Widget by:Baiozid khan
শিরোনাম:

ঢাকা Wed August 15 2018 ,

সিলেটে অভিযোগ আর অভিযোগ

Published:2018-07-26 10:31:10    

সকাল থেকেই মাইকিং, মোটরসাইকেল শোডাউন- বিধি লঙ্ঘন করে মিছিল-সমাবেশ, প্রতিপক্ষ প্রার্থীর প্রচারণায় বাধা- সিলেট সিটি করপোরেশনে এসব এখন নিত্যঘটনা। প্রতিদ্বন্দ্বী মেয়র প্রার্থী ছাড়াও কাউন্সিলর প্রার্থীরা এ ব্যাপারে নির্বাচন কমিশনে একাধিক অভিযোগ করেছেন। অভিযোগ রয়েছে, সরকারি চাকরিজীবীদের বিরুদ্ধে। লিখিত অভিযোগ ছাড়াও কমিশনের কাছে মৌখিক অভিযোগ দিচ্ছেন তারা। এছাড়া গণসংযোগে বেরিয়েও অভিযোগের ঝাঁপি খুলছেন প্রার্থীরা। অভিযোগ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধেও।

এসব অভিযোগের কোনো কোনোটিতে নজর দিচ্ছে নির্বাচন কমিশন। তবে তা কেবলই লোক দেখানো। দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না কমিশন। দায়সারাভাবে দায়িত্ব পালন করছেন তারা। অভিযোগকারীরা বলছেন, একই ধরনের অভিযোগ বারবার করা হলেও দৃশ্যমান কোনো প্রতিকার মিলছে না। বিধি লঙ্ঘনকারীরাও থোড়াই কেয়ার করছে কমিশনের নিয়মনীতি। নির্বাচনের দিন যত ঘনিয়ে আসছে, অভিযোগও ততই বাড়ছে। বিরোধী দলের পাশাপাশি নানা অভিযোগ করছেন সরকারদলীয় প্রার্থীও। সবমিলিয়ে সিলেটে চলছে আচরণবিধি লঙ্ঘনের মহোৎসব। অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগের নগরীতে উত্তপ্ত ভোটের মাঠ। 
 
সরজমিনে গতকালও শহরের বিভিন্ন এলাকায় সকাল থেকেই কয়েকজন মেয়র প্রার্থীর পক্ষে মাইকিং করতে দেখা গেছে। শুধু গতকালই নয়, সিলেটে এ চিত্র প্রতিদিনের। এমন কী নির্ধারিত সময় রাত ৮টার পরও চলতে থাকে হর্ন বাজিয়ে উচ্চ স্বরে প্রচারণা। এছাড়া মোটরসাইকেল শো-ডাউন, মহড়া নির্বাচনী মাঠের নিত্যঘটনা। এসব শো-ডাউনে অংশ নেয়া অনেকেই জানেন না কমিশনের সুনির্দিষ্ট আচরণবিধি মালা। আচরণবিধি ভঙ্গের ছবি তুলতে গিয়ে গণমাধ্যম কর্মী হামলার স্বীকার হয়েছেন- এমন ঘটনাও ঘটছে। 
 
সংশ্লিষ্ট প্রার্থী ও নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা গেছে, মাঠ পর্যায়ে নির্বাচনী কার্যক্রম শুরু হওয়ার পর থেকে গতকাল পর্যন্ত বিভিন্ন প্রার্থী তার প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে ২৫টি লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। এর মধ্যে আওয়ামী লীগ প্রার্থী বদর উদ্দিন কামরানের পক্ষ থেকে তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি প্রার্থী এবং নাগরিক ফোরামের ব্যানারে জামায়াতের প্রার্থীর বিরুদ্ধে অভিযোগ দেয়া হয়েছে ৬টি। আওয়ামী লীগ প্রার্থীর বিরুদ্ধে বিএনপি এবং জামায়াত প্রার্থীর পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে ১৪টি। এরমধ্যে বিএনপি করেছে ৮টি এবং জামায়াত করেছে ৫টি অভিযোগ। আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে অপর অভিযোগ করেছেন ইসলামী আন্দোলনের হাত পাখা প্রতীকের প্রার্থী প্রফেসর মোয়াজ্জেম হোসেন খান। এছাড়া ওয়ার্ডের কাউন্সিলর প্রার্থীরাও তাদের প্রতিদ্বন্দ্বীদের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। ওয়ার্ড পর্যায়ে অভিযোগের সংখ্যা চারটি। ওয়ার্ডগুলো হলো- ৩, ৫, ২২ এবং ২৬ নং। এসব অভিযোগ বলা হয়, প্রতিপক্ষরা তাদের নির্বাচনী প্রচারণা চালানোর সময় বাধা দেয়াসহ মারধর করেছে।
 
নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা গেছে, অভিযোগের বেশিরভাগই আচরণবিধি লঙ্ঘন, নেতাকর্মীদের হয়রানি, নির্বাচনী পোস্টার ছিঁড়ে ফেলা ও প্রচারণায় বাধা দেয়া। কমিশন এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি নির্দেশ দিয়েছে। তবে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নির্দেশ দেয়ার পর সংশ্লিষ্টরা কী পদক্ষেপ নিয়েছে, সে ব্যাপারে কমিশনের কোনো তদারকি নেই।
 
গত কয়েক দিনের উল্লেখযোগ্য অভিযোগের মধ্যে, আচরণবিধি লঙ্ঘন করে নগরীতে শো-ডাউন করায় আওয়ামী লীগ প্রার্থীর অভিযোগের ভিত্তিতে নাগরিক ফোরামের মেয়র প্রার্থী নগর জামায়াতের আমির অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়েরকে শোকজ করেছে নির্বাচন কমিশন। অভিযোগে দেখা যায়, ২২শে জুলাই নগরীর বন্দর বাজার এলাকা থেকে সহস্রাধিক নেতাকর্মীদের নিয়ে দেয়ালঘড়ি প্রতীকের সমর্থনে শো-ডাউন করেন জুবায়ের। জিন্দাবাজার-চৌহাট্টা হয়ে আম্বরখানায় গিয়ে পথসভায়ও অংশ নেন তিনি। এ সময় সড়কে দীর্ঘ যানজটেরও সৃষ্টি হয়। এ কারণে মঙ্গলবার তাকে শোকজ করা হয়েছে। জামায়াত প্রার্থীকে তিনদিনের মধ্যে শোকজের জবাব দিতে বলা হয়েছে। এর আগেও আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগে জুবায়েরকে শোকজ করেছিল ইসি। আওয়ামী লীগের নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নেয়ায় সিলেটের সিভিল সার্জন ডা. হিমাংশু লাল রায় এবং ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অধ্যক্ষ ডা. মুর্শেদ আহমদ চৌধুরীকে শোকজ করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। নির্বাচনের আচরণবিধি অনুসারে সরকারের সুবিধাভোগী বা কর্মকর্তা-কর্মচারী কেউ কোনো প্রচারণায় অংশগ্রহণ করতে পারবেন না। কিন্তু তারা দুজন প্রচারণায় অংশ নিয়েছেন। তিনদিনের মধ্যে অভিযুক্তদের জবাব দিতে বলা হয়েছে। সোমবার বিকেলে আওয়ামী লীগ প্রার্থীর বিরুদ্ধে আচরণবিধি লঙ্ঘনের দুই অভিযোগ আনেন ধানের শীষের আরিফুল হক চৌধুরী। অভিযোগে বলা হয়, গত ২২শে জুলাই সকালে নগরীতে রিকশায় করে একটি নৌকার প্রদর্শনী করা হয়। প্রকাশ্যে নগরীতে বিশাল আকারের কাঠের তৈরি নৌকা নিয়ে সিটি করপোরেশন এলাকায় প্রদর্শনী করা স্থানীয় সরকার ও সিটি করপোরেশন আইন অনুযায়ী গুরুতর অপরাধ। অপর অভিযোগে বলা হয়, একইদিন সন্ধ্যা ৭টা ও ৮টার দিকে কামরানের সমর্থনে কুমারপাড়া ও সুবহানীঘাট পয়েন্টে মূল সড়কের মাঝে মঞ্চ, প্যান্ডেল ও মাইক ব্যবহার করে বিশাল জনসভার আয়োজন করা হয়। এতে কুমারপাড়া পয়েন্টে ও সুবহানীঘাট পয়েন্টে যানজট সৃষ্টি হয়ে জনসাধারণের চলাচলেও ব্যাঘাত করে। আরিফের অভিযোগ প্রতিদিন গভীর রাত পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সমাবেশ করলেও প্রশাসন কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না। নগরের বাগবাড়ীতেও আলোকসজ্জা সংবলিত বিশাল আকারের নৌকা বসানো হয়েছে। 
 
