Widget by:Baiozid khan
শিরোনাম:

ঢাকা Sat October 23 2021 ,

  • Techno Haat Free Domain Offer

সরকারি মাধ্যমিকের সম্ভাব্য পদোন্নতি ও শিক্ষকদের প্রত্যাশা

Published:2020-12-31 00:20:23    

মাহমুদ সোহেল, বিশেষ প্রতিবেদক: সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক নিয়োগের শর্ত হিসেবে নিয়োগের পাঁচ বছরের মধ্যে পেশাগত বিএড ডিগ্রি অর্জনের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। নিয়োগ বিধিমালা-১৯৯১ এর অধীন তেরটি নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতেও স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে- "তবে শর্ত থাকে যে, নিয়োগ লাভের পাঁচ বছরের মধ্যে বিএড ডিগ্রি অর্জন করিতে হইবে।"  অনিয়মের মধ্যে থাকতে থাকতে এই সেক্টরে বর্তমান প্রশাসনের নিয়ম অনুসরণকে কেউ কেউ অনিয়ম হিসেবে প্রচারের ষড়যন্ত্র শুরু করেছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ১১.০১.১৯৮৬ তারিখের নং-শা৫/৩ গি-২/৮৪/৪৪-শিক্ষা নং আদেশে প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত স্নাতক ডিগ্রিধারী জুনিয়র শিক্ষক /শিক্ষিকাগণ বি.এড পরীক্ষার ফলাফল ঘোষণার তারিখ হতে সহকারী শিক্ষক/শিক্ষিকা হিসেবে প্রযোজ্য বেতন ও ভাতাদি পাবেন মর্মে আদেশ জারি করা হয়।

১৮.০৫.১৯৯১ সন পর্যন্ত নিয়োগপ্রাপ্ত সহকারী শিক্ষক/শিক্ষিকা থেকে সহকারী প্রধান শিক্ষক /শিক্ষিকা পদে পদোন্নতির লক্ষ্যে জ্যেষ্ঠতার মানদন্ড হিসেবে বাংলাদেশ পাবলিক সার্ভিস কমিশনের ০৬/০২/২০০৩ তারিখে সিদ্ধান্ত হলোঃ "যে সকল শিক্ষক/শিক্ষিকা বিএড পাশ করে চাকরিতে যোগদান করেছেন তাদের যোগদানের তারিখ  হতে এবং যারা যোগদানের তারিখের পর বিএড ডিগ্রি অর্জন করেছেন তাদের বিএড পাশের তারিখ হতে এবং বিএড পাশের তারিখ একই হলে যোগদানের তারিখের ভিত্তিতে এবং যোগদানের তারিখ একই হলে বয়সের ভিত্তিতে জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণ করার সিদ্ধান্ত কমিশন গ্রহণ করেছেন। ১৯৯১সালে কর্মকর্তা ও কর্মচারী নিয়োগ বিধিমালা গেজেট আকারে প্রকাশের পরেও ১৯৯১ সালে নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষকগণ পাঁচ বছরের মধ্যে বিএড ডিগ্রি অর্জনের বাধ্যবাধকতা পালনের যৌক্তিকতা চেয়ে হাইকোর্টে ৫৬৬৭/২০১৫ নম্বর মামলা দাখিল করতে বাধ্য হয়।

যেহেতু নিয়ম মানার প্রতি একটি শ্রেণির অনীহা ছিল। মামলার রায়ে অত্যাবশকীয় পেশাগত বিএড ডিগ্রি অর্জনের বাধ্যবাধকতার উপর গুরুত্বারোপ করে বলা হয়েছেঃ "In the recruitment advertisement, it has been clearly mentioned that the appointees who did not have B.Ed degree would have to obtain the degree within 05 years from joining in the service. Due to failure to comply with such mandatory condition though some teachers were supposed to lose their jobs but instead they have been given seniority over the petitioners who have complied with the condition and now those teachers would be considered for promotion in the next higher posts ahead of the petitioners illegally. "

