Widget by:Baiozid khan
  • Advertisement

নাফ নদীর ওপারে অপেক্ষায় থাকা ৫০ হাজার রোহিঙ্গার জীবন বিপন্ন

Published:2017-10-25 09:45:21    

কক্সবাজার সংবাদাতা: নাফ নদীর ওপারে মংডু এলাকার ধাওনখালী ও কোয়াংচিপংয়ে অন্তত ৫০ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশের অপেক্ষায় রয়েছেন। তারা বুচিডংয়ের বিভিন্ন এলাকা থেকে পালিয়ে ওই এলাকায় আশ্রয় নিয়েছেন। নৌকার অভাবে তারা সমুদ্র পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশে আসতে পারছেন না। সেখানে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গারা পলিথিন দিয়ে ছোট ছোট শেড তৈরি করে অবস্থান করছেন। এ ছাড়া আরাকান রাজ্যের বিভিন্ন স্থানে চলাচলের পথে ব্যারিকেড দিয়েছে সীমান্তরক্ষী ও পুলিশ। প্রতিকুল পরিবেশ এবং অর্ধাহারে - অনাহারে বিপন্ন প্রায় এসব বনি আদমের জীবন।

অপর দিকে আরাকান রাজ্যের বুচিডং জেলার মাম্ব্রা থানার থেইনসেইক (হত্তিপাড়া) গ্রামে বোমা বিস্ফোরণের অভিযোগে পাঁচ রোহিঙ্গা আলেমকে গ্রেফতার করে সেনাবাহিনী। গত শুক্রবার এই বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। রাখাইনেরা (মগ) পরিকল্পিতভাবে এই বোমা বিস্ফোরণ ঘটিয়ে উল্টো স্থানীয় আলেমসমাজ ও রোহিঙ্গাদের ওপর দায় চাপাচ্ছে বলে অভিযোগে জানা যায়।

এ ঘটনায় স্থানীয় প্রশাসন ও সেনাবাহিনীর সদস্যরা যখন যাকে ইচ্ছা তাকে ধরে নিয়ে যাচ্ছে। ঘটনার কোনো রকম তদন্ত ছাড়া রোহিঙ্গাদের জড়িয়ে তাদের বাড়িঘর তল্লাশি করছে। স্থানীয় পুলিশও রোহিঙ্গাদের থানায় ডেকে নিয়ে মোটা অঙ্কের চাঁদা আদায় করছে। চাঁদা দিতে অপারগতা প্রকাশ করলে গুম-খুন করার ভয়ভীতি দেখানোসহ নানাভাবে হয়রানি করছে।


অপর দিকে সেনাবাহিনী ওই গ্রামের আলেম রোহিঙ্গা নুরুদ্দীন, আবু শামা, হাবিবুল্লাহ, মুহাম্মদ ফয়সাল ও হাফেজ কামাল উদ্দীনকে গ্রেফতার করে নিয়ে যায়। তাদের কোনো খোঁজ পাচ্ছেন না আত্মীয়রা। স্থানীয় থানায় যোগাযোগ করা হলে এ ব্যাপারে কোনো তথ্য মিলছে না। আত্মীয়দের ধারণা তাদেরকে হত্যা করে লাশ গুম করা হয়েছে।

এ ছাড়া উখিয়ার আঞ্জুমানপাড়া সীমান্তে নাফ নদীর ওপারে প্রায় ২৫ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশের অপেক্ষায় রয়েছেন। মিয়ানমার সেনাদের অভিযানের মুখে পড়ে প্রাণে বাঁচতে এপারে আসার সুযোগ খুঁজছেন তারা। প্রতিদিন এই সীমান্ত দিয়ে হাজার হাজার রোহিঙ্গা প্রবেশ করেন। ওই সীমান্ত চৌকির বিজিবির এক কর্মকর্তা বলেন, এ সীমান্তের ওপারে কোয়ানচিং পাড়ায় প্রায় ২৫ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশের অপেক্ষা করছেন।

বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়ার জন্য মংডু উপকূলে ধাওনখালী সৈকত এলাকায় প্রায় ২০ হাজার রোহিঙ্গা অপেক্ষা করছেন। সাগর উপকূলে বৈরী আবহাওয়ায় তারা বিপন্নপ্রায় অবস্থায় রয়েছেন। এদের মধ্যে নারী ও শিশুর সংখ্যা বেশি। 
মংডুর ওই সৈকতে আশ্রয় নেয়া শামশুল আলম নামে এক রোহিঙ্গা টেলিফোনে জানিয়েছেন, প্রায় ২০ হাজার রোহিঙ্গা এখানে একটি চরে এক সপ্তাহ ধরে অবস্থান করছেন। আরাকানের বুচিডংয়ের বিভিন্ন এলাকা থেকে পালিয়ে তারা সৈকতে আশ্রয় নিয়েছেন। বাংলাদেশে আসার চেষ্টা করছেন তারা। নৌকার অভাবে তারা সমুদ্র পাড়ি দিতে পারছেন না।

