Widget by:Baiozid khan

ঢাকা Tue November 20 2018 ,

  • Advertisement

সৎ সাংবাদিকতা ও কিছু কথা

Published:2013-07-18 06:35:05    


মাহমুদা ডলি : সকাল বেলা ফোনটা বেজে উঠলো। রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে পরিচিত কন্ঠস্বর। বললেন, মাহমুদুর রহমান ও আমারদেশের সাংবাদিকতার বিরুদ্ধে দুদিন ধরে মশিউল আলমের লেখা প্রকাশিত হচ্ছে। তোমাদের সাংবাদিকতা হয় না, এমন কিছু কথা বলা হয়েছে। সেখানে তোমার রিপোর্টের সমালোচনা রয়েছে। শুনে কোনো জবাব না দিয়ে ফোন কেটে দিলাম।  অফিসে গিয়ে দুদিনে প্রকাশিত প্রথম আলোর লেখা পড়লাম।
১১ ও ১২ জুন মশিউল আলমের লেখা আমারদেশ’র সাংবাদিকতা পড়লাম। আমি স্তম্ভিত, হতবাক, বিস্মিত। যেখানে মাত্র ক’দিন আগে মাহমুদুর রহমান ও দৈনিক আমারদেশ নিয়ে ১৫ জন সম্পাদক বিবৃতি দিলেন। সেখানে মশিউল আলম কি করে তথ্য বিকৃতি করে এসব কথা বলেছেন! দৈনিক আমারদেশ পত্রিকার প্রেস বন্ধের ঘটনায় গণমাধ্যমের জন্য যেখানে অশনি সংকেত হিসেবে উল্লেখ করলেন সম্পাদকরা, সেখানে এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়েও  রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির বাইরে যেতে পারলেন না তিনি। বারবার সাংবাদিকতার দায়িত্বশীলতা ও নৈতিকতা নিয়ে আমারদেশ’র দিকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে আঙ্গুল তুলে বরং তার নিজের অনৈতিকতার নজির দেখালেন। লেখার মধ্যে তিনি নিজেই জার্নালিজমের রেসপন্সিবিলিটিজের বাইরে থেকে কথা বলেছেন। এমনকি তার এসব কথা প্রথম আলোর পলিসি অনুযায়ী কর্পোরেট রেসপন্সিবিলিটিজও বহন করে কিনা তাতেও সন্দেহ রয়েছে। সব ধরনের যুক্তিতর্কের বাইরে থেকে শুধুমাত্র তিনি একজন আওয়ামী লীগের কর্মীর মতো কিছু সমালোচনা উগরে দিলেন। যাতে  ভিন্নমতালম্বী মাহমুদুর রহমানের ওপর সরকারের জেল, জুলুম, স্বৈরাচারী, ফ্যাসিবাদী আক্রমণ অটুট ও অব্যাহত থাকে। ওই সাংবাদিক তার কলামে বলেছেন, ‘২০ ফেব্রুয়ারি দৈনিক আমারদেশ পত্রিকার প্রথম পাতায় প্রধান শিরোনাম ছিল ব্ল¬গে নাস্তিকতার নামে কুৎসিত অসভ্যতা’। কয়েকজন ব্লগারের নামের সঙ্গে নাস্তিক ও ধর্মবিদ্বেষী বিশেষণ দেয়া হয়েছে বলে ওই সাংবাদিকের গাত্রদাহ হলো। তার বড় ক্ষোভ, কেন আমারদেশ এদেরকে নাস্তিক বলল?  আমার প্রশ্ন, উনি সেই সময় কোথায় ছিলেন?  এসব সংবাদ প্রকাশের আরো এক বছর আগে ইসলাম বিদ্বেষী এসব ব্লগারদের খুঁজে বের করতে হাইকোর্ট নির্দেশনা দিয়েছিল। যা আমারদেশ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। ২৮ মার্চ আরো একটি সংবাদ প্রকাশিত হয়েছিল হাইকোর্টের আদেশের ১ বছর পর মনিটরিং সেলের কাজ শুরু। এর জের ধরে সরকার কিন্তু ওই নাস্তিক ব্লগারদের কয়েকজনকে গ্রেফতারও করেছে। তাহলে দৈনিক আমারদেশ মিথ্যা সংবাদ প্রকাশ করলো কোথায়? যা সত্য সেগুলো তুলে ধরাই আমারদেশ’র যদি অপরাধ হয়ে থাকে। তাহলে একই অপরাধ প্রথম আলোও করেছে।  