Widget by:Baiozid khan
  • Advertisement

ঢাকার বাইরের ও ক্যাম্পাস সাংবাদিকতা : সমস্যা ও সম্ভাবনা

Published:2013-07-13 15:30:30    

দুলাল চন্দ্র বিশ্বাস :
১. ঢাকার বাইরের সাংবাদিকতা চরিত্র বিচারে ঢাকার সাংবাদিকতারই অনুকরণ। বাংলাদেশে সাংবাদিকতার যে সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে তার কেন্দ্র এখন ঢাকায়। রাজধানী শহর হওয়ার কারণে ঢাকা দেশের রাজনৈতিক অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু। প্রান্তের সাথে রাজনীতি, অর্থনীতি ও প্রশাসনের যে সম্পর্ক ঢাকার সাথে ঢাকার বাইরের সাংবাদিকতার সম্পর্ক সেই রকমের। এ সম্পর্ক শোষণমূলক। ঢাকা কেন্দ্রিক সাংবাদিকতা ঢাকার বাইরের সাংবাদিকদের শ্রম, নিষ্ঠা, স্বপ্ন এবং সততা শোষণ করছে। এই নির্মমতার বিপরীতে ঢাকার সাংবাদিকতার যে নেতিবাচক প্রবনতা তা চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে ঢাকার বাইরের সাংবাদিকতায়। ঢাকার বাইরের সাংবাদিকতা ঢাকা কেন্দ্রীক সাংবাদিকতারই সম্প্রসারণ। মাঝে মাঝে যে ব্যতিক্রম দেখে আমরা চমকে উঠি তা ঢাকার বাইরের সাংবাদিকদের আর্তনাদ।

২. তিনটি imagined community বা কল্পরাজ্য এবং একটি মিথকে ঘিরে সাম্প্রতিক সময়ে কেন্দ্রের সাংবাদিকতা প্রতীক পরিবেশ গড়ে তুলতে চাচ্ছে। এই কল্পরাজ্যের প্রথম দুটি এদেশের ইতিহাস সঞ্জাত। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ শক্তির বাংলাদেশ-রাষ্ট্রকল্পনা ভিত্তি যে চেতনা তাই মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের গণমাধ্যম সাংবাদিকতা ভাবাদর্শগত (idiology) ভিত্তি অপরদিকে মুক্তিযুদ্ধের প্রতিপক্ষ শক্তির বাংলাদেশ-রাষ্ট্রকল্পনা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি সবক ভিন্ন। মুক্তিযুদ্ধের প্রতিপক্ষ শক্তির রাষ্ট্রকল্পনার ভিত্তি যে ধর্মীয় মূল্যবোধ ও সাম্প্রদায়িকতা তাই মুক্তিযুদ্ধের প্রতিপক্ষ শক্তির সাথে সংশ্লিষ্ট গণমাধ্যম এবং সাংবাদিকতার ভাবাদর্শ। মনে করিয়ে দেয়া প্রয়োজন যে, গণমাধ্যমের ভাবাদর্শ গণমাধ্যমের উৎপাদনকে প্রভাবিত করে। ভাবাদর্শের এই বিভাজন দেশে সাংবাদিকতার উদ্দেশ্যকে দুটি ধারায় ভাগ করে ফেলেছে। শুধু তাই নয়, সাংবাদিক সম্প্রদায়, প্রেসক্লাব এবং সাংবাদিক ইউনিয়ন সমূহও দ্বিধা বিভক্ত।

তৃতীয় কল্পরাজ্যটি বিশ্বায়নের প্রভাবজাত। ভৌগলিক সীমানাবিহীন এক পৃথিবীর যে আওয়াজ উঠেছে তার একাধিক চিন্তাগত ভিত্তি রয়েছে। এইসব চিন্তা কাঠামো মিলে যে দর্শন তার উপর ভিত্তি করে দেশের প্রধান ধারার বেশ ক’টি গণমাধ্যম তাদের ভাবাদর্শিক অবস্থান তৈরি করেছে। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ প্রতিপক্ষ শক্তি রাষ্ট্রক্ষমতা দখল এবং রাষ্ট্রের চরিত্র নির্ধারণ করার লড়াইকে এরা নিরপেক্ষ অবস্থান থেকে নিরীক্ষণ করার কৌশলে বিশ্বাসী। তাদের এই বিশ্বাস পশ্চিমা সাংবাদিকতার মুলনীতি ‘বস্তুনিষ্ঠতা’র সাথে একার্থক মনে হয়। জাতির মনোজগতের বিভাজন, μমঘনায়মান অস্তিত্ব এবং আত্মপরিচয়ের সংকট, অনেকটা পাশ কাটিয়ে এরা বিশ্বায়নের এজেন্ডার প্রতি বেশী আগ্রহী।