সেখানে শিশুদের কোলে বা কাঁধে নিয়ে অনেক রোহিঙ্গা পানিতেই দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে ছিলেন। জোয়ারের পানি নেমে গেলে তারা চরের ওপর উন্মুক্ত স্থানে অবস্থান করছেন। টেলিফোনে ওই রোহিঙ্গা জানান, শনিবার সকালে তারা সেখানে একটি বালুর বাঁধ তৈরি করে জোয়ারের পানি ঠেকানোর আপ্রাণ চেষ্টা করছেন। বাঁধটি পানিতে ভেঙে গেলে তাদের জীবন বিপন্ন হবে বলে তিনি জানিয়েছেন। এখানে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের পেছনে ফিরে যাওয়ার কোনো উপায় নেই। কারণ তাদের পেছনে রয়েছে কাঁটাতারের বেড়া। 
টেকনাফের শামলাপুরে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গা শফিক আহমদ বলেন, মংডুর ধাওনখালী সৈকতে আটকে পড়াদের মধ্যে আমার এক ভাই ও তার পরিবারের আট সদস্য রয়েছেন। তারা এ দিকে বাংলাদেশেও আসতে পারছেন না, আবার পেছনেও যেতে পারছেন না।

আরাকানে বৌদ্ধ ভিক্ষুদের বিক্ষোভ
এদিকে মিয়ানমারের আরাকান রাজ্যের উগ্রপন্থী বৌদ্ধ ভিক্ষুদের রোহিঙ্গাবিরোধী বিক্ষোভের মুখে আকিয়াবে রোহিঙ্গারা নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে ছুটছে। গত রোববার থেকে রোহিঙ্গাবিরোধী বিক্ষোভের পাশাপাশি উগ্রপন্থী বৌদ্ধ ভিক্ষু ও রাখাইনেরা অস্ত্র ও লাটিসোটা নিয়ে দাঙ্গা চালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। এতে উগ্রপন্থী বৌদ্ধ ভিক্ষুদের রোহিঙ্গাবিরোধী বিক্ষোভ কর্মসূচির ফলে বৌদ্ধ ও মুসলমানের মধ্যকার আঞ্চলিক সহাবস্থান আরো অসম্ভব হয়ে পড়েছে। মুসলমান এলাকায় অস্ত্র নিয়ে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে রাখাইন ও মগের উচ্ছৃঙ্খল তরুণেরা। যখন তখন লুটপাট করছে। লাটিসোটা নিয়ে দাঙ্গা চালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে তারা। ফলে সংখ্যালঘু নিরীহ রোহিঙ্গারা আতঙ্কে ঘরবাড়ি ছেড়ে অজানার উদ্দেশে বেরিয়ে পড়ছে।


গত মঙ্গলবারও দক্ষিণ বুচিডংয়ের লুইংগ্যাদং, পুইমালী ও শাহাব বাজার এলাকা থেকে কয়েক শ’ রোহিঙ্গা নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য ছোটে। সেনাদের দেয়া আগুনে পুড়ে যাওয়া গ্রামের পর গ্রাম মাড়িয়ে পাহাড়ি পথ ধরে সীমান্ত অভিমুখে ছুটছে তারা। 
সূত্র জানিয়েছে, লক্ষাধিক রোহিঙ্গা বুচিডং থেকে সপ্তাহ খানেক আগে বাংলাদেশে পাড়ি জমায়। এবারো কয়েক শ’ রোহিঙ্গা বাংলাদেশের সীমান্তে জড়ো হচ্ছে। এদের বেশির ভাগই নারী ও শিশু।
পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের একজন জানান, আমাদের আশপাশের গ্রাম এখন লোকশূন্য। ফলে মগ ও রাখাইনেরা আমাদের মারার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। তারা লাটিসোটা নিয়ে গ্রাম ঘিরে রয়েছে। লুটপাট চালাচ্ছে। তাই বেঁচে থাকার আশায় ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়ে এসেছি।


পালিয়ে আসা রোহিঙ্গারা জানায়, আরাকানে সেনাবাহিনীর তাণ্ডবে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন ঠেকাতে রোববার থেকে বৌদ্ধ ভিক্ষুরা বিক্ষোভ করেছে। বিক্ষোভকারীদের নেতৃত্বদানকারী অং হতের মতে, পালিয়ে আসা রোহিঙ্গারা জানিয়েছে, আরাকান রাজ্য ছেড়ে বাংলাদেশে পালিয়ে যাওয়া বাঙালিদের অনেকেই সন্ত্রাসী। আশঙ্কা করা হচ্ছে, তাদের ফিরিয়ে নিয়ে আসা হলে সহিংসতার পুনরাবৃত্তি ঘটবে।

অং হতের মতে, পালিয়ে যাওয়া রোহিঙ্গা বাঙ্গালিদের ফিরিয়ে নিয়ে আসার প্রকল্প রাখাইনের (আরাকান) বৌদ্ধ জনগণ মেনে নেবে না। সন্ত্রাসীদের সাথে বাস করা সম্ভব নয় বলে মন্তব্য করেন বিক্ষোভকারীদের আরেক নেতা বৌদ্ধ ভিক্ষু ইউ ধামিকা। 

আরও সংবাদ