কারণটা মশিউল আলমের লেখার মধ্যে থেকেই তুলে ধরছি। উনি ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন যে ‘শাহবাগ ছিল উত্তাল। আর সেই উত্তাল শাহবাগ নিয়ে দৈনিক আমারদেশ কথা বলেছে’। মশিউল আলমের মতো যেসব সাংবাদিকরা মাহমুদুর রহমান দৈনিক আমারদেশের বিরুদ্ধে ধর্মীয় উস্কানির দোহাই  দিচ্ছেন। তাদের কাছে প্রশ্ন, আপনাদের এটা কি ধরনের সাংবাদিকতা? কি ধরনের দায়িত্বশীলতা? ওই শাহবাগে বসে দৈনিক আমারদেশসহ ভিন্নমতের গণমাধ্যম বন্ধের দাবি জানানো হলো। অথচ তখনো পর্যন্ত শাহবাগ নিয়ে আমারদেশ কোন কথা বলেনি। আপনারাও শাহবাগ নামের সরকারের দলীয় ক্যাডার-সাঙ্গপাঙ্গদের আমারদেশ বন্ধের জন্য উস্কে দিয়েছিলেন। এছাড়াও শাহবাগে নাস্তিক ব্ল¬গাররা ঘোষণা দিয়েছে ফাঁসি চাই, জবাই করো... ইত্যাদি ইত্যাদি। ওই সব স্লোগান প্রথম আলোতে প্রধান প্রতিবেদন হিসেবেও প্রকাশিত হয়েছে। ওই উস্কানিতে জামায়াত শিবির নিধনের নামে সারাদেশে ১৭২ জনকে পাখির মতো নির্বিচারে গুলি করে মারলো পুলিশ। তাতে বাদ যায়নি নারী ও শিশুরাও। ওই সময় এ ধরনের হত্যাকা-ের প্ররোচনাকারী উত্তাল শাহবাগের প্রকৃত ফ্যাসিবাদী চরিত্র তুলে ধরে পানি ঢেলে দিয়েছে দৈনিক আমারদেশ। এমনকি গত ১৭ জুন আন্দালিব রহমান পার্থ এমপি  জাতীয় সংসদে হেফাজত নিয়ে কথা বলেছেন। কিন্তু প্রথম আলোতে ১৮ জুন ওই এমপির বক্তব্যের একাংশ নিয়ে যে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে তাতে হেফাজতকে জঙ্গিবাদী হিসেবে ঘোষণা দেয়া হয়েছে। এগুলো কি উস্কানি নয়? ইসলামিক সংগঠন বিদ্বেষী, কয়েকটি মিডিয়া  ধর্মনিরপেক্ষতার নামে শাহবাগকে  উস্কানি দেওয়ার পেছনের লুকিয়ে থাকা ষড়যন্ত্র ও মুখোশ উন্মোচন করে দিয়েছে আমারদেশ ও মাহমুদুর রহমান। আর তাই মশিউল আলমদের মতো কতিপয় সাংবাদিক নামধারী রাজনৈতিক কর্মীদের ব্যক্তিগত স্বদিচ্ছা পূর্ণ না হওয়ার ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশে মাহমুদুর রহমানের বিরুদ্ধে উল্টো ধর্মীয় উস্কানির অভিযোগ আনা হয়েছে। সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে এসব সাংবাদিকরা হাইকোর্টের পূর্ব নির্দেশনা নিয়ে একটি কথাও বলেননি। বরং একমাত্র মাহমুদুর রহমান ভীতিতেই স্বৈরতান্ত্রিকতার আদলে নিজেদের ওপর নিজেরা মূল্য নির্ধারণ করে ন্যূনতম চেতনাকেও ভূলুন্ঠিত করছেন। শুধু তাই নয়, তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনুসহ সরকারের একাধিক মন্ত্রী-এমপি শাহবাগ মঞ্চের নেতৃত্বদানকারীদের অন্যতম ব্লগার রাজীবের ইসলাম অবমাননামূলক পোস্টগুলো সম্পর্কে নির্লজ্জ মিথ্যাচার করেছেন। অথচ নাস্তিক ব্লগার আসিফ মহিউদ্দীন ও রাজীব হায়দারের বিরুদ্ধে ইসলাম অবমাননা, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত ও আদালত অবমাননার কারণে মহামান্য হাইকোর্টে একটি রিট (নং ৮৮৬/১২) করা হয়। এ রিটের ওপর শুনানির পর গত বছর ২১ মার্চ রিট আবেদনটি গ্রহণ করে ব্ল¬গগুলো স্থায়ীভাবে বন্ধের