হাইকোর্টের রায় ও আপীল বিভাগের এই চুড়ান্ত রায়কে অবমাননা করে ২২/১১/২০১৭ খ্রিঃ সহকারী প্রধান শিক্ষক পদে পদোন্নতির জন্য একটি জ্যেষ্ঠতা নীতিমালা সুপারিশ কমিটি গঠিত হয়। কমিটির সুপারিশে বিএড শর্তকে শিথিল করে মহামান্য রাষ্ট্রপতি স্বাক্ষরিত নিয়োগ বিধিমালাকে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করা হয়েছে। ১৯৯১ সালের নিয়োগ বিধিমালায় স্পষ্টভাবে নিয়োগ শর্ত মোতাবেক পাঁচ বছরের মধ্যে পেশাগত বিএড ডিগ্রি অর্জনের বাধ্যবাধকতা থাকলেও সুপারিশে বলা হয়েছে-১৯৯১ বা তৎপরবর্তী সময়ে যোগদানকৃত বিএড বা সমমান ডিগ্রিবিহীন স্নাতক (চাকা) / স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী এবং ৫ বছরের মধ্যে বিএড বা সমমান ডিগ্রি অসম্পন্নকারী শিক্ষক/শিক্ষিকাগণের জ্যেষ্ঠতা বিএড পরীক্ষার ফলাফল ঘোষণার তারিখ থেকে গণ্য করা,'অথবা' এরুপ ক্ষেত্রে প্রচলিত সাধারণ বিধিবিধান অনুযায়ী নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ কর্তৃক গৃহীত যেকোনো সিদ্ধান্ত অনুসরণ করা।" যা কোনো সুপারিশ কমিটি প্রস্তাব করতে পারে না। ১১/০৪/২০১৮ খ্রিঃ ছয় সদস্যের একটি রেজুলেশন কমিটি গঠন করা হয়।

যদিও কমিটিতে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের কমিটি গঠনের ছক অনুসারে অর্থ মন্ত্রণালয়ের উপসচিব পদমর্যাদার একজন সদস্য ছিলেন না। সংশ্লিষ্ট দপ্তরের পরিচালক সমমান একজন থাকার নির্দেশনা থাকলেও পরিচালক স্বয়ং যেই কমিটিতে উপস্থিত সে কমিটিতে একই দপ্তরের সহকারী পরিচালক ও উপ পরিচালকদ্বয়কে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। যা সম্পূর্ণরুপে বেআইনী হয়েছে। তাদের প্রণীত এই রেজুলেশনে একটি বিতর্কিত ধারা অন্তর্ভুক্ত করা হয়। যা ১৯৯১ এর নিয়োগ বিধিমালায় বর্ণিত ০৫ বছরের মধ্যে বিএড অর্জনের অত্যাবশকীয় শর্তকে একেবারে শিথিল করা হয়। যা অবস্থাদৃষ্টে মনে হয় পেশাগত এই ডিগ্রি যার খুশি সে অর্জন করতে পারবে। মহামান্য রাষ্ট্রপতি স্বাক্ষরিত একটি আইনকে অবমাননা করার এই দাম্ভিক সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করে প্রশাসনিক ট্রাইবুনালে ৭০/২০১৯ নম্বরে একটি মামলা হয়।

মামলায় বিতর্কিত রেজুলেশনের বিপক্ষে রায়ে স্পষ্ট হয়- যেসকল কমিটি গঠন অসম্পূর্ণ ও উদ্দেশ্য প্রণোদিত তাদের সুপারিশও অবৈধ। সে কমিটির সুপারিশের উপর প্রদত্ত রায় সমূহ আদালতের মূল্যবান সময় নষ্ট করার সামিল বলে ভুক্তভোগী শিক্ষকগণ অভিমত ব্যক্ত করেন। এই বিষয়টি হাইলাইট করে উক্ত কমিটিগুলোর বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান তারা। ভবিষ্যতে কেউ যাতে আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে ফাঁক দিয়ে নিজের অশুভ স্বার্থসিদ্ধি করতে না পারে। যেখানে ১৯৯১ এর নিয়োগ বিধিমালা ও প্রতি সালের নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে ০৫ বছরের মধ্যে বিএড ডিগ্রি অর্জনের বাধ্য বাধকতা রয়েছে সেখানে রেজুলেশনে বির্তকিত ধারা সমূহ যুক্ত করে ন্যায্য অধিকার বঞ্চিত করায় নিন্দা জানান সাধারণ শিক্ষকগণ।

