Widget by:Baiozid khan
  • Advertisement

ট্যানারির বর্জ্যে বিষাক্ত হয়ে পড়েছে ১৪টি নদ-নদীর পানি

Published:2018-09-26 22:35:17    

মোঃ কামরুজ্জামান :

ট্যানারির বর্জ্যে কেবল বুড়িগঙ্গা ও তুরাগ  দেশের বিভিন্ন  অঞ্চলের  ১৪টি নদ- নদীর পানি বিষাক্ত হয়ে পড়েছে। এর মধ্যে রয়েছে, রাজধানী শহরকে ঘিরে থাকা বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু, সাভারের ধলেশ্বরী, বংশী, গাজীপুরের শীতলক্ষ্যা, খুলনার রূপসা, কপোতাক্ষ, যশোরের ভৈরব, চট্টগ্রামের কর্ণফুলী, হালদা ও সাঙ্গু নদী। ট্যানারি বর্জ্য অন্য কিছু নদী ও খালে পড়ায় ওইগুলোর পানিও কমবেশি দূষিত হয়েছে। এর মধ্যে কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচরে মেঘনা নদী, ময়মনসিংহে ব্রহ্মপুত্র নদও রয়েছে।

চামড়ার বর্জ্যে সবচেয়ে বেশি বিষাক্ত হচ্ছে ধলেশ্বরী ও বুড়িগঙ্গার পানি। এই পানি জোয়ার-ভাটা ও বৃষ্টির পানির সাথে মিশে গিয়ে পড়ছে তুরাগ, বালু ও শীতলক্ষ্যা নদীতে। ফলে এসব নদীর পানিও দূষিত হচ্ছে। এছাড়া টঙ্গীতে অবস্থিত চামড়ার আড়ত থেকে বর্জ্য মিশছে তুরাগ নদীতে। গাজীপুর জেলার শ্রীপুরের চামড়ার আড়তের বর্জ্য মিশছে শীতলক্ষ্যা নদীতে। রাজধানীর হাজারিবাগের ২৭০টি ট্যানারির বর্জ্য নদীতে মিশে পানি দূষিত করছে।

ট্যানারি শিল্প রাজধানীর হাজারিবাগ থেকে সাভারে স্থানান্তরিত হওয়ার পর সেখানকার ধলেশ্বরী নদীও দূষণের শিকার হচ্ছে। ট্যানারির বর্জ্যের কারণে ধলেশ্বরী নদী দূষণের বিষয়ে ব্যাখ্যা চেয়েছে পরিবেশ বন ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক সংসদীয় কমিটি।  বুধবার সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত কমিটির সভায় এ বিষয়ে মন্ত্রণালয়ের কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়।

এদিকে নতুন নির্মিত শিল্প অঞ্চলে সিইটিপি পুরোদমে কার্যকরী না হওয়ায় চালু হওয়া কারখানাগুলোর সরাসরি ও আংশিক পরিশোধিত বর্জ্য নদীতে ফেলা হচ্ছে। এতে করে ট্যানারির কঠিন ও তরল বর্জ্যের প্রভাবে বুড়িগঙ্গার মতো ধলেশ্বরী নদীও মরতে বসেছে।

স্থানীয় বিভিন্ন সূত্র জানায়, দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে সাভারের স্থানীয় মানুষের জীবন। কিছুদিন আগেও যেখানে স্বাভাবিক পরিবেশ ছিল, এখন সেখানে পচা দুর্গন্ধে টেকা দায়। জমিতে ফসল ফলছে না, মরে ভেসে উঠছে নদীর মাছও।

পরিবেশবিদেরা বলছেন, ব্যবস্থা না নিলে ধলেশ্বরীর সঙ্গে সংযুক্ত কালিগঙ্গা, বুড়িগঙ্গা ও তুরাগ নদী একই বর্জ্যে দূষিত হবে।

বর্জ্যের বিষাক্ত প্রভাব থেকে ঢাকার ‘প্রাণ’ বুড়িগঙ্গা নদীকে বাঁচাতে ট্যানারি শিল্পকে সাভারে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। প্রায় অর্ধেক ট্যানারি কারখানা সেখানে স্থানান্তর হয়েছে। এরই মধ্যে পরিকল্পনা ও প্রস্তুতির অভাবে বুড়িগঙ্গার মতো পরিণতি হতে যাচ্ছে সাভার সংলগ্ন ধলেশ্বরী নদীর।

পরিবেশবিদেরা বলছেন, পরিকল্পিত কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগারের (সিইটিপি) অভাবে বুড়িগঙ্গার মতো ধলেশ্বরীসহ আশপাশের নদীগুলোরও এখন প্রাণ যেতে বসেছে। বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন পরিবেশবিদ ও স্থানীয়রা বাসিন্দারা।