বিষয়ে সরকারের প্রতি রুল জারি করা হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে তারা গ্রেফতারও হন। ২০১২ সালের ২১ মার্র্চ আদালত ওয়েবসাইট ও ব্ল¬গগুলো বন্ধ রাখার নির্দেশ দেয়। শেষ পর্যন্ত ক্ষমতাসীন সরকারের ভেতরকার প্রভাবশালী মহলের বাধার কারণে আইনশৃক্সক্ষলা বাহিনী তাদের এসব  ব্ল¬গ ও ব্লগারের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি। এ সম্পর্কে পর্যাপ্ত তথ্য-প্রমাণসহ কয়েকটি জাতীয় পত্রিকায় খবর প্রকাশিত হয়েছে। এখন প্রশ্ন, যদি ব্ল¬গে এসব অশালীন বক্তব্য, কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য ও আপত্তিকর পোস্ট তারা নিজেরা না দিয়ে থাকেন তাহলে মাননীয় উচ্চ আদালত ধর্ম ও আদালত অবমাননার দায়ে ব্লগগুলো বন্ধ করার এবং তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দিলেন কীভাবে?
আমারদেরশ পত্রিকার আরো কয়েকটি সংবাদ নিয়ে  অপব্যাখ্যা দেয়া হয়েছে। যেমন- ব্লগার রাজীব খুন হওয়ার মাত্র ৩ দিন পরই ১৯ ফেব্রুয়ারি প্রথম পাতায় দুই কলামে রাজীবের ছবিসহ একটি লেখা ছাপা হয়েছে ‘ধর্মদ্রোহী নষ্ট তরুণের প্রতিকৃতি ব্লগার রাজীব’ শিরোনামে। ওই লেখায় নাকি রাজীবের চরিত্র হনন করা হয়েছে, রাজীবের বান্ধবী পরিচয়ের দুই নারীর নাম উল্লেখ করায় তাদের সম্মান ক্ষুণœ হয়েছে। এমনকি তারা ইচ্ছা করলে আমার বিরুদ্ধে আইনগত পদক্ষেপও নিতে পারতেন বলেও বলা হয়েছে। কিন্তু যুক্তিসঙ্গত, আইনগত  এবং  একটি অনুসন্ধানী রিপোর্টে যা যা থাকে সবগুলোই আমি আমার রিপোর্টে তোলে ধরেছি। শুধু একটা নয় দু’টি রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছিল রাজীব হত্যা মামলা নিয়ে। জনাব মশিউল আলমের লেখায় দুর্বলতা ধরা পড়বে বলেই তিনি এসব বিষয়গুলো ব্যাখ্যা না দিয়ে নিজের কথাগুলো বলেছেন। কিন্তু যারা রাজীবের প্রতি অতিরিক্ত ভালোবাসায় শহীদ বিশেষণ মুছে যাওয়ায় কষ্ট পেয়েছেন। তাদের উদ্দেশ্যে বলছিÑ রাজীবের বান্ধবীদের নাম আমারদেশ পত্রিকার আবিষ্কার নয়। রিপোর্টে বলা হয়েছিলÑ পুলিশই রাজীবের আত্মীয়ের বাসা থেকে তাদের গ্রেফতার করেছে। তাদের সম্পৃক্ততার কথা পুলিশই বলেছে। পরবর্তীতে পুলিশের নীরব ও রহস্যজনক ভূমিকা থাকায় আমারদেশ এ অনুসন্ধানী রিপোর্ট করে। এমনকি গ্রেফতারের ১৫ মিনিটের মধ্যেই পল্ল¬বী থানা থেকে তাদের ডিবি পুলিশ নিয়ে আসে সন্দেহজনকভাবে। পল্ল¬বী পুলিশ বলেছিল, মামলার তদন্তে তাদের সফলতা দেখানোর আগেই কেন যে ডিবি পুলিশ মাত্র ১৫ মিনিটের মধ্যে নিয়ে গেল তা তারা বুঝে উঠতে পারছেন না। রাজীবের বান্ধবীদের গ্রেফতারের বিষয় প্রাথমিকভাবে কিছু আলামত পাওয়া গেছে বলেও আনুষ্ঠানিকভাবে সাংবাদিকদের সাথে ডিবি পুলিশ শেয়ার করেছিল। যা  আমারদেশসহ অনেক পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। এমনকি কোন আইনের ভিত্তিতে  ৫/৭ দিন ওই দুই নারীকে ডিবি পুলিশ তাদের নজরে রেখে ছিল, মিডিয়ার দৃষ্টি থেকে আড়াল করতে?
