Widget by:Baiozid khan
  • Advertisement

মুক্তিযুদ্ধের সময় আটক হয়েছিলেন রওশন জাহান

Published:2013-05-01 21:17:48    

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরুর পরদিনই পাক সেনারা ধরে নিয়ে যায় সাহসী নারী রওশন জাহান সাথীকে৷ তবে পাক সেনাদের সামনে মাথা নিচু না করে কৌশলে মুক্তি পান তিনি৷

সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছেন মুক্তির সংগ্রামে৷ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে রওশন জাহান সাথী এমপি'র বীরত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়ে বিশেষ পরিবেশনার প্রথম পর্ব আজ৷

যশোরে ১৯৫১ সালের ৮ই মে জন্ম রওশন জাহান সাথীর৷ পিতা অ্যাডভোকেট মোশাররফ হোসেন এবং মা বেগম নুরুন্নাহার৷ পিতা ছিলেন সত্তরের নির্বাচনে বিজয়ী সাংসদ এবং মুক্তিযোদ্ধা৷ ফলে পারিবারিক সূত্রেই রাজনৈতিক চেতনায় বেড়ে উঠেছেন রওশন৷ স্কুল জীবন থেকেই তাই পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের সাথে জড়িয়ে পড়েন তিনি৷ কলেজে পড়ার সময় ছাত্রলীগের কার্যক্রমে সক্রিয় ছিলেন৷ মুক্তিযুদ্ধ শুরুর আগেই তিনি ডিগ্রি পরীক্ষা শেষ করেন৷

আন্দোলন-সংগ্রামের পরিস্থিতি বিবেচনা করে স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরুর আগে ছাত্রলীগ দৃঢ়প্রতিজ্ঞ কর্মী-সদস্যদের নিয়ে একটি গোপন বাহিনী গঠন করে৷ সেই বিশেষ বাহিনীর সদস্য হিসেবে কীভাবে মুক্তিযুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি নিয়েছিলেন, ডয়চে ভেলের সাথে একান্ত সাক্ষাৎকারে সেসব কথা জানালেন রওশন জাহান সাথী৷ তিনি বলেন, ‘‘মুক্তিযুদ্ধের আগে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের যশোর মহকুমা শাখার সভাপতি ছিলাম৷ দেশমাতৃকার স্বাধীনতার জন্য ছাত্রলীগের মধ্যে ‘স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী পরিষদ' নামে একটি গোপন সংগঠন গড়ে ওঠে৷ নেতারা এসময় বিভিন্ন জেলায় এই গোপন সংগঠনের কর্মী সংগ্রহ করতেন৷ তারাই আমাকে এতে অন্তর্ভুক্ত করেন৷ আমি এই সংগঠনের যশোর জেলা ফোরামের সদস্য ছিলাম৷ পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করে দেশ স্বাধীন করতে হবে এজন্য সবধরণের প্রস্তুতি নিতে থাকি আমরা৷ এই সংগঠনের শর্তগুলো ছিল, যুদ্ধ করেই দেশ স্বাধীন করতে হবে৷ যুদ্ধের মধ্য দিয়ে দেশ স্বাধীন না করা পর্যন্ত অন্য কোন ব্যক্তিগত সম্পর্কে জড়ানো যাবে না৷ এসব প্রতিজ্ঞা করে আমরা বিশ্বের নানা দেশের আন্দোলনের ইতিহাস পর্যালোচনা করে যথার্থ জ্ঞান অর্জন করি এবং অস্ত্র প্রশিক্ষণ নিই৷ আমরা যুদ্ধের জন্য নিজেদের তৈরি করতে থাকি৷ ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানসহ সেসময়ের সকল আন্দোলন-সংগ্রামে যশোর জেলায় যারা নেতত্ব দিয়েছেন আমি তাদের সাথেই ছিলাম৷ এসময় প্রত্যেকটি শহরে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পায়ে হেটে ঘুরে ঘুরে সদস্য ও কর্মী সংগ্রহ করেছি৷ তৎকালীন বৃহত্তর যশোর জেলার অন্তর্ভুক্ত মাগুরা, ঝিনাইদহ, নড়াইল ও যশোরের সকল প্রান্ত আমরা চষে বেড়িয়েছি৷ এসময় ঐ অঞ্চলের তরুণদের মুক্তিযুদ্ধের জন্য সংগঠিত করার কাজে নিয়োজিত ছিলাম৷''

