Widget by:Baiozid khan
শিরোনাম:

ঢাকা Thu September 20 2018 ,

প্রিয় তরুণেরা ব্যবহার হয়ো না

Published:2018-04-17 11:23:20    
রেজানুর রহমান: মাথায় কতো প্রশ্ন আসে দিচ্ছে না কেউ জবাব তার। কোথায় গেলে জবাব পাব ভাবছি বসে সবিস্তার। প্রিয় পাঠক, নিশ্চয়ই আপনাদের কৌতূহল হচ্ছে। তবে প্রশ্নগুলো জানার পর অনেকেই হয়তো অবাক হয়ে বলবেন, আরে, এই কথাগুলো তো আমিও ভাবছি... আসুন আমি আপনাদের হয়েই প্রশ্নগুলো তুলে ধরি। প্রশ্ন এক. বৈশাখে কালবৈশাখীর ঝড় আসে। এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু আমাদের সামনে এবার হঠাৎ করেই একটা অন্যরকম ঝড় এলো এবং হঠাৎ করেই দেশটাকে যেন লণ্ডভণ্ড করতে চাইলো। ঝড়ের নাম কোটা সংস্কার। সরকারি চাকরিতে কোটা পদ্ধতির সংস্কার চেয়ে হঠাৎ যেন একটা আন্দোলন শুরু হলো। কোটা সংস্কারের এই আন্দোলনের সঙ্গে শুধু সুশীল সমাজ নয়, দেশের সাধারণ মানুষও একাত্মতা ঘোষণা করেছিল। হঠাৎ কী এমন ঘটলো যে আন্দোলনের নামে সারাদেশ অচল করে দিতে হবে? ১২ এপ্রিল দেশের একটি বড় দৈনিক পত্রিকার প্রথম পাতার খবর পড়লেই পরিস্থিতির ভয়াবহতা ফুটে উঠবে। ‘ঢাকা-সহ সারাদেশে ২৭ জেলায় আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছে। ঢাকায় সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়সহ ৩৪টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে, ১১ জেলার ২৪ স্থানে মহাসড়ক, সড়ক অবরোধ, ময়মনসিংহে রেললাইন অবরোধ’। প্রথম প্রশ্নেরই অনেক শাখা-প্রশাখা ছড়িয়ে গেলো। শাখা-প্রশাখা ওয়ালা প্রশ্নগুলোর উত্তর অথবা সমাধান খুঁজতে থাকুন। সেই ফাঁকে আমি দ্বিতীয় প্রশ্নটা তুলে ধরি।
 
প্রশ্ন নম্বর দুই. কোটা সংস্কারের দাবির প্রেক্ষিতে সড়ক পরিবহন মন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের আন্দোলকারী শিক্ষার্থীদের একটি প্রতিনিধিদলকে ডেকে নিয়ে বৈঠক করলেন এবং দাবির যৌক্তিকতা স্বীকার করে এ ব্যাপারে সময় চাইলেন। আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিদল ওই বৈঠকে আশ্বস্ত হয়ে আন্দোলন আপাতত স্থগিত রাখার ঘোষণাও দিলেন। কিন্তু তারপরও কেন আন্দোলনের নামে দেশকে অচল করে দেওয়ার ঘৃণ্য তৎপরতা শুরু হয়েছিল?
 
প্রশ্ন নম্বর তিন. কোটা সংস্কারের আন্দোলনের সঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসির সম্পর্ক কী? তিনি তো আর এই দাবি পূরণ করবেন না। তাহলে রাতের অন্ধকারে ভিসির পরিবারকে জিম্মি করে কেন তার বাসভবনে নারকীয় কায়দায় হামলা চালানো হলো?
 