এটিও সিটি করপোরেশন নির্বাচন আইনে আচরণ লঙ্ঘন বলে দাবি করেন আরিফ। গত শুক্রবার এক অভিযোগে আরিফের পক্ষে বিএনপির এক নেতা অভিযোগ করেন, বৃহস্পতিবার সিলেটের আচরণবিধি লঙ্ঘন করে আওয়ামী লীগ প্রার্থীর প্রধান নির্বাচনী কার্যালয়ে বিশাল আকারের গেট নির্মাণ করেছেন। যা আচরণবিধির পরিপন্থি। এছাড়া তার সমর্থকরা ১১ই জুলাই রাত পৌনে ১১টার দিকে নগরীর হাসান মার্কেট এলাকায় ধানের শীষের পোস্টার সাঁটাতে বাধা দেয়। একইসঙ্গে পোস্টার ছিঁড়ে ফেলে এবং ধানের শীষের কর্মীকে মারধর করে পুলিশের হাতে তুলে দেয়। 
 
শুক্রবার দেয়া এক লিখিত অভিযোগে কামরানের পক্ষ থেকে বলা হয়, আইন অনুযায়ী একজন মেয়র প্রার্থী তার মাইকিং করার জন্য শুধু একটি মাইক ব্যবহার করতে পারবেন। কিন্তু বিএনপির প্রার্থী একটি মাইকের পরিবর্তে তার নির্বাচনী প্রচারণার সিএনজি অটোরিকশাতে দুটি মাইক ব্যবহার করছেন। ১২ই জুলাই রাত ৮টায় যার প্রমাণ পাওয়া যায়। শনিবার সকালে আরো দুটি অভিযোগ করেন মেয়রপ্রার্থী কামরানের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির আহ্বায়ক ও সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শফিকুর রহমান চৌধুরী। এর একটি অভিযোগে বলা হয়, বিএনপি প্রার্থী আরিফুল হক চৌধুরী শুক্রবার সন্ধ্যা ৭টায় সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সামনের রাস্তায় নির্বাচনী সভা করেন। ফলে রোগী ও তাদের স্বজনদের চলাচলে বিঘ্ন ঘটে। অপর এক অভিযোগে বলা হয়, আরিফুল হক চৌধুরী নগরীর ঐতিহ্যবাহী শাহী ঈদগাহের ভেতরের মাঠ ব্যবহার করে নির্বাচনী পোস্টার সাঁটানোর কার্যক্রম চালাচ্ছেন। এর ফলে ঈদগাহের পবিত্রতা নষ্ট হচ্ছে।
 
এদিকে লিখিত অভিযোগ ছাড়াও প্রতিদিনই নির্বাচন কমিশনে মৌখিকভাবে একাধিক অভিযোগ দেয়া হচ্ছে। প্রার্থীদের দাবি, বেশিরভাগ অভিযোগই আমলে নিচ্ছে না নির্বাচন কমিশন। এ ব্যাপারে বিএনপির প্রার্থী আরিফুল হক চৌধুরী বলছেন, তারা অভিযোগ দিলেও নির্বাচন কমিশন সেগুলো আমলে নিচ্ছেন না। অপরদিকে আওয়ামী লীগ প্রার্থীন বদর উদ্দিন কামরান পাল্টা দাবি করছেন, প্রতিপক্ষ প্রার্থীর অভিযোগের ভিত্তিতে কমিশন তাদেরকেই বারবার শোকজ করছেন, কিন্তু তাদের অভিযোগের ব্যাপারে কোনো পদক্ষেপ নিতে দেখা যাচ্ছে না। কমিশনের বিরুদ্ধে অভিযোগ করছেন জামায়াত প্রার্থীও। দলটির সিলেট মহানগরীর প্রচার সম্পাদক নুরুল ইসলাম বলেন, অভিযোগের দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নিতে দেখা যাচ্ছে না। প্রার্থীদের এমন অভিযোগের ব্যাপারে রিটার্নিং অফিসার আলীমুজ্জামান বলেন, কোনো অভিযোগ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। কিছু বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

 

আরও সংবাদ