দারিদ্র এদেশে মিথ না বাস্তবতা? একই প্রশ্ন করা যায় উন্নয়ন সম্পর্কেও। স্থানীয়, জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে বাংলাদেশের দারিদ্র এবং উন্নয়ন এর সামগ্রিক অর্থময়তা নিয়ে বাংলাদেশের সমকালীন সাংবাদিকতায় উপস্থাপিত হয়েছে। তবে খুবই আশ্চর্যের ব্যাপার, দারিদ্র এবং উন্নয়নও μমাগত গণমাধ্যমের দলীয় বিষয়ে পরিগণিত হচ্ছে।

সাংবাদিকদের ভাবদর্শগত বিভাজনের কারনেই সাংবাদিকতার নৈতিকতার মানদন্ড ভেঙে পড়েছে। সাংবাদিকরা এখন আর জনবিবেকের প্রতিনিধিত্ব করেন না। তারা সংবাদপত্রের মালিকের চাকর। গণমাধ্যম শিল্পে যে ব্যবসায়ীক পূঁজি বিনিয়োজিত হয়েছে তার কাছে সাংবাদিকরা তাদের সাহস ও বিবেক বিμি করে দিয়েছেন। প্রতিষ্ঠান হিসেবে সম্পাদকের মৃত্যু ঘটেছে। ফলে গোটা দেশে সাংবাদিক এবং তথ্য বেচাকেনার একধরনের স্বেচ্ছাচার তৈরি হয়েেেছ। তথ্যভোক্তা জনগোষ্ঠির মাঝে গণমাধ্যম সাক্ষরতা না থাকার কারণে গণমাধ্যম ও সাংবাদিকদের স্বেচ্ছাচার প্রতিরোধ করা যাচ্ছে না। বাংলাদেশ বস্তুতপক্ষে এখন দুই কল্পরাজ্যের ঝগড়ার মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে। দুঃখের বিষয় হচ্ছে, গণমাধ্যম এই ঝগড়া বিμি করে ভালো মুনাফা করছে এবং প্রচুর বিজ্ঞাপনও পাচ্ছে।

মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ ও প্রতিপক্ষ শক্তি একে অন্যকে পরাজিত ও অধীনস্ত করতে চায়। ফলে যখনি রাষ্ট্রক্ষমতা হাতে পায়, একে অন্যের প্রতি উপনিবেশবাদী হয়ে ওঠে। গণমাধ্যম ও সাংবাদিকদের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিμম ঘটে না। ঢাকা কেন্দ্রিক গণমাধ্যম, সাংবাদিক ও সাংবাকিতার এই চিত্র গোটা দেশেরই বাস্তবতা।

৩.ঢাকার বাইরের সাংবাদিকতার কয়েকটি পরেত বা স্তর আছে। বিভাগীয়, জেলা, উপজেলা শহর থেকে দৈনিক, সাপ্তাহিক এবং অনলাইন পত্রিকা প্রকাশিত হচ্ছে। সংখ্যায় এসকল পত্রিকার সাংবাদিক অনেক। এ তিনটি পর্যায়ের ঢাকা কেন্দ্রিক সংবাদপত্র এবং টেলিভিশনের প্রতিনিধি রয়েছেন। প্রযুক্তি ও সুযোগের বিস্তৃতির কারণে একজন সাংবাদিক এখন একই সাথে একাধিক গণমাধ্যমে কাজ পারেন। ঢাকার বাইরের সাংবাদিকদের আয়, মর্যাদা ও ক্ষমতা বেড়েছে পাশাপাশি সংকটও আরো ঘনীভূত হয়েছে।

ক. স্থানীয় পত্রিকার পুঁজি, পাঠক, সংখ্যা এবং বিজ্ঞাপন কম। সাংবাদিকদের বেতন অনিয়মিত। তাই সাংবাদিকদের অন্য পেশায় কাজ করে অথবা সাংবাদিক নাম প্রত্যাহার করে জীবিকা অর্জনের উপায় করতে হয়। ফলে সাংবাদিকতা সমাজের অন্যায়, অনাচার, দুর্নীতি প্রতিরোধে কাজ করার শক্তি হারাচ্ছে। কখনও কখনও এসব আড়াল করার ক্ষেত্রে সাংবাদিকতা ব্যবহৃত হচ্ছে।

খ. ঢাকার গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের যারা স্থানীয় প্রতিনিধি তারাও যে সবাই নিয়মিত বেতন-ভাতা পান এমন নয়। হাতে গোনা দু-একটি প্রতিষ্ঠান ওয়েজ বোর্ড অনুযায়ী এবং নিয়মিত বেতন দিয়ে থাকে। তবে ঢাকার সাংবাদিকদের তুলনায়, স্থানীয় প্রতিনিধিদের বেতন অনেক কম। অধিক স্বচ্ছলতা অর্জনে তারাও দুর্নীতি ও দুর্বৃত্তায়নের অংশ হতে বাধ্য।

গ. গণমাধ্যমের ক্ষমতার অপব্যবহার গণমাধ্যমের ক্ষমতা সম্পর্কে একটা আতংক তৈরি করেছে। তথ্য সংগ্রহে, উৎস ব্যবহারে, তথ্যের বিন্যাস ও বিশ্লেষণে সাংবাদিকরা গণমাধ্যমের এই ইমেজের সুযোগ নিচ্ছেন। ফলে গণমাধ্যমের গণবিচ্ছিন্নতার দুর্নামটি আরো দৃড় হচ্ছে।