প্রশ্ন নম্বর চার. কোটা সংস্কারের আন্দোলনকে কেন্দ্র করে বিদেশে অবস্থানরত তারেক রহমানের সঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন বিএনপিপন্থী শিক্ষকের টেলিফোন সংলাপ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়ে গেছে। প্রশ্ন উঠেছে, এই টেলিফোন সংলাপই কি কোটা সংস্কারের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনকে বিপথে পরিচালিত করেছে?
 
প্রশ্ন নম্বর পাঁচ. কোটা সংস্কারের আন্দোলনের প্রেক্ষিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সুফিয়া কামাল নামের এক ছাত্রী হলে এশা নামের একজন ছাত্রলীগ নেত্রীকে বহিষ্কার করা হয়েছে। এশার বিরুদ্ধে হলের সাধারণ ছাত্রীদের নির্যাতন করার অভিযোগ আনা হয়েছে। এই অভিযোগের প্রেক্ষিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ও ছাত্রলীগের পক্ষ থেকে এশার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক যে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে তা প্রশংসার দাবিদার। কিন্তু পরবর্তী সময়ে গভীর রাতে এশার গলায় জুতার মালা পরিয়ে যেভাবে তাকে অপমান ও নাজেহাল করা হয়েছে তা খুবই নিন্দনীয় অপরাধ। প্রশ্ন উঠেছে, যারা এই ঘৃণ্য কর্মকাণ্ডে নেতৃত্ব দিয়েছেন তাদের আসল উদ্দেশ্য কী ছিল? আরও একটি প্রশ্ন একইসঙ্গে উঠে আসে, সেটি হলো পরবর্তীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এবং ছাত্রলীগ থেকে এশার বহিষ্কারের বিষয়টিও প্রত্যাহার করে। এখানেও একটি প্রশ্ন তৈরি হয়।
 
প্রশ্ন নম্বর ছয়. সরকারি চাকরিতে কোটা পদ্ধতির সংস্কার মানেই মেধাবীদের যোগ্যতাকে আরেকটু মূল্যায়ন করা। কিন্তু কোটা পদ্ধতির আন্দোলনে যাদের দেখা গেছে তারা কি প্রকৃত মেধাবী? মেধাবীদের আন্দোলনে শারীরিক ভাষায় ক্ষোভ বিক্ষোভের ছায়া থাকলেও একধরনের বিনয়ও থাকে। কিন্তু কোটা সংস্কারের আন্দোলনে জড়িতদের অনেকের শারীরিক ভাষা ও হাতে ধরা পোস্টারের ভাষা অনেক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
 
প্রশ্ন নম্বর সাত. কোটা সংস্কারের দাবির সঙ্গে সাধারণ মানুষও সমর্থন জানিয়েছিল। কিন্তু আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের সামনে ‘আমি রাজাকারের সন্তান’ এই ধরনের স্লোগান বুকে নিয়ে যখন কোনও তরুণ আন্দোলন করে তখন মনে শঙ্কায় জন্ম দেয়– এটি কার মুখ? বন্ধুর মুখ নিশ্চয়ই নয়। অথচ তাকে নিয়েই আন্দোলন করেছে মেধাবী শিক্ষার্থীরা।
 
প্রিয় পাঠক, শেষ প্রশ্ন অর্থাৎ সাত নম্বর প্রশ্নের একটু বিশ্লেষণ করতে চাই। ভাবুন একবার এটা ছিল মেধাবী শিক্ষার্থীদের যৌক্তিক দাবি আদায়ের আন্দোলন। সঙ্গত কারণেই এই আন্দোলনের ব্যানার পোস্টারে স্লোগানের ভাষার শালীনতাও আমরা কামনা করবো। কিন্তু আমরা মেধাবীদের সমাবেশে এটা কি ধরনের স্লোগান দেখলাম। যা প্রকাশযোগ্যও নয়। মায়াবী চেহারার কয়েকজন ছাত্রীর পাশেই বোরকা পরা এক তরুণী একটা পোস্টার ধরে দাঁড়িয়ে আছে। জানি না মিডিয়ার ওপরে তাদের কেন এত ক্ষোভ! মেধাবীদের জমায়েতে এ ধরনের আরও অনেক অশ্লীল শব্দের পোস্টার দেখা গেছে। প্রশ্ন উঠেছে– ক্ষোভ-বিক্ষোভের এ কেমন ভাষা? যারা এই ধরনের ভাষা লিখেছে তারাই কি ভবিষ্যতে দেশের নেতৃত্বভার গ্রহণ করবে?
 