রেজুলেশনের ষড়যন্ত্রমূলক ৪.২উপ-ধারাটি হলোঃ"১৯৯১ সালের নিয়োগবিধির আলোকে ১০ গ্রেডে নিয়োগপ্রাপ্ত যে সকল শিক্ষক/শিক্ষিকা কর্তৃপক্ষের অনুমতি(ডেপুটেশন) না পাওয়ার কারণে চাকুরিতে যোগদানের ৫ বছরের মধ্যে বিএড ডিগ্রি অর্জনে ব্যর্থ হয়েছেন, তবে তারা পরবর্তীতে বি.এড ডিগ্রি অর্জন করেছেন তাদেরকেও যোগদানের তারিখ থেকে জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।" তবে রেজুলেশনে উল্লেখ আছে যে, বিএডএর জন্য শর্ত ভঙ্গকারীরা মাউশিতে আবেদন করেছে অথচ মাউশি অনুমতি দেয়নি এইরুপ কোনো প্রমাণাদি তারা দেখাতে পারেনি।

এই সুপারিশ কমিটি ও রেজুলেশন কমিটি উভয় গঠিত হয়েছিল সহকারী প্রধান শিক্ষক পদোন্নতির জন্য। যা সিনিয়র শিক্ষক পদোন্নতির সাথে সম্পর্কিত নয়। সিনিয়র শিক্ষক পদোন্নতির জন্য কেবল ২০১৮ এর নিয়োগ বিধিমালায় স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। তাই সিনিয়র শিক্ষক পদোন্নতির গ্রেডেশন তালিকা প্রণয়নের জন্য সিনিয়র শিক্ষক পদোন্নতির নীতিমালা-২০১৮ অনুসরণ ছাড়া বিকল্প কোনো উপায় নেই। ভিন্ন কোনো পদ্ধতি অনুসরণ করা হলে আইনী জটিলতা তৈরি হয়ে পদোন্নতি দীর্ঘায়িত হওয়ার সম্ভাবনা থেকে যায়।

সম্পূর্ণ নতুন সৃষ্ট এই পদে প্রথম বারের মতো পদোন্নতি দেয়া হবে বিধায় এই বিষয়ের উপর প্রণীত বিধিবিধানের আলোকে গ্রেডেশন প্রস্তুত করে পদোন্নতি দেয়া ভবিষ্যতের জন্য অনুকরণীয় হবে। কোনো রুপ বিধি বহির্ভূত সিদ্ধান্ত হলে যোগ্যতা অর্জকারীদের অধিকার লঙ্ঘন করবে। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের কর্মচারী ও কর্মকর্তা নিয়োগ বিধিমালা-২০১৮ (সংশোধিত-১৯৯১) মতে সহকারী শিক্ষক হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্তদের নিম্নোক্ত শর্ত পালন করতে হয়- ক) বিএড সহ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে স্নাতক। 'অথবা' খ) সংশ্লিষ্ট বিষয়ে স্নাতকোত্তর। তবে শর্ত থাকে যে এই ধরনের নিয়োগপ্রাপ্তদের নিয়োগ লাভের ৫ বছরের মধ্যে বিএড ডিগ্রি অর্জন করতে হবে।

গ) আরও শর্ত থাকে যে, একটির বেশি তৃতীয়বিভাগ/ শ্রেণি বা সমমান ডিগ্রি গ্রহণযোগ্য হবে না। এই সকল যোগ্যতা ও শর্ত পূরণ সাপেক্ষে একজন নিয়োগপ্রাপ্তকে সহকারী শিক্ষক হিসেবে গণ্য হয়। নিয়োগ বিধিমালা-২০১৮ অনুসারে সহকারী শিক্ষকগণ নিয়োগের শর্ত পূরণ সাপেক্ষে নিয়োগ লাভের আট বছর পর পদোন্নতি পেয়ে সিনিয়র শিক্ষক হবেন। বিধায় সহকারী শিক্ষক এর শর্ত পূরণ সাপেক্ষে অর্থাৎ নিয়োগ লাভের ০৫বছরের মধ্যে বিএড ডিগ্রি অর্জন সাপেক্ষে সিনিয়র শিক্ষক পদে পদোন্নতির জন্য গ্রেডেশনভুক্ত করা হবে। এখানে উল্লেখ্য যে ০৫ বছরের মধ্যে বলতে যোগদানের তারিখ থেকে বিএড পরীক্ষার ফল প্রকাশের তারিখ পর্যন্ত সময়কালকে বোঝায়।