ঘ. ঢাকার বাইরের সাংবাদিকদের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের সুযোগ নেই। কাজের ভেতর দিয়ে সংবাদ সংগ্রহ আর লেখালেখির সাধারণ ধারনা তৈরি হলেও সাংবাদিকদের আচরণ, নৈতিকতা, দায়িত্ব সম্পর্কিত ধারনার অভাব থেকেই যায়। গণমাধ্যমের মালিক পক্ষ এ ব্যাপারে উদাসীন। এই উদাসীনতার অর্থনীতি আছে।

ঙ. ঢাকার বাইরে যারা সৎ ও সাহসী সাংবাদিক তারা সব সময়েই নিরাপত্তা ঝুঁকিতে থাকেন। সাংবাদিকদের যে কাজে ঐক্য এ ঝুঁকি মোকাবেলার সহায়ক হতে পারতো তা অনুপস্থিত।

চ. ঢাকার বাইরের সাংবাদিকতায় ক্যাম্পাস সাংবাদিকতা কেবল স্থানীয় বৈশিষ্ট্রের কারনে নয়, এর চ্যালেঞ্জ এর কারনেও বিশেষ মনোযোগ দাবি করে। দেশের প্রত্যেকটি বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ রাষ্ট্রের মিনিয়েচার। সাংবাদিকরা এখানে বয়সে একাবারেই তরুণ। সাংবাদিক হওয়ার জন্য তাদের স্বপ্ন নিষ্পাপ। কিন্তু পেশাজীবনের শুরুতেই তারা শ্রম শোষণ এবং আর্থিক বঞ্চনার শিকার হন। বহু বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবেদক এখন মূল ধারার গণমাধ্যমের পরিচিত মুখ তাদের সাক্ষ্যে একথা স্পষ্ট হচ্ছে। আশা ভঙ্গ ও বঞ্চনার ভেতর দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবেদকদের মূল ধারার সাংবাদিকতার জন্য প্রস্তুত হতে হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্ষমতার উচ্ছিষ্টের লোভে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবেদকদের শেখার এত সুযোগ করে দেয় যে বৃহত্তর পেশা জীবনে তাদের কোনো অসুবিধা পোহাতে হয় না।

সম্ভাবনা একটি চতর শব্দ। বর্তমান সাংবাদিকতার সংস্কৃতি ও কাঠামোর ভেতরে আমি বাংলাদেশে ঢাকা ঢাকার বাইরের এবং ক্যাম্পাস সাংবাদিকতার কোনো সম্ভাবনা দেখি না। তবে বর্তমান সাংবাদিকতার বাজারমুখী মডেল যদি গণসাংবাদিকতার মডেল দ্বারা প্রতিস্থাপিত করা যায় তাহলে নতুন সম্ভাবনার তৈরি হবে।

দ্বিতীয়ত ঢাকার বাইরে খামাখা বহু পত্রিকা প্রকাশিত হচ্ছে। ব্যবসা ও জনকল্যাণ মাথায় রেখে এসকল পত্রিকার ভাবাদর্শিক বলয় ঠিক রেখে একীভূত হতে পারে। বাজার সম্প্রসারনের সাথে এসকল পত্রিকার বহুজাতিক বিজ্ঞাপন পাওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যাবে।

তৃতীয়ত প্রযুক্তি ব্যবহার সাংবাদিকতায় জন অংশগ্রহণ বাড়ানো যেতে পারে। স্থানীয় পর্যায়ে সিটিজেন জার্নলিজম চর্চা সাংবাদিকতা স্থানীয় বাস্তবতা ও পরিবর্তনের উপযোগী করে তুলবে।

সর্বশেষ স্থানীয় সংবাদ মাধ্যমে স্থানীয় জ্ঞান কেন্দ্রে পরিণত করার একটা চেষ্টা বলা যেতে পারে। স্থানীয় সংবাদপত্র তার অনলাইন ভার্সণ কমিউনিটি রেডিও কমিউনিটি টেলিভিশন আর মোবাইল ফোন মিলে সাংবাদিকতার এক নতুন রুপ দেয়ার প্রযুক্তিগত সুবিধা আমাদের নাগালের মধ্যেই।

লেখক: সাবেক মহাপরিচালক, বাংলাদেশ প্রেস ইনস্টিটিউট ও সহযোগী অধ্যাপক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।

(রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির (রাবিসাস) ৪৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে তিন দিনব্যাপী উৎসবের প্রথম দিন ৪জুলাই ২০১৩ ‘ঢাকার বাইরের ও ক্যাম্পাস সাংবাদিকতা: সমস্যা ও সম্ভাবনা’ শীর্ষক এক সেমিনারে প্রবন্ধটি উপস্থাপন করা হয়।)
 

আরও সংবাদ