এদিকে ট্যানারি মালিকেরা সিইটিপি নির্মাণে সরকারের গাফিলতিকে দায়ী করছেন। সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তর বলছে, সবগুলো কারখানা স্থানান্তর হওয়ার পর সিইটিপি পুরোদমে কার্যকর হবে। তখন দূষণের মাত্রা কমে আসবে।

ঢাকার বুড়িগঙ্গা নদী এবং নদী সংলগ্ন হাজারীবাগ এলাকা দূষণমুক্ত করা এবং চামড়াশিল্পের পরিবেশ উন্নত করার লক্ষ্যে ২০০৩ সালে ১ হাজার ৭৯ কোটি টাকা ব্যয়ে সাভারের হেমায়েতপুরে ধলেশ্বরী নদীর তীরে ১৯৯ একর জমিতে চামড়া শিল্পনগর প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়। এক যুগেরও বেশি সময় ধরে বারবার তাগিদ দেওয়া সত্ত্বেও ট্যানারি কারখানাগুলোকে নতুন শিল্প অঞ্চলে নেওয়া যাচ্ছে না।

গত ১ জানুয়ারি ট্যানারি মালিকদের দুটি সমিতির সঙ্গে বৈঠক করে কারখানার ওয়েট ব্লু অংশ সাভারে নেওয়ার জন্য ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত সময় বেঁধে দেয় শিল্প মন্ত্রণালয়। আর পুরো ট্যানারি সরানোর জন্য সময় দেওয়া হয় আগামী মার্চ পর্যন্ত।

অথচ চামড়া শিল্পনগর কার্যালয়ের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী সাভারে জমি পাওয়া মোট ১৫৪টি ট্যানারির মাত্র ৪৩টি সাভারে চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণের প্রথম অংশ ওয়েট ব্লুর কাজ শুরু করতে পেরেছে। আর ওয়েট ব্লু করার জন্য ড্রাম স্থাপন করতে পেরেছে ৫২টি ট্যানারি।

সাভারে চামড়া শিল্প নগর চালু হতে না হতেই পরিবেশের এই দুর্বিষহ অবস্থা নিয়ে গত বছর ‘ধলেশ্বরীকে বুড়িগঙ্গা হতে দেওয়া হবে না’ শিরোনামে স্থানীয় উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে এক গণশুনানি হয়। কয়েকটি পরিবেশবাদী সংস্থার আয়োজনে এই গণশুনানিতে এলাকার পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের দুর্দশা নিয়ে নিজেদের নানা অভিযোগ তুলে ধরেন বিভিন্ন বয়সের ভুক্তভোগী মানুষ।

নানাভাবে ফুসলিয়ে চামড়া শিল্প নগরের জন্য জমি অধিগ্রহণ করে স্থানীয়দের অসহায় করে ফেলা হয়েছে বলে গণশুনানিতে অভিযোগ করেন স্থানীয় বাসিন্দা শাহানাজ বেগম। তিনি বলেন, “এই ট্যানারির কারণে আমাদের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। সোনা-রুপার রং পর্যন্ত বদলে যাচ্ছে।”

বাংলাদেশ পরিবেশ আইনজীবী সমিতির (বেলা) প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান ওই শুনানিতে বলেন, “বহুদিনের আইনি লড়াইয়ের পর হাজারীবাগ থেকে ট্যানারি শিল্প সাভারে স্থানান্তর ও সিইটিপি নির্মাণ হয়েছে। অথচ সেখানে আজও সিইিটিপি কার্যকর হয়নি। এ জন্য পরিবেশের ক্ষতি হচ্ছে।”

তিনি বলেন, দূষণ নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা পুরোপুরি কার্যকর না হওয়া পর্যন্ত ট্যানারি কারখানাগুলো এভাবেই ধলেশ্বরীকে দূষণ করবে কিনা সরকারের কাছ থেকে সেই উত্তর প্রত্যাশা করেন তিনি।

সাভারের সংসদ সদস্য এনামুর রহমান এ বিষয়ে  বলেন, “চামড়া শিল্পের উন্নয়নের মাধ্যমে রপ্তানি আয় বাড়াতেই কারখানাগুলোকে সাভারে স্থানান্তর করা হয়েছে। সিইটিপি কার্যকর না হওয়ায় সেই চামড়া শিল্প এখানেও পরিবেশ নষ্ট করছে। এটা চলতে দেওয়া যায় না। অতি দ্রুত পূর্ণাঙ্গভাবে সিইটিপিকে কার্যকর করে সব ধরনের বর্জ্য শোধন করে তা পরিবেশে ছাড়তে হবে।”