১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ রাতে অন্যান্য অঞ্চলের মতো যশোর জেলাতেও হত্যাযজ্ঞ শুরু করে পাকিস্তানি বাহিনী৷ যশোরের বিভিন্ন নেতা, এমপিএ, এমএনএ এবং ছাত্রনেতার বাড়িতে হামলা চালায় তারা৷ যুদ্ধ শুরুর ঘটনা জানাতে গিয়ে নারী নেত্রী রওশন জাহান বলেন, ‘‘২৫শে মার্চ রাতে আমাদের বাড়িতেও হামলা হয়৷ তবে আমরা এর ঘণ্টাখানেক আগে বাড়ি থেকে চলে গিয়েছিলাম বলে রক্ষা পাই৷ আমার বাবা স্থানীয় সবাইকে নিয়ে যুদ্ধে চলে গিয়েছিলেন৷ আমরা বাইরে দু'দিন কয়েকটি বাড়ি ঘুরে মামার বাড়ি গিয়েছি৷ কিন্তু সেদিন যশোর সেনানিবাস থেকে কর্নেল তোফায়েলের নেতৃত্বে পাঁচ/ছয় গাড়ি সৈন্য এসে বাড়িটা ঘেরাও করে৷ আমাকে গ্রেপ্তার করে যশোর সেনানিবাসে নিয়ে যায়৷ সঙ্গে আমার মা এবং খালাও ছিলেন৷ সেখানে পাক সেনারা আমাকে বিভিন্ন অস্ত্রের মুখে হুমকি দিচ্ছিল এবং জিজ্ঞাসাবাদ করছিল৷ এক পর্যায়ে তারা খুব অশ্লীল ভঙ্গিমায় অশ্লীল ইঙ্গিত করতে থাকে৷ আমার কাছ থেকে নানা তথ্য বের করার চেষ্টা করে৷ মিছিলের ছবি দেখিয়ে বলে তোমরা মিছিল করেছো, তোমরা পাকিস্তান ভাঙতে চাও৷ তোমরা চক্রান্ত করছ, তোমাদের শাস্তি হবে৷ এরপরে ওরা আমাকে দু'টি বিশেষ ঘরের সামনে নিয়ে যায়৷ একটি ঘরে দেখলাম বেশ কয়েকজনকে ভীষণ মেরেছে৷ রক্তাক্ত অবস্থা৷ ওরা খুব কাতরাচ্ছে৷ অপর ঘরটি হলো বিশাল ব্যারাক৷ সেখানে অনেকগুলো সৈন্য রয়েছে৷ তাদের সাথে আরো কিছু মানুষ এবং মেয়েরাও রয়েছে৷ দেখালো যে, আমি যদি তাদের কথা মতো তথ্য না দিই এবং সহযোগিতা না করি, তাহলে হয় আমাকে মেরে হাড্ডিগুড্ডি ভেঙে মেরে ফেলবে অথবা ঐ মেয়েদের মতো ব্যারাকে সৈন্যদের সাথে থাকতে হবে৷ এরপর কর্নেল তোফায়েল আমাকে অনেক কিছু জিজ্ঞেস করল৷ কিন্তু আমি শুধু এটুকু বললাম যে, হ্যাঁ, আমি মিছিল করেছি৷ কিন্তু এর চেয়ে আর বেশি কিছু বলতে পারবো না৷ এরপর আমি তাকে বোঝাতে চেষ্টা করি যে, আমাকে যেখান থেকে ধরে এনেছেন, সেখানে রেখে আসেন এবং নজরবন্দি করে রাখেন৷ আপনার নিয়ন্ত্রণেই রাখেন কিন্তু সেনানিবাসে না রেখে ঐ বাসায় রাখেন৷ কর্নেল তোফায়েল আমার এই কথাটা রেখেছিল৷ রাত এগারোটার দিকে সে আমাদেরকে ঐ বাসায় পৌঁছে দেয় এবং তারপর থেকে পালাক্রমে সেনা পাহারার ব্যবস্থা করে৷ পরে জানতে পারি যে, যশোর জেলার শান্তি কমিটির সেক্রেটারি আমাদের অবস্থান জানিয়ে দিয়ে আমাদেরকে ধরিয়ে দিয়েছিল৷''

এছাড়া তখন যশোর শহরে মাইকিং করা হয়েছিল যে, রওশন জাহানের বাবাকে জীবিত বা মৃত ধরিয়ে দিতে পারলে বড় অঙ্কের টাকা পুরস্কার দেওয়া হবে৷ কিন্তু তাঁর বাবা আগেই যুদ্ধে চলে যান বলে তারা আর ধরতে পারেনি৷ তবে তাঁদের বাড়িটাকে খালি পেয়ে সেটাকে রাজাকারেরা ঘাঁটি বানিয়েছিল৷

প্রতিবেদন: হোসাইন আব্দুল হাই
সম্পাদনা: আরাফাতুল ইসলাম


বাংলাসংবাদ২৪/এনডি/বিএইচ

আরও সংবাদ