এবার দুই নম্বর প্রশ্নের বিশ্লেষণে যেতে চাই। কোটা সংস্কারের দাবির সঙ্গে সরকার শুরু থেকেই পজিটিভ মনোভঙ্গি প্রকাশ করেছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে সড়ক পরিবহনমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের একটি প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠক করলেন। বৈঠকে সমঝোতাও হলো। মন্ত্রী একটা সময় বেঁধে দিয়ে বললেন ওই তারিখে মধ্যে কোটা পদ্ধতির সংস্কার করা হবে। প্রতিনিধি দলের সদস্যরা ওই বৈঠকে আন্দোলন স্থগিত রাখার ঘোষণাও দিলেন। অথচ একই সময়ে টিএসসিতে আন্দোলনরত ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে অংশ নেওয়া কিছু ছাত্রছাত্রী মন্ত্রীর বক্তব্যের বিরোধিতা করে আন্দোলনের নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করলেন। এ পর্যায়ের আন্দোলনে ক্ষোভ-বিক্ষোভ প্রকাশের সুযোগ করে দিলো জাতীয় সংসদে কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরীর একটি বক্তব্য। প্রশ্ন উঠলো কোটা সংস্কারের দাবির আন্দোলনের নেতৃত্ব কার হাতে? সড়ক পরিবহন মন্ত্রীর সঙ্গে যারা বৈঠক করতে গিয়েছিল তাদের হাতে? নাকি যারা ওই বৈঠকে দেওয়া সড়ক পরিবহন মন্ত্রীর বক্তব্যের বিরোধিতা করে কোটা পদ্ধতির দাবির অহিংস আন্দোলনে সন্ত্রাস ছড়ানোর ইন্ধন দিয়েছিল তাদের হাতে? একটু খেয়াল করলেই দেখবেন, কোটা পদ্ধতির আন্দোলন দানা বাঁধলেও সঠিক নেতৃত্ব পায়নি। ফলে এই আন্দোলনকে সুযোগসন্ধানী একটি মহল নিজেদের কব্জায় নেওয়ার ষড়যন্ত্রে মেতে উঠেছিল। কোটা পদ্ধতি সংস্কারের আন্দোলনে ছাত্রছাত্রীদের কাঁধে বন্দুক রেখে তারা সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে চেয়েছিল।
 
আশার কথা, ষড়যন্ত্রকারীরা সফল হয়নি। তাই বলে তারা যে থেমে আছে সে কথাও বলা যাবে না। আর তাই মেধাবী তরুণ বন্ধুদের কাছে একটা আরজি রাখতে চাই। তার আগে ফেসবুকে দেখা একটা ছবির কথা তুলে ধরি। একটি আমগাছের ছবি। গাছটির মগডালে একটি মাত্র আম ঝুলে আছে। ছবিতে আমের নাম দেওয়া হয়েছে ‘চাকরি’। আমটি নেওয়ার জন্য অনেক কষ্টে গাছ বেয়ে উঠছে এক তরুণ। এই তরুণের পাশে লেখা হয়েছে ‘মেধাবী’। গাছের নিচে লম্বা বাঁশের ডগায় আংটা লাগিয়ে মাটিতে দাঁড়িয়ে আছে এক তরুণ। যে মাটিতে দাঁড়িয়ে কোনও কষ্ট ছাড়াই লম্বা বাঁশের মাধ্যমে আমটি পেড়ে নিচ্ছে। মাটিতে দাঁড়ানো তরুণের জায়গায় লেখা হয়েছে– ‘কোটা’। এই ছবির ক্ষেত্রে বোধকরি বিশ্লেষণের কোনও প্রয়োজন নেই। কোটা পদ্ধতির সংস্কারের পক্ষে বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ আনিসুজ্জামান ও ড. মুহম্মদ জাফর ইকবালসহ সমাজের নেতৃত্বস্থানীয় অনেকেই ইতোমধ্যে বক্তব্য দিয়েছেন। অধ্যাপক আনিসুজ্জামান বলেছেন, সরকারি চাকরিতে ১০ ভাগের বেশি কোটা থাকা উচিত নয়। তার মানে সকলেই কোটা সংস্কারের পক্ষেই ছিলেন।
 
