের ফাতিয়ারপাড়ার ঢালা এলাকায় জড়ো হন। ফেলে আসা স্বজনদের জন্য সেখানে বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার পর্যন্ত তারা অপেক্ষা করেন। ১৪ অক্টোবর ভোররাতে মিয়ানমার সেনা ও সশস্ত্র রাখাইন যুবকরা তাদের লক্ষ্য করে গুলি বর্ষণ করে। এতে তারা পালাতে থাকেন। এসময় ৫০ জনের মতো বৃদ্ধ নারী-পুরুষ আহত হন বলেও জানান ফরিদ।

জাতিসংঘের কক্সবাজার অফিসের কর্মকর্তা যোসেফ জানান, রোববার থেকে রোহিঙ্গারা আবারও বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ শুরু করেন, যা সোমবার ও মঙ্গলবার আরো বেড়েছে। এখন আনজুমানপাড়া সীমান্তের নো-ম্যানসল্যান্ডে হাজার হাজার রোহিঙ্গা নারী, পুরুষ ও শিশু অবস্থান করছেন। এদের অনেকেই অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। শিশুদের অবস্থা খুবই করুণ। এছাড়া রোহিঙ্গাদের মাঝে খাদ্য সংকট দেখা দিয়েছে।

পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের সাথে কথা বলেছেন জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থার প্রতিনিধিরা। তাদের অনেকেই বলেন, নিরাপত্তা ঝুঁকি সত্ত্বেও রাখাইনে থাকতে চেয়েছিলেন। কিন্তু গ্রাম জ্বালিয়ে দেয়ায় পালিয়ে আসতে বাধ্য হন বলে জানান তারা।

জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থার প্রতিনিধিদের কাছে রোহিঙ্গারা জানিয়েছেন, বাংলাদেশ সীমান্তে আসতে এক সপ্তাহেরও বেশি সময় হাঁটতে হয়েছে তাদের। সীমান্ত অতিক্রমের জন্য অপেক্ষায় থাকাকালে মিয়ানমার সীমান্তের দিক থেকে গুলির আওয়াজ শুনেছেন তারা।

রোহিঙ্গা জনস্রোত কমার লক্ষণ নেই
উখিয়া (কক্সবাজার) থেকে হুমায়ুন কবির জুশান জানান, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে বাংলাদেশমুখী রোহিঙ্গা জনস্রোত কমার কোনো লক্ষণ নেই। সেনাবাহিনী ও উগ্রপন্থী বৌদ্ধদের নির্যাতন-নিপীড়নের মুখে ওই রাজ্যের মংডু, বুচিডং, রাচিডং টাউনশিপ (জেলা) এলাকার শত শত গ্রাম বর্তমানে রোহিঙ্গাশূন্য। সংকট শুরুর পর দেড় মাস পেরিয়ে গেলেও এখনো রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে আসা থামছে না। হাজারে হাজারে আসছেন তারা।

মাঝে কয়েকদিন রোহিঙ্গাদের আগমন কিছুটা কমলেও আবারো বাংলাদেশ অভিমুখে তাদের ঢল নেমেছে। সোমবার বিকেল থেকে উখিয়ার আঞ্জুমানপাড়া সীমান্ত দিয়ে হাজার হাজার রোহিঙ্গা আসতে থাকে। নোম্যান্স ল্যান্ডে তাদের প্রবেশে বাধা দেয় বিজিবি।

বিজিবির একটি সূত্র জানায়, উপরের নির্দেশনা না পাওয়া পর্যন্ত তাদেরকে প্রবেশ করতে দেয়া যবে না। নির্দেশনা পেলে তাদেরকে তল্লাশির পর প্রবেশ করতে দেয়া হবে।

৩৪ বিজিবি ব্যাটালিয়নের উপ-অধিনায়ক মেজর আশিকুর রহিম সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, ৩০ হাজারের মতো রোহিঙ্গা বাংলাদেশ সীমান্তে অবস্থান করছে। তাদের শুকনো খাবার ও পানি দেয়া হচ্ছে। নির্দেশনা পেলে প্রক্রিয়া মেনে তাদের ঢুকতে দেয়া হবে।

সীমান্তে অবস্থান করা দিলারা, নুর আয়েশা, নুর কায়দা, হাজেরা, ফাতেমা, রফিক উল্লাহ, সেলিম, মোহাম্মদ ইউনুছ, ইয়াহিয়াসহ কয়েকজন রোহিঙ্গা জানিয়েছেন, আরাকান রাজ্যের গুথিদং জেলার কোয়েনগাইন গ্রাম থেকে বাংলাদেশের উদ্দেশে রওয়ানা হওয়ার সাত দিন পর তারা বাংলাদেশ সীমান্তে পৌঁছেন। বাংলাদেশে প্রবেশের জন্যে যেসব রোহিঙ্গা সীমান্তে অবস্থান করছেন তারা সবাই গুথিদং জেলার বাসিন্দা বলে তারা জানান।

এদিকে রোহিঙ্গাদের অতিরিক্ত চাপের কারণে কক্সবাজারে বেড়ে গেছে নিত্যপণ্যের দাম। ফলে স্থানীয়দের পড়তে হচ্ছে বিপাকে। পাশাপাশি উখিয়ায় বাসাভাড়া, অফিস ও গাড়িভাড়া বৃদ্ধি পেয়েছে। বিভিন্ন এনজিওতে ছাত্রছাত্রী নিয়োগের কারণে কলেজে ছাত্রছাত্রীর উপস্থিতির হার কমে গেছে বলে জানিয়েছেন উখিয়া বিশ্ববিদ্যালয় ডিগ্রি কলেজের অধ্যাপক তহিদুল আলম তহিদ।

আরও সংবাদ