Widget by:Baiozid khan
শিরোনাম:

ঢাকা Tue September 25 2018 ,

স্বাধীন বাংলাদেশের একজন যুগমানব

Published:2013-05-14 17:37:20    

একাত্তরে আমাদের একজন যুগমানব এসেছিলেন, সরকার গঠন থেকে শুরু করে পুরো মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনায় যিনি অনন্যসাধারণ ভূমিকা রাখেন। যিনি দলকে ছাড়িয়ে দেশকে ধারণ করেছিলেন আপন সত্তায়; যিনি সব প্রতিকূলতা অতিক্রম করে স্বাধীনতার স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিয়েছিলেন। তিনি তাজউদ্দীন আহমদ।
২৫ মার্চ রাতেই স্বাধীনতাসংগ্রামের প্রধান নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হন। সহকর্মীদের আত্মগোপনে চলে যেতে বললেও তিনি থেকে যান ৩২ নম্বরের বাড়িটিতে, যেখান থেকে ১ থেকে ২৫ মার্চ পরিচালিত হয়েছে সমগ্র দেশ। তাঁর আশঙ্কা ছিল, পাকিস্তানি সেনারা তাঁকে না পেয়ে গোটা শহর জ্বালিয়ে দেবে (ডেভিড ফ্রস্টের সঙ্গে সাক্ষাৎকার)।
৩ এপ্রিল দিল্লিতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে বৈঠককালেই তাজউদ্দীন আহমদ মনস্থির করেছিলেন, সংগ্রাম সফল করতে হলে আইনানুগ সরকার গঠনের বিকল্প নেই। সরকার গঠিত না হলে বহির্বিশ্বের সহায়তা পাওয়া যাবে না।
কীভাবে সরকার গঠিত হবে, কারা সেই সরকারে থাকবেন—সেই প্রশ্নের জবাবও অজানা ছিল না এই বিচক্ষণ রাজনীতিকের। মার্চে অসহযোগ আন্দোলন চলাকালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব দলের সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক ও চার সহসভাপতিকে নিয়ে হাইকমান্ড গঠন করেছিলেন। তাজউদ্দীন আহমদ ঠিক করলেন, তাঁরাই হবেন সরকারের প্রধান কান্ডারি। দিল্লি থেকে ফিরে তিনি দলের অন্যান্য কেন্দ্রীয় নেতার খোঁজে বের হন, কেউ কেউ তখন কলকাতায় পৌঁছে গেছেন।
১০ এপ্রিল বলা যায়, তাঁর একক উদ্যোগে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে স্বাধীন বাংলাদেশ সরকার গঠিত হলো। বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে সৈয়দ নজরুল ইসলাম হলেন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি এবং প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ। সরকারের অন্য সদস্যরা হলেন ক্যাপ্টেন মনসুর আলী (অর্থ), খন্দকার মোশতাক আহমদ (পররাষ্ট্র ও আইন এবং এ এইচ এম কামরুজ্জামান (স্বরাষ্ট্র, ত্রাণ ও পুনর্বাসন)।
এই মন্ত্রিসভা গঠনে তাজউদ্দীন আহমদ সবচেয়ে বেশি বিরোধিতার সম্মুখীন হয়েছিলেন আওয়ামী লীগের যুব নেতৃত্বের কাছ থেকে। তাঁদের দাবি ছিল, বিপ্লবী কাউন্সিল গঠন করে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করতে হবে। কিন্তু আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে তা গ্রহণযোগ্য হতো না। বিশেষ করে, গণতান্ত্রিক দেশগুলো এ ধরনের কাঠামোকে সন্দেহের চোখে দেখত। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে প্রধান যুক্তি ছিল নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরে পাকিস্তানি শাসক চক্রের অস্বীকৃতি। সে ক্ষেত্রে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে সরকার গঠনই ছিল উত্তম পথ। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের (জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদ) অধিকাংশ তাজউদ্দীন আহমদের নেতৃত্বের প্রতি আস্থাশীল না হলেও তাঁর অকাট্য যুক্তি মেনে নিতে বাধ্য হন। এ ক্ষেত্রে যে মানুষটি তাঁকে নীরবে ও সরবে সমর্থন করে গেছেন, তিনি সৈয়দ নজরুল ইসলাম।
আসলে বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে যুদ্ধের কর্তৃত্ব ও নেতৃত্ব এককভাবে নিজেদের হাতে নিতে চেয়েছিলেন যুবনেতারা। আওয়ামী লীগের বাইরের কাউকে মুক্তিযুদ্ধের সাংগঠনিক প্রক্রিয়ায় যুক্ত করতেও প্রবল আপত্তি ছিল তাঁদের। কিন্তু তাজউদ্দীন আহমদ তাঁদের কথা আমলে না নিয়ে সব পথ ও মতের লোকদের নিয়ে গড়ে তুলেছিলেন মুজিবনগর সরকারের প্রশাসনিক ও সামরিক কাঠামো। বিলম্বে হলেও সর্বদলীয় উপদেষ্টা পরিষদ গঠনও ছিল তাঁর রাজনৈতিক দূরদর্শিতার পরিচয়।