এ বিষয়ে নদী দখল ও দূষণ মুক্তকরণ সংক্রান্ত জাতীয় টাস্কফোর্সের সদস্য ও পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. রইছ উল আলম মণ্ডল  বলেন, “সাভারের ট্যানারি শিল্প এলাকায় সব ট্যানারিও আসেনি। যার কারণে পুরো সিইটিপি চালু করা যাচ্ছে না। যে ৪০-৪৩টি ট্যানারি এসেছে, পরিবেশ অধিদপ্তর, বিসিক সবাই মিলে তাদের সঙ্গে মত বিনিময় করা হচ্ছে, যাতে পরিবেশ দূষণমুক্ত রাখা যায়।

শিল্পাঞ্চলের পূর্ণাঙ্গ কাজ শেষ না করেই ট্যানারি স্থানান্তরের কাজ শুরু করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন বাংলাদেশ ট্যানারি অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএ) চেয়ারম্যান মো. শাহীন আহমেদ। তিনি বেনারকে বলেন, “সরকার আমাদের ট্যানারি স্থানান্তর করতে বলেছে। আমরা কিছু করেছি, বাকিগুলোর কাজ চলছে। ইতিমধ্যে সেখানে আমাদের তিন হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ হয়ে গেছে। এখন বিসিক যদি বর্জ্য শোধন ব্যবস্থা নিশ্চিত না করে, তাহলে সেখানে গিয়েও আমাদের লাভ কী? পুরো কাজ শেষ করেই আমাদের স্থানান্তর করা উচিত ছিল।”

এদিকে, জাতীয় সংসদে স্থায়ী কমিটির বৈঠকের কার্যপত্র থেকে জানা যায়, বৈঠকে জানানো হয়, সাভার বিসিক চামড়া শিল্প নগরীতে এখন ১১৫টি ট্যানারি উৎপাদনে আছে। ট্যানারির তরল বর্জ্য পরিশোধনের জন্য বিসিকের নির্মিত ২৫ হাজার ঘনমিটার/দিন ক্ষমতাসম্পন্ন সিইটিপিতে ফ্লুয়েন্ট পাওয়ার সিস্টেমের মাধ্যমে তরল বর্জ্য স্থানান্তর করা হয়। কিন্তু সিইটিপির পরিশোধিত তরল বর্জ্য ও অপরিশোধিত তরল বর্জ্য এবং ধলেশ্বরী নদীর ১০০ মিটার উজানে ও ২০০ মিটার ভাটি থেকে প্রতি মাসে পরিবেশ অধিদপ্তরের গবেষণাগারের মাধ্যমে নমুনা সংগ্রহ করে ফলাফলে দেখা যায়, বিভিন্ন ক্ষতিকর তরল বর্জ্য (সিওডি, বিওডি এবং টোটাল ক্রমিয়াম, টিডিএস, ক্লোরাইড) বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালার মানমাত্রার বাইরে।

বৈঠক শেষে হাছান মাহমুদ সাংবাদিকদের বলেন, হাজারিবাগের ট্যানারি শিল্প সাভারে স্থানান্তরিত হওয়ায় পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাবসহ ধলেশ্বরী নদী দূষণের বিষয়ে পরিবেশ বন ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে। পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে বলা হয়েছে, চীনের একটি কোম্পানির মাধ্যমে সিটিপি স্থাপন করা হয়েছে, সেটি তারা দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনা করছে না। যারা অদক্ষভাবে সিটিপি পরিচালনা করছে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বলেছে সংসদীয় কমিটি

হাছান মাহমুদ বলেন, সংসদীয় কমিটি এলপিজি বোটলিং প্লান্টকে কেন লাল থেকে সবুজ শ্রেণিভুক্ত করা হয়েছে, সে ব্যাখ্যাও চেয়েছে। এ বিষয়ে মন্ত্রণালয় যে ব্যাখ্যা দিয়েছে, তা কমিটির কাছে গ্রহণযোগ্য মনে হয়নি। যে কারণে পরবর্তী বৈঠকে এই ব্যাপারে লিখিত ব্যাখ্যা দিতে বলা হয়েছে।

কমিটির সভাপতি হাছান মাহমুদের সভাপতিত্বে কমিটির সদস্য পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন উপমন্ত্রী আবদুল্লাহ আল ইসলাম জ্যাকব, নবী নেওয়াজ, মো. ইয়াহ্ইয়া চৌধুরী, মো. ইয়াসি আলী এবং মেরিনা রহমান বৈঠকে অংশ নেন।

 

আরও সংবাদ