তারপর এলো রাজীবের চরিত্রের কথা। ওই রিপোর্টের কোথাও সাংবাদিক বা সম্পাদকের ব্যক্তিগত মতামত নেই। রাজীবের শ্বশুর বাড়ির লোকজনের সাথে দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে রাজীবের চরিত্র ফুটে ওঠেছিল। সেগুলোই তাদের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়েছিল। তাহলে নীতি নৈতিকতা ক্ষুণœ হলো কি করে? নাকি শহীদ উপাধী পাওয়া রাজীবের বিশেষণটি মুছে যাওয়ায় মশিউল আলমদের ক্রোধের বহিঃপ্রকাশ, তাদের দেয়া ওই স্লোগানটি আমারদেশ’র জন্য নস্যাৎ হয়ে গেছে বলে ক্ষোভের আগুনে যা ইচ্ছে তাই বলা হচ্ছে! মজার ব্যাপার হলো ওই  সংবাদ লেখার পরে শাহবাগীরাও কিন্তু রাজীব নামের ওই ব্লগারকে অস্বীকার করেছে। এখন কথা হচ্ছে রাজীবের বান্ধবী ও রাজীবের ব্যাপারে সংবাদ প্রকাশ করায় যদি আমারদেশ পত্রিকা, মাহমুদুর রহমান বা আমার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হয়। তাহলে সবার আগে পল্লবী থানা পুলিশের বিরুদ্ধে আগে ব্যবস্থা নেয়া উচিত। পুলিশের দেয়া তথ্য অনুযায়ী আরো যারা ওই দুই নারীকে নিয়ে সংবাদ প্রকাশ করেছে তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেয়া উচিত নয় কি? বিষয়টি যদি সাংবাদিকতার নীতিমালা, দায়িত্বশীলতা ও নৈতিকতার প্রশ্নে আসে তাহলে মশিউল আলমের মতো সাংবাদিকদের জন্য এ ধরনের অসত্য, যুক্তিতর্ক দিয়ে বিভ্রান্তি ছড়ানো এবং স্বৈরাচারকে উস্কে দেয়াটা সমানভাবে প্রজোয্য। সাংবাদিকরা যদি নিজেদের ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধির জন্য অসত্য দিয়ে সংবাদপত্র ও সাংবাদিকদের স্বাধীনতার পরিপন্থী কাজ করেন । তাহলে এদেশের সাধারণ মানুষের আস্থাটা কোথায়? কোথায় গেল সেই সব সাংবাদিকদের দুর্নীতিমুক্ত, সংবেদনশীল ও মানবাধিকার রক্ষার প্রতিশ্রুতি? সাধারণ মানুষের প্রতি নিরপেক্ষতা দেখাতে না পারার জন্য খেসারতও কিন্তু কম দিতে হয়নি তাদের। স্থূল অর্থে না হলেও সূক্ষ্ম অর্থে এসব কমিউনিস্ট ঘরানার সাংবাদিকদের মতাদর্শের সঙ্গে মানুষের নাড়ির কোন যোগ নেই। জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া এসব সাংবাদিকদের মতাদর্শ এদেশের মানুষ গ্রহণ করে না। তাই নিজেদের মতাদর্শকে টিকিয়ে রাখতে এবং তা অন্যদের ওপর চাপিয়ে দিতে ভিন্নমতাদর্শের জনপ্রিয় লেখক সাংবাদিক মাহমুদুর রহমানের বিরুদ্ধে মিথ্যাচার করা হচ্ছে। তার ওপর চালানো সরকারের জুলুমকে আরো উস্কে দেয়া হচ্ছে। এটা কোনভাবেই সৎ সাংবাদিকতার পর্যায়ে পড়ে বলে মনে হয় না।

আরও সংবাদ