পৃথিবীতে মাত্র দুটি দেশের স্বাধীনতার আনুষ্ঠানিক ঘোষণাপত্র আছে—বাংলাদেশ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। ১০ এপ্রিল ছয় সদস্যের সরকার গঠনের পাশাপাশি স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রও জারি হয়। পরদিন ১১ এপ্রিল বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ দেশবাসীর উদ্দেশে বেতারে ভাষণ দেন, যা আকাশবাণী থেকে একাধিকবার প্রচারিত হয়। এই প্রথম দেশ ও বিদেশের মানুষ জানল, বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রাম পরিচালনার লক্ষ্যে একটি আইনানুগ সরকার গঠিত হয়েছে। এই ভাষণে তাজউদ্দীন আহমদ বলেন, ‘পাকিস্তান আজ মৃত এবং অসংখ্য আদমসন্তানের লাশের তলায় তার কবর রচিত হয়েছে।...সাড়ে সাত কোটি বাঙালি অজেয় মনোবল ও সাহসের মাধ্যমে স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম দিয়েছে এবং প্রতিদিন হাজার হাজার বাঙালি সন্তান রক্ত দিয়ে এই শিশুরাষ্ট্রকে লালিত-পালিত করছেন। দুনিয়ার কোনো জাতি এই নতুন শক্তিকে ধ্বংস করতে পারবে না।’
স্বাধীন বাংলাদেশ সরকার গঠিত হলো। কোথায় এই সরকার, কীভাবে কাজ করছে তারা, সেটি দেখাতে তো একটি বিশ্বস্ত প্রমাণ চাই। পাকিস্তান সরকার অপপ্রচার চালিয়ে যাচ্ছে যে বাংলাদেশ সরকারের অস্তিত্ব নেই; ওটি কেবল ভারতের প্রচারণা। সে কারণেই দেখাতে হবে, বাংলাদেশের মাটিতেই স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ সরকার কাজ করছে। শপথ গ্রহণের স্থান হিসেবে বেছে নেওয়া হলো পশ্চিমবঙ্গের সীমান্তবর্তী কুষ্টিয়া জেলার বৈদ্যনাথতলার আম্রকাননকে। এলাকাটির তিন দিকে ভারত। তাই পাকিস্তানি বিমান হামলার আশঙ্কা ছিল না।
১৬ এপ্রিল কলকাতা প্রেসক্লাবে এসে বাংলাদেশ সরকারের দুই প্রতিনিধি আবদুল মান্নান ও আমীর উল ইসলাম শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে যাওয়ার জন্য সাংবাদিকদের আমন্ত্রণ জানান। তাঁদের বলা হলো, পরদিন সকাল আটটায় প্রেসক্লাব থেকে গাড়ি রওনা হবে। কাউকে জানানো হলো না কোথায় যেতে হবে।
নির্ধারিত সময়ে সাংবাদিকদের গাড়িবহর এসে বৈদ্যনাথতলায় এসে পৌঁছাল। এর আগেই এসেছিলেন বাংলাদেশ সরকারের প্রতিনিধি, জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য, সরকারি কর্মকর্তারা। এসেছিলেন মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি কর্নেল (অব.) আতাউল গনি ওসমানী। এরপর এলেন ইপিআর ও আনসার বাহিনীর সদস্যরা। এলেন আশপাশের এলাকা থেকে কয়েক হাজার মানুষ। প্রথমে কোরআন তেলাওয়াত হলো। তারপর বাংলাদেশের মানচিত্রশোভিত জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হলো। স্থানীয় চার তরুণ গাইলেন জাতীয় সংগীত ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি...।’ জাতীয় পরিষদের চিফ হুইপ অধ্যাপক ইউসুফ আলী মুহুর্মুহ স্লোগান ও করতালির মধ্যে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পাঠ এবং শপথ অনুষ্ঠান পরিচালনা করলেন।
শপথ গ্রহণের পর সাংবাদিকদের উদ্দেশে নবগঠিত রাষ্ট্রের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি ভাষণ দেন এবং প্রধানমন্ত্রী সাংবাদিকদের উদ্দেশে আট পৃষ্ঠার একটি বিবৃতি পাঠ করেন। তাঁরা বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামে বিশ্ববাসীর সহায়তার আহ্বান জানালেন। এরপর তাজউদ্দীন আহমদ সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন। সাংবাদিকেরা জানতে চান, বাংলাদেশের রাজধানী কোথায়? জবাবে তিনি বলেন, ‘মুজিবনগর।’ মুজিবনগর ছিল স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম রাজধানী; আক্ষরিক ও রূপক—দুই অর্থেই। যুদ্ধকালীন সরকার নয় মাস এই মুজিবনগরেই তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করেছে। নিয়েছে দেশ গঠন ও উন্নয়নের স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা।
বাংলাদেশের স্বাধীনতাসংগ্রামের দীর্ঘ পথচলায় যে কটি তারিখ নক্ষত্রের মতো জ্বলজ্বল করছে, নিঃসন্দেহে ১৭ এপ্রিল সেগুলোর মধ্যে অন্যতম। স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সরকারের আনুষ্ঠানিক শপথ নেওয়ার দিন।

আরও সংবাদ