কিন্তু কোটা সংস্কারের আন্দোলনে কি সঠিক নেতৃত্ব ছিল? যদি থাকতো তাহলে তো সড়ক পরিবহন মন্ত্রীর সঙ্গে প্রতিনিধি দলের বৈঠকের পরই পরিস্থিতি শান্ত হয়ে যাওয়ার কথা। অথচ তা হয়নি। সে কারণে ষড়যন্ত্রের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব তারেক রহমানের টেলিফোন সংলাপ এই ষড়যন্ত্রের অংশ কিনা এ নিয়েও কথা উঠেছে।
 
কোটা পদ্ধতির সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনত মেধাবী তরুণ বন্ধুরা হয়তো পরিস্থিতি সামাল দিতে ব্যর্থ হয়েছেন। তবু তাদের উদ্দেশ্যে একটি ছোট্ট পরামর্শ রাখতে চাই। বন্ধুরা, একবার ভাবুন তো কেউ আপনাদের ব্যবহার করছে না তো? কোটা সংস্কারের দাবি তুলেছেন। সরকার এই দাবির ব্যাপারে পজিটিভ দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশের পরও কেন দেশকে অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে নেওয়ার ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছিল। কোটা সংস্কারের দাবির সঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসির বাসভবনে নারকীয় হামলার ঘটনার সম্পর্ক কী? মেধাবীদের আন্দোলনে ব্যানার পোস্টারের ভাষাও হবে মেধাবী। কিন্তু তা লক্ষ করা যায়নি। বরং মেধাবীদের আন্দোলনে ব্যানার পোস্টারের ভাষা দেখে লজ্জিত হয়েছি। বন্ধুরা, কার সাথে আপনারা আন্দোলন করেছেন? দেখুন তার নমুনা।
 
ফেসবুকে উম্মে হাবীবা নামে একজন নাট্যকর্মী লিখেছেন, কোটা আন্দোলনের একজন কর্মীকে বললাম, আপনি বেশ সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন, সাধুবাদ। নারীদের ওপর অত্যাচার ও ধর্ষণের বিরুদ্ধে আসুন না কথা বলি। উনি জবাবে বললেন, ‘এতো তেল নাই ভাই’। এই কয়দিন অনেক ধকল গেছে। এখন শান্তিতে ঘুমাবো। আর তাছাড়া ওই আন্দোলনের সাথে তো সবার স্বার্থ ছিল। তাই রাজপথে ছিলাম। ফাও খাটতে কেন যাবো? আপনাদের জিনিস আপনারা সামলান!
 
তরুণ বন্ধুরা, আপনারা সবই জানেন ও বুঝেনও। কাজেই নিজেদের মেধাকে বিকিয়ে দেবেন না। সচেতন থাকবেন। দেশের ক্ষতি হয় এমন কাজে জড়াবেন না। ভাবুন তো একবার, আপনার মেধাকে কেউ অসৎ পথে ব্যবহার করছে না তো? জয় হোক তারুণ্যের। জয় হোক মেধাবীদের।
 
লেখক: কথাসাহিত্যিক, নাট্যকার, সম্পাদক আনন্দ আলো।

আরও সংবাদ