সুতরাং ১৯৯১ এর বিধিতে নিয়োগপ্রাপ্ত সকলকে নিয়োগ বিধিমালা-২০১৮ মোতাবেক সিনিয়র শিক্ষক পদে পদোন্নতি দেয়া হবে কেবল সিনিয়র শিক্ষক পদের শর্ত ও যোগ্যতা অনুসারে। যদি কারো শর্ত ও যোগ্যতায় ঘাটতি থাকে তাহলে সে পদোন্নতির যোগ্য হবেনা।

প্রতিবেদনটি প্রণয়নকালীন শিক্ষকদের সাথে মতবিনিময়ের মাধ্যমে জানা যায় মুজিববর্ষ উপলক্ষে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর বড় ধরনের একটি পদোন্নতি দিতে চাচ্ছেন। এই দপ্তরে দীর্ঘদিন কর্মরত থেকেও অধিকাংশ শিক্ষক পদোন্নতি ছাড়া কর্মজীবন শেষ করেছেন। যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও পদোন্নতি ছাড়া অবসরে যাওয়া শিক্ষকদের মধ্যে চাপা বেদনা ছিল সবসময়। এবার সকলের মধ্যে স্বপ্ন উঁকি দিচ্ছে। সকল শিক্ষকের একটি দাবি নিয়োগ শর্ত পালনকারী সকলকে পদোন্নতি দিতে আইনী কোনো জটিলতা নেই। তাই দ্রুত সময়ে পদোন্নতি পাওয়ার আশায় তারা উদগ্রীব হয়ে আছেন।

সরকারি মাধ্যমিক স্বাধীনতা শিক্ষক পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির মহাসচিব মোহাম্মদ মানজু মিয়া সরকার বলেন, দেখুন এখানে পদোন্নতির শর্ত দেওয়া হয়েছে তিনটি। চাকুরির বয়স মোট আট বছর হতে হবে, চাকুরিতে যোগদানের ৫ বছরের মধ্যে বিএড ডিগ্রী অর্জণ করতে হবে এবং যথাযথ নিয়মে চাকুরির স্থায়ীকরণ হতে হবে। অনেকে এসব শর্ত পূরণ না করেই পদন্নোতি পেতে চেষ্টা করছেন। আমরা বলেছি প্রকৃতপক্ষে পদোন্নতির জন্য যে বিধি করা হয়েছে তা মেনে কার্যক্রম পরিচালনা করা হোক। 

সরকারি মাধ্যমিক স্বাধীনতা শিক্ষক পরিষদ (স্বাশিপ)এর কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক ও বাংলাদেশ সরকারি মাধ্যমিক শিক্ষক সমিতি খুলনা জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক মোঃ ওমর ফারুক বলেন,"সরকারি মাধ্যমিকে এই মুজিববর্ষে বঙ্গবন্ধু কন্যার উপহার হিসেবে সিনিয়র শিক্ষক পদে যে প্রমোশন হতে যাচ্ছে, তা যেন বিধি-বিধান ও শর্ত পালনকারী শিক্ষকদের বঞ্চিত করে দেওয়া না হয়; কারণ - চাকরির নিয়োগ কালীন শর্ত পালন না করলে সন্তোষজনক চাকুরীকাল বলা যায় না; আর তাই, ৯০ ভাগ শর্ত পালনকারী শিক্ষকগণ মনে করেন, সন্তোষজনক চাকুরী এবং বিধি-বিধান ও শর্ত পালন কারী শিক্ষকগণের ন্যায্য অধিকার রয়েছে সিনিয়র শিক্ষক পদে"পদোন্নতি" পাওয়ার। শর্ত পালনকারীদের পদোন্নতির নিশ্চিত করে তারপর অন্যদের বিবেচনায় আনার সুযোগ দিলে বেশিরভাগ শিক্ষক এই মুজিববর্ষে কিছুটা হলেও প্রশান্তি পাবেন এবং মুজিব বর্ষের বিশেষ উপহার হিসেবে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রতি সরকারি মাধ্যমিক শিক্ষক কুল চির কৃতজ্ঞ থাকবেন।

এমএস/এসএস

